মা

মা

আজ আমার আম্মুর বিয়ে। হমম আমার মায়ের বিয়ে।আম্মুর বিয়েয়ে হয়েছিল আজ থেকে ২৭ বয়স আগে। এই ২৭ বছরে মাকে দেখলাম না ২৭ টা দিনও সুখি হতে। নানাভাই অনেক সম্পত্তি দেখে মাকে বিয়ে দেয়। পরিবারে প্রায় ১৩ জন সদস্যা। যৌথ পরিবার। মা এতো জনের রান্নাবারা করে সব কিছু সামলেছে। তাও মাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল করে দাদি বাবা ফুপ্পিরা অনেক কথা বলতো। কিন্তুু কখনোই কিছু বলতো না। চুপ করে কাদতো। তারকিছু দিন পরই আমি পেটে আসি। তখন দাদি চেয়েছিল সবারই প্রথম যেহেতু ছেলে হয়েছে আমার আম্মুর ওও ছেলে হবে। সেকি যত্ন। কিন্তুু সবই ভুল প্রমাণিত করে যখন আমার জন্ম দাদির নাকির এতো রাগ হয়েছিল দাদি নাকি সেদিন রাতে ভাত খায়নি আর বাবা সেতো আমার মুখই দেখেনি। দরজার ওপাশে দাড়িয়ে আতুর ঘরে মাকে বলে তোর জন্য আমার মা খাওয়া বন্ধ করে দিছে তুই এই মেয়ে নিয়ে তোর বাপের বাড়ি যা।

নাহলে কাল তোর মেয়ের জানাজা পরাবো। মা সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলো।কতোদিন যে সে ঘুমাই নাই ভয়ে। ১৭ দিনের মাথায় মা আমাক নিয়ে নানু বাসায় চলে গেছে। প্রায় ৩ মাস ছিলো এর মধ্যে বাবা একবার ওও খোজ নেয়েনি। মা বলেছিল আমি যখন হয়েছিলাম তখন নাকি এতো সুন্দর হয়েছিলাম অন্ধকারেও ঘর আলো করে রাখতো। তাই আমার নাম হলো আলো। ৩ মাস পর মা দাদির বাসায় ফিরে আসে। তারপর থেকে একটা না একটা ঝামেলা লেগেই থাকতো। মাঝে মাঝে মাকে চড় থাপ্পরও দিতে সাথে আমাকেও দিতো। এভাবে চলতে থাকলো আমার জীবন। আমার প্রথম ভর্তি স্কুলের যাওয়া, হাই স্কুলে যাওয়া কোনো কিছুতেই বাবা যায় নি। আমার পরিক্ষা কেমন হয়েছে সেটাও জানতে চায় নি মা রাতে রাতে সেলাই করে সব খরচ চালাতো। চাচাতো ভাই বোনরা যখন মার্কেটের নতুন জামা পরতো আমি আমার মায়ের সেলাইয়ের জামা পরতাম।

আমার একদমই খারাপ লাগতো না। কারন মা বলতো তুমি এটা পরো এটাতে আমার অনেক আদর মেশানো রয়েছে। খুশি মনে পরতাম। মাঝে মাঝে ছোট চাচ্চুর সামনে পরলে ১০/২০ টা দিতো তাও বছরে ১/২ বার হতো। কারন সে তার ব্যাবসা নিয়ে দারুন ব্যস্ত থাকতো। বাকী সদস্যরা সবসময় নিজেদের স্বার্থ ছাড়া কাছেও আসতো না। একবার ঈদে চাচ্চু ৫০ টাকা দিয়ে ছিল সে কি আনন্দ। রাতে এই টাকাটা নিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। কারন আমাকে কেউ তো কখনো এতো টাকা দেয়নি। এভাবে প্রায় হাই স্কুল পাস করলাম। ভালো রেজাল্ট করলাম। এলাকার সবাই বাবাকে এসে বল্লো সেই প্রথম বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বল্লো কাল দোকানে যাইস নতুন একটা জামা কিনে দিবো। এতো আনন্দ আমি সেদিনের মতো পাইনি।

দাদিকে বলতে গেলাম। দাদি হো হো করে হেসে বল্লো তোর বাপের ঘারে কতো দিন এইবার বিয়ে দেখতে বলবো। মন খারাপ করে চলে আসলাম। মাঝে মাঝে আম্মুকে নানা টাকা পাঠাতো ওই টাকা দিয়ে আমি কলেজ ভর্তি হই। এই নিয়ে মায়ের ওপর কতো কিছু যে গেল। আমি দেখেছি বলার মতো সাহস পাই নাই। বেশ এভাবেই চলছে জীবন তার মধ্যে কলেজ পাশ করলাম। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পালা। কারন মা চেয়েছিল। আমি ভালো কিছু করে মাকে এই পরিবেশ থেকে বের করি। কিন্তুু দাদি চেয়েছিল যে করেই হোক আমার বিয়ে দিবে। ২/৩ পাত্রও বাড়িতে এসেছে। এটা নিয়া মা নিষেধ করাতে মাকে ধানের ঘরে ২ দিন আটকে রেখেছে। খেতে দেয়নি।আমাকে বলছে ওখানে গেলে আমাকে জ্যন্ত কবর দিবে। আমি দিশেহারা ছিলাম। কারন এভাবে একটা মানুষ বাচতে পারেনা। তার ৬ দিন পর মায়ের খুব জ্বর।

নানাকে খবর দেওয়া হলো। মরে মরে অবস্থা। নানা বল্লো বাড়ি নিয়ে যাবে। সেদিন মা নানাকে হাতে ধরে বল্লো আলোকে নিয়ে যাও বাবা। আমার মেয়েকে বাচাও।আমি যেতে চাইনি কাদতেছিলাম বলে বলেছিল তুই এখন না গেলে আমি গলায় দড়ি দিবো। বেশ চলে গেলাম নানার হাত ধরে। আজ ৬ বছর আমি আর কখনো দাদি বাড়ি যাইনি। মাকেও দেখিনা। কারন আমার পড়াশুনা শেষ করলাম। মাকে অনেক বার খবর দিয়েছে। সে জানিয়েছে মেয়েকে সেদিন দেখতে যাবো যেদিন আমার মেয়ে আর কখনো এই বাড়িতে না ফেরার ব্যবস্থা করে। কতো কেদেছি কতো রাত চেয়েছি মাকে কাছে পেতে মায়ের গন্ধ নিতে। মার্কেটের কতো জামা গায়ে দিলাম। মায়ের গন্ধটা আর পাইনি গত ৬ বছরে। অনেকটা ঝাপসা হয়ে গেছে ভালোবাসাগুলো।

কয়েকটা চিঠি পাঠিয়েছিলাম একবার উত্তর পেয়েছি। বলেছিলো মা আলো তুকে খুব ভালোবাসি ভালো থাকিস তুই, এইটুকু।বেশ কয়েকদিন পর ছোট একটা চাকরি পেলাম। তার মধ্যে শুনলাম দাদির একটা চোখ নষ্ট হয়ে গেছে চাচারা শহরে বাড়ি করে চলে গেছে। বাবার ব্যাবসা অনেক লস হয়ে গেছে। প্রায় পথে বসবে। তাও সেদিকে মন টানেনা যেতে। কিন্তুু মাকে আনতে হবে। এভাবে প্রায় ৬ বছর ৬ মাস পর বাড়ির পথে রওনা দিলাম। আতংক নিয়ে যাচ্ছি আর ভাবছি জানিনা মা কেমন আছে আদও বেচে আছে?? ভাবতে ভাবতে রিকশা প্রায় বাড়ির রাস্তায়। আগের মতোই আছে সব। দেখতে দেখতে বাড়ি পৌছে গেলাম গিয়ে দেখলাম বাড়ির সেই জৌলস আর নেই সবাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যে যার মতো চলে গেছে।

পাশেই আমার জননী একটা মলিন কাপড় পরে মুড়ি ভাজছে। দাদি বারান্দায় বসে মুড়ি চিবাচ্ছে পাশে বিড়ালটাও বাটিতে মুখ দিচ্ছে। বাবা বাড়িতে কিনানা জানিনা।মাকে ডাকার সাহস পাচ্ছিলাম না কেমন জানি লাগছিল। কিছুক্ষন এভাবে ডাকার পর মা কে ডাক দিলাম মা আমার কন্ঠ শুনেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে এতো আদর করলো। সে খুশিতে মরে যাচ্ছে। আমি চেয়ে শুধু দেখলাম। পরে মা বল্লো তুমি দাদির কাছে যাও। অনিচ্ছা সত্বেও গিয়ে সালাম করলাম। প্রায় সে চোখেই দেখে না আমার স্পর্শ পেয়ে সে বল্লো আমার আলো এসেছে বলেই হাও মাও করে কাদছে। আমি তো বুঝে ছিলাম এই কান্না কিসের কান্না। পরম যত্নে জরিয়ে নিলাম তাকে। তারপর মাকে বল্লাম তৈরি হও আমরা এখনি চলে যাবো। মা বল্লো তোর বাবা দাদিকে রেখে কোথাও যেতে পারবো না রে মা। আমি অবাক হলাম। রাগে কিছুই বল্লাম না। বুঝলাম লোকটিকে সে কতো ভালোবাসে। রুমে আর ঢুকি নাই বারান্দায় বসেছিলাম। মা কয়েকবার জোর করেছিল।

আমি যেতে নারাজ। সন্ধ্য হতেই বাবা আসলো। মা ফিসফিস করে কি যেনো বল্লো বাবা কাচুমাচু করে বল্লো কখন আসলি?? উত্তর না দিয়ে বল্লাম আমি মাকে এখনই নিয়ে যেতে চাই?? বাবা মনে হয় কষ্ট পেলো বল্লো তোর মা যেতে চাইলে নিয়ে যা। এই বলে সে দাড়িয়ে থাকতে পারলো না। মা জোর করে ঘরে নিয়ে গেল।দাদির ঘরে ঘুমাচ্ছিলাম একটা কান্নার শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।আনুমানিক রাত ২ টা শব্দটা মায়ের ঘর থেকে আসছে না?? তাহলে কি আবারও বাবা না একটা বিহীত এবার হবে যলদি করে মায়ের ঘরে উকি দিলাম দেখি মা নয় বাবা কাদছে বাচ্চাদের মতো। আমি চুপ হয়ে গেলাম।

খালি মাকে বলছে মেয়েটাকে বুঝাও তুমি চলে গেলে আমি মারা যাবো আমাকে মাফ করো। আমি সেদিন রাতে আর ঘুমাই নি। খুব সকালে উঠে বাজার করতে গেলাম । তারা ঘুম থেকে উঠতে রান্না বসিয়ে দিলাম। মা আজ একটু দেরিতে ওঠেছে, ওঠে দেখে এমন হজবরল।বাবা ও বোকা হয়ে গেছে। মা বল্লো কি করছিস এগুলা।ব্যস্ততা দেখিয়ে বল্লাম আজ তোমাদের বিয়ে। দুপুরে কাজি আসবে নতুন কাপড় আনছি তৈরি হয়ে না কথা বাড়িও না অনেক হয়েছে। বাবা মাও বাচ্চাদের মতো ঘরে চলে গেলো।কারন আজ তাদের বিয়ে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত