শাশুড়ি

শাশুড়ি

বিয়ের পর প্রথম জামাইষষ্ঠী! তাঁর পরিবারের সবাই খুশীতে মাতোয়ারা! শুধু নন্দিতাই ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে। যা বদমেজাজি বর জুটেছে কপালে! পান থেকে চুন খসলেই চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। প্রথম প্রথম তো সে কেঁদেই ফেলত। খালি মনে হত বাবা-মা এ কার হাতে তাকে তুলে দিল?

সারাটা জীবন এই লোকের সাথে সে কাটাবে কি করে? তারপর মাস কয়েক যেতে বুঝল মানুষটা খারাপ না। কিন্তু ওই একটাই সমস্যা! মতে না মিললেই অয়নের মাথা গরম হয়ে যায় আর তখন তাঁর কিছুই খেয়াল থাকে না। না! গালিগালাজ সে করে না! শুধু নন্দিতার বাপের বাড়ির মানুষদের অকারণ অপমান করে। রান্নায় নুন কম হলে সেটা নন্দিতার মা-বাবার দোষ!

–“আসলে শিক্ষার অভাব! তোমার মা-বাবাই তোমায় বিগড়েছে! রান্নাটাও ঠিকমত করতে পার না!” কিংবা হয়তো অফিস যাওয়ার সময় ঘড়িটা খুঁজে পাচ্ছে না, সেটাও তাঁদেরই দোষ!
-“তুমি আর গোছাতে শিখবে কি করে! বাপের বাড়ির যা ছিরি! অশিক্ষিত লোকে ভর্তি!” বিয়েতে পাওয়া শার্টের রঙ পছন্দ হয়নি বলে তাঁর বক্তব্য ছিল
-“তোমার বাপের বাড়িতে একজনেরও যদি পছন্দ বলে কিছু থাকে! এটা একটা কালার হল? আনকালচার্ড পাবলিক সব!”

স্বভাবতই আজকের খাওয়াদাওয়া থেকে উপহার সব কিছু যাতে নিখুঁত হয় তার জন্য নন্দিতা রোজ তাঁর মাকে রীতিমত উত্যক্ত করেছে। আর তার সুফলও পেয়েছে। মা ষষ্ঠীর কৃপায় সকাল থেকে কোনো সমস্যা হয়নি। তবু সে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। অথচ মা কি সুন্দর স্মিতমুখে নিশ্চিন্তে দুপুরের খাওয়ার আয়োজন করছেন। সে কয়েকবার রান্নাঘরে উঁকি দিয়েছে মেনু জানার জন্য। কিন্তু মা প্রতিবারই তাকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন। বাধ্য হয়ে সে ঘরে বসে অয়ন আর তাঁর বাবার গল্প শুনছে। আর প্রতিমুহূর্তেই ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছে যেন বাকি দিনটাও এইরকম ভাবেই কেটে যায়। যথাসময়ে নন্দিতার মা, নন্দিতার বাবা এবং অয়নকে খেতে ডাকলেন। নন্দিতা তাঁদের পিছু পিছু খাওয়ার জায়গায় পৌঁছে অবাক হয়ে দেখল তাঁর মা টেবিলটাকে সরিয়ে মাটিতে দুজনের খাওয়ার জায়গা করেছেন। অয়নকে দেখে তাঁর মা বলে উঠলেন

-“বস বাবা! এখানে বস!”
-“টেবিলে খেলেই তো হতো! আবার নীচে আলাদা করে…”
-“টেবিলেই করব ভেবেছিলাম বুঝলে বাবা!

কিন্তু কাল তোমার শ্বশুরমশাই একটা বই কিনে এনেছেন – জামাইষষ্ঠীর এ টু জেড! তাতে দেখলাম লিখেছে যে মাটিতে বসে খেলে খাবার হজম হয় ভালো। তাই মাটিতেই জায়গা করে ফেললাম!” নিরূপায় অয়ন কোনোরকমে তাঁর প্যান্টশার্ট সামলে মাটিতেই বসলে নন্দিতার মা এক এক করে বিচিত্র রঙের সব পদ হাজির করতে শুরু করলেন।

-“নাও বাবা! শুরু করো! এই-এইটা আগে খাও! উচ্ছে সেদ্ধ!
-“উচ্ছে! আজ জামাইষষ্ঠীতে আমি উচ্ছে সেদ্ধ খাবো?”
-“হ্যাঁ বাবা! খেয়ে নাও! উচ্ছের অনেক উপকারিতা বুঝলে বাবা! ওই কাল যে বইটা তোমার শ্বশুরমশাই এনেছেন! ওতে লেখা আছে! খুব ভালো বই!”
-“আর এই লাল রঙের – এটা কী?”

-“এটা বাবা বীট পোড়া! খুব উপকারী! আর ওই যে সাদা সাদা দেখছ! ওটা চিংড়ির স্যুপ! হালকা তেলে করেছি! হলুদ ছাড়া! আর ওই যে শেষে হালকা হলুদ রঙের পদটা দেখছ! ওটা চিকেনের স্ট্যু! শুধু একের চার চা চামচ মাখন দিয়ে বানিয়েছি! খেয়ে নাও বাবা!”

-“আপনি আমায় এইসব খেতে দিয়েছেন?”
-“হ্যাঁ বাবা! ওই যে তুমি বলো না যে আমরা একদম অশিক্ষিত। ঠিকই বলো বাবা! আসলে কিছুই তো শিখিনি এই জীবনে! তবু কথায় বলে শেখার কোনো বয়স নেই! তাই ভাবলাম এবার সব শিখে-পড়ে নিয়ে এগোব। প্রথম জামাইষষ্ঠী বলে কথা! তাই কাল তোমার শ্বশুরমশাইকে দিয়ে ওই…”

-“বই তো?”
-“হ্যাঁ বাবা!”
-“খুব ভাল করেছেন মা! শুধু একটাই প্রশ্ন! আমার স্বাস্থ্যের এতো খেয়াল আর ওঁর বেলায় সব বেখেয়াল?”
-“নন্দুর বাবার কথা বলছ বাবা? সেতো আর আমার জামাই নয়! আর তাছাড়া! বয়স হয়ে গেছে! কবে কি হয়ে যায়! খেয়ে নিক আশ মিটিয়ে! কই বাবা! সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল যে! তুমি শুরু করো!”

অয়ন থালাটা টেনে নিতেই নন্দিতা আর থাকতে পারল না। এক দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে কলটা চালিয়ে দিয়ে সজোরে হাসতে শুরু করল। তারপর সেদিন আর কী কী হয়েছিল ঠিক জানা যায় না! তবে নন্দিতা এখন অয়নকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে সংসার করছে। নন্দিতা এখন সুখী ও খুশী।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত