ডায়েরীর শেষ কটা পৃষ্ঠায়

ডায়েরীর শেষ কটা পৃষ্ঠায়

অনেকদিন পর ফেসবুকে এসে নিজেকে কেমন যেন এলিযেন মনে হচ্ছে। ম্যাসেজবক্সে ১০০এর উপরে ম্যাসেজ জমা হয়ে আছে। কমবেশি সবারই প্রশ্ন, “এতোদিন কই ছিলেন আপনি?” কেউ কেউ আবার প্রশ্ন করেছে, “আপু, তোমার কি বিয়ে হয়ে গেছে?” তাদের প্রশ্ন দেখে আমি নিজেই কনফিউশড হয়ে গেলাম। আসলেই তো….

আমি এতোদিন কোথায় ছিলাম? নিজেরই তো মনে নেই। ও হ্যা, মনে পড়েছে। আমার স্মুতিশক্তি হারিয়ে গিয়েছিল। তাও মায়ের মুখে শোনা। আমার স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছিল! ব্যাপারটাতে কেমন যেন সিনেম্যাটিক ভাব আছে। নায়িকার স্মৃতি হারিয়ে গেছে। কাউকে চিনতে পারছে না। সবাই নায়িকাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। তারপর নায়ক এসে নায়িকার স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে। তবে আমার সাথে এতটুকুর মিল নেই। কারন আমার জীবনে নায়ক নামে কেউ কখনো ছিল না। যাকে নায়ক ভাবতাম, সে কখনো আমার গল্পের নায়ক ছিল না। হয়ত ছিল.. কিন্তু আমি দেখি নি কিংবা খেয়াল করি নি। আমাকে অনলাইনে দেখে অনেকেই ম্যাসেজ করা শুরু করেছে।

যাইহোক, সবার ম্যাসেজের রিপ্লে করে সবার শেষে আদিলের ম্যাসেজের রিপ্লে দিলাম। আমি রিপ্লে দেয়ার ৫সেকেন্ডের মধ্যে পাল্টা রিপ্লে চলে আসলো। লিখেছে- “আপনার কি হয়েছিল নিপুন? এতদিন কই ছিলেন? কেমন ছিলেন?” “আমি অসুস্থ ছিলাম। স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিলাম।” “বলেন কি! আমি তো কিছুই জানতে পারলাম না। কেউ আপনার কোন খোঁজ দিতে পারে নি আপনার।” “হ্যা। তবে স্মৃতি না ফেরাই ভালো ছিল। রেজাল্টের দুঃস্বপ্ন আবার দেখা শুরু করেছি। আমি কি এতটাই খারাপ স্টুডেন্ট ছিলাম, বলুন? প্লাসটা মিস হয়ে গেল।” “এখন এসব নিয়ে ভেবে কি হবে? এডমিশনের দেয়া উচিত ছিল আপনার। কিন্তু আপনিই হাপিস হয়ে গেলেন। এখন বিসিএস-এর জন্য পড়াশুনা করেন। ওস্তাদের মাইর কিন্তু শেষ রাতেই হয়।” আমি হাসির ইমো দিয়ে বললাম, “পড়াশুনা আর করে কি হবে? জীবন এখন আর ভালো লাগে না। জীবনের প্রতিটা অলিগলি এখন আমার অচেনা লাগে। “ আদিল স্ট্রেট বলে দিল, “প্রেম করেন।”

আমি না হেসে পারলাম না। যে মানুষটা মাত্র দুদিনের অতিথি এই পৃথিবীতে, তার এসব করে কি লাভ? কিছু না বলেই ফেসবুক জগত থেকে বেরিয়ে আসলাম। ভালো লাগছে না কিছু্। রক্তিমকে চিঠি লিখতে বসলাম। আগে মন খারাপ হলেই ওকে চিঠি লিখতাম। যদিও কোন চিঠিই পোস্ট করা হয় নি। পিচ্চি, আজ অনেকদিন পর আবার তোমাকে লিখতে বসলাম। ইচ্ছে করেই যে লিখি নি তা কিন্তু নয়।সময় পাই নি। তাছাড়া আমি তোমাকে চিঠি লিখলেই কি আর না লিখলেই কি। তোমার তো আর কিছু যায় আসে না। আজ আমার মন ভালো নেই, পিচ্চি। স্বাস্থ্যও ভালো নেই। ডাক্তার বলেছে আমি নাকি এখন অতিথি তোমাদের পৃথিবীতে!

আচ্ছা, তোমার দুনিয়ায়ও কি আমি অতিথি? চলো না পিচ্চি, আমার সংসার শুরু করি। ছোটবেলায় বরছাড়া যে বর-বউ আর রান্নাবাড়া খেলা খেলতাম তা এখন তোমায় নিয়ে আবার শুরু করি। তুমি বাজার করে আনবে, আর আমি রান্না করবো। নুনের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে। কল্পনার মতো করেই সুন্দর একটা সংসার হবে আমাদের। জীবনটা এখন বড় পানসে আর অসহ্য লাগে আমার। এত অরুচি কেন আমার? ইদানিং সত্যিই মনে হচ্ছে ডাক্তার কাকুর কথাই সত্য। হুট করেই ফাঁকি দিবো সবাইকে। তোমাকেও ফাঁকি দিবো। হিহিহি!

আমার কি হয়েছে তা জেনে কি হবে বলো? তবুও তোমার জানার আক্ষেপ থাকবে হয়ত। তাহলে বলেই দেই। আমার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে। ভালো হযেছে না বলো? তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে। আমি তোমাকে ছুটি দিয়ে দিবো খুব শিঘ্রই।
তুমি এখন কার শহরে বাস করো? আমি তোমকে তোমার শহরে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু পাই নি। আবারো তোমার শহরে শেষবারের মতো হানা দিবো আমি। তোমার শহরে আমার হৃদয় পোড়ার কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে দিবো আমি। দেয়ালের প্রতিটা ইট-পাথরে আমার নাম খোদাই করে দিব। তুমি যখন তোমার শহরে ফিরে আসবে, তখন শুনতে পাবে আমার নামের প্রতিধ্বনি। গন্ধ পাবে হৃদয় পোড়ার। তখন তুমি বুঝতে পারবে- কেউ তোমায় কতটা ভালোবেসেছিল। তখন তুমি আফসোস করবে? কিন্তু কিসের জন্য? আমাকে কাছে থেকে একটাবার না দেখার জন্য? একগুচ্ছ বকুল ফুল না দিতে পারার জন্য?

আচ্ছা যাও। আমার সাথে সংসার করতে হবে না তোমাকে। কিন্তু কারো না কারো সাথে তো তোমায় সংসার করতেই হবে। তার মাঝে কি তুমি আমায় খুঁজবে? আমার কিন্তু তখন একটুও আফসোস হবে না। একটুও কষ্ট পাবো না। তুমি সুখী হলেই আমি সুখী হবো। সব চাওয়া যে পূর্ণতা পেতে হবে এমনটা তো নয়। তাইনা? ভালো থেকো তুমি। তোমার আগামী নতুন সংসার নিয়ে।

ইতি,
যাকে বউ ভাবতে।

চিঠিটা লিখে নিজের কাগজটা দুমড়ে মুচড়ে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিলাম। কি হবে এসব লিখে? বাসার কারো মন ভালো নেই আমার জন্য। কি যে করবো বুঝতে পারছি না। মা আমাকে দেখলেই হুহু করে কেঁদে উঠে আঁচলে মুখ লুকান। আর বাবাকে তো দেখাই যায় না ইদানিং। কখন যে বাসায় ফিরেন আর কখন বেরিয়ে যান সেটাই বুঝতে পারি না। সবার এতো অভিমান কেন আমার উপর? এ কদিন আমার সাথে একটু হাসিহাসি মুখ নিয়ে কথা বলবে তা না। মুখ গোমড়া করে রাখেন। এসব দেখে কি আমার ভালো লাগে।

ঋত্বিকটাও কেমন যেন হয়ে গেছে ইদানিং। এখন আর আমার সাথে তেমন মেশে না। হয়ত আমাকে ছেড়ে থাকার অভ্যাস করছে। আমি না থাকরে এই পাগলা ভাইটার কি যে হবে কে জানে। হয়ত তখন সিরিয়াস হয়ে যাবে জীবন নিয়ে। আমিও কি ঐ নীলের জগতের তারা হতে পারবো? সেখান থেকে কি আমার পাগলা ভাইটাকে দেখতে পাবো? ওর সাথে একদিন কথা না বললে আমার দিন কাটাতে কষ্ট হয়। আর আমি না খাইয়ে দিলে নাকি ওর পেট ভরে না। কিন্তু আমি না থাকলে ও থাকবে কেমন করে? আর আমিইবা কেমন করে থাকবো? গতকাল রাতে সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আমি ওর ঘরে উকি দিয়েছিলাম। দেখলাম ভাইটা কাঁদছে। কষ্ট লেগেছিল খুব। কিন্তু কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেই নি। নিজেকে হালকা করে নিচ্ছে হয়ত।

উপরওয়ালার দেখা যদি পেতাম তাহলে বলতাম আমার মা-বাবা অঅর ভাইটাকে কষ্ট থেকে দূরে রাখতে। আমি নেই একথাটা যেন তারা কখনো অনুভব না করেন। দিন তো এমভাবেই কেটে যাচ্ছে এখন। রাতের ঘুমও হারিয়ে যাচ্ছে। আমি নতুন জগত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছি এখন। প্রস্তুতি নিয়ে রাখাই ভালো। হুট করেই যেদিন শুনেছিলাম আমার ব্রেইন ক্যান্সার হয়েছে, সেদিনই আমি শেষ কান্না করে নিয়েছিলাম।

আজকে সকালে জারিন , নওশীন, তায়মা আর রশ্নি দেখতে এসেছিল আমাকে। মা-বাবা আর ভাইয়ের পর ওরাই আমার কাছের মানুষ। ওরাও কেউ হাসতে পারছিল না। অথচ আমি দিব্যি হেসে হেসেই কথা বলেছিলাম ওদের সাথে। বিদায়ও দিয়েছি হেসেই। কি অদ্ভুত! আমার একটুও কষ্ট লাগছে না কারো জন্য। অথচ আমার এখন কান্নায় ভেঙ্গে পড়া উচিত ছিল। আমার অনুভূতিগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত