বাঙালী-টোলা

বাঙালী-টোলা

১. টিকিট কালেক্টরের হাতে টিকিট দিয়ে

টিকিট কালেক্টরের হাতে টিকিট দিয়ে সুবোধবাবু এক পা এগুতে না এগুতেই প্রায় শতখানেক রিকশাওয়ালা ওঁকে ছেঁকে ধরল। কেউ কেউ হাত ধরে বলে, আইয়ে বাবুজি, চলিয়ে বাবুজি। কেউ কেউ আবার ওঁর হাতের ছোট সুটকেসটা নিয়ে টানাটানি করতে করতে জিজ্ঞেস করল, কাঁহা যানা সাব?

শুধু ওঁকে না, সব প্যাসেঞ্জারকেই ওরা ঘিরে ধরছে। কী করবে ওরা? এ শহরে কোন রিকশাওয়ালাই দিন-রাত্তির খেটে দশ-বারো টাকার বেশি কামাই করতে পারে না। মালিকের পাওনা মিটিয়ে বিবি-বাচ্চার পেট চালানোই দায়। যা দিনকাল পড়েছে!

সারা দিনরাত্তিরে দশ-বারোটা ট্রেন আসে ঠিকই কিন্তু ভোরবেলার এই গাড়িতেই সব চাইতে বেশি প্যাসেঞ্জারের আসা-যাওয়া হয়। তাইতো এই গাড়ির প্যাসেঞ্জার ধরতে না পারলে রিকশাওয়ালাদের সারা সকালটাই মাটি হয়ে যাবে। কিন্তু এত রিকশার প্যাসেঞ্জার কি আছে?

সুবোধবাবু খানিকটা এগিয়ে শেষ পর্যন্ত একজন বয়স্ক রিকশাওয়ালার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন। কী করবেন? কতজনের টানাটানি কতক্ষণ সহ্য করা যায়?

শিকার ধরার মহানন্দে রিকশা ওয়ালা এক লাফে সীটে উঠেই একটু পিছন ফিরে জিজ্ঞেস করল, কাঁহা যানা সাব?

বাঙালীটোলা।

ডান পা দিয়ে প্যাডেলে জোরে একটা চাপ দিয়েই আবার প্রশ্ন করে, কিসকা ঘর যানা সাব?

রাজাবাবু কা কোঠি। সুবোধবাবু একটু থেমেই বললেন, উকিল মহেন্দ্রবাবুর বাড়ি। চেনো তো?

ট্রেনের প্যাসেঞ্জার নিয়ে অনেকগুলো রিক্শা এক সঙ্গে বেরিয়েছে বলে রাস্তায় বেশ ভিড়। ক্রীং ক্রীং করে বেল বাজিয়ে, চিৎকার করে এরই মধ্যে সুবোধবাবুর রিকশাওয়ালা একটু এগিয়ে বলে, সব পুরানা বাঙালীবাবুদের কোঠি আমি চিনি। আর রাজাবাবুর ছোট ছেলের কোচোয়ান ছিল তো আমার বড় চাচা।

সুবোধবাবু সিগারেট ধরিয়েই বলেন, তাই নাকি?

আমি নিজেও তো ঝন্টুবাবুর কাছে কাজ করেছি।

আচ্ছা!

আচ্ছা বললেও সুবোধবাবু কিন্তু ঝন্টুবাবুকে চেনেন না। নামও শোনেননি কোনদিন। এই রাজাবাবুর পরিবারের বিষয়ে উনি কোন কিছুই জানেন না। ওঁদের কাউকে চেনেনও না। শুধু মহেন্দ্রবাবুর সঙ্গেই মাত্র মাস কয়েক আগে মেজ মাসীমার ওখানে আলাপ হয়েছে। তাও নেহাতই হঠাৎ।

সুবোধবাবুকে ওঁর মা অনেকদিন ধরেই বলছিলেন, হ্যাঁরে আদু, তুই হরদম হিল্লী-দিল্লী ঘুরছিস আর যাতায়াতের পথে একবার রাচীতে নেমে মেজদিকে একটু দেখতে পারিস না? উনি একটু থেমে বললেন, এই মেজ মাসী কি তোদের জন্য কম করেছে?

সুবোধবাবু একজন প্রবীণ অধ্যাপক। ওঁর বহু ছাত্র নানা জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছেন। তাদের অনেকেই সুপ্রতিষ্ঠিত। কেউ কেউ খ্যাতিমানও। তাইতো তাদের অনুরোধে বা চাপে সুবোধবাবুকে নানা কারণে ছুটতে হয় এখানে-ওখানে। প্রায় সারা দেশেই বলা যায় কিন্তু সত্যি রাঁচী যাবার অবকাশ বা সুযোগ হয় না। উনি ওঁর মাকে বললেন, দেখি, যদি সম্ভব হয় সামনের বার নাগপুর থেকে ফেরার সময় টাটায় নেমে রাঁচী ঘুরে আসিব।

ঐ মেজ মাসীর ওখানে গিয়েই হঠাৎ মহেন্দ্রবাবুর সঙ্গে আলাপ। পরিচয় ও ঠিক নয়। একথা-সেকথার পর মেজ মাসী ওঁকে জিজ্ঞেস করলেন, হারে আদু, ছেলের বিয়ে দিবি না?

সুবোধবাবু একটু হেসে বললেন, মা তো নাতির বিয়ে দেবার জন্য পাগল হয়ে উঠেছেন কিন্তু কোন মেয়েকেই মা বা তার নাতির পছন্দ হচ্ছে না।

মেজ মাসী সঙ্গে সঙ্গে মহেন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে এক গাল হাসি হেসে বললেন, কি মহিম, ঘটকালী করব নাকি?

মহেন্দ্রবাবু একটু সকৃতজ্ঞ হাসি হেসে বললেন, যদি ওঁরা দয়া করে আমাদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক করতে চান

ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই মেজ মাসী বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, তোদের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক করা তো ভাগ্যের ব্যাপার। হাজার হোক তোরা রাজা অবলাকান্তের নাতি!

কথাটা শুনে অর্থনীতির যশস্বী অধ্যাপক সুবোধবাবু মুগ্ধ হতে পারেন না। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে এই বিংশ শতাব্দীর গোড়া পর্যন্ত বাংলা-বিহার-উত্তরপ্রদেশে যেসব বাঙালী পরিবার খ্যাতি অর্জন করেছে, তাঁদের কজন উত্তরপুরুষ সেই খ্যাতি, গৌরব অম্লান রাখতে পেরেছেন? তবে উনি মুখে কিছু বললেন না। চুপ করে থাকেন।

পারিবারিক গৌরবের ইঙ্গিত পেয়েও সুবোধবাবুর মধ্যে বিন্দুমাত্র কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে মহেন্দ্রবাবু মনে মনে একটু ব্যথা অনুভব করেন। কিন্তু হাজার হোক উকিল তো! মনের ভাব মনের মধ্যেই লুকিয়ে একটু গদ্গদ হয়ে বললেন, আমার কন্যাটিকে যদি দয়া করে ওঁরা পছন্দ করেন…

এবার ও মেজ মাসী মাঝপথে কথা বলেন, তোদের বংশে কি কুচ্ছিত ছেলেমেয়ে জন্মেছে?

এবার সুবোধবাবু মনে মনে সত্যি একটু বিরক্ত হন।

মেজ মাসী বলে যান, তাছাড়া মহিম, তোর মেয়ে তো সাক্ষাৎ রাজকন্যা? ও ছুঁড়ীর মত রূপসী তো চোখে পড়ে না।

এত বাড়াবাড়িতে বোধ হয় মহেন্দ্রবাবুও একটু কুণ্ঠিত না হয়ে পারেন না। বলেন, না, না, পিসী, অত বলবেন না। তবে হ্যাঁ, আমার মেয়েটি মোটামুটি সুন্দরী। দেখলে হয়তো অপছন্দ হবে না।

এতক্ষণ পর বোধ হয় মেজ মাসীর হুঁশ হয়েছে, শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের দিকে একটু বেশী ঝোল টেনেছেন। তাই উনি এবার মহেন্দ্রবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, বুঝলি মহিম, আমার বাবা তো আমাদের কোন বোনকেই আজেবাজে পরিবারে বা পাত্রের হাতে দেননি।

সেকি আমি জানি না? মোসাহেবীর সুরে মহেন্দ্রবাবু মন্তব্য করেন।

এই আদুর বাবা কলকাতায় গবরমেন্টের কলেজে সব চাইতে বড় প্রফেসার ছিলেন। রিটায়ার করার দশ-বারো বছর আগে প্রিন্সিপ্যাল হন। এই আদু তো কত বছর বিলেতে থেকে পড়াশুনা করেছে!…

সুবোধবাবু একটু হেসে বলেন, মেজ মাসী, বাবার বা আমার কথা বলে কি হবে? আসলে পাত্রটিকে যদি ওঁদের পছন্দ হয়…

মহেন্দ্রবাবু গগদ হয়ে বললেন, কি যে বলেন আপনি?

মেজ মাসী একটু শাসন করার ভান করে বলেন, আঃ! আমাকে বলতে দে। এবার উনি রাজা অবলাকান্তর নাতির দিকে তাকিয়ে বলেন, শোন মহিম, আদুর ছেলেও বিলেত থেকে পাস করে এসেছে। হীরের টুকরো আমার নাতি! যেমন রূপ, তেমন গুণ!

বাপ-ঠাকুর্দার মতই..

ডাক্তার অঘোরনাথ চৌধুরীর দ্বিতীয়া কন্যা যোগমায়া দেবীর এই একটি রোগ! বড্ড কথা বলেন। শুধু তাই নয়। অন্য কাউকে কথা বলার সুযোগও দেন না। মহেন্দ্রবাবুকে আবার বাধা দিয়ে বললেন, ও ছেলে বাপ-ঠাকুর্দার চাইতে অনেক বেশী নাম করবে। বাপ-ঠাকুর্দা আর কখানা বই লিখেছে? ঐ কচি ছেলে এর মধ্যেই পাঁচ-সাতটা মোটা মোটা বই…

সুবোধবাবু একটু সংশোধন করে দেন, না মেজ মাসী, বাবুলের মাত্র দুটো বই বেরিয়েছে।

ঐ একই ব্যাপার! এই বয়সেই যদি মোটা মোটা দুটো বই লিখে থাকে, তাহলে…

যাই হোক ঐ রাঁচীতে মহেন্দ্রবাবুর সঙ্গে সুবোধবাবুর আলাপ হয়। যোগমায়া দেবী পূজা করতে গেলে মহেন্দ্রবাবু সবিনয়ে নিবেদন করেন, পারিবারিক ব্যাপারে বেশী আর কি বলব? তবে আমার ঠাকুর্দা বিহার-উত্তরপ্রদেশের প্রবাসী বাঙালীসমাজে সত্যি গণ্যমান্য পুরুষ ছিলেন। আর আমি সামান্য উকিল..

সামান্য কেন হবেন? সুবোধবাবু একবার ওঁর আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে একটু হেসে বলেন, আপনাকে দেখে তো স্যার আশুতোষের কথা মনে পড়ে যায়।

কি যে বলেন!

আপনার কটি সন্তান?

আমার তিনটি কন্যা। বড় মেয়েটির বিয়ে দিয়েছি বছর দুয়েক আগে। আমার দ্বিতীয় কন্যাটি এই বছরই এম. এ. পাস করল।

বাঃ! শিক্ষাবিদ সুবোধবাবু শুনে খুশিই হন।

এবং শুনে খুশি হবেন, ফার্স্ট ক্লাসই পেয়েছে।

খুব ভাল।

মহেন্দ্রবাবু আরও অনেক কথা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সুবোধবাবু বললেন, অত কিছু বলার প্রয়োজন নেই। মোটামুটি শিক্ষিতা ও সুন্দরী মেয়েই আমরা চাই।

উনি এবার নিজের পুত্রের বিষয়ে বলেন, হাজার হোক আপনি মেয়ের বিয়ে দেবেন। নিশ্চয়ই পাত্রকে ভাল করে দেখে-শুনে নেবেন।…

অত দেখাশুনার কি আছে? পিসীর কাছে যা শুনলাম…

উনি যাই বলুন, আপনি না দেখেশুনে একটি ছেলের হাতে অমন ভাল মেয়েকে তুলে দেবেন কেন। সুবোধবাবু একটু থেমে বলেন, আমার ছেলেটি স্বাস্থ্যবান এবং সুপুরুষও বলতে পারেন। ও প্রেসিডেন্সি থেকে পাস করে এল-এস-ই থেকে মাস্টার্স করেছে।

এল-এস-ই মানে?

প্রশ্ন শুনে সুবোধবাবু একটু দুঃখই পান। তবে সঙ্গে সঙ্গে বলেন, লণ্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স।

ও!

এখন জে-এন-ইউ তে পড়ায়। মাইনে—

জে-এন-ইউ তে কী?

ওঃ! সরি! জে-এন-ইউ মানে দিল্লীর জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি।

আচ্ছা! আচ্ছা!

এল-এস-ই এবং জে-এন-ইউ সম্পর্কে ভদ্রলোকের প্রশ্ন শুনেই সুবোধবাবু স্পষ্ট বুঝলেন, ওঁদের পারিবারিক ঐতিহ্যের গঙ্গা এখনও প্রবাহিত থাকলেও শিক্ষাদীক্ষারা ধারা ফল্গুর মতই বিলুপ্ত! বি. এ. এম. এ. পাস করলেই কি শিক্ষিত বা সংস্কৃতিবান হওয়া যায়?

যাই হোক রাঁচীতে আলাপ-আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে সুবোধবাবু দিল্লী রওনা হবার আগে ওঁকে চিঠি দেন, আপনার পত্রের জন্য অশেষ ধন্যবাদ। আমার মা ও তার নাতি যাকে পছন্দ করবেন, তাকেই পুত্রবধূ করে ঘরে আনব কিন্তু আপনারা দূরের বাসিন্দা বলে ওরা দুজনেই আমার উপর প্রাথমিক নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়েছেন

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আঞ্চলিক সেমিনারে যোগ দেবার জন্য আমি আগামী সোমবার দিল্লী যাচ্ছি। পনেরই পর্যন্ত সেমিনার চলবে। দিল্লীতে আমারও কিছু কাজ আছে। তাছাড়া পুত্রের আগামী বইটির পাণ্ডুলিপিও পড়তে হবে। যাইহোক মোটামুটি কুড়ি বাইশ তারিখ নাগাদ দিল্লী থেকে রওনা হয়ে আপনাদের ওখানে আসব বলে মনস্থির করেছি। ইচ্ছা আছে, একবেলা আপনাদের কাছে থেকেই কলকাতা রওনা হব। এখানে আমার অনেক কাজ।

সেই সুবাদেই সুবোধবাবু বহু প্রবাসী বাঙালীর উজ্জ্বল স্মৃতি বিজড়িত এই শহরে এসেছেন।

বৃদ্ধ রিকশাওয়ালা রিকশার প্যাডেল ঘুরোতে ঘুরোতেই আপন মনে একটু হেসে বলে, ঝণ্টুবাবু বহুত মজাদার আদমী ছিলেন। ইয়ার-দোস্তদের নিয়ে লাচ-গান শোনার জন্য উনি কত রুপেয় খরচা করতেন।

সুবোধবাবু একটু হাসেন।

ও একটু থেমেই বেশ গর্বের সঙ্গে বলে, জানেন সাব, ঝন্টুবাবুর শরাব বিলাইত থেকে আসত।

উনি একটু উৎসাহ দেবার সুরেই বলেন, সত্যি?

আরে সাব, আমি কি আপনাকে ঝুট বলব? এ শহরের সবাই ওঁর কথা জানে।

এদিক-ওদিক ঘুরে-ফিরে রিক্শা এগিয়ে চলে। রিকশাওয়ালা আপন মনেই বলে যায়, আরে সাব, রহিশ আদমীদের কারবারই আলাদা! ঝণ্টুবাবুর দুটো বিবি ছিল, দু-তিনটে আওরাতকেও উনি রেখেছিলেন। এছাড়া লক্ষ্ণৌ-কাশী থেকেও বাইজী এনে কয়েক মাস নিজের কাছে রাখতেন।

শুনেই সুবোধবাবুর সারা শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। রাগও হয়। একবার মনে মনে ভাবেন, যে পরিবারে ঝণ্টুবাবুর মত সুসন্তান জন্মেছেন, সেই পরিবারের মেয়েকে উনি পুত্রবধূ করে ঘরে আনতে পারেন না। আবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, যে কোন বড় পরিবারেই এ ধরনের দু-একটি রত্ন থাকতেই পারে কিন্তু তাদের জন্য নিরপরাধ বংশধররা শাস্তি পাবে কেন?

হঠাৎ উনি প্রশ্ন করেন, তুমি কি ঝণ্টুবাবুর কাজ ছেড়ে দিয়েছিলে?

ছেড়ে দেব না? বৃদ্ধ রিক্শাওয়ালার সুরই বদলে গেল। বলল, সাব, বলতে শরম হয়।

শরম লাগলেও ও থামে না। বলে, একদিন রাত্রে শরাব খেয়ে উনি আমার বিবির ইজ্জত নষ্ট করতে আসেন।

সুবোধবাবু মুখ বিকৃত করে অজান্তেই বলেন, ইস!

…সাব, তখন আমি জোয়ান বেটা! বিবিও জোয়ান লেড়কী। কোন বাল-বাচ্চাও হয়নি। ঝণ্টুবাবুর ঐ কাণ্ড দেখে আমার মাথায় খুন চড়ে গেল। ভুলে গেলাম উনি আমার মালিক আছেন। হাতের কাছেই একটা বাঁশ পেয়ে আমি দমাদম ওঁকে পেটাতে শুরু করি।

ও একবার নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলে, তারপর ঝন্টুবাবুর হুকুমে দুটো দারোয়ান চাবুক দিয়ে মারতে মারতে আমাকে আধমরা করার পর…

বল কী?

রিকশা চালাতে চালাতেই ও মুহূর্তের জন্য পিছন ফিরে বলল, ভগবান কী কসম সাব! সব সাচ হ্যায়।

তুমি কিছু বললে না?

আমি গরীব অদমী। আমি কি বলব? ও বোধহয় একটু হাসে। বলে, সাব, ঝণ্টুবাবু সেদিন রাত্রে আমাকে আর আমার বিবিকে নাংগা করে বের করে দেন।

শুনে সুবোধবাবুর মত শান্ত মানুষেরও রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে থাকে। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, এ কতদিন আগেকার ঘটনা?

সাব, তখন আংরেজ জমানা। লড়াই ভী চলছিল!

উনি বুঝতে পারেন, যুদ্ধের সময়ের কথা।

হঠাৎ রিক্শাটা মোড় ঘুরে ঢালু রাস্তায় এসে খুব জোরে ছুটতে শুরু করল কিন্তু বেশি দূর যাবার আগেই রিকশাওয়ালা ব্রেক কষে একটা বিরাট দোতলা বাড়ির সামনের মাঠে ঢুকল।

এই কি রাজাবাবুর বাড়ি?

হাঁ সাব!

গাড়িবারান্দার নিচে রিকশা থামতে না থামতেই মহেন্দ্রবাবু প্রায় ছুটে এসে অভ্যর্থনা করলেন, আসুন, আসুন।

ছোট্ট সুটকেসটা পাশে নামিয়ে রেখেই রিকশাওয়ালা দু হাত জোড় করে মহেন্দ্রবাবুকে বলল, প্রণাম সাহাব।

হাজার হোক রাজাবাবুর বংশধর! একজন তুচ্ছ রিকশাওয়ালার দিকে মুহূর্তের জন্য নজর দেওয়াও বোধহয় অমার্জনীয় অপরাধ। তাই মহেন্দ্রবাবু ওর কথায় কান দিলেন না।

সুবোধবাবু রিকশা থেকে নামার আগেই দুটো টাকা রিকশাওয়ালার দিকে এগিয়ে দিতেই মহেন্দ্রবাবু হঠাৎ যেন ক্ষেপে উঠলেন, আহা হা! মোটে ষাট পয়সা ভাড়া।

সুবোধবাবু একটু হেসে বললেন, আমি অর্থনীতির অধ্যাপক। আমি জানি কতটুকু পরিশ্রম করলে কি পারিশ্রমিক পাওয়া উচিত। এবার উনি রিকশাওয়ালার হাতে দু-টাকার নোটটি গুঁজে দিয়ে বললেন, আমি দিচ্ছি। তুমি রেখে দাও। সাহেব একটুও রাগ করবেন না।

কন্যার বিয়ের ব্যাপার না হলে মহেন্দ্রবাবু নিশ্চয়ই এত বড় অন্যায় বরদাস্ত করতেন না। উনি বেশ গর্বের সঙ্গেই বললেন, আগে কোন গাড়ি-ঘোড়া এ বাড়িতে ঢুকলে ধন্য মনে করত। জোর করলেও কেউ ভাড়া নিত না।

একজন চাকর সুটকেসটি নিয়ে প্রায় দৌড়ে দোতলায় উঠল।

মহেন্দ্রবাবু সম্মানিত অতিথিকে নিয়ে ধীর পদক্ষেপে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে একটু ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলেন, এই রিকশাওয়ালা হারামজাদাই এক কালে আমার বাবাকে দুবেলা মালিশ করত।

আচ্ছা?

হ্যাঁ সুবোধবাবু!

২. সুবোধবাবু এ বাড়িতে পা দিয়েই

সুবোধবাবু এ বাড়িতে পা দিয়েই খেয়াল করেছেন, এককালে এ বাড়ির সিঁড়ি ও মেঝে ইটালিয়ান মার্বেল দিয়ে মোড়া ছিল। এখনও যে নেই, তা নয়। মেঝের সর্বত্র না হলেও অনেক জায়গাতেই আছে কিন্তু সিঁড়িতে প্রায় নেই বললেই চলে। তাদের শূন্যস্থান পূর্ণ হয়েছে সিমেন্ট-বালি দিয়ে। গরমের দিনে মুখে পাউডার মাখার মত কোন কোন জায়গায় ঐ সিমেন্ট-বালির উপর একটু সাদাঁ সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। গ্রাম্য যাত্রার দলে পুরুষ নর্তকী যেমন বেমানান, তেমনই বীভৎস?

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই সুবোধবাবু প্রশ্ন করেন, আচ্ছা মহেন্দ্রবাবু, এ বাড়ি কতদিনের হল?

তা একশ বছরের উপর হল। মহেন্দ্রবাবু পাশ ফিরে ওঁর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলেন, আঠারোশ উনষাট সালে আমার গ্রেট গ্র্যাণ্ড-ফাদার ইংরেজদের কাছ থেকে প্রথম জমিদারী পান।…

তার মানে সিপাহী মিউটিনির পর পরই?

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন।

সুবোধবাবু আর কোন প্রশ্ন না করলেও রাজাবাবুর বংশধর ওঁদের একদা গৌরবের কাহিনী বলে যান, ঐ জমিদারী পাবার পর আমার গ্র্যাণ্ডফাদার রাজা অবলাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় বিহার-উত্তরপ্রদেশের সাতটি বড় বড় শহরে সাতটি প্যালেস তৈরী করেন।…

এত কথা শোনার পর কি চুপ করে থাকা উচিত?

নিতান্ত সৌজন্যের জন্য সুবোধবাবু বলেন, আচ্ছা?

এবার মহেন্দ্রবাবু একটু আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বলে, ঐ সাতটি প্যালেসের মধ্যে এইটি সবচাইতে ছোট!

সুবোধবাবুও একটু হাসেন। বলেন, আপনার গ্রেট গ্র্যাণ্ড ফাদারের রুচি ও মেজাজ দেখছি সত্যি রাজামহারাজের মতই ছিল।

সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। উনি একটু থেমে, একটু হেসে বলেন, আপনি খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রাম করুন। তারপর ওঁর গল্প শোনাব।

দোতলার বিরাট বারান্দায় পা দিয়েই সুবোধবাবু বললেন, এবার আর ওঁর গল্প শোনা হবে না

কেন? আপনি কি ইন্টারেস্টেড না?

না, না, তা না। আমি আজ বিকেলের গাড়িতেই চলে যাব।…

এ কথা শুনেই মহেন্দ্রবাবু যেন চমকে উঠলেন। থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, না, না, তা কখনোই হতে পারে না। আপনাকে অন্তত দুচারদিন থাকতেই হবে।

বারান্দা দিয়ে এগুতে এগুতেই সুবোধবাবু অত্যন্ত ধীর স্থিরভাবে বললেন, না মহেন্দ্রবাবু, এ যাত্রায় দয়া করে আমাকে যেতে দিন। কাল কলকাতায় আমার অনেক কাজ।

কিছু ভিক্টোরিয়ান, কিছু মামুলী ফার্নিচার দিয়ে সাজানো ড্রইংরুমে পা দিয়েই মহেন্দ্রবাবু বললেন, কিন্তু…

এবার দয়া করে আমাকে বাধা দেবেন না। সত্যি আমার অনেক কাজ। উনি পুরনো দিনের একটা সোফায় বসতে বসতে বললেন, মা আর মেজ মাসীর জন্য এখন এলাম। হয়তো

এবার মহেন্দ্রবাবু ওঁর কথার কোন জবাব না দিয়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মত হুঙ্কার দিলেন, বাবুলাল?

বাবুলাল দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়েছিল প্রভুর স্নেহের ডাক শুনেই সে আত্মপ্রকাশ করে বলে, জী হুজুর!

চা আন।

বাবুলাল জী হুজুর বলে ভিতরের দিকে পা বাড়াতেই প্রভু আবার হুকুম করলেন, আর শোন, মাকে আসতে বল।

জী হুজুব! ও এবার দৌড়ে ভিতরে গেল।

এই ড্রইংরুম দেখে সুবোধবাবুর মনে হল, এক অতীত ইতিহাসের অন্ধকার ভগ্নস্তূপের মধ্যে বসে আছেন। মহেঞ্জোদাড়ো-হরপ্পা বা নালন্দা-বিক্রমশীলাও তো ভগ্নস্তূপ! কিন্তু ঐসব ভগ্নস্তূপের প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে মানবসভ্যতার গৌরবময় কাহিনী, ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। আর এখানে? ভাবতে গিয়েও বোধ হয় ওঁর লজ্জা হয়। তবু উনি বেশ আগ্রহের সঙ্গেই চারপাশ দেখেন।

কী আর দেখবেন সুবোধবাবু? এখন তো আমরা ভিখারী! আক্ষেপ করে মহেন্দ্রবাবু বলেন।

ছি, ছি, ওকথা বলবেন না।

সত্যি কথাই বলছি সুবোধবাবু। যা ছিল তার তুলনায় ভিখারী বৈকি!

গভর্নমেন্ট জমিদারী নিয়ে নিলে…

ওঁকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই উনি বলেন, গভর্নমেন্ট জমি দারী নেবার আগেই আমাদের বারো আনা টাকাকড়ি-সম্পত্তি বাবা বেচে দেন।

কেন? সুবোধবাবু একটু বিস্ময় প্রকাশ করেই জিজ্ঞেস করেন, উনি বুঝি খুব আমুদে লোক ছিলেন?

মহেন্দ্রবাবু প্রায় চিৎকার করে ওঠেন, না, না, নট অ্যাট অল! নট অ্যাট অল! হি ওয়াজ এ গ্রেট ন্যাশনালিস্ট।

তাই নাকি?

উনি ন্যাশনালিস্ট লীডার ও কর্মীদের দুহাতে টাকা বিলিয়েছেন। পরিচিতদের মধ্যে যারা জেলে যেতেন, তাদের ফ্যামিলীকে ঠিক নিজের ফ্যামিলীর মত প্রতিপালন করতেন।

সুবোধবাবু মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওঁর দিকে তাকিয়ে থাকেন।

উনি প্রায় এক নিশ্বাসেই বলে যান, টেররিস্ট মুভমেন্টের সময় টেররিস্টদের লুকিয়ে রাখার জন্য উনি কয়েকজন বাঈজীকে বছরের পর বছর রেখে দেন।

বাঈজীদের বাড়িতে টেররিস্টদের লুকিয়ে রাখেন?

সম্মতিতে মাথা নাড়িয়ে একগাল হাসি হেসে মহেন্দ্রবাবু বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেন, পুলিসের গোয়েন্দারা কি জমিদারের বুদ্ধির সঙ্গে

সুবোধবাবু বেশ জোরেই হেসে ওঠেন।

মহেন্দ্রবাবু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললেন, কিন্তু দেশের জন্য এত ক্ষতি স্বীকার করেও বাবার কত বদনাম হয়েছে জানেন?

আরে ওসব গ্রাহ্য করতে নেই।

এ বিষয়ে আর কোন কথাবার্তা হবার আগেই মহেন্দ্রবাবুর স্ত্রী ড্রইংরুমে ঢুকলেন। চা-জলখাবারের ট্রে নিয়ে ওঁর পিছন পিছন বাবুলাল এল।

আমার স্ত্রী! মহেন্দ্রবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন।

মিসেস ব্যানার্জী ও সুবোধবাবু প্রায় একই সঙ্গে নমস্কার ও প্রতি নমস্কার করলেন।

সেন্টারটেবিলে চা-জলখাবারের পাত্র রাখতে রাখতে মিসেস ব্যানার্জী বললেন, আমার শ্বশুরমশায়ের খুড়তুতো বোনের দূরসম্পর্কের ননদ হলেও যোগমায়া পিসী আমাদের অত্যন্ত স্নেহ করেন।…

মহেন্দ্রবাবু বললেন, একটু চা খান।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই সুবোধবাবু একটু হেসে বললেন, হ্যাঁ, তা জানি।

ভদ্রমহিলা পাশের একটা সোফায় বসে বললেন, ঈশ্বরের কি ইচ্ছা জানি না তবে আপনাদের মত শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত পরিবারে মেয়েকে দিতে পারলে আমরা ধন্য মনে করব।

না, না, একথা বলবেন না। সুবোধবাবু আবার এক চুমুক চা খেয়ে বললেন, আজকাল তো সবাই শিক্ষিত। তাছাড়া আপনাদেব মত ঐতিহ্য বা আভিজাত্য তো আমাদের নেই।

মিসেস ব্যানার্জী একটু ম্লান হাসি হেসে বললেন, ঐ নামেই তালপুকুর। আসলে ঘটি ডোবে না।

মহেন্দ্রবাবু চুপ করে থাকলেও ওঁর স্ত্রী বলে যান, ঐ ঐতিহ্য আভিজাত্যই এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওঁর কথা শুনে সুবোধবাবু মনে মনে ওঁকে শ্রদ্ধা না করে পারেন না কিন্তু মুখে বলেন, কিন্তু ব্যক্তি বা সমাজজীবনে তো ঐতিহ্য আভিজাত্যের একটা বিরাট ভূমিকা আছে।

ভূমিকা আছে বলবেন না। বলুন, ভূমিকা ছিল। উনি একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেন, এ যুগে ঐতিহ্য-টৈতিহ্যের দাম ফুটো পয়সাও না।

এতক্ষণ পর মহেন্দ্রবাবু ওঁর স্ত্রীকে বললেন, এদিকে প্রফেসর সাহেব কী বলেছেন জানো?

কী?

উনি আজই বিকেলের ট্রেনে কলকাতা চলে যাবেন।

মিসেস ব্যানাজী সঙ্গে সঙ্গে বললেন, অসম্ভব।

সুবোধবাবু বললেন, কিন্তু কাল কলকাতায় আমার সত্যি অনেক কাজ।

নিশ্চয়ই কাজ আছে, কিন্তু দাদা আপনার মত মানুষকে তো কাছে পাই না! তাই এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে পারব না।

এবার সত্যি সুবোধবাবু হাসতে হাসতে বলেন, শুনেছিলাম, আপনার স্বামী উকিল কিন্তু এখন দেখছি, আপনিই সিনিয়র অ্যাডভোকেট!

ওঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই হাসেন। ঐ হাসতে হাসতেই মিসেস ব্যানার্জী জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু মামলায় জিতেছি কিনা তা তো বললেন না?

জজ সাহেব বলেছেন, এমন তুচ্ছ ব্যাপারে মামলা করাই অন্যায় হয়েছে। তাই উনি দু-পক্ষকেই মিটমাট করে নিতে বলেছেন, অধ্যাপক মুখার্জী চাপা হাসি হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেন।

যাক তাহলে মামলায় হারিনি। অর্থাৎ অজি বিকেলে আপনি যাচ্ছেন না।

ঐ ড্রইংরুমে বসেই আরও এক রাউণ্ড চা খেতে খেতে ঠিক হল, সুবোধবাবু পরের দিন ভোরবেলার ট্রেনে রওনা হবেন।

সুবোধবাবু স্নান করে বেরুতেই ব্রেকফাস্টের ডাক পড়ল। উনি ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াতেই মিসেস ব্যানার্জী বললেন, ছোট মেয়ে মামারবাড়ি গেছে। তাই এখন আমরা মাত্র তিনটি প্রাণী এখানে আছি। আমরা দুজনে আপনার সঙ্গে গল্প করছি আর। আমার মেজ মেয়ে একলা একলা ঘরের মধ্যে

সুবোধবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আপনাদের আপত্তি না থাকলে আমরা সবাই মিলেই তো গল্প করতে পারি।

ওঁরা স্বামী-স্ত্রী প্রায় একসঙ্গেই ডাক দিলেন, কৃষ্ণা, এদিকে আয়।

দক্ষিণ দিকের কোণার ঘর থেকে বেরিয়ে কৃষ্ণাকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসতে দেখেই সুবোধবাবু মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন।

৩. বাঙালীকে যারা ঘরকুনো বলেন

বাঙালীকে যারা ঘরকুনো বলেন, তারা সত্যি বাঙালীর ইতিহাস জানেন না। আজ নয়, বাঙালী চিরকালই ঘর ছেড়ে অজানা দেশ দেশান্তরের পথে বেরিয়ে পড়েছে। সেই অনাদি অতীতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও বাঙালী সেনারা যোগ দিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, বাঙালী সেনারা সত্যাশ্রয়ী পাণ্ডবদের পক্ষে ছিল না। ওঁরা লড়াই করেছিলেন কুরুর পক্ষে। শুধু সে সময় নয়, বাঙালী চিরকালই রাজাদের দলে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পর কিছু বাঙালী ক্ষেপে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তাদের ঠাণ্ডা হতেও বেশি সময় লাগেনি। তারপর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সময় কিছু বাঙালী রাজার বিরুদ্ধে হাতিয়ার ধরেছিল কিন্তু তাদের সহস্রগুণ বেশি বাঙালী তখন দেবজ্ঞানে রাজসেবা করেছেন। আগস্ট বিপ্লবের সময়ও বাঙালী রাজদ্রোহীদের চাইতে অনেক অনেক বেশি সংখ্যক বাঙালী পুলিস ও গোয়েন্দা সে বিদ্রোহ দমনে সব শক্তি নিয়োগ করেছিল। অজিও আমরা অনেকেই এস. পি. ম্যাজিস্টেট, মন্ত্রী দেখলে গদগদ না হয়ে পারি না।

বাঙালীর রক্তেই বোধহয় রাজভক্তির বীজ লুকিয়ে আছে। পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভ করলেও লর্ড ক্লাইভ বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাছাড়া ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির ঘর-সংসার সামলাতে কয়েকটা বছর তাকে ব্যস্ত থাকতে হয়। তারপর একটু ফুরসত পাবার পর লর্ড ক্লাইভ বেরিয়ে পড়লেন এবং এলাহাবাদ যাবার সময় সঙ্গে নিলেন কলকাতা শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ দেব মহাশয়কে। হাজার হোক একে রাজা নবকৃষ্ণ, তার উপর স্বয়ং লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে বেরিয়েছেন। সুতরাং সাঙ্গপাঙ্গ অনেক ছিল এবং তাদেরই একজনের নাম গঙ্গাধর। শ্রীমান গঙ্গাধরের হাতে তৈরি তামাক না খেলে রাজা নবকৃষ্ণের তৃপ্তি হতো না।

যমুনা যেখানে পুণ্য পবিত্র জাহ্নবীতে আত্মসমর্পণ করে আত্মহারা হয়ে লুপ্ত সরস্বতীর সঙ্গে একাকার হয়েছে, সেই ত্রিবেণী সঙ্গমের শোভা দেখবার সময় লর্ড ক্লাইভ রাজা নবকৃষ্ণের সুপারিশে গঙ্গাধরের হাতে তামাক খেয়ে এমনই মুগ্ধ হয়ে যান যে সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ সহস্র মুদ্রা ও কোম্পানিতে একটি স্থায়ী চাকরি দেন। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রবাসী বাঙালী পরিবারের জন্ম হল।

গঙ্গাধরের আদি নিবাস ছিল হুগলী। এবং তিনি ব্রাহ্মণ ছিলেন। তার গলায় পৈতা থাকলেও পেটে শাস্ত্রজ্ঞান ছিল না। শুধু তাই নয়। পিতামহের শত চেষ্টাতেও তিনি শালগ্রামশিলার সেবা করতেও শিখলেন না বলে ঘর থেকে বিতাড়িত হন। শ্রীমান গঙ্গাধর মন্ত্র-তন্ত্র না জানলেও তামাক খেতে বড় ভালবাসতেন এবং সাজতেনও ভাল। ঐ বিদ্যাটুকু সম্বল করেই তিনি একদিন ঘুরতে ঘুরতে কলকাতা শহরে হাজির। বিধির বিধান কে খণ্ডাবে! একদিন আহিরীটোলার গঙ্গার ঘাটে রাজা নবকৃষ্ণের এক বিশ্বস্ত কর্মচারীর সঙ্গে এই ব্রাহ্মণ সন্তানের পরিচয় হয় ও তিনি তার দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে বড়ই বিচলিত হন। ওঁরই কৃপায় গঙ্গাধর রাজা নবকৃষ্ণের রাজবাড়িতে প্রথমে আশ্রয় লাভ ও পরে স্নেহভাজন কৃপাপাত্র হয়ে ওঠেন।

যাই হোক লর্ড ক্লাইভ ও রাজা নবকৃষ্ণের বিদায়ের পর গঙ্গাধর কিছুকাল বিলাস-ব্যসনে জীবন কাটালেও অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কোম্পানির চাকরি করেন। ইতিমধ্যে হুগলী দেবানন্দপুর-ভাস্তাড়া অঞ্চলের এক ব্রাহ্মণ সপরিবারে তীর্থ ভ্রমণে এলে অত্যন্ত বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের একান্ত অনুরোধে গঙ্গাধর তার কন্যাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর গঙ্গাধর চাকরির সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির কন্ট্রাক্টারী শুরু করেন ও প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। গঙ্গাধর মৃত্যুর সময় দুটি স্ত্রী, নটি পুত্র, পাঁচটি কন্যা, পাঁচটি নাতি-নাতনী, একটি অট্টালিকা, চার-পাঁচশ ভরি সোনা, প্রায় মনখানেক রূপা, বিশ-ত্রিশ মণ বাসন-কোসন ও প্রায় পনেরো হাজার টাকা নগদ রেখে যান। তখন বোধ হয় সত্যি রাম-রাজত্ব ছিল!

গঙ্গাধরের মৃত্যুর পরই পরিবারের মহা অশান্তি দেখা দেয় ও আস্তে আস্তে সোনার সংসার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। বছর দশেকের মধ্যে গঙ্গাধরের বংশধররা প্রায় সারা উত্তরপ্রদেশে ছড়িয়ে পড়েন। ইতিমধ্যে ইংরেজ রাজত্বের পাকা বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে। অফিস আদালতের সঙ্গে সঙ্গে লেখাপড়া শেখার বিধি-ব্যবস্থা ও ডাক্তারখানা চালু হল এবং এই সমস্ত বিভাগেই বাঙালীর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও একাধিপত্য ছড়িয়ে পড়ল। কোর্ট-কাছারির কৃপায় বাঙালী উকিলবাবুরা তো রাজা হয়ে গেলেন। লোকে সাধে কি বলত, লড়ে টোপী-ওয়ালা, খায় ধোতিওয়ালা! এইরকম এক ভাগ্যবান উকিল ছিলেন গঙ্গাধরের পঞ্চম পুত্র শ্রীধর বাঁড়ুজ্যে। কোম্পানির অনেক ইংরেজ কর্মচারীই এই শ্রীধর ব্যানার্জীর বন্ধু ছিলেন ও কালেক্টর লঙ সাহেবের কৃপায় তার জ্যেষ্ঠপুত্র ডাকমুন্সীর চাকরি পান। এর কিছুকাল পরে ডাকবিভাগ কালেক্টরের হাত থেকে সিভিল সার্জেনের অধীনে চলে যায় এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অশ্ব ডাক চালু হয়। শ্রীধর নন্দন ডাক অশ্বের কালেক্টর হন।

শ্রীধরবাবু সব পুত্রদেরই কিঞ্চিৎ ইংরেজি শিখিয়েছিলেন এবং সেই সামান্য ইংরেজি জ্ঞানের দৌলতে অন্য একটি পুত্রও অশ্ব ও গোডাক বিভাগে কাজ পান। এর নাম কামিনীরঞ্জন।

কামিনীরঞ্জন সত্যি একটি রত্ন ছিলেন। নিজের কর্ম দক্ষতায় উনি যে শুধু মাত্র ডেপুটি পোস্ট মাস্টার হন তাই নয়, সিপাহী বিদ্রোহের সময় উনি যেভাবে ইংরেজ সেনাপতি ও অফিসারদের সেবা করেন, তার তুলনা বিরল। বিদ্রোহী সিপাহী ও মুসলমানরা ইংরেজসেবক বাঙালীদের শত্রু মনে করতেন বলে তাদের অনেকের উপরই অকথ্য অত্যাচার হয়। ধন-সম্পত্তি ছাড়াও বহু বাঙালীকে প্রাণ হারাতে হয়। বিদ্রোহীরা কামিনীরঞ্জনকেও খুন করার পরিকল্পনা করেছিল কিন্তু উনি সে খবর আগেই জানতে পেরে পোস্ট অফিসের দামী ও দরকারী জিনিসপত্র ছাড়াও কিছু বিশ্বস্ত কর্মীকে নিয়ে পালিয়ে যান।

কামিনীরঞ্জন আত্মগোপন করে থাকার সময় বিশ্বস্ত কর্মী ও ইংরেজ সমর্থক কিছু সুচতুর গ্রামবাসীদের সাহায্যে বিদ্রোহী দলের গোপন খবর সংগ্রহ করে অত্যন্ত গোপনে ওয়াটসন সাহেবের এক ঘনিষ্ঠ অফিসারের কাছে পাঠাতেন অনেক সময় কামিনীরঞ্জন নিজেও জীবন বিপন্ন করে সাধুসন্ন্যাসী-ফকিরের বেশে শত্রু শিবিরে প্রবেশ করে সংবাদ সংগ্রহ করতেন। যাদের সক্রিয় ও ঐকান্তিক সাহায্যে মহামান্য ইংরেজ সরকার বিদ্রোহ দমনে সমর্থ হয়, তাদের অন্যতম এই বাবু কামিনীরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় মহোদয়।

দেশে শান্তি স্থাপনের পর ইংরেজ সরকার প্রকাশ্যে ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রচুর অর্থ ও ডেপুটি কালেক্টরের পদ দিয়ে পুরস্কৃত করেন। সে সময় উত্তরপ্রদেশের বেশ কিছু বাঙালী চরম রাজভক্তি দেখাবার জন্য এই দুর্লভ সম্মান লাভ করেন।

কামিনীরঞ্জনের কাহিনী, সৌভাগ্যের ইতিহাস এখানে শেষ নয়। কোম্পানির জমানা শেষ হবার পর স্বয়ং মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসন ব্যবস্থা চালু হবার কিছুকালের মধ্যেই ছোটলাটের ব্যক্তিগত সুপারিশে ও আগ্রহে কামিনীরঞ্জন বিহার ও উত্তরপ্রদেশে বিশাল জমিদারীও লাভ করেন। একদা অশ্ব ও গো-ডাক বিভাগের নগণ্য কর্মচারীর সৌভাগ্যের ইতিহাস এখানেও শেষ হল না।

মহারানী ভিক্টোরিয়ার শাসনব্যবস্থা চালু হলে কিছু ইংরেজ অফিসারকে দেশে পাঠান হল, নতুন কিছু অফিসার দেশ থেকে এখানে এলেন। আবার বেশ কিছু উচ্চপদস্থ অফিসারকে কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে বদলী করা হল। এই রদবদলের বাজারে ল্যাঙ্কাশায়ার ফিফথ ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন বার্জম্যানকে এলাহাবাদে কমিশনার নিয়োগ করা হল। কোন অজ্ঞাত কারণে বহু ইংরেজ অফিসারই এই নিয়োগের খবর জেনে অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন এবং তারা অনেকেই ওঁর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও করতেন না। এই সব ইংরেজদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বহু গণ্যমান্য ভারতীয়রাও বার্জম্যানকে এড়িয়ে চলতেন কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন শুধু কামিনীরঞ্জন।

কামিনীরঞ্জন নতুন কমিশনার সাহেব ও মেমসাহেবের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আনন্দের জন্য প্রাণ ঢেলে দিলেন ও দু-হাতে জলের মত অর্থ ব্যয় করতেন। ক্যাপ্টেন বার্জম্যান সর্বশক্তিমান কমিশনার হলেও লাটসাহেব ছিলেন না, কিন্তু প্রভুভক্ত কামিনীরঞ্জন ওঁকে খুশি করার জন্য সব সময় হিজ একসেলেনসী বলে সম্বোধন করতেন।

বন্ধু কুমুদবিহারী একদিন বললেন, কামিনীরঞ্জন, এতগুলো ইংরেজ অফিসারকে চটিয়ে নতুন কমিশনার সাহেবকে খুশি করা কী বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে?

কামিনীরঞ্জন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, দেখ কুমুদবিহারী, আমি কমিশনার সাহেবকে নিয়োগ করিনি। স্বয়ং মহারানী ভিক্টোরিয়া ওঁকে এখানে পাঠিয়েছেন। যিনি পৃথিবীব্যাপী এতবড় সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন, আমি কি করে তার মনোনীত নতুন কমিশনার বাহাদুরকে সম্মান ও মর্যাদা না দিয়ে পারি।

তা ঠিক কিন্তু…

ওঁকে বাধা দিয়ে কামিনীরঞ্জন বললেন, তাছাড়া কে বলতে পারে, কমিশনার সাহেব স্বয়ং মহারানীর প্রিয়পাত্র বা আত্মীয় না।

কুমুদবিহারীও রাজভক্ত এবং রাজ অনুগ্রহেই জীবনে বহু উন্নতি করেছেন কিন্তু ওঁর মাথায়ও এত কিছু চিন্তাভাবনা আসেনি। উনি গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বললেন, তা তো বটেই।

এবার কামিনীরঞ্জন একটু হেসেই বলেন, দেখ কুমুদবিহারী, হু এভার ম্যারেজ মাই মাদার, ইজ মাই ফাদার! যিনিই মাকে বিয়ে করবেন, তিনিই আমার বাবা।

ওঁর কথায় কুমুদবিহারী হোহো করে হেসে ওঠেন। বলেন, ইউ আর রাইট, মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ড! ইউ আর রাইট, মাই ডিয়ার ফ্রেণ্ড! ত্রিবেণী সঙ্গম দিয়ে গঙ্গা-যমুনার জল আরো গড়িয়ে যায়। কমিশনার সাহেব ও তার মেমসাহেবের সঙ্গে কামিনীরঞ্জনের ঘনিষ্ঠ পরিচয় ধীরে ধীরে গভীর হৃদ্যতা ও বন্ধুত্বে পরিণত হয়। কামিনীরঞ্জন বুঝতে পারেন, কমিশনার সাহেব শুধু ক্ষমতা পেয়ে খুশি না। উনি আরও অনেক কিছু আশা করেন। প্রভুভক্ত জমিদারও তার সে সুপ্ত আশা আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে কোন ক্রটি করেন না। যখন তখন সাহেব-মেম সাহেবকে দামী দামী জিনিসপত্র উপহার দেন। তারপর সাহেবের জন্মদিনে উনি ওঁকে একটা অত্যন্ত দামী হীরার আংটি দিতেই মেম সাহেব হাসতে হাসতে বললেন, খামিনী, আমি কী অপরাধ করলাম যে তুমি বার্জ-কেই শুধু উপহার দিলে?

কামিনীরঞ্জন গদগদ হয়ে হাসি মুখে বললেন, হিজ একসেলেনসী দয়া করে অনুমতি দিলে আমি আপনাকে হীরের নেকলেস উপহার দেব।

ও! লাভলি! শুনেই মেমসাহেব আত্মহারা হয়ে যান।

আধ গেলাস হুইস্কী একসঙ্গে গলায় ঢেলে দিয়ে কমিশনার সাহেব বললেন, খামিনী, তুমি শুধু আমার বন্ধু না, আমার স্ত্রীরও বন্ধু।…

ইওর একসেলেনসী, আমি কী আপনাদের বন্ধু হবার যোগ্য? আমি নিছক ভক্ত মাত্র!

একে হুইস্কী, তার উপর অত দামী হীরের আংটি। বার্জম্যান ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বললেন, নো খামিনী, তুমি আমাদের দুজনেরই বন্ধু।

পেটে আরও দু-পাঁচ পেগ হুইস্কী পড়ার পর কমিশনার গড় গড় করে বলে যান, ইউ সী খামিনী, আমি বোকা না..

ছি, ছি, ইওর একসেলেনসী, এ কি কথা বলছেন?

…হার ম্যাজেস্টি দ্য কুইন আমাকে ভাল না বাসলে এই সাঁইত্রিশ বছর বয়সে আমি কমিশনার হই না কিন্তু আমি জানি অনেকেই আমাকে পছন্দ করে না। এমন কি বহু ব্লাডি নেটিভ জেন্টলম্যানও আমাকে এড়িয়ে চলে।

ইওর একসেলেনসী, ওরা পাপী, ওরা হতচ্ছাড়া।

কমিশনার সাহেব ওর কথা শুনেও শোনেন না। উনি আপনমনে বলেন, তুমি যেভাবে আমাদের সেবা করছ, তার জন্য আমরা শুধু খুশি না, উই আর গ্রেটফুল।

এটা তো আমার কর্তব্য ইওর একসে..

হঠাৎ বার্জম্যান গর্জে ওঠেন, স্টপ! ব্লাডি খামিনী! কাম অন! আমরা তিনজনে নাচব!

কামিনীরঞ্জনের জীবনে সে এক অবিস্মরণীয় দিন। পুণ্য তিথিও বলা চলে।

তিনজনে মিলে নাচ শুরু হলেও নেশার ঘোরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বার্জম্যান ঢলে পড়লেন কিন্তু মেমসাহেব কামিনীরঞ্জনকে নিয়ে নাচ থামালেন না। কিছুতেই না। মাঝে মাঝে মেমসাহেব ওয়াইনের গেলাসে চুমুক দেন। কামিনীরঞ্জনও একটু হুইস্কী দিয়ে শুকনো গলা ভিজিয়ে নেন। নাচ চলে মৃদুমন্দ গতিতে। নাচতে নাচতে কথাও হয়।

জানো খামিনী, বার্জ কী বলে?

কী বলেন?

বার্জ বলে, খামিনী নেটিভ হলেও বোধহয় ইংরেজ মহিলার গর্ভে জন্মেছে। তা না হলে এত সুন্দর দেখতে হয়?

কামিনীরঞ্জনের মনে খুশি ও গর্বের বন্যা বয়ে যায়। বলেন, হিজ একসেলেনসী, আমাকে সত্যি স্নেহ করেন।

আই অলসো লাভ ইউ খামিনী!

একশবার! হাজার বার তা স্বীকার করি।

রাত আরো একটু গম্ভীর হয়। বার্জম্যান সাহেব মুহূর্তের জন্য আত্মসম্বিৎ ফিরে পেয়েই আবার একটু হুইস্কী খেয়েই শুয়ে পড়েন। চোখ বন্ধ করেই উনি জড়িয়ে জড়িয়ে বলেন, নাচ থামালেই আমি তোমাদের চাকরি খেয়ে দেব।

গভীর রাত্রি ও ওয়াইনএর সম্মিলিত মাদকতার প্রভাবে মেমসাহেবও কেমন যেন একটু বদলে যান। কামিনীরঞ্জনকে আরো কাছে টেনে নেন। তারপর হঠাৎ একটি চুম্বন।

কামিনীরঞ্জন চমকে ওঠেন। অনিন্দে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। তারপর নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন, মেমসাহেব, একি করলেন?

খামিনী, ইউ আর এ লাভলি ম্যান! তোমার সঙ্গে নাচতে আমার খুব ভাল লাগছে।

বাট হিজ একসেলেনসী…

ড্যাম ইওর হিজ একসেলেনসী! ও যদি জনস্টোনের ঐ হতভাগী বউটাকে নিয়ে রেগুলার স্ফুর্তি করতে পারে, তাহলে আমি তোমাকে কেন কিস করতে পারব না?

মেমসাহেবের কথা শুনেও ওর ভাল লাগে। সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয় কিন্তু হিজ একসেলেনসীর সামনে…

মেমসাহেব এবার ওকে দুহাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে আবার একটি চুম্বন করেন।

এবার আর কামিনীরঞ্জন চুপ করে থাকতে পারেন না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলেন, মেমসাহেব, হিজ একসেলেনসী আমাকে গুলী করে মারবেন।

মিসেস বার্জম্যান হাসতে হাসতে বলেন, এখন আমি তোমাকে নিয়ে সারা রাত শুয়ে থাকলেও তোমার হিজ একসেলেনসী জানতে পারবে না। ভুলে যেও না, প্রায় দুবোতল হুইস্কী ওর পেটে গেছে।

দিন এগিয়ে চলে। কমিশনার দম্পতির সঙ্গে কামিনীরঞ্জনের সম্পর্ক আরো নিবিড় হয়। কমিশনার সাহেব ট্যুরে যাবার সময় মাঝে মাঝে স্ত্রীকে ছাড়াও কামিনীরঞ্জনকেও সঙ্গে নিয়ে যান। আবার সাহেব একলা গেলে কামিনীরঞ্জন সকাল সন্ধ্যেয় কোঠীতে গিয়ে মেমসাহেবের তদারকী করেন।

এখন আর বার্জম্যান সাহেবকে কেউ এড়িয়ে চলেন না। বরং সবাই ওকে খুশি করতে ব্যস্ত। রাজা-মহারাজা-জমিদাররা ছাড়াও গণ্যমান্য নেটিভরা ওকে নিত্য উপঢৌকন পাঠান। হাজার-হাজার লাখ-লাখ মূল্যের সেসব উপহার। সাহেব-মেমসাহেব দুইজনেই খুশি কিন্তু দুইজনেই কামিনীরঞ্জনকে বলেন, এখন সবাই আমাদের খুশি করতে ব্যস্ত কিন্তু আমরা জানি তুমি ছাড়া আর কেউ আমাদের রিয়েল ফ্রেণ্ড না।

হিজ একসেলেনসী, আমি কী এই দুর্লভ সম্মানের উপযুক্ত?

রাজকার্যের জন্য কমিশনার সাহেবকে মাঝে মাঝেই বাইরে যেতে হয়। কখনো দুএকদিন, কখনো আবার পাঁচ-সাতদিন। এই অবসরে মেমসাহেবের সঙ্গে কামিনীরঞ্জনের সম্পর্ক হঠাৎ মোড় ঘুরল।

সেদিন সন্ধ্যে থেকেই দারুণ জল-ঝড়। কামিনীরঞ্জন ঐ জল-ঝড় উপেক্ষা করেই মেমসাহেবের খোঁজ-খবর নিতে এলেন কোঠীতে। ইচ্ছা ছিল ঘণ্টাখানেক থেকেই ফিরে যাবেন কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির বেগ এত বাড়ল যে ঘর থেকে বের হওয়াই অসম্ভব। এইসব চিন্তা-ভাবনা করতে করতেই দুজনে একটু-আধটু ড্রিঙ্ক করলেন। তারপর ঝড়-বৃষ্টির তেজ আরও বাড়তেই মেমসাহেব বললেন, খামিনী, এই ঝড়-বৃষ্টির রাত্রে আমি শুধু চাকর-বাকরদের ভরসায় থাকতে পারব না। আজ তুমি আমার কাছে থাকবে।

না, না, মেমসাহেব তা হতে পারে না। আপনি প্লীজ..

হোয়াট না? না? তুমি আজ আমার কাছে থাকবে। এটা আমার অর্ডার।

মনে মনে যত ইচ্ছাই থাক, মুখে কামিনীরঞ্জন বার বার আপত্তি করলেন। অনুনয়-বিনয়ও করলেন কিন্তু কে কার কথা শোনে? আরও খানিকটা ড্রিঙ্ক করার পর মেমসাহেব কামিনীরঞ্জনকে নিয়ে শোবার ঘরে ঢুকলেন।

না, এখানেও কামিনীরঞ্জনের জীবন-নাট্যে যবনিকা পড়ল না। বছরখানেক পর হঠাৎ একদিন কমিশনার সাহেব গোপনে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে জনস্টোন সাহেবের সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। পরে অবশ্য জানা গেল, ওরা দুজনে মিশরে গেছেন।

কমিশনার সাহেবের উধাও হবার খবরে কামিনীরঞ্জন প্রথমে ঘাবড়ে গেলেও মেমসাহেব বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। মেমসাহেব ওকে বললেন, খামিনী, অযোধ্যার নবাব বিন্ধ্যাচল পাহাড়ের যে ছোট্ট প্যালেসটা আমাকে দিয়েছেন, আমি সেখানেই থাকব। তুমি আমার সব বিধিব্যবস্থা করে দাও।

শুধু মেমসাহেবের না কামিনীরঞ্জনেরও জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হল। মেমসাহেব বছরের অনেক সময়ই বিন্ধ্যাচলের প্যালেসে কাটালেও রাজা-মহারাজা-নবাবদের প্রদত্ত অন্যান্য কোঠীতেও মাঝে মাঝে কিছুদিন কাটান। কামিনীরঞ্জন জমিদারী দেখাশুনার অজুহাতে মাঝে মাঝেই মেমসাহেবের কাছে কিছুদিন কাটান।

সত্যি বলছি খামিনী, ইংরেজরা ভালবাসতে জানে না। তুমি আমার হাজব্যাণ্ড না কিন্তু তোমার কাছে আমি যে ভালবাসা, যে আদর পাই তা কোন ইংরেজ স্বামী দিতে পারবে না।

সত্যি মেমসাহেব?

হ্যা খামিনী। মেমসাহেব কামিনীরঞ্জনের গলা জড়িয়ে ধরে বলেন, খাজুরাহো টেম্পল দেখেই আমি বুঝেছি, ইণ্ডিয়ান নেটিভরা সত্যি ভালবাসতে জানে।

দুরন্ত প্রাণচঞ্চল পাহাড়ী নদীর মত কামিনীরঞ্জনের জীবনধারাও বার বার তার গতিপথ বদলেছে। বছর দুই পর এক বান্ধবীর সঙ্গে ডালহৌসী পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় মেমসাহেব মারা গেলেন।

মেমসাহেবের অকস্মাৎ মৃত্যু কামিনীরঞ্জনের ব্যক্তিগত জীবনে যত দুঃখ বা বেদনার কারণই হোক, লাভও কম হল না। মেমসাহেবের কয়েক লক্ষ টাকার গহনা ও হীরা-জহরত ছাড়াও নানা জায়গায় চার পাঁচটি প্যালেস ও কোঠী ওরই দখলে এল।

বিহারের গঙ্গাতীরের অর্ধখ্যাত শহরের রাজাবাবুদের পরিবারের এই হল আদি ইতিহাস। তবে এইসব কাহিনী মহেন্দ্রবাবুরা কাউকে বলেন না। বলতে পারেন না। উনি যে সাতটি প্যালেসের জন্য গর্ব করেন, তার অধিকাংশই যে বার্জম্যান সাহেবের ছিল এবং তার মেমসাহেবের সঙ্গে ওর পূর্বপুরুষের অবৈধ সম্পর্কের জন্যই ওদের দখলে অসে, সে কথা কী কাউকে বলা যায়। বলা যায় না আরও অনেক কিছু।

অধিকাংশ অভিজাত পরিবারের মানুষজনই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু বান্ধবকে অতীত ঐতিহ্যের দীর্ঘ কাহিনী না বলে থাকতে পারেন না কিন্তু যা বলেন না, বলতে পারেন না, সে ইতিহাস কাহিনী বোধ হয় আরও দীর্ঘ, আরও রহস্যপূর্ণ।

৪. ইংরেজ প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে

ইংরেজ প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র উত্তর ভারতে যে অসংখ্য বাঙালী ছড়িয়ে পড়েন, তাঁরা সবাই কামিনীরঞ্জন ছিলেন না। পেশোয়ার-রাওলপিণ্ডি থেকে গিরিডি-জসিডি-মধুপুর বা রাঁচী জামসেদপুরের স্কুল-কলেজ-লাইব্রেরী, মঠ-মন্দির, সংবাদপত্র-সাহিত্য সভা ইত্যাদির ইতিহাস একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেই অসংখ্য উদার শিক্ষিত পরোপকারী বাঙালীর আশ্চর্য কীর্তি-কাহিনী জানা যাবে। বাঙালী শুধু কালীমন্দির দুর্গাবাড়ি বা থিয়েটারের ক্লাব গড়েনি বলেই আজো তারা বহু শহরে-নগরে শ্রদ্ধার আসনে আছেন।

গঙ্গাধর-কামিনীরঞ্জন বা তাদের বংশধরদের রক্তে রাজভক্তির মহা শক্তিশালী বীজ প্রায় কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত স্থায়ী আসন বিছিয়ে বসায় শিক্ষা-দীক্ষা বা পরোপকারের বিষ ঢুকতে পারেনি। একমাত্র ব্যতিক্রম রাজা অবলাকান্ত। উনি বোধ হয় ভুল করেই গর্ভধারিণীর স্মৃতিতে একটা স্কুল তৈরি করেছিলেন। অবশ্য তার কারণ ছিল।

কামিনীরঞ্জন হু এভার ম্যারেজ মাই মাদার, ইজ মাই ফাদার নীতি নিয়ে রাজার জাত ইংরেজদের ভজনায় এমনই নিমগ্ন ছিলেন যে ছেলেমেয়েদের ভদ্র-শিক্ষিত করার চেষ্টায় সারা জীবনে এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতে পারেনি। তাই তো তাঁর মৃত্যুর পর ছেলেমেয়েদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি শুরু হতে একটুও দেরি হল না। মামলা মোকদ্দমাও চলল বেশ কয়েক বছর। তারপর শুরু হল ভাগভাগি কাড়াকাড়ি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত কামিনীরঞ্জনের ঐশ্বর্যের এক ভগ্নাংশ নিয়ে অবলাকান্ত একদিন বিহারের এই শহরে এসে হাজির। সম্বল বলতে শদেড়েক একর চাষের জমি, একটা পুরনো কুঠীবাড়ি, কয়েক লাখ টাকার বাসন-কোসন, গহনাগাটি ও প্রায় লাখখানেক টাকার কোম্পানির কাগজ। এই সামান্য সম্বল নিয়ে গঙ্গাতীরের এই ছোট্ট শহরে মোটামুটি শান্তিতে জীবন কাটাবার আশায় উনি এখানে এলেন। ছোট হলেও শহরটি মন্দ নয়। কলকারখানা তো দূরের কথা, কোন বড় সরকারী অফিসও এখানে নেই। তবে কোর্ট-কাছারি ও কালেক্টর আছেন। কয়েক বছর আগে একটা সরকারী হাসপাতালও হয়েছে। আশেপাশের জমিতে চাষ-আবাদ ভালই হয়। এছাড়া সর্বোপরি বহু ব্রাহ্মণের বাস। ঠিক জমিদার কেউ না থাকলেও কয়েক ঘর ধনী বারেন্দ্র আছেন। তার মধ্যে ওকালতি করে যতীন মুখুজ্যে ইতিমধ্যেই দুটি দোতলা ও তিন-চারটি একতলা বাড়ি বানিয়েছেন। তাছাড়া উনি জুড়িগাড়ি চড়ে কোর্টে যান। বাঙালীটোলার কালীমন্দির তৈরির জন্য উনি পাঁচশ এক টাকা দান করে বাঙালী সমাজের সর্বজনস্বীকৃত নেতা বলে বিবেচিত হন। এছাড়া ডাঃ নগেন্দ্রবিজয় বাঙ্গালী ঘোড়ায় চড়ে রুগী দেখতে যান ও নগদ দুটাকা ফী পান বলেও কম সম্মানিত না। এমনি আরও কয়েকজন আছেন।

এদের সবাইকে টেক্কা দেওয়া ছাড়াও সারা শহরের মানুষকে চমকে দেবার জন্য অবলাকান্ত পুরনো কুঠীবাড়িটাকে একটা প্রাসাদে রূপান্তরিত করতে কলকাতা থেকে সিমেন্ট-লোহালক্কড় ছাড়াও ইটালি থেকে মার্বেল ও জয়পুর থেকে মিস্ত্রী-কারিগর আনলেন। গৃহপ্রবেশের আগে অবলাকান্ত নিজে শহরের প্রত্যেকটি বাঙালীর বাড়িতে গিয়ে করজোড়ে নিবেদন করলেন, আমি একজন দীনদরিদ্র ব্রাহ্মণ। প্রয়াগ থেকে নতুন এসেছি এবং আপনাদের এই শহরে স্থায়িভাবে বসবাসের অভিপ্রায়ে কোন মতে দিন কাটাবার মত একটা কুটির বানিয়েছি। গৃহপ্রবেশের দিন আপনারা দয়া করে সপরিবারে সবান্ধবে পায়ের ধুলো দিলে কৃতার্থ বোধ করব।

সারা শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যেই রটে গিয়েছিল, এলাহাবাদের রাজার কোঠী তৈরী হচ্ছে। বাঙালীটোলার বাঙালীরা অবশ্য জানতেন না, এলাহাবাদের রাজার বাড়ি না, অবলাকান্ত বাঁড়ুজ্যে বলে কোন এক জমিদার এ বাড়ি তৈরি করছেন। জমিদার না হলে কেউ ইটালি থেকে মার্বেল পাথর আনাতে পারে?

যাইহোক গৃহপ্রবেশের নিমন্ত্রণ পর্ব শেষ হতে না হতেই বাঙালীটোলার ঘরে ঘরে অবলাকান্তকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হল। কেউ কেউ বললেন, জমিদার হলেও লোকটি বেশ বিনয়ী। আবার কেউ কেউ বললেন, নতুন এসেছেন তো! তাই সমাজে ঢোকার চেষ্টা করছেন। আবার দু-চারজন বলাবলি করলেন যে এই উপলক্ষে সবাইকে দেখিয়ে দেবেন, কত বড় জমিদার। তবে সবাই ঠিক করলেন, নিমন্ত্রণ রক্ষা করতেই হবে। হাজার হোক জমিদার। তারপর বাড়ি এসে যখন নেমন্তন্ন করেছেন তখন না যাওয়া অত্যন্ত অন্যায় ও অসামাজিক কাজ হবে।

শহরের ধারের গঙ্গার মত এখানকার বাঙালী সমাজেও জোয়ার ভাটা হত না। গতানুগতিকভাবেই তাদের দিন কাটছিল। যতীন মুখুজ্যে ও নগেন গাঙ্গুলীর মত কয়েকজন মাত্র উপলব্ধি করলেন, অবলাকান্ত ওদের শান্তিতে থাকতে দেবেন না।

গৃহপ্রবেশের দিন দুপুরের মধ্যে বাঙালীটোলার ঘরে ঘরে রটে গেল, গৃহ প্রবেশের পূজা করার জন্য অবলাকান্ত পুরুতঠাকুরকে একশ টাকা দক্ষিণা, রুপোর বাসন-কোসন ও বহু কাপড়-চোপড় ছাড়াও দশ বিঘে জমি দান করেছেন। কোর্ট থেকে ফিরে এসে গিন্নীর কাছে এই সংবাদ শুনেই যতীন মুখুজ্যে বললেন, বুঝলে গিন্নী, এ হারামজাদা আমার মত দু-একজনকে অপমান করার জন্যই এইসব বদমায়েসী শুরু করেছে।

গিন্নী পান চিবুতে চিবুতে বললেন, সরলা পিসীর কাছে খবরটা শুনে আমি তো ভাবলাম, জমিদার হলেও লোকটা বড় ধাম্মিক।

ঘোড়ার ডিম ধার্মিক! শালা টাকার গরম দেখাচ্ছে।

গিন্নী রাঁধুনী-মার হাত থেকে লুচি-হালুয়ার পাত্র নিয়ে স্বামীর সামনে রেখেই বললেন, তাহলে আমরা আর ওর রাজবাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছি না।

না, না, গিন্নী যেতে আমাদের হবেই।

যে তোমাকে অপমান করতে চায়, তার বাড়িতে যাব কেন?

যতীন উকিল একটু হেসে গিন্নীর দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি তো চাণক্য শ্লোক পড়নি। পড়লে জানতে যুদ্ধ জয় করতে হলে আগে শত্রু সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ভিতরের সব খবর জেনে নিতে হয়। আমরা শুধু আজই যাব না, নিয়মিত যাতয়াত করব।

অবলাকান্ত সত্যি এলাহি ব্যাপার করেছিলেন। গেটের কাছেই সব অতিথি-অভ্যাগতদের মাথায় আতর জল ছিটিয়ে দেওয়া হল। কর জোড়ে অভ্যর্থনা করলেন স্বয়ং অবলাকান্ত। পারস্য দেশীয় কার্পেটের উপর দিয়ে হেঁটে অতিথিরা প্যালেসের সামনে পৌঁছতেই তাদের প্রত্যেকের গলায় মালা, হাতে গোলাপফুল দেওয়া হল। ওদিকে কাশীর ওস্তাদ নাসিরুদ্দীন খাঁ সাহেব বিভোর হয়ে সানাই বাজা চ্ছিলেন। ইটালিয়ান মার্বেল দিয়ে মোড়া সিঁড়ি পার হয়ে দোতলার মেন ড্রইং রুমে পুরুষ অতিথিরা না ঢুকতে ঢুকতেই সবার হাতে এক গ্লাস করে চন্দনের শরবত তুলে দেওয়া হল। বাঙালীটোলার বাসিন্দারা ঘরদোর সাজসজ্জা দেখে সত্যি বিস্মিত না হয়ে পারেন না। সবাই ফিসফিস করে বলাবলি করেন, লোকটার যেমন পয়সা তেমন রুচি আছে। ইতিমধ্যে হঠাৎ স্বয়ং কালেক্টর সাহেব মেমসাহেবকে নিয়ে হাজির হতেই বাঙালীটোলার সবাই যেন ভূত দেখার মত চমকে ওঠেন। এমন কি যতীন উকিল ও নগেন ডাক্তারও স্বপ্নে ভাবেননি কালেক্টর সাহেব মেমসাহেবকে নিয়ে এই সদ্য আগত অবলাকান্তর বাড়িতে গৃহপ্রবেশের নেমন্তন্ন খেতে আসবেন। তাছাড়া এ শহরে কোন বাঙালীর বাড়িতে ইতিপূর্বে কোন কালেক্টর সাহেবের শুভাগমন হয়নি। আমন্ত্রিত সম্ভ্রান্ত ধনী বাঙালীরাও বিস্মিত হলেন।

সেদিনের আমন্ত্রিত বাঙালী সজ্জনদের বিস্ময়ের পর্ব এখানেও শেষ হল না। কালেক্টর সাহেবের বিদায় লগ্নের পূর্ব মুহূর্তে অবলাকান্ত জন-কল্যাণে ব্যয় করার জন্য মেমসাহেবের হাতে পাঁচ হাজার এক টাকা দান করলেন। সমস্ত বাঙালীর সামনে কালেক্টর সাহেব বললেন অবলাকান্তর মত দায়িত্বশীল ও কর্তব্যপরায়ণ প্রজার জন্য আমরা সত্যি গর্বিত।

বাড়িতে ফেরার পর যতীন উকিলের স্ত্রী বললেন, গল্পের বইতেই রাজবাড়ির কথা পড়েছি কিন্তু আজ সত্যি একটা রাজবাড়ি দেখলাম। লোকটার যে কত কোটি টাকা আছে, তা কে জানে।

উকিলবাবু গম্ভীর হয়ে কথাগুলো শুনে শুধু বললেন, হুঁ।

তবে লোকটার দিল আছে। তা না হলে শুধু গৃহপ্রবেশের জন্য এত টাকা ব্যয় করতে পারে।

এবার উকিলবাবুর মুখ দিয়ে আর একটি শব্দও বেরোয় না কিন্তু ওর গিন্নী চুপ করে থাকতে পারেন না। বলেন, অমিাদের এই বাঙালীটোলা কালীমন্দিরের জন্য দু-আড়াই হাজার টাকা তুলতেই সবাই হিমসিম খেয়ে গেল। তুমি পঁচিশ টাকা না দিলে তো মন্দিরটাও শেষ হত না আর এই অবলা বাঁড়ুজ্যে দুম করে পাঁচ হাজার টাকা মেমসাহেবের হাতে তুলে দিল!

এবারও উকিলবাবু চুপ। কী বলবেন?

শুধু যতীন মুখুজ্যের বাড়িতেই না বাঙালীটোলার ঘরে ঘরেই অবলাকান্তকে নিয়ে আলোচনা শুরু হল। সবাই স্বীকার করলেন, লোকটা সত্যি রাজা। রাজা না হলে ঐ রকম প্রাসাদ বানাতে পারে? নাকি অমন মুড়ি-মুড়কির মত টাকা খরচ করতে পারে? সেদিন দুপুরে অবনী চাটুজ্যেদের বাড়ির পাঁচ বউ শুয়ে শুয়ে অবলাকান্তকে নিয়েই আলোচনা করছিলেন। বাড়ির বড় বউ অবনী-গিন্নী বললেন, অবলাকান্তর স্ত্রীকে দেখতে সত্যি রানীর মত। এই বয়সেও কী রূপ! চোখ ঝলসে যায়?

সেজ বউ বললেন, তাছাড়া বড়দি, উনি কত হীরের গহনা পরে ছিলেন, তা দেখেছো?

মেজ বউ একটু হেসে বললেন, আজ ওকে দেখে যতীন উকিলের বউয়ের দেমাক ঠাণ্ডা হয়েছে।

বড় বউ বললেন, আমি খুব খুশি। যতীন উকিলের বউয়ের এত অহঙ্কার আর সহ্য করা যাচ্ছিল না।

ছোট বউ বললেন, বড়দি, শুধু ওর কথা কেন বলছ? ডাক্তার বাবুর স্ত্রীর অহঙ্কার কী কম?

আবার একটা পান মুখে পুরে মেজ বউ বললেন, এবার সব ঠাণ্ডা। নন্দ ঠাকুরপোর ছেলের অন্নপ্রাশনে আমি গরদ পরে যাইনি বলে ডাক্তারের বউ আমাকে সবার সামনে যে অপমান করেছিল, তা কী আমি জীবনে ভুলব?

বড় বউ বললেন, ঐ উকিল আর ডাক্তারের বউ–দুটোই সমান। সব সময় দেখাতে চায় ওদের অনেক টাকা আছে। আর এখন? অবলা বাড়ুজ্যে তো ওদের মত লোককে চাকর রাখতে পারে। দুতিন বউ একসঙ্গে বলে, ঠিক বলেছ!

শুধু মেয়েদের মধ্যে না, বাঙালীটোলার পুরুষদের মধ্যেও এখন। একমাত্র আলোচনার বিষয় রাজা অবলাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়। বৈঠক খানায়, তাসের আড্ডায়, ব্যায়ম সমিতির মাঠে, কালীমন্দিরের চত্বরে–যেখানেই দু-চারজন বাঙালী বাবুদের দেখা হয়, সেখানেই ঐ একথা, আলোচনা। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিন্তু মাস ঘুরতে ঘুরতেই বাঙালীদের আলোচনায় নতুন মোড় ঘুরল।

সেদিন কী কারণে যেন কোর্ট-কাছারির ছুটি। স্কুল-টুলও বন্ধ। কর্তা ব্যক্তিরা সবাই বাড়িতে আছেন বা ইতিমধ্যে পাড়ার সমস্ত বাচ্চা কাচ্চার সম্মিলিত চিৎকার–মোটরগাড়ি! মোটরগাড়ি!

মোটরগাড়ি? বাঙালীটোলায়? ছেলেমেয়েরা বলে কী? এ শহরে শুধু কালেক্টর সাহেবের মোটরগাড়ি আছে। তাও তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন না। কদাচিৎ, কখনও। তবে ছোটলাট মাঝে মাঝে আসেন বলে কালেক্টর সাহেবকে এই মোটরগাড়ি দেওয়া হয়েছে। ছেলেমেয়েদের চিৎকার শুনে বুড়ো-বুড়ীরাও চুপ করে বসে থাকতে পারেন না। বাইরে বেরিয়ে না এলেও ওরা সবাই জানলা দিয়ে উঁকি দিলেন। না দিয়ে পারলেন না। হ্যাঁ সত্যি তো একটা মোটরগাড়ি ঐ মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে কী কালেক্টর সাহেব এলেন? কিন্তু বাঙালীটোলায়…

দাদু! দাদু! রাজবাড়ির মোটরগাড়ি।

কী বললি?

রাজবাড়ি থেকে মোটরগাড়ি এসেছে তুই কী করে জানলি?

আমি শুনলাম।

প্রথমে বুড়ো-বুড়ীরা বিশ্বাস করেননি কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখা গেল, ওরা ঠিকই বলেছে। আগামী শনিবার সন্ধ্যায় রাজ বাড়িতে শনি-সত্যনারায়ণ পূজা হবে। তাই স্বয়ং অবলাকান্তর স্ত্রী বাড়ি বাড়ি নেমন্তন্ন করতে বেরিয়েছেন।

গড়গড়ার নল পাশে সরিয়ে রেখে যতীন মুখুজ্যে ওর স্ত্রীকে বললেন, বুঝলে গিন্নী, অবলাকান্ত এক ঢিলে দুই পাখি মারল। শনি-সত্য নারায়ণের নেমন্তন্ন করাও হল, আবার নতুন মোটরগাড়িটাও বাঙালীটোলার সবাইকে দেখিয়ে গেলেন।

তা ঠিক কিন্তু মোটরগাড়িটা ভারী সুন্দর!

উকিলবাবু চুপ।

তাছাড়া যে লোকটা গোল চাকার মত কি একটা ধরে চালাচ্ছিল, সে কী সুন্দর জামা-কাপড় পরেছিল!

এবারও উকিলবাবু চুপ।

গিন্নী কিন্তু চুপ করে থাকতে পারেন না। স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, হ্যাঁগো-একটা মোটরগাড়ি কিনতে কত টাকা লাগে?

হবে দশ-পনের হাজার।

বাপরে বাপ! এত টাকা লাগে? ঐ টাকা দিয়ে তো তুমি দু-তিনটে বাড়ি বানিয়েছ?

এবার উকিলবাবু একটু রেগেই বলেন, আজেবাজে বকবক করা বন্ধ কর তো।

যাইহোক এই ভাবেই অবলাকান্ত তার পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যাকে নিয়ে এই নতুন শহরে জীবন আরম্ভ করলেন।

৫. মানুষ সুখে-দুঃখে যে ভাবেই থাক

মানুষ সুখে-দুঃখে যে ভাবেই থাক, সময় কখনও দাঁড়িয়ে থাকে না। মানুষ অলস কর্মহীন থাকলেও ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে প্রায় অলক্ষ্যেই এগিয়ে চলে। পচা ভাদ্দরের মেঘে সারা আকাশ ছেয়ে থাকলেও সূর্য ঠিক সময়েই উদয় হয়, অস্ত যায়। শত সহয় মানুষের তর্জন-গর্জন বা চোখের জলে ফুল ফোঁটা মুহূর্তের জন্যও বিলম্বিত হয় না। সর্বত্যাগী উদার সন্ন্যাসীর মত সময় ও প্রকৃতি তাদের আপন সাধনায়, লীলাখেলায় মত্ত।

হঠাৎ একদিন অবলাকান্তের খেয়াল হল, প্রয়াগ ত্যাগ করে আসার পর এই শহরে অনেকগুলি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। মন-মেজাজ ইদানীং ভাল যাচ্ছে না। সব সময় ঐ এক চিন্তা, যে খবর পর স্ত্রী বা ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত জানতে পারেনি এবং ড্রাইভার বা দারোয়ান চাকর-বাকরদের পক্ষেও জানা অসম্ভব, সে খবর বাঙালীটোলায় ছড়িয়ে গেল কী করে? সর্বোপরি এ খবর কালেক্টর সাহেবের কাছে কে বা কারা পৌঁছে দিলেন?

কালেক্টর সাহেব অনুরোধ করলে উনি হাসতে হাসতে স্কুলের জন্য দশ হাজার কেন, বিশ হাজারও দিতে পারতেন কিন্তু এই কেলেঙ্কারী চাপা দেবার জন্য টাকা দিয়েছেন বলেই অবলাকান্তের দুঃখ। মনে বেদনা।

একবার তো উনি ভেবেছিলেন, সবার সামনেই বলবেন, যা করেছি, বেশ করেছি। আমি পুরুষ মানুষ তার উপর জমিদার। এবং স্বাস্থ্যবান ও অত্যন্ত সুদর্শন। সুতরাং যদি কোন সম্ভ্রান্ত ঘরের সুন্দরী স্বাস্থ্যবতী মহিলা স্বেচ্ছায় তাকে আনন্দদান করেন, তাহলে উনি কেন প্রত্যাখান করবেন?

যাকগে। এসব নিয়ে অনেক মাথা ঘামিয়েছেন এবং স্কুলের জন্য দশ হাজার টাকা দান করার পর বাঙালীটোলার বাসিন্দাদের ধারণা হয়েছে, সুধাদেবী ও তার হতচ্ছাড়া ডেপুটি স্বামী অবলাকান্তর কাছ থেকে বেশ কিছু টাকা আত্মসাৎ করার জন্যই এই ধরনের একটা নোংরা গুজব ছড়িয়ে ছিলেন। যাইহোক কালেক্টর সাহেবের অশেষ কৃপায় সব ভাল ভালয় মিটে গেছে। শেষ পর্যন্ত উনি ডেপুটিকেও সাঁওতাল পরগণায় বদলী করে দিয়েছেন। তবুও আর এখানে ভাল লাগছিল না।

কামিনীরঞ্জন মৃত্যুর কয়েক বছর আগে কাশীর বাঙালীটোলায় একটা বিরাট বাড়ি কেনেন এবং এই বাড়িটি কারুরই বিক্রির অধিকার নেই। শুধু বসবাস করার অধিকার আছে সব ছেলেমেয়ে ও তাদের বংশধরদের। তীর্থে গেলে দূর সম্পর্কের আত্মীয়-স্বজনরাও এখানে থাকতে পারবেন বলে কামিনীরঞ্জন উইল করে যান। বোধহয় কাশীর এই বাড়ির কথা ভেবেই অবলাকান্তের স্ত্রী বিন্দুবাসিনী দেবী বহুকাল ধরেই বলছিলেন, হ্যাঁগো, মোটরগাড়ি কেনার পর মাঝে মাঝে কয়েক দিনের জন্য দেওঘর-বৈদ্যনাথধাম যাওয়া ছাড়া আর তো কোথাও যাই না। চলো না, কিছুদিনের জন্য কোন তীর্থে ঘুরে আসি।

উনি একটু থেমেই আবার বলেন, এই ছোট্ট শহরে থাকতে থাকতে সত্যি হাঁপিয়ে উঠেছি।

অবলাকান্ত একটু হাসেন।

হাসছ যে? সত্যি, এই ছোট্ট শহরে কী করে যে এক নাগাড়ে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলাম, তা ভাবলেও অবাক হতে হয়।

সত্যি, অনেক বছর আমরা কোথাও যাই না।

বিন্দুবাসিনীদেবী বলেন, হতচ্ছাড়া শহরে না আছে একটা মন্দির, আছে একটা ভাল রাস্তা বা বেড়াবার জায়গা। তাছাড়া অন্নপ্রাশন থেকে বিয়ে-পৈতে-শ্রাদ্ধ যে কোন অনুষ্ঠানেই যাই না কেন, সেই বাঙালীটোলার কয়েকটা পরিচিত মুখ ছাড়া একজন নতুন মানুষের মুখও এখানে দেখতে পাই না।

অবলাকান্ত একটু হেসে বলেন, তুমি ঠিকই বলেছ। এখানে সব উৎসব-অনুষ্ঠানেই একই মানুষগুলোকে সব সময় দেখতে পাওয়া যায়।

এবার বিন্দুবাসিনীদেবী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, সব চাইতে বড় কথা ছেলেমেয়েদের ঝামেলা আর সহ্য হচ্ছে না। খুব দূরে কোথাও একলা থাকতে পারলেই বোধহয় একটু শান্তিতে থাকতে পারতাম।

অবলাকান্তও দীর্ঘনিঃশ্বাস না ফেলে পারেন না। বলেন, দুটো মেয়েকে বিয়ে দেবার পরও যে এত ঝামেলা সহ্য করতে হবে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।

তা ঠিক কিন্তু তোমার ছেলেরা যে এক একটি রত্ন তৈরি হয়েছে।

অবলাকান্ত মুখ নিচু করে মাথা নাড়েন, মুখে কিছু বলেন না।

সত্যি, ছেলেমেয়েদের নিয়ে ওদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই। এখানে আসার পরই ওঁরা ছেলেমেয়েদের পাদ্রীদের স্কুলে ভর্তি করেন। প্রত্যেক ছেলেমেয়ের জন্যই আলাদা আলাদা গৃহ-শিক্ষক নিয়োগ করলেন কিন্তু কোন ছেলেমেয়েই না নিয়মিত স্কুলে যাবে বা বাড়িতে পড়বে। বড় পাদ্রী নিজে কতবার অবলাকান্তকে বলেছেন, রাজাবাবু, আপনার চিলড্রেনরা বহুত কামাই করে। আই আণ্ডারস্ট্যাণ্ড ওরা জমিদার বাড়ির ছেলেমেয়ে এবং আমরা ওদের স্পেশালী ট্রিট করি কিন্তু স্কুলের তো কিছু রুলস আছে।

হা ফাদার, আমি তা বুঝি।

আপনি প্লীজ ওদের বলবেন রেগুলারলি স্কুলে যেতে।

নিশ্চয়ই বলব।

থ্যাঙ্ক ইউ রাজাবাবু।

ওরা স্বামী-স্ত্রী বার বার বলেও কোন ফল হয় না। ছেলেমেয়েরা দুদিন স্কুলে গেলে তিনদিন যায় না। ভাগ্যক্রমে স্কুলে গেলেও মাথা ধরা, পেট কামড়ানোর অজুহাতে অনেকেই অনেক দিন পুরোস্কুল করবে না। গৃহ-শিক্ষকরাও সকাল-সন্ধেয় নিয়মিত আসাযাওয়া করেন, চা-জল খাবার খান কিন্তু তারা অধিকাংশ দিনই ছাত্র-ছাত্রীদের দর্শন পান না।

এইভাবেই বছরের পর বছর কেটেছে। অবলাকান্ত গোপনে গোপনে পাদ্রীদের স্কুলে প্রতি বছর কিছু দানধ্যান করে ছেলেমেয়েদের প্রমোসন ব্যবস্থা করেছেন। কী করবেন? সব ছেলেমেয়ে ফেল করলে ওর সম্মান থাকে কোথায়?

মোহনবাগানের শীল্ড জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তেই বড় ছেলে সূর্যকান্ত অবলাকান্তকে বলল, বাবা, বাঙালীদেব ক্লাব মোহনবাগান সাহেবদের হারিয়ে শীল্ড জয় করেছে, সে খবর জানেন?

শুনেছিলাম বটে।

আমি কলকাতা যাব।

তার সঙ্গে মোহনবাগানের শীল্ড জয়ের কী সম্পর্ক?

ঠিক করেছি আমিও মোহনবাগানে খেলে সাহেবদের হারাব।

জ্যেষ্ঠপুত্রের কথাবার্তার ধরন দেখেই ওঁর মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বলেন, সাহেবদের হারানো কী খুব মহৎ কাজ? নাকি জমিদারবাড়ির ছেলে হয়ে সাহেবদের বিরুদ্ধে খেলা খুব সম্মানজনক?

মিনিটখানেক চুপ করে থাকার পর সূর্যকান্ত বলে, কিন্তু আমি ফাইনালি ঠিক করেছি মোহনবাগানে খেলব।

অবলাকান্ত পুত্রের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আমাকে কী সেই খেলা দেখার নেমন্তন্ন করছ? নাকি আমাকেও খেলতে হবে?

না মানে…

কী বলতে চাও, চটপট বল। আমার অনেক কাজ আছে।

আমাকে টাকা দিতে হবে।

কেন?

টাকা না দিলে ওরা আমাকে খেলতে দেবে কেন?

অবলাকান্ত ভুরু কুঞ্চিত করে বড় কুমারকে জিজ্ঞেস করেন, ফুটবল গোল না চৌকো, তা তুমি জানো?

কী যে বলেন আপনি? ফাদার বারোজকে জিজ্ঞেস করবেন, আমি কী দারুণ ফুটবল খেলি।

আচ্ছা?

সূর্যকান্ত বেশ গর্বের সঙ্গেই বলে, হ্যাঁ, উনিই তো আমাকে বলেছেন, আমি মোহনবাগানে চান্স পাবই।

অবলাকান্ত একটু মৃদু হেসে বলেন, বাঃ! বড়ই আনন্দের কথা। এবার উনি নিজেকে দেখিয়ে বলেন, তাহলে এই বাঙালী ফাদারকে বিরক্ত না করে তোমার ঐ সাহেব ফাদারকেই বল টাকাকড়ি দিতে। প্রায় এক নিঃশ্বাসেই উনি বলেন, যাও, বিরক্ত কর না।

হাজার হোক কামিনীরঞ্জনের নাতি। যাও বললেই কী চলে যায়? কত ঝগড়া-বিবাদ চিৎকার-চেঁচামেচি জিনিসপত্র ভাঙাচুরো করে শেষ পর্যন্ত সূর্যকান্ত সত্যি সত্যি হাজার হাজার টাকা নিয়ে কলকাতা গেল। কলকাতায় যাবার পরও শান্তি কী আছে? শেষ পর্যন্ত কেচ্ছা কেলেঙ্কারী!

দ্বিতীয় পুত্র চন্দ্রকান্ত বেশ ভদ্র-সভ্য থাকলেও হঠাৎ একদিন তার মাথায় ভূত চাপল, উনি কবি হবেন। কার কাছ থেকে শুনেছিল, রবিবাবু পদ্মার উপর সুন্দর বাহারী নৌকায় বসে কাব্য রচনা করেন। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে তিনি পিতৃদেবের কাছে আবেদন পেশ করলে, বাবা, আমিও গঙ্গায় চাঁদনী রাতে বোটে বসে কাব্য রচনা করব।

অবলাকান্ত না হেসে পারলেন না। বললেন, অতি সাধু প্রস্তাব কিন্তু বাবা, চাঁদের আলো তো আমাদের বারান্দায়, বাগানেও ছড়িয়ে পড়ে। সে সব জায়গায় বসে কাব্য রচনা হয় না?

তাহলে আর রবিবাবু জোড়াসাঁকোর প্রাসাদ ছেড়ে পদ্মার বুকে ভেসে বেড়াতেন না।

অকাট্য যুক্তি! লুকিয়ে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজ্ঞেস করলেন, তা বাবা কতদিন তুমি গঙ্গার বুকে ভেসে বেড়াবে?

যতদিন ভাল লাগে।

বাঃ! কিন্তু বাবা, আকাশে তো সব সময় চাঁদ থাকে না। চাঁদমামা পনেরো দিন ডিউটি দিয়ে পনেরো দিন ছুটিতে থাকেন। তখন তুমি কী করবে?

অত ভাবিনি।

অত না ভাবলে তো তোমাকে আমি রবিবাবু তৈরি করতে পারব না।

এবার ভাবী কবিও ফোঁস করে ওঠে। বলে, এই জমিদারীতে আমারও অংশ আছে।…

না, অবলাকান্ত আর সহ্য করতে পারেন না। দপ করে জ্বলে ওঠেন। বলেন, বেরিয়ে যাও আমার বাড়ি থেকে। গলা টিপলে দুধ বেরুবে আর এরই মধ্যে উনি জমিদারীর অংশ নিয়ে কথা বলছেন।

ভাবী কবি মুহূর্তের মধ্যে অবলাকান্তের প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলেও কয়েক ঘণ্টা পর স্বয়ং কালেক্টর সাহেবকে নিয়ে ফিরে এল।

ছি, ছি, সে কী কেলেঙ্কারী! বিচক্ষণ কালেক্টর সাহেব পিতা পুত্র দুজনকেই অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলেন কিন্তু কোন ফল হল না। শেষ পর্যন্ত নগদ বিশ হাজার টাকা, বেশ কিছু জমিজমার দলিল ও যথেষ্ট গহনাপত্র নিয়েই হবু কবি চন্দ্রকান্ত গৃহত্যাগ করলেন।

এখানেই নাটক শেষ হল না। পরদিন ভোরেই সারা বাঙালীটোলার ঘরে ঘরে আগুনের মত খবর ছড়িয়ে পড়ল, রাজবাড়ির গৃহ শিক্ষক আশু লাহিড়ীর মেয়ে লতাকে নিয়ে দ্বিতীয় কুমার সাহেব শহর ছেড়ে উধাও হয়েছে। এ দুঃসংবাদ অবলাকান্তর কানে পৌঁছতেই উনি আশুবাবুকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, যা শুনছি তা কি সত্যি?

আজ্ঞে, আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।

ন্যাকামী না করে সোজাসুজি বলুন, আপনার মেয়ে আমার ছেলেকে নিয়ে পালিয়েছে কিনা।

আজ্ঞে না।

আজ্ঞে না মানে? সারা বাঙালীটোলার মানুষ যে কথা জানে আর আপনি…

আশুবাবু নিজে শিক্ষকতা করলেও ওঁদের বংশের সবাই ওকালতি করেন। জমিদার না হলেও প্রচুর ভূসম্পত্তির মালিক ওঁরা। ছোট খাট যুদ্ধ-বিগ্রহ করার অভ্যাস ভালই আছে। তাই উনি অবলাকান্তকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বললেন, আজ্ঞে বাঙালীটোলায় যে খবর রটেছে, তা ঠিকই কিন্তু আমার মেয়ে আপনার ছেলেকে নিয়ে উধাও হয়নি…

এবার অবলাকান্তর মুখ দিয়ে ইংরাজি গালাগালি বেরোয়, ননসেন্স।

আজ্ঞে আমাকে কথাটা শেষ করতে দিন। আসলে আপনার ছেলেই আমার মেয়েকে নিয়ে উধাও হয়েছে।

অবলাকান্ত অনেক তর্জন-গর্জন করলেও আশুবাবু বিন্দুমাত্র উত্তেজিত হলেন না। অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে জমিদারবাবুকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ওসব বারেন্দ্র-রাঢ়ী নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে লাভ নেই।

কেন? কেন?

ওরা আর হিন্দু নেই। ব্রাহ্ম হয়েই ওরা বিয়ে করেছে।

কথাটা শুনেই শান্তকাল বৈশাখীর মত অবলাকান্ত ফেটে পড়লেন কিন্তু হাতের পাখী বনে উড়ে গেলে কী আর ফিরে আসে?

শুধু সূর্যকান্ত ও চন্দ্রকান্তকে নিয়েই অশান্তি না। অন্য তিন পুত্র ইন্দ্ৰকান্ত, নিশিকান্ত ও শ্রীকান্তকে নিয়েও ওদের স্বামী-স্ত্রীর কম ঝামেলা বা অশান্তি সহ্য করতে হয়নি বা হয় না। এক একটি এক এক অবতার।

সৌখীন ইন্দ্ৰকান্ত যখন প্রথম সঙ্গীত চর্চায় আত্মমগ্ন হল, তখন বিন্দুবাসিনীই স্বামীকে বললেন, ম্যানেজারবাবু বলছিলেন, ওস্তাদজী বলেছেন, তোমার এই ছেলে গান-বাজনায় খুব নাম করবে।

আগে নাম করুক, তারপর বল। অনেক দুঃখে অবলাকান্ত একটু ম্লান হেসে বললেন, তুমি সত্যি রত্নগর্ভা!

এখন যত দোষ, নন্দ ঘোষ। তাই না? তোমার বাপ-ঠাকুর্দারা কী মহাপুরুষ ছিলেন, তা কী ভুলে গেছ? যে বাড়িতে বসে কথা বলছ, সে বাড়িটাও তো তোমার বাপের মেমসাহেব রক্ষিতার।

আঃ! চুপ কর।

দিন এগিয়ে চলে। বছরের পর বছর ঘুরে যায়। প্রিয় শিষ্যের সঙ্গীত বিদ্যায় অভূতপূর্ব উৎসাহ ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে ওস্তাদজী পাত তাড়ি গুটিয়ে রামপুর ফিরে গেছেন। কুমার ইন্দ্ৰকান্ত এখন নিজেই ওস্তাদ। বাঙালীটোলার কিছু রসিক ছোকরা তার একান্ত ভক্ত শিষ্য। রোজ সন্ধ্যেয় আসর বসে, চলে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত। তবে খেয়াল-ঠুংরীর চর্চার চাইতে খামখেয়ালী করেই সময় কাটে। ওস্তাদজীর অনুপ্রেরণায় ও সক্রিয় সাহায্যে শিষ্যরাও একটু-আধটু পান করেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা করতে হলে ওটা নাকি অত্যন্ত জরুরী। বাঙালীটোলায় শিষ্যদের বাড়িতে বাড়িতে চাপা গুঞ্জন, মৃদু প্রতিবাদ, মাঝে মাঝে অশান্তি কিন্তু কোন ফল হয় না। ওস্তাদজীর চাইতে শিষ্যদেরই বেশি উৎসাহ, উদ্দীপনা। কখনও কখনও ওস্তাদজীও শিষ্যদের বাড়িতে হাজির হয়ে নানা রাগ-রাগিণী নিয়ে আলাপ আলোচনা করেন। শিষ্যদের বাড়ির লোকজনও তাতে খুশি হন। না হবার কোন কারণ নেই। ইন্দ্ৰকান্ত যে কখনই খালি হাতে শিষ্যদের বাড়ি যান না। কিছু না হলেও এক ঝুড়ি ল্যাংড়া আর দুআড়াই সের রাজভোগ নিশ্চয়ই নিয়ে যাবেন। সম্ভব হলে আরও অনেক কিছু কিন্তু সেদিন ইন্দ্ৰকান্ত বৃন্দাবন মুখুজ্যের স্ত্রীর হাতে একখানি সুন্দর গরদের শাড়ি তুলে দিতেই উনি অবাক–একি বাবা? হঠাৎ আমাকে গরদের শাড়ি দিচ্ছ কেন? আপনি তো দিনের অর্ধেক সময় পূজার ঘরেই কাটান। তা..ইন্দ্ৰকান্ত অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নিবেদন করে।

কিন্তু তাই বলে এত দামী গরদ?

না, না মাসিমা, এসব কথা বলে লজ্জা দেবেন না। সুধাময়ের মত আমিও তো আপনার এক ছেলে!

আহা হা! কি কথা! বৃন্দাবন-পত্নী আনন্দে গর্বে প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কী! বলেন, সে তো একশ বার বাবা। তোমার মত ছেলে পেটে ধরতে পারলে তো ধন্য হয়ে যেতাম।

শুধু সুধাময়ের মা না, সব শিষ্যের মা-রাই এখন ইন্দ্রনাথের শ্রদ্ধাভক্তি ও ব্যবহারে মুগ্ধ। ওদের সবার বাড়িতেই ইন্দ্রনাথের অবাধ গতি।

…এই যে শোভা, মুকুন্দ আছে?

এমন অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যে শোভা চমকে ওঠে। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে মুহূর্তের জন্য ইন্দ্ৰকান্তর দিকে তাকিয়ে বলে,

না, দাদা তো নেই।

ইন্দ্ৰকান্ত একটু গম্ভীর হয়ে কি যেন চিন্তা করে বলে, একটু দরকার ছিল। আচ্ছা

আপনি চলে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ।

দাঁড়ান, দাঁড়ান, মাকে ডাক দিই।

আবার ওঁকে কষ্ট দেবার কী দরকার? তাছাড়া উনি নিশ্চয়ই কাজকর্মে ব্যস্ত আছেন।

না, না, আপনি বসুন। আমি মাকে ডাকছি। শোভা প্রায় দৌড়ে ভিতরে যায়।

এক মিনেটের মধ্যেই মুকুন্দর মা এসে বলেন, তুমি দাঁড়িয়ে কেন বাবা? আগে বসো।

মুকুন্দ যখন নেই…

সে নেই বলেই তুমি চলে যাবে? আমরা কী কেউ না?

সেই শ্রদ্ধা, বিনয়ের সঙ্গে ইন্দ্ৰকান্ত বলে, আমি তো তা বলিনি মাসিমা।

একটু মিষ্টিমুখ না করেই তুমি চলে যাবে, তাই কী হয়?

আবার মিষ্টিমুখ…

না, তুমি বাবা বসো। এবার উনি মেয়েকে বলেন, শোভা, ইন্দ্রকান্তকে বাতাস কর।

উনি সঙ্গে সঙ্গেই ভিতরে চলে যান। শোভা ভিতর থেকে ঝালর দেওয়া একখানা হাতপাখা এনে বাস করতেই ইন্দ্ৰকান্ত একটু হেসে বলে, না না, হাওয়া করতে হবে না। তুমি বসো।

শোভা মৃদু প্রতিবাদ করে, না না, শুধু শুধু বসে থাকব কেন?

হ্যাঁ, তুমি শুধু শুধুই বসে থাকবে। আমি তোমাকে দেখব।

আনত নয়নে শোভা বলে, আমাকে আবার কী দেখবেন?

কী দেখব মানে? তোমার মত সুন্দরী মেয়ে এশহরে আর কে আছে?

শুনে আনন্দে গর্বে শোভার বুক ভরে উঠে কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে লজ্জায় সারা মুখ লাল হয়ে যায়। ওর মুখ দিয়ে আর কথা বেরোয় না।

ইন্দ্ৰকান্তই আবার কথা বলে, তোমাকে আমার খুব ভাল লাগে। ইচ্ছে করে তোমার সঙ্গে গল্প করি, তোমাকে গান শেখাই…

আমারও গান খুব ভাল লাগে।

তাই নাকি?

হ্যাঁ।

বেশ তো, আমি তোমাকে শেখাব।

কিন্তু বাঙালীটোলার কোন মেয়ে তো গান শেখে না। আমি গান শিখলে যদি কিছু বলে?

ইন্দ্ৰকান্ত অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তির মত বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলে, কী আর বলবে? তুমি তো চুরি করছ না?

না, তা না কিন্তু…

রবিবাবু যদি তার বীরভূমের আশ্রমে মেয়েদের গান শেখাতে পারেন, তাহলে তুমি আমার কাছে গান শিখলে দোষ কী?

অকাট্য যুক্তি।

এক থালা ফল-মিষ্টি নিয়ে মুকুন্দর মা ঘরে ঢুকতেই ইন্দ্ৰকান্ত বলল, মাসিমা, আমি শোভাকে গান শেখালে আপনাদের কোন আপত্তি নেই তো?

প্রস্তাব শুনেই উনি বিস্মিত হন। মুহূর্তের মধ্যে বাঙালীটোলায় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে নেন কিন্তু সরাসরি প্রত্যাখ্যান, নাকচ করতে সাহস হয় না। বলেন, সে তো সৌভাগ্যের কথা কিন্তু বাবা, বাঙালীটোলার মানুষদের তো তুমি চেনো…

গান শেখা তো কোন অন্যায় না মাসিমা? তাছাড়া আমি তো কোন পেশাদারী গাইয়ে না।

সে কী আর আমি বুঝি না বাবা! তবু একবার ওর বাবার সঙ্গে কথা বলে নেব।

মেসোমশায়ের মতামত তো নিতেই হবে। তিনি অনুমতি না দিলে তো আমিও শেখাব না।

শোভাই প্রথম, কিন্তু বছর খানেক ঘুরতে না ঘুরতেই বাঙালীটোলার পাঁচ-ছটি ঘর থেকে হারমোনিয়ামের আওয়াজ সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। শিষ্যরা মাঝে মাঝে অনুযোগ করে, ওস্তাদ! তুমি আজকাল আমাদের দিকে নজর দিচ্ছ না।

আমাকে পছন্দ না হলে তোমরা অন্য কোন ভাল ওস্তাদের কাছে শিখতে পারো।

ওরা সবাই এক সঙ্গে প্রতিবাদ করে, না না, ওস্তাদ, তোমার কাছে ছাড়া আর কারুর কাছে আমরা গান শিখব না।

ইন্দ্ৰকান্ত ওদের বিনোদন ব্যবস্থা আরও একটু উন্নত করতেই সব শিষ্যরা চুপ। তাছাড়া ইতিমধ্যে ইন্দ্ৰকান্ত শিষ্যদের নিয়ে মুঙ্গেরের বাঈজীর কাছে গিয়ে সারারাত ধরে ঠুংরী শোনার পর তো শিষ্যরা ওর গোলাম হয়ে গেল।

মেয়েদের গান শেখা নিয়ে বাঙালীটোলায় গুঞ্জন উঠলেও তা বাইরে আত্মপ্রকাশ করল না। তার একমাত্র কারণ ইন্দ্ৰকান্ত। সারা পাড়ার সব বাড়িতেই ওর যাতায়াত, সবার সঙ্গেই ওর ভাব। তাছাড়া গুরুজনদের প্রতি ও সব সময় শ্রদ্ধাশীল ও কথাবার্তায় অত্যন্ত বিনয়ী।

ইন্দ্ৰকান্ত অত্যন্ত বুদ্ধিমান বলেই সব মেয়েকেই দু-একটা কীর্তন বা শ্যামাসঙ্গীত শিখিয়েছিল। ওরা মাঝে মাঝে বুড়ো-বুড়ীদের সেসব গান শোনাত বলে সারা পাড়ায় ইন্দ্ৰকান্তর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে গেল।

একদিন মলিনা কথায় কথায় বলল, জানেন ইন্দ্ৰকান্তদাদা, সবাই আপনার প্রশংসা করে।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। মলিনা একটু থেমে বলে, আপনার প্রশংসা শুনতে আমার খুব ভাল লাগে।

কেন?

ও মুখ নিচু করে বলে, তা বলতে পারব না কিন্তু সত্যি আমার ভাল লাগে।

কিন্তু তুমি তো আমার প্রশংসা কর না।

মলিনা মুহূর্তের জন্য ওর দিকে তাকিয়েই দৃষ্টি গুটিয়ে নিয়ে বলে, আমি প্রশংসা করলে যে লোকে নানা কথা বলবে!

ন্যাকামি করে ইন্দ্রকান্ত জিজ্ঞেস করে, লোকে আবার কী বলবে?

বলবে মানে সন্দেহ করবে।

কী আবার সন্দেহ করবে?

মলিনা প্রথমে বলতে চায় না কিন্তু ইন্দ্ৰকান্ত কয়েকবার অনুরোধ করার পর অত্যন্ত দ্বিধা ও কুণ্ঠার সঙ্গে বলে, সবাই সন্দেহ করবে আমি আপনাকে ভালবাসি।

এবার ইন্দ্ৰকান্ত একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে খুব চাপা গলায় জিজ্ঞেস করে, কেন, তুমি আমাকে ভালবাসো না?

মলিনা শুধু মাথা নেড়ে জানায়, হ্যাঁ।

ইন্দ্ৰকান্ত সঙ্গে সঙ্গে ডানহাত দিয়ে ওর মুখখানি আলতো করে একটু তুলে ধরে বলে, তোমাকেও আমার খুব ভাল লাগে।

আনন্দে গর্বে কৃতজ্ঞতায় মলিনা প্রায় আত্মহারা হয়ে যায়। মনে মনে একটু ভয়ও হয়, দ্বিধা করে। বলে, আমার মত সামান্য মেয়েকে আপনার কখনও ভাল লাগতে পারে না।

হঠাৎ ইন্দ্ৰকান্ত দুহাত দিয়ে ওকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে, সত্যি মলিনা, তোমাকে আমার খুব ভাল লাগে।

সে রাত্রে মলিনা দুচোখের পাতা এক করতে পারে না। স্বপ্ন দেখে, সানাই বাজছে, রাজবাড়ি আলোয় আলো, কত শত-সহস্র অতিথির আগমন হচ্ছে, অসংখ্য দাস-দাসীর দৌড়াদৌড়ি, স্বয়ং অবলা কান্ত ওকে আশীর্বাদ করছেন, বিন্দুবাসিনী স্নেহচুম্বন দিয়ে কোলে তুলে নিয়েছেন।

আরও কত কি ভাবে। রাত কাটতে না কাটতেই সেই পরম আকাঙ্ক্ষিত তিথি, সেই অনুপম মাধুরী রাত। মদির দৃষ্টিপাতেই কী রোমাঞ্চ! স্পর্শে? আশ্চর্য শিহরণের ঢেউ বয়ে যাবে শরীর দিয়ে।

তারপর?

ধীরে ধীরে, তিলে তিলে মহানন্দে আত্মসমর্পণ। যৌবন-মানস সরোবরে দ্বৈত অবগাহন।

তোমার কী শরীর খারাপ?

মলিনা মাথা নেড়ে বলে, না।

ইন্দ্ৰকান্ত প্রশ্ন করে, তবে তোমাকে দেখে ক্লান্ত লাগছে কেন?

মলিনা মুখ নিচু করে একটু হেসে বলে, কাল সারারাত শুধু আপনার কথাই ভেবেছি। এক মিনিটের জন্যও দুটো চোখের পাতা এক করতে পারিনি।

এবার ইন্দ্ৰকান্ত একটু হেসে বলে, তুমি তো শুধু কাল সারারাত আমার কথা ভেবেছ কিন্তু আমি যে বহু রাত জেগেই তোমার কথা ভাবছি।

সত্যি?

আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না?

না, না, তা কেন বিশ্বাস করব না? কিন্তু

কিন্তু কী?

আমার মত সামান্য মেয়েকে নিয়ে আপনার এত ভাবনা-চিন্তা করা কী ঠিক হচ্ছে?

ইন্দ্ৰকান্ত আবার একটু হেসে বলে, মলিনা, ভালবাসার এই তো বিপদ!

শুধু শ্রবণে বা গন্ধে-স্পর্শে কী কামিনীরঞ্জনের নাতির মন ভরে?

ঘরে ঘরে ইন্দ্ৰকান্তর সঙ্গীত শিক্ষার আসর সত্যি বড় বেশী জমে উঠেছিল কিন্তু হঠাৎ বনবিহারী মুখুজ্যের নাতনী যোগমায়ার সঙ্গে তার সঙ্গীত শিক্ষক ইন্দ্ৰকান্তর বিয়েতে সবাই চমকে উঠলেন। তাছাড়া বিয়ের দুদিনের মধ্যে নবদম্পতি সুদূর রাজপুতানায় চলে যাওয়ায় সারা বাঙালীটোলায় গুঞ্জন উঠল। কেউ কেউ সরাসরি বনবিহারীবাবুকেও জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার হে বনবিহার, হঠাৎ ওদের বিয়ে, হঠাৎ ওদের উধাও হয়ে যাওয়া কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

বনবিহারী গড়গড়া টানতে টানতে বলেন, ওরে বাপু, নাতনীকে দেখে হঠাৎ অবলাকান্তর পছন্দ হল বলেই হঠাৎ বিয়ে হল। এতে আর অবাক হবার কী আছে?

কিন্তু বিয়ের পর পরই ওরা এমন করে শহর ছেড়ে গেল বলেই নানাজনে নানা কথা বলছে।

বনবিহারীবাবু বেশ গম্ভীর হয়েই বলেন, যারা নানা কথা বলাবলি করছে তারা তো জানেন যে রাজপুতানাতেও ওদের অনেক সম্পত্তি আছে। তাছাড়া ওখানে এক ওস্তাদের কাছে নাতজামাই গান শিখবে।

পাড়ার লোকজন এই কৈফিয়ত শুনে ঠিক খুশি হয় না।

বনবিহারীবাবু বলেন, ওরে বাপু, ইন্দ্ৰকান্ত তো আমার নাতনীকে নিয়ে পালিয়ে যায়নি। রীতিমত বৈদিক মন্ত্র পাঠ করে সাতপাক ঘুরে বিয়ে করেছে।

উনি একটু দম নিয়ে বলেন, আসলে নাতজামাইয়ের প্রতি অনেকেরই লোভ ছিল। আমার নাতনীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বলে অনেকেই তাই হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরছেন।

বনবিহারীবাবু যাই বলুন না কেন, বাঙালীটোলার সবাই বুঝলেন, কান কেলেঙ্কারী ধামাচাপার জন্যই এমন তাড়াহুড়ো করে বিয়ে হবার পরই ওরা রাজপুতানা চলে গেছে।

নিশিকান্ত ও শ্রীকান্তকে নিয়েও অবলাকান্ত ও তার স্ত্রী বিন্দু বাসিনীর অশান্তির শেষ নেই। তাই তো কিছুদিনের জন্য নিশ্চিন্তে থাকার আশায় ওরা দুজনে একদিন কাশী যাত্রা করলেন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত