আদিকালে রাজা-মহারাজা

আদিকালে রাজা-মহারাজা

আকাশ-ভরা সূর্য-তারা, বিশ্ব প্রাণ,
তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান
বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।……

জীবনে অনেক কিছু করেছি। যা করিনি, তা হচ্ছে বাপ-ঠাকুরদার পদাঙ্ক অনুসরণ। সংসারের আর পাঁচজনের মতো ভালহৌসী স্কোয়ারে চাকরি নিলাম না। পরমাত্মীয়দের বিয়েতে বরযাত্রী গেলাম না, বৌভাত খেলাম না। একটা তাঁতের শাড়ী বা ইলেকট্রিক ইস্ত্রি বা টেবিল ল্যাম্পও প্রেজেন্ট করতে পারলাম না। অফিসের পশ্চিমী দারোয়ানের কাছ থেকে পনেরো টাকা ধার করে জামাই ষষ্ঠীর দিন সিল্কের পাঞ্জাবি চড়িয়ে অরক্ষণীয়া শালীকে নিয়ে ঠাট্টা ইয়ারকি করার দুর্লভ সুযোগও এলো না জীবনে।

আরো অনেক কিছুই হলো না এই জীবনে। জিমন্যাষ্টিক প্লেয়ারদের মতো এক আঙ্গুলের ‘পর সমস্ত দেহের ভর রেখে বাসে চড়ে ঘুরে বেড়ানো দেখাতে পারলাম না, পাঁচ টাকা ইনক্রিমেন্টের জন্য দেড় বছর ধরে আন্দোলন করতে পারলাম না, সাত্ত্বিক ভোজপুরী ব্রাহ্মণ পুলিশ কনষ্টেবলের পবিত্র লাঠির ঠেঙানি খেয়ে শহীদ হওয়াও সম্ভব হলো না। ধাপার কপি, বনগাঁর কাঁচাগোল্লা, কেষ্টনগরের সর ভাজা, মালদার ফজলিও কপালে জুটল না। বিজয়া দশমীর পর গুরুজনদের প্রণাম করে নারকেলের ছাপা সন্দেশ না খেতে পারার জন্যও কি কম দুঃখ হয়?

এসব কিছুই হলো না কিন্তু বিবেকানন্দ-রবীন্দ্রনাথ-সুভাষচন্দ্রের বাংলাদেশে থাকলে আরো কিছু কিছু সম্ভাবনা ছিল। শিক্ষাবিদ হলে শ্রমিকদের মতো তিন-শিফট-এ কাজ করার দুর্লভ সুযোগ পেতাম, সর্বত্যাগী রাজনীতিবিদ হলে বিনা রোজগারেও বেশ মেজাজের সঙ্গে সঙ্গে সংসার চালাতে পারতাম, উদভ্রান্ত শ্রমিক নেতা হলে আমার তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও অপগণ্ড ভাইপো গুলোকে কল-কারখানার মালিক নিশ্চয়ই জোর করে চাকরি দিত। পোড়া কপালে তাও হলো না।

মোন্দাকথায় ঠিক মধ্যবিত্ত ভদ্দরলোক বলতে যা বোঝায়, আমি তা হলাম না বা হতে পারলাম না। কেউ বলেন ম্লেচ্ছ হয়েছি, কেউ বলেন গোল্লায় গেছি। আমি নাকি যা-তা খাই, যেখানে-সেখানে যাই, যাঁর-তাঁর সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। অভিযোগগুলো যে মিথ্যে, তা নয়। কখনও জীবিকার তাগিদে, কখনও জীবনের প্রয়োজনে মিশেছি অনেকের সঙ্গে। মিশেছি বড়লোক, ভদ্দরলোক, ছোটলোকের সঙ্গে। মিশেছি পুরুষের সঙ্গে, মেয়েদের সঙ্গে। তবে তারা সবাই মানুষ। জীবনের টানে, জীবিকার গরজে ঘুরেছি সারা ভারতবর্ষ, ঘুরেছি এশিয়ার নানা দেশ। পাড়ি দিয়েছি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা।

ছোট্ট ঘরে নিশ্চিন্ত জীবন আমি পাইনি। ঘরের থেকে বেরিয়ে এসে বিরাট আকাশের তলায় আশ্রয় নিতে হয়েছে আমাকে। ঘরের কোণে ছোট্ট প্রদীপের আলোয় অদৃষ্টের খেয়াঘাট খুঁজে পাইনি। শেষে আকাশ ভরা সূর্য-তারার আলোয় চিনে নিয়েছি সে খেয়াঘাট। তাইতো মনে হয় ভালবেসেছি আকাশ-ভরা সূর্য-তারাকে। আশঙ্কা হয় এই আকাশের কোন থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছোট্ট ঘরের নিশ্চিন্ত পরিবেশে নিজেকে কোনদিনই বন্দী করতে পারব না।

আমার এই আকাশ-ভরা সূর্য-তারার সঙ্গে যদি অন্য কারুর আকাশের সূর্য তারার কোন মিল থাকে, তবে তা নিতান্তই দুর্ঘটনা।

–নিমাই ভট্টাচার্য

.

১.

আদিকালে রাজা-মহারাজা, বাদশা-শাহেনশার দরবারে সভাকবির দল থাকতেন। তাঁরা রাজার কথা লিখতেন, ছোটরাণী, বড়রাণীর কথা লিখতেন। লিখতেন আরো কিছু। লিখতেন রাজ্যের কথা, রাজ্যশাসনের কথা, রাজ্যের খ্যাতিমান পুরুষদের কথা। আর লিখতেন রাজার মহানুভবতার, রাণীমার ঔদার্যের কাহিনী। মাঝে মাঝে রাজকুমারের মৃগয়ার কথা বা অষ্টাদশী পূর্ণযুবতী রাজকুমারীর রূপ-যৌবনের কাহিনী নিয়েও সভাকবির দল লিখতেন। সময়ে অসময়ে আরো অনেক কিছু লিখতে হতো। শত্রুপক্ষের নিন্দা করে কাব্যরচনা করতে হতো সভাকবিদের। কখনো-কখনো সুরাপানের প্রয়োজনীয়তা বা উপকারিতা নিয়েও লিখতেন তাঁরা। রাজার মনোরঞ্জনের জন্য দেহপসারিণী নাচিয়ে-গাইয়েদের নিয়েও চমৎকার কাব্যরচনা করে গেছেন অতীত যুগের ঐ সভাকবির দল।

অতীতকালের ইতিহাসের টুকরো-টুকরো ছেঁড়া পাতাগুলো খুঁজলে সভাকবিদের বিস্ময়কর প্রতিভার আরো অনেক পরিচয় পাওয়া যাবে। এইসব সভাকবিদের টুকরো টুকরো কাব্যকে অবলম্বন করে পরবর্তীকালের ঐতিহাসিকরা ইতিহাস লিখেছেন। সে ইতিহাস আমরা মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করেছি, কিন্তু ভুলে গেছি সভাকৰিদের। শুধু যে তাদের আমরা ভুলে গেছি, তা নয়। সভাকবিদের জীবনকাহিনী সম্পর্কে আমাদের অবজ্ঞা আমাকে বড় পীড়া দেয়; সভাকবিদের রচনা নিয়ে আমরা হৈ-চৈ করি, কিন্তু তাদের জীবনে কোনদিন সুখ-দুঃখ ভালবাসা-ব্যর্থতা নিয়ে আলো-আঁধারের খেলা হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে আমাদের কোন আগ্রহ নেই। সভাকবিরা সব কিছু লিখেছেন, লেখেননি শুধু নিজেদের কথা। হয়তো নিজেদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালবাসার জ্বালায় তাঁরা জ্বলেপুড়ে মরেছেন, কিন্তু সে কাহিনী লেখার সুযোগ কোনদিন তাঁদের জীবনে আসেনি।

আমরা খবরের কাগজের রিপোর্টাররাও হচ্ছি এযুগের সভাকবির দল। আমরাও রাজার কথা লিখি, মন্ত্রীর কথা লিখি, রাজার মহানুভবতা রাণীমার ঔদার্যের কথা, রাজ্যের কথা, রাজার বন্ধুদের কথা লিখি। অতীতের সভাকবিদের কাব্যের মতো আজকের দিনের খবরের কাগজের রিপোর্টারদের টুকরো-টুকরো রিপোর্টকে কেন্দ্র করে আগামী দিনের ঐতিহাসিকরা নিশ্চয়ই আজকের ইতিহাস লিখবেন। আগামী দিনের মানুষ সে ইতিহাস হয়তো মুগ্ধ হয়ে পড়বেন, কিন্তু মুহূর্তের জন্যও কেউ স্মরণ করবেন না রিপোর্টারদের।

সভাকবিদের টুকরো-টুকরো কাব্যের মধ্য দিয়ে যেমন অতীতের বহু মানুষের জীবন কাহিনীর একটা পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়, আজকের দিনের রিপোর্টারদের টুকরো-টুকরো রিপোর্টের মধ্য দিয়েও তেমনি বহু মানুষের জীবন-কাহিনীর একটা পূর্ণাঙ্গ ছবি ফুটে উঠবে। রিপোর্টারদের কলমে বা টাইপরাইটারে আজ যিনি ছাত্রনেতা বা ছাত্র-আন্দোলনের অন্যতম কর্মী, আগামী দিনে তিনিই হয়ত মন্ত্রী। মাঝখানে তাঁর কারাবরণের কথা ও মুক্তিলাভের খবরও ঐ একই টাইপরাইটারে লেখা হয়। শুধু কি তাই? ঐ একই রিপোর্টার হয়ত মন্ত্রীর পদত্যাগ, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, তার তদন্ত, তদন্তের খবর ফাঁস, সরকার কর্তৃক তদন্তের রিপোর্ট নাকচ, মন্ত্রীর দলত্যাগ, আবার পুরনো দলে ফিরে আসা, মন্ত্রীর বিদেশ ভ্রমণ, তাঁর প্রতিদিনের কাজকর্ম, এমন কি তার প্রেম, বিয়ে বা নার্সিংহোমে পুত্রসন্তান জন্মের খবরও ঐ রিপোর্টারের কলমেই লেখা হয়। অদৃষ্টের পরিহাসে ঐ মন্ত্রীর মৃত্যু সংবাদও হয়তো একই রিপোর্টারের টাইপরাইটারে লেখা হবে। দীর্ঘদিনের বিস্তীর্ণ পরিবেশে লেখা এইসব টুকরো-টুকরো খবর জুড়লে নিশ্চয়ই একটা জীবন-কাহিনীর পূণ রূপ দেখা যাবে। রিপোর্টারের দল সবার অলক্ষে হয়তো নিজেদেরও অজ্ঞাতসারে অসংখ্য মানুষের জীবন-কাহিনী লিখে যান। অতীতের সভাকবিদের মতো আজকের দিনের খবরের কাগজের রিপোর্টাররাও লেখেন না শুধু নিজেদের কথা, নিজেদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-ভালবাসা, আনন্দ-বেদনার ইতিহাস।

তাইতো নির্মলদার ইতিহাস হয়তো কেউ জানবেন না, কেউ এক ফোঁটা চোখের জল ফেলবেন না, কেউ তাঁর জীবনের আনন্দ বেদনার উষ্ণতা অনুভব করবেন না নিজেদের অন্তরে। নির্মলদার জীবন-নাট্যে আমি অভিনয় করিনি, ড্রপ সিন টানিনি, উইং স্ক্রীনের পাশ থেকে প্রম্পটারের কাজ করিনি, গ্রীনরুমেও যাইনি। তবে অদৃষ্টের পরিহাসে দুটি প্রাণীর জীবন-নাট্যের চরম কয়েকটি দৃশ্যের একমাত্র দর্শকরূপে আমি তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলাম।

নির্মলদা ও নির্মলাবৌদি দীর্ঘ ও বিচিত্র জীবনপথ পাড়ি দিয়ে ছিলেন। এক পান্থশালা থেকে আরেক পান্থশালায় গিয়েছেন ওঁরা দুজনে। আমি তাদের সহযাত্রী হবার গৌরব অর্জন করিনি, কিন্তু ওঁদের জীবনপথের প্রান্তসীমায় এক পান্থশালায় মাত্র কয়েকটি স্মরণীয় রাত্রির জন্য আমি সঙ্গী হয়েছিলাম। ধন্য হয়েছিলাম ঐ দুটি মহাপ্রাণের কাছে এসে। ওঁদের দুজনের ভালবাসার আত্মতৃপ্তিতে আমি আমার অন্তর ভরিয়েছিলাম। অতর্কিত আক্রমণ করে ঐ দুটি প্রাণীর স্নেহ ভালবাসা দশ হাতে লুটপাট করে নিয়েছি, কিন্তু তার বিনিময়ে শুধু কফোঁটা চোখের জল ছাড়া আর কিছু দিতে পারিনি আমি।

নির্মলাবৌদি তাঁর হৃদয়-ঔদার্যে আমার হৃদয়-কার্পণ্য ক্ষমা করলেও আমি নিজে বুকের মধ্যে প্রতিনিয়ত একটা অসহ্য জ্বালা অনুভব করি। কাজকর্মের অবসরে নিজের অজ্ঞাতে আজও দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে আমার বুকটাকে ভারী করে তোলে, মনটাকে পীড়িত করে। মানুষকে আমি ভালবাসি। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে এসে আমি ধন্য হয়েছি, কিন্তু কেন জানি না মানুষের যত কাছে এসেছি, ততই তাদের সুখ-দুঃখের ঝঙ্কার এমন তীব্রভাবে আমার অন্তরে বেজেছে যে, বেদনা অনুভব করেছি।

গত বছরের মত এবারও লণ্ডন এয়ারপোর্টে শুধু একটি প্রাণীই আমাকে রিসিভ করতে এসেছিলেন। বন্ধুবান্ধব বা বান্ধবীদের আমার যাবার কথা জানাই, কিন্তু ঠিক কবে কোন্ ফ্লাইটে কটার সময় কোথা থেকে লণ্ডন পৌঁছাচ্ছি, সে কথা জানাই না। লণ্ডনের মাটিতে পা দিয়ে প্রথমে আমি শুধু একটি প্রাণীকেই দেখতে চাই, তাঁকে প্রণাম করতে চাই, তার বুকে আত্মসমর্পণ করতে চাই। লণ্ডনে পৌঁছে প্রমথ কয়েকটি আনন্দ বেদনাতুর মুহূর্তে আমাদের দুজনের মাঝখানে হাইফেনের মতো অন্য কোন তৃতীয় ব্যক্তিকে আমি কল্পনা করতে পারি না। তাইতো এবারেও সবাইকে জানিয়েছিলাম কমনওয়েলথ প্রাইম মিনিস্টার্স কনফারেন্স কভার করতে লণ্ডন আসছি। কিন্তু দাস ফার, নো ফারদার। শুধু নির্মলাবৌদিকে লিখেছিলাম—

বৌদি,

আমি আসছি। ১১ই জুন সুইস এয়ার ফ্লাইটে জুরিখ থেকে বিকেল চারটে কুড়িতে লণ্ডন পৌঁছাব। কদিন আবার দুজনে কাঁদব, গাইব, বেড়াব। কেমন? প্রণাম নিও।
তোমার ঠাকুরপো।

চিঠি পাবার পরই নির্মলাবৌদি আমার জন্য ঘর দোর ঠিক করতে লেগে পড়েছিলেন। আমি ঠিক যা যা চাই, যা কিছু ভালবাসি, তার আয়োজন সম্পূর্ণ করেছিলেন আমি আসার কদিন আগেই। এগারোই জুন বারোটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়া সেরে তিনটে বাজতে না বাজতেই নির্মলাবৌদি এয়ারপোর্টে হাজির হয়েছিলেন। আমি কাস্টমস এনক্লোজারে ঢুকতেই দেখলাম বেরুবার রাস্তায় দেওয়ালে মাথাটা ভর দিয়ে একটু কাত হয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আমার নির্মলাবৌদি। আমি হাত তুলে ইশারা করলে উনি একটু হেসে হাত তুলে প্রত্যুত্তর দিলেন আমাকে। তারপর কয়েক মিনিট পরে কাস্টমস চেক্ শেষ করে বেরিয়ে আসতেই ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলাম নির্মলাবৌদিকে। বৌদিও দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। দু এক মিনিট পরে কফোঁটা চোখের জল আমার গালে গড়িয়ে পড়তে খেয়াল হলো বৌদি নিশ্চয়ই কাঁদছেন। হাত দুটোকে ছাড়িয়ে নিয়ে বৌদির চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে বললাম, ছিঃ বৌদি, তুমি কাঁদছ? এত দূর থেকে ছুটে এলাম তোমার কাছে সে কি তোমার চোখের জল দেখবার জন্য?

ঠোঁটের কোণে একটু হাসির রেখা ফোঁটাবার চেষ্টা করে বৌদি বললেন, না, না, ঠাকুরপো কাঁদছি কোথায়?

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা কোরো না বৌদি। আমার অনিচ্ছাসত্ত্বেও একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে গেল। তারপর বললাম, এতদূর থেকে ছুটে আসি তোমার কাছে আত্মসমর্পণ করে আনন্দ পাবার জন্যে, তোমাকে কাঁদাবার জন্যে নয়।

চোখের জল বন্ধ হলো, কিন্তু চোখের মণিদুটো স্থির করে এমন উদাস দৃষ্টিতে বৌদি চাইলেন যে, আমার বুকের মধ্যে জ্বালা করে উঠল। নীচের ঠোঁটটা কামড়াতে কামড়াতে খুব ধীর স্থির আস্তে বৌদি বললেন, ঠাকুরপো, তুমিও যেমন আমাকে পেয়ে আনন্দ পাও, আমিও তেমনি তোমাকে কাছে পেয়ে অনেক শান্তি পাই। আজ তুমি ছাড়া আমার ঘর আলো করার আর কে আছে বলতে পার?

ঠিক বলেছ বৌদি। তোমার ঘরে, তোমার মনে, তোমার জীবনে আর কোনদিন সূর্যের আলো পড়বে না বলে তুমি আমার মতো একটা মাটির প্রদীপকে ধন্যবাদ জানাচ্ছ?

তুমি মাটির প্রদীপ হলেও আমার এই জমাট বাঁধা অন্ধকার জীবনে তার অনেক প্রয়োজন, অনেক দাম। তাই না ঠাকুরপো?

আর বেশি কথা না বলে এয়ারপোর্ট থেকে বৌদির বাসায় গিয়েছিলাম। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে ডান দিকের ঘরে ঢুকতেই টেবিলের ওপর নির্মলদার কলম, পেন্সিল, টাইপরাইটার, নোট বই, হাতঘড়ি আর একটা ছবি দেখতে পেলাম। বছর পাঁচেক আগে যেদিন সন্ধ্যায় এই বাড়িতে প্রথম পদার্পণ করি, সেদিনও ঠিক এমনি করেই সাজানো ছিল। ঘরের অন্যান্য জিনিসপত্রও ঠিক এমনিই ছিল। আজকের সঙ্গে সেদিনের বিশেষ কোন পার্থক্যই ছিল না। তবে হ্যাঁ, সেদিন এই ঘরের মালিক নির্মলদা ছিলেন, আজ তিনি নেই। আর শুধু একটা পরিবর্তন নজরে পড়ল। সেদিন নির্মলদার ফটোটায় ফুল চন্দন ছিল না, আজ ছিল। পাঁচ বছর আগে যেদিন এসেছিলাম, সেদিন নির্মলাবৌদি নির্মলদাকে পূজা করতেন, আজ পূজা করেন তার ঐ ফটোটাকে। নির্মলদার টাইপরাইটার একটু খুললাম। ফটোটাকে হাতে তুলে নিলাম। মিনিট খানেকের মধ্যেই চোখের দৃষ্টিটা ঝাঁপসা হয়ে উঠল, তারপর ধীরে-ধীরে অজস্র ধারায় নেমে এল চোখের জল। আমাকে সান্ত্বনা জানাবার শক্তি বৌদির ছিল না। তিনিও আমারই মতন অতীত স্মৃতির ঝড়ে পথ হারিয়েছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ বাদে বৌদি বললেন, ঠাকুরপো!

কি বৌদি?

পাঁচ বছর আগে প্রথম যেদিন এ বাড়িতে তুমি এসেছিলে সেদিনের কথা মনে পড়ে?

নির্মলদার স্মৃতিতে আমার মানসিক অবস্থা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। মুখে কোন উত্তর দিতে পারিনি, শুধু মাথা নেড়ে জানিয়েছিলাম, হ্যাঁ, মনে পড়ে। বৌদির পাশে দাঁড়িয়ে নির্মলদার ফটোটার মুখো মুখি হয়ে শুধু পাঁচ বছর আগের কথাই নয়, আরো অনেক কথা, অনেক স্মৃতি আমার মনে সেদিন ভীড় করে এসেছিল।

আমি ঠিক নির্মলদার সহকর্মী না হলেও আমাদের মধ্যে বেশ একটা হৃদ্যতা, ভ্রাতৃত্বের ভাব ছিল। বহু ট্যুরে আমরা দুজনে একসঙ্গে থেকেছি, বহু ঐতিহাসিক খবর দুজনে একসঙ্গে কভারও করেছি। দুজনের মধ্যে বেশ খানিকটা বয়সের পার্থক্য থাকায় খুব গভীরভাবে নির্মলদাকে কাছে টানতে পারিনি। আমি কলকাতা ছাড়ার পর শুনলাম নির্মলদা হঠাৎ অন্য একটা কাগজের ফরেন করেসপনডেন্ট হয়ে কায়রো গেছেন। বছর দুই পরে বেইরুটে এক বন্ধুগৃহে নির্মলদার সঙ্গে আমার দেখা। তারপর দুজনের দেখা হয় যুগোশ্লাভিয়ার রাজধানী বেলগ্রেডে। দুজনেই নন্ অ্যালাইনমেন্ট কনফারেন্স কভার করতে গিয়েছিলাম। একই হোটেলে প্রায় পাশাপাশি ঘরে ছিলাম আমরা দুজনে।

নির্মলদাকে নানাভাবে নানা জায়গায় দেখেছি। দেখেছি কাছ থেকে, দেখেছি দূর থেকে। বেশ লাগত নির্মলদাকে। ওর হাসি খুশিভরা মুখখানা আমাকে অনেক সময়েই অনুপ্রেরণা দিত। বহু বিষয়ে নির্মলদার আগ্রহ ছিল, কিন্তু কোনদিন কোন অবস্থাতেই মেয়েদের বিষয়ে তার কোন আগ্রহ দেখতে পাইনি। তাছাড়া নির্মলদার আর একটা বৈশিষ্ট্য আমার কাছে একবার নয়, দুবার নয়, বহুবার ধরা পড়েছিল। মাঝে মাঝেই উনি কোথায় যেন তলিয়ে যেতেন, অনেক চেষ্টা করেও ওঁকে খুঁজে পেতাম না। সন্দেহ হতো হয়তো কোন রহস্য আছে, কিন্তু চেষ্টা করেও বুঝতে পারিনি।

খবরের কাগজের রিপোর্টাররা বিভিন্ন কাগজে কাজ করলেও নিজেদের মধ্যে পারিবারিক হৃদ্যতার মতো মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সুখে-দুঃখে পাশাপাশি না চললে আমাদের বেঁচে থাকাই মুশকিল। এই তো বিজয়দার বোন উমার বিয়েতে ওদের ব্যারাকপুরের বাড়িতে তমাল বা পূর্ণেন্দু যা করল, তা দেখে কি কেউ ভাবতে পারল ওরা ঐ পরিবারের কেউ নয়? কেউ কি জানতে পারল ওদের কাগজের মধ্যে দারুণ লড়াই? রিপোর্টারদের লেখার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের কোন সম্পর্ক নেই। এই তো মান্নার বাবা মারা গেলে বলাইদা যা করলেন বা অধীরদার মেয়ের বিয়ের জন্য ছেলে দেখা থেকে শুরু করে সবকিছুই তো রমেনদা করলেন, কিন্তু কেউ বুঝতে পারবে না, কেউ জানতে পারবে না ওঁরা সহকর্মী পর্যন্ত নন। রিপোর্টারদের মধ্যে এমন একটা অচ্ছেদ্য বন্ধন থাকা সত্ত্বেও কোন প্রবীণ রিপোর্টারকেও নির্মলদার বিয়ের জন্য অনুরোধ করতে দেখিনি। আমার বেশ একটু আশ্চর্য লাগত। নিজের মনে মনেই প্রশ্ন করতাম, কিন্তু কোন উত্তর খুঁজে পেতাম না। দীর্ঘদিন পরে স্বয়ং নির্মলদার কাছ থেকেই এই প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলাম।

বেলগ্রেডে যখন নির্মলদার সঙ্গে দেখা হলো, তখন উনি লণ্ডনে পোস্টেড। তাই লণ্ডন যাবার পথে আমি নির্মলদার সহযাত্রী হলাম। পথে কদিনের জন্য দুজনেই বার্লিন গেলাম। কেম্পিনিস্কি হোটেলে দুজনে একই ঘরে ছিলাম। দীর্ঘদিনের পরিচয়ের পরিপ্রেক্ষিতে দুজনের একত্রে বার্লিন বাস এক বিচিত্র গাঁটছড়া বেঁধে দিল আমাদের মধ্যে। দুটি মানুষের মধ্যে পরমাত্মীয়ের সম্পর্ক গড়বার জন্য সতেরো দিন মোটেই দীর্ঘ সময় নয়, কিন্তু অত্যন্ত নিবিড় করে মেশবার জন্য আমার আর নির্মলদার মধ্যে এক প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব হয়েছিল। তাই তো বার্লিন ত্যাগের আগের দিন নির্মলদা হঠাৎ আমাকে বললেন, বাচ্চু, তুই তোর লণ্ডনের হোটেল রিজার্ভেশন ক্যানসেল করে একটা টেলিগ্রাম করে দে।

একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলাম, কেন নির্মলদা?

কেন আবার? তুই আমার কাছেই থাকবি।

হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারে টেলিগ্রামটা দেবার সময় নির্মলদাও একটা টেলিগ্রাম পাঠালেন। কাকে, কোথায়, কিজন্য পাঠালেন, তা বুঝতে পারলাম না। ফ্রাঙ্কফুর্ট হয়ে লণ্ডন পৌঁছবার পর জেনেছিলাম ঐ টেলিগ্রামটা নির্মলাবৌদিকে পাঠিয়েছিলেন।

লণ্ডন এয়ারপোর্ট কাস্টমস থেকে বেরিয়ে আসতেই একজন সুদর্শনা মহিলা ধীর পদক্ষেপে আমাদের দিকে এগিয়ে এসে নির্মলদার হাত থেকে টাইপরাইটার আর কেবিন-ব্যাগটা নিয়ে নিলেন। তারপর কপালে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে, টানা চোখ দুটোকে একটু কুঁচকে নির্মলদার দিকে তাকিয়ে বললেন, আচ্ছা, তুমি কি কোনদিন আমাকে শান্তি দেবে না?

সামনের দিকে এগোতে এগোতে একটু হেসে অবাক হয়ে নির্মলদা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কেন বল তো?

আবার জিজ্ঞেস করছ কেন? আজকে তোমার ফেরার কথা?

কেন, টেলিগ্রাম পাওনি?

নিশ্চয়ই, একশোবার পেয়েছি, কিন্তু তোমার না সোমবার আসার কথা?

একগাল হাসি হেসে নির্মলদা বললেন, ও, এই কথা।

আজ্ঞে হ্যাঁ, এই কথা।

আমি বেশ বুঝতে পারলাম সোমবার নির্মলদার লণ্ডন ফেরার কথা ছিল এবং কদিন যে দেরী করে আসছেন, সে খবরও জানাননি। স্বাভাবিকভাবেই বৌদির সেজন্য চিন্তা হয়েছে। ট্যাক্সির কাছে এসে নির্মলদার খেয়াল হলো আমার সঙ্গে বৌদির পরিচয় করিয়ে দেননি। বৌদির ডান হাতটা টেনে ধরে বললেন, রাধা, তোমার সঙ্গে বাচ্চুর পরিচয় করিয়ে দিইনি।

নির্মলদার দিকে ফিরে বৌদি বললেন, সে-সব কাণ্ডজ্ঞান কি তোমার আছে? এবার আমার দিকে ফিরে বললেন, এস ভাই, ট্যাক্সিতে ওঠো।

তিনজনে ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম। ট্যাক্সির মধ্যে আমাদের অনেক কথা হয়েছিল, সে-সব আর আজ মনে নেই। তবে মনে আছে বৌদি একবার বাঁকা চোখে নির্মলদার দিকে তাকিয়ে পরে আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, বিয়ে করেছ?

না বৌদি।

বিয়ে কোরো না।

কেন বলুন তো?

কেন আবার? বিয়ে করলে তো আমারই মতো তাঁকেও যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে।

উত্তর-পশ্চিম লণ্ডনের হেণ্ডন সেন্ট্রালে নির্মলদার ফ্ল্যাটে আমার দিন গুলো বেশ কাটছিল। এত ভাল আমি কাটাতে চাইনি, কিন্তু অদৃষ্টের যোগাযোগে এড়াতে পারিনি। হিসাব-নিকাশে ভগবানের ভুল নেই; সেদিনের সব আনন্দের জের সুদে-আসলে তিনি আজ আদায় করছেন। কিন্তু আমি অসহায়।

নির্মলদা ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যেতেন। আমি তিনবার বেড-টি খেয়েও উঠতে চাইতাম না। বৌদি কাজকর্মের ফাঁকে-ফাঁকে এক একবার হাঁক মারতেন, ঠাকুরপো, উঠুন ভাই। অনেক বেলা হয়ে গেল। আমি কোন জবাব না দিয়ে বালিশটাকে আরো একটু আদর করে জড়িয়ে পাশ ফিরে শুতাম। শেষকালে বৌদি এসে ধাক্কা দিতে শুরু করতেন। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর আমি পাশ ফিরে জিজ্ঞাসা করতাম, কিছু বলছেন?

চোখের কোণে হাসি ফুটিয়ে, মুখের চারপাশে গাম্ভীর্যের ভাব এনে বৌদি বলতেন, বাপরে, বাপ, তোমরা এত ঘুমোতেও পার!

সকালবেলায় উঠতে না উঠতেই বহুবচন দিয়ে গালাগালি দিতে শুরু করলেন। তারপর বৌদির মুখটা কাছে টেনে নিয়ে কানে-কানে ফিস ফিস করে বলতাম, কেন, নির্মলদারও বুঝি খুব বেশি ঘুম?

চট করে বৌদি মুখটা টান দিয়ে বলতেন, বাচ্চু! কানটি মলে দেব।

উইথ প্লেজার। কিন্তু প্রশ্নের উত্তর দেবেন।

বৌদি আমার কথায় কান না দিয়ে উঠে যেতে গেলেই আমি তার শাড়ির আঁচল ধরে টান দিয়ে কাছে টেনে নিতাম।

জানেন তো বৌদি, প্রাইম মিনিস্টারকেও রিপোর্টারের প্রশ্নের জবাব দিতে হয়।

বৌদি বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটা দেখিয়ে বলতেন, রেখে দাও তোমাদের রিপোর্টারী চালিয়াতি। মাঝে দুবছর ছাড়া আজ আঠারো বছর ধরে রিপোর্টার দেখছি। ওসব ভয় আমাকে দেখিও না।

শেষ পর্যন্ত দুজনেই মিটমাট করে নিতাম। বৌদি একটা গান শোনালেই আমি উঠে পড়তাম।

কাজ কর্ম সেরে আমার ফিরতে রাত হত, কিন্তু নির্মলদা সন্ধ্যার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসতেন। খুব জরুরী কাজ না থাকলে সন্ধ্যার পর কোনদিন তিনি বেরুতেন না।

আমি ফিরলে তিনজনে একসঙ্গে ডিনার খেতে বসতাম। খেতে বসে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডের আলোচনা শেষ করে উঠতে উঠতে অনেক রাত হতো। কিন্তু তখনও আমাদের আসর ভাঙত না। ফায়ার প্লেসের ধারে আমরা দুজনে সিগারেট টানতাম, আর বৌদি শোনাতেন গান। একটা নয়, দুটো নয়, ডজন-ভজন গান গাইতেন বৌদি। এত গান শোনার পরও হয়তো নির্মলদা বলতেন, রাধা, সেই গানটা শোনাবে?

কোন্ গান?

সেই যে–নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।

বৌদি কোন উত্তর দিতেন না, শুধু ভাব-ভরা চোখে একবার চাইতেন নির্মলদার দিকে। তারপর গাইতেন গান।

কবে কখন ও কেন বৌদিকে তুমি বলে ডাকতে আরম্ভ করেছিলাম, তা আজ মনে নেই। মনে আছে শুধু সেই কটি দিনের স্নেহভরা মধুর স্মৃতি। নির্মলদার ঔদার্য ও বৌদির স্নেহে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ওদের দুটি জীবনের মাঝে আমিও আমার একটা ঠাঁই খুঁজে পেলাম।

কদিন থাকার পরই জানতে পারলাম বৌদির নাম কৃষ্ণা। একদিন রাত্তিরে কথায়-কথায় হঠাৎ নির্মলদাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি বৌদিকে রাধা বলে ডাকেন কেন?

কেন আবার? পরস্ত্রীকে তো এর চাইতে ভাল নামে ডাকা যায় না।

মুহূর্তের মধ্যে বৌদির মুখটা লাল হয়ে উঠল, দুজনের দৃষ্টি বিনিময়ও হলো। আমি এসব নজর করেছিলাম, কিন্তু বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। বৌদির সিথিতে সিঁদুর দেখিনি। তবে তার জন্য আশ্চর্য হইনি, কারণ লণ্ডনপ্রবাসী কোন মেয়েই সিঁদুর পরে না বললেই চলে।

বছর দেড়েক পর রাষ্ট্রপতির ব্রিটেন-সফর কভার করার জন্য আমি লণ্ডন গেলাম। রাষ্ট্রপতির সফর শেষে কদিন নিরিবিলি লণ্ডনবাস করার জন্য আমি আবার হেণ্ডন সেন্ট্রালে নির্মলদার ফ্ল্যাটে বৌদির সংসারে আশ্রয় নিলাম। সেবার একটু ভাল করে খেয়াল করে দেখলাম। ড্রয়িংরুমে রাত্তিরের গানের আসর ভাঙার পর দুজনকে দুটি ঘরে চলে যেতে দেখলাম। গভীর রাতে চুরি করেও দেখেছি, দেখেছি দুজনকে দুঘরে গভীর নিদ্রায় মগ্ন থাকতে। মনে একটু খটকা লেগেছিল। কিন্তু সেটা নিতান্তই খটকা, তার বেশী কিছু নয়। ইতিমধ্যে বৌদি নির্মলদার স্ত্রী বলে আমি তার নাম দিলাম নির্মলা। ডিনার টেবিলে এই নামকরণ-উৎসবের সময় দুজনেই একটু মুচকি হেসেছিলেন। বোধকরি এই নামকরণ-উৎসবের পরই নির্মলদা ও নির্মলাবৌদি স্থির করেছিলেন, আর দেরি করা ঠিক নয়। তাই তো রাত্তিরে ফায়ার-প্লেসের ধারে বসে নির্মলদা ওঁদের দুজনের অতীত জীবন-কাহিনী শুনিয়েছিলেন।

হাওড়া মধুসূদন পালচৌধুরী লেনে নির্মলদা ও নির্মলাবৌদিদের বাড়ী প্রায় পাশাপাশি। দুটি পরিবারের মধ্যে গভীর হৃদ্যতাও ছিল। শৈশবে নির্মলদার মা মারা গেলে কিছুকাল বড়পিসির তদারকেই ছিলেন। বড়পিসির বিয়ে হবার পর নির্মলদার জন্য তার বাবা বড়ই চিন্তায় পড়লেন। তখন নির্মলাবৌদির ঠাকুমা বললেন, আরে, এর জন্য আবার চিন্তা কি? ও আমার কাছেই থাকবে।

তখন নির্মলদার বয়স আট কি নয় হবে। পরে নির্মলদাদের সংসারে তাঁর কাকিমা এসেছিলেন, কিন্তু এই মাতৃহীন শিশুটি সম্পর্কে তিনি বিশেষ আগ্রহ দেখালেন না। নির্মলদা ঐ ঠাকুমার স্নেহছায়ায় থেকে গেলেন। স্কুল ছেড়ে কলেজে ঢুকলে নির্মলদা নিজেদের বাড়িতে থাকলেও আত্মার যোগাযোগটা কমল না। দুনিয়ার সবাই শুধু এইটুকুই জানত, কিন্তু কেউ জানত না ঐ অতগুলো মানুষের ভীড়ের মধ্যেও দুটি আত্মা সবার কল-কোলাহল থেকে বহুদূরে নিজেদের একটা ছোট্ট দুনিয়া রচনা করেছে। রিপন কলেজ থেকে ইকনমিক্সে অনার্স নিয়ে পাস করার পর নির্মলদা ইকনমিক্সে এম-এ পড়বার জন্য ইউনিভার্সিটিতে ঢুকলেন। মাস ছয়েক পরে হাওড়া ব্রীজের কোণায় এক দুর্ঘটনায় নির্মলদার বাবা মারা গেলেন। ঠাকুমার স্নেহের স্পর্শে ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালবাসায় সে-দুঃখও নির্মলদা ভুলেছিলেন। কিন্তু রেজাল্ট খুব ভাল হলো না, সেকেণ্ড ক্লাস পেলেন।

এদিকে রেজাল্ট বেরুবার আগে থেকেই নির্মলদা পাড়ার দত্তদার সূত্রে ডেইলি টাইমস পত্রিকায় যাতায়াত শুরু করেছিলেন। রেজাল্ট বেরুবার পর পাকাপাকিভাবে রিপোর্টারের কাজে লেগে পড়লেন।

তিন বছর পর নির্মলাবৌদিও বি-এ পাস করলেন, কিন্তু বাড়ির কেউ এম-এ পড়াতে চাইলেন না। সবাই বললেন, আরো পড়লে ভাল পাত্র পাওয়া মুশকিল হবে। পাত্র নির্বাচন-পর্ব প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এলে নির্মলদা আর দেরি করলেন না। একদিন একটু আড়ালে ঠাকুমাকে বললেন, আম্মা, এ বিয়ে দিও না। কিনু সুখী হবে না।

ঠাকুমা একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, কেন রে?

ঠাকুমার বিশেষ আপত্তি ছিল না, কিন্তু নির্মলাবৌদির মা কিছুতেই রাজী হলেন না। স্ত্রীর চাপে পড়ে নির্মলাবৌদির বাবাও আপত্তি করলেন। নির্মলাবৌদি অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন কিন্তু কিছু ফল হয়নি। বন্ধু-বান্ধব নির্মলদাকে পরামর্শ দিয়েছিল নির্মলাবৌদিকেও নিয়ে বম্বে বা দিল্লী মেলে চেপে পড়তে, কিন্তু নির্মলদা রাজী হননি। শুধু বলেছিলেন, তা হয় না রে। যাদের দয়ায় আমি এতদূর এসে পৌঁছেছি, তাদের সর্বনাশ করা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।

পরবর্তী সাতাশে শ্রাবণ মাঝরাতের এক লগ্নে এঞ্জিনিয়ার সুকুমারবাবুর সঙ্গে নির্মলাবৌদির বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ে বাড়ির রোশনাই আলোর চেকনাইতে কেউ জানল না দুটি আত্মা জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

নির্মলাবৌদি সুকুমারবাবুর হাত ধরে হাজারিবাগ রওনা হবার কয়েকদিনের মধ্যেই নির্মলদা ছুটি নিয়ে বম্বে রওনা হয়ে গেলেন। বম্বের ডেইলি এক্সপ্রেসের এডিটর মিঃ রঙ্গস্বামীর সঙ্গে একবার একটা প্লেনের উদ্বোধনী-যাত্রায় একত্রে জাপান গিয়েছিলেন। নির্মলদাকে তার বেশ ভাল লেগেছিল এবং একটা ভাল অফারও দিয়েছিলেন। তখন সে-অফার নেওয়া নির্মলদার পক্ষে সম্ভব হয়নি কিন্তু অতীতের সেই সূত্র ধরেই আজ উনি বম্বে গেলেন। সপ্তাহ খানেক বম্বে থাকার পর মিঃ রঙ্গস্বামী জানালেন, দিল্লী বা বম্বেতে কোন ওপেনিং নেই, তবে কায়রোতে স্পেশাল করেসপনডেন্টের পোস্টটা খালি আছে। নির্মলদা হাসিমুখে সে অফার গ্রহণ করে পনেরো দিনের জন্য কলকাতা ফিরে এলেন।

পনেরো দিন বাদে আম্মাকে প্রণাম করে নির্মলদা বি-ও-এ-সি-র প্লেনে কায়রো রওনা হলেন। তিন বছর বাদে কায়রো থেকে মস্কো বদলি হবার সময় একমাসের জন্য হোম লিভ পেয়েছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণা বিহীন হাওড়ার কোন টান না থাকায় দেশে আসেন নি। আবার তিন বছর মস্কোয় কাটালেন নির্মলদা। তারপর বদলি হলেন লণ্ডনে।

..জানিস বাচ্চু, তখন সবে লণ্ডন এসেছি। একদিন ইণ্ডিয়া হাউসের এক রিসেপশন থেকে ফেরার সময় অকস্মাৎ চ্যারিং ক্রশ টিউব স্টেশনে রাধার সঙ্গে দেখা। ওর বিয়ের আট বছর পরে ওকে লণ্ডনে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তোর বৌদি সে রাত্তিরে আর নিজের ফ্ল্যাটে ফিরল না, আমার সঙ্গে এল। আট বছরের জমাট বাঁধা ইতিহাস দুজনে দুজনের কাছে তুলে ধরলাম। হাওড়ার সঙ্গে কোন যোগাযোগ না থাকায় আমি কিছুই জানতাম না, জানতাম না বিয়ের দেড় বছর বাদে জীপ দুর্ঘটনায় সুকুমারবাবু মারা গেছেন। বিধবা হবার পর তোর বৌদির কোন প্রতিবন্ধক এল না। বাবা, মা, আম্মা সবাই মত দিলেন। থাক, বিলেতে গিয়েই পড়াশুনা করুক। তারপর একদিন ও লণ্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে পাস করে বেরুল। তারপর দিনের পর দিন, রাতের পর রাত দুজনে মিলে অনেক ভেবেছি, অনেক আলোচনা করেছি, অনেক কথা বলেছি, অনেক কথা শুনেছি। শুধু কি তাই? দুজনে মিলে অনেক চোখের জল ফেলেছি। রিজেন্ট পার্কের বেঞ্চগুলো আজও সে চোখের জলে ভিজে আছে। ভাবতে ভাবতে কোন কূল-কিনারা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত দুজনে ঘর বেঁধেছি, আর এই তিনটি বছর স্বামী-স্ত্রীর অভিনয় করে চলেছি দুজনে।

নির্মলদা একটা পাঁজরকাঁপানো দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন। ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে বৌদিও একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। হয়তো আমারও একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়েছিল কিন্তু ঠিক মনে নেই।

…যাকে সারা জীবন ধরে নিজের জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে দেবার স্বপ্ন দেখেছি, যার রক্তের সঙ্গে নিজের রক্ত মিশিয়ে সন্তানের হাসিমুখ দেখবার ছবি এঁকেছি মনে মনে, তাঁকে নিয়ে এই অভিনয় করা যে কি অসহ্য, সে কথা তুই বুঝবি না বাচ্চু।

উত্তেজনায় আমার হাতটা চেপে ধরলেন নির্মলদা। বললেন, বিশ্বাস কর বাচ্চু, আজ আর তোর কাছে মিথ্যা বলব না।…মাকে মাঝে সমস্ত ন্যায়-অন্যায়ের কথা ভুলে গিয়ে রাতের অন্ধকারে তোর বৌদির ঘরে ঢুকে পড়েছি। দু-একদিন হয়তো হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছি, কিন্তু তারপর কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসেছি নিজের ঘরে। কখনও কখনও আমি ঘুমিয়ে পড়ার পর তোর বৌদি চুরি করে আমার পাশে শুয়ে থেকেছে, আমাকে আদর করেছে, আমার মুখে মুখ রেখে কেঁদেছে, কিন্তু তবুও আজ পর্যন্ত তার বেশী এগুতে পারিনি।

নির্মলদা হাঁপিয়ে পড়েছিলেন, আর কিছু বলতে পারলেন না, থেমে গেলেন। চোখের জলটা মুছতে মুছতে বৌদি বললেন, ঠাকুরপো একটা কথা বলব?

আমি উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরুল না। মাথা নেড়ে বললাম, বলুন।

তোমার দাদাকে আর আমাকে খুব খারাপ মনে হচ্ছে, তাই না?

তুমি কি ভেবেছ বৌদি, আমি ভাটপাড়ার পণ্ডিত, না কি পাষাণ? একটু থেমে মুখে একটু হাসির রেখা ফুটিয়ে বললাম, আমাকে আরো একটু দুঃখ না দিলে তুমি বুঝি তৃপ্তি পাচ্ছ না বৌদি?

বৌদি নির্মলদার ওপাশ থেকে উঠে এসে আমার চোখের জল মুছিয়ে নিলেন। বললেন, লক্ষ্মীটি ঠাকুরপো, দুঃখ কোরো না। তুমি যে আমাদের জন্য চোখের জল ফেলছ, তাতেই আমাদের অনেক দুঃখ কমে গেছে। তাছাড়া তুমি ভিন্ন আর কেউ তো আমাকে এমন করে বৌদি তাকেনি, এমন মর্যাদা তো আর কেউ দেয়নি, আমি তো আর কাউকে এমনভাবে ঠাকুরপো বলে ডাকবার অধিকার পাব না, তাই তোমার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।

বৌদির হাতটা চেপে ধরে বললাম, ছি, ছি, বৌদি, এ কি কথা বলছ?

পরের দিন নির্মলদা আর কাজে বেরুলেন না, আমিও আমার অ্যাপয়েন্টমেন্টগুলো বাতিল করে দিলাম। লাঞ্চের পর তিনজনে অক্সফোর্ড স্ট্রীটে মার্কেটিং করে কাটালাম সারা বিকেল, সারা সন্ধ্যা। রাত্তিরে পিকাডিলীর ধারে একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার খেয়ে হাইড পার্ক কর্নারে আড্ডা দিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফিরলাম।

রাত্রে ফিরে এসে নির্মলদা দেখলেন বিকেলের ডাকে একটা প্লেন কোম্পানির লণ্ডন-মন্ট্রিলের উদ্বোধনী-যাত্রার অতিথি হবার আমন্ত্রণ এসেছে। নির্মলদা বললেন, বাচ্চু তুই কটা দিন থেকে যা, আমি ঘুরে এলে দিল্লী যাস।

পরের দিন আমি আমার এডিটরকে একটা টেলিগ্রাম করে জানালাম, লণ্ডন ডিপারচার ডিলেড স্টপ রিচিং ডেলহি নেক্সট উইক।

তিনদিন পর রাত দশটার সময় আমি আর নির্মলাবৌদি নির্মলদাকে লণ্ডন এয়ারপোর্টে বিদায় জানিয়ে এলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল। দুজনেই বেশ ক্লান্ত ছিলাম। টেলিভিশনের সামনে বসে গল্প না করে দুজনেই শুয়ে পড়লাম, লেট নাইট নিউজটাও শুনলাম না।

পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে খবরের কাগজটা খুলে ধরার সঙ্গে সঙ্গে বৌদি একটা বিকট চিৎকার করে চেয়ার থেকে পড়ে গেলেন। আমি মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলাম। বৌদির মাথাটা কোলে তুলে নিয়ে দেখি জ্ঞান নেই। তাড়াতাড়ি ফ্রিজ থেকে কয়েক বোতল ঠাণ্ডা জল এনে চোখে মুখে জলের ঝাঁপটা দিতে দিতে খবরের কাগজের পর নজর পড়তেই দেখলাম, যে প্লেনে নির্মলদা রওনা হয়েছিলেন, সে প্লেন লণ্ডন থেকে টেকঅফ করার পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে অতলান্তিকের গভীর গর্তে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্লেনের কয়েকটা টুকরো পাওয়া গেছে, কিন্তু একটি যাত্রীরও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

অনেক ঔষধ-পত্র ডাক্তার-নার্স করবার পরও বৌদি ষোল ঘন্টা অজ্ঞান ছিলেন। কিন্তু কি আশ্চর্য, জ্ঞান হবার পর একফোঁটা চোখের জল ফেলেননি বৌদি। শোকে-দুঃখে বৌদি পাথর হয়ে গিয়েছিলেন। তিন দিন তিন রাত্রি একবিন্দু জল পর্যন্ত স্পর্শ করলেন না। সপ্তাহ খানেক পর বৌদি বললেন, ঠাকুরপো, তোমার বুকিংটা এবার করে নাও। আর কতদিন তোমাকে আটকাব।

আমি আপত্তি করছিলাম, কিন্তু বৌদি কিছুতেই রাজী হলেন না। বললেন, না ভাই ঠাকুরপো, তুমি আর আমার সংস্পর্শে থেকো না। হয়তো আমার সংস্পর্শে থেকে এবার তোমারও কোন সর্বনাশ হবে।

দুদিন পর আমি দিল্লী রওনা হলাম। অনেক আপত্তি করা সত্ত্বেও বৌদি এয়ারপোর্টে এসে আমাকে বিদায় জানিয়ে গেলেন। প্রণাম করে বৌদির কাছ থেকে বিদায় নিলাম। বৌদি আমাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে চোখের জলের বন্যা বইয়ে দিয়ে বললেন, আমি তোমার দাদার স্মৃতি নিয়ে এই লণ্ডনেই থাকব, আর কোথাও গিয়ে আমি শান্তি পাব না। তুমি তাই আমাকে ভুলো না। মনে রেখো এই ঝড়ের রাতে তুমি ছাড়া আর কেউ নেই যে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

আমি কোন উত্তর দিতে পারলাম না। যন্ত্রচালিতের মত প্লেনে উঠে পড়লাম। বোয়িং ৭৩৭-এর তীব্র গর্জন আমার কানে এল না, বার-বার শুধু মনে পড়ল বিকট চিৎকার বৌদি ব্রেকফাস্ট দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন।

পালামের মাটিতে পা দিয়েই বৌদিকে আমার পৌঁছানো সংবাদ দিলাম। কদিন পর বৌদির একটা উত্তর পেলাম।

ভাই ঠাকুরপো,
তোমাকে প্লেনে চড়িয়ে দেবার পর জীবনে সব চাইতে প্রথম অনুভব করলাম, আমি নিঃসঙ্গ, আমি একা, বন্ধুহীন, প্রিয়হীন। অনুভব করলাম, আমার অন্তরের শূন্যতা। আজ মনে হচ্ছে স্বার্থপরের মতো তোমাকে ধরে রাখলেই ভাল হত; মনে হচ্ছে তোমার নির্মলদার জন্য যদি আর একজনকে চোখের জল ফেলার সঙ্গী পেতাম, তবে অনেক শান্তি পেতাম।
আজ বেশ বুঝতে পারছি কে যেন অলক্ষ্যে বসে আমার জীবনটা নিয়ে খুশীমত খেলা করছে। বেশ বুঝতে পারছি তারই ইচ্ছায় আমার মনের রং বদলায়। কখনো মেঘে-মেঘে ছেয়ে যায়, কখনো সোনালী রোদে ঝলমল করে ওঠে, আবার কখনো গোধূলির বিষণ্ণ রাঙা আলোয় ভরে যায়। আমি আর কিছুই ঠেকাবার চেষ্টা করি না, কিছুরই বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ নেই। আমার জন্য তুমি একটুও চিন্তা কোরো না। জীবন দেবতা যখন যেদিকে নিয়ে যাবেন, আমি নিঃশব্দে সেদিকেই যাব। তবে আমার সংস্পর্শে দুটি নিরপরাধ মানুষের সর্বনাশ হওয়ায়, আজ তোমার জন্য বড় ভয় হয়।
বাচ্চু, একদিন তারকার দীপ্তি আমারও ছিল, কিন্তু তবুও বিশাল আকাশের কোলে কেন ঠাঁই হলো না বলতে পার? বলতে পার কেন কক্ষচ্যুত তারকার মতো উল্কার জ্বালা বুকে নিয়ে ছুটে বেড়ালুম পৃথিবী ময়? বলতে পার কোন্ প্রায়শ্চিত্ত করলে এজন্মে না হোক, অন্ততঃ আগামী জন্মে তোমার নির্মলদাকে পেতে পারি? ভালবাসা নিও।
তোমার অভাগা বৌদি।

শেয়ার বা বুকমার্ক করে

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত