স্তব্ধতা

স্তব্ধতা

পুরুনো নোটবুক খুঁজে লাকীর ফোন নম্বরটা বের করি। সকাল থেকে নম্বরটা হাতে নিয়ে ভাবছি,ফোন দেবো কিনা! ভাবতে ভাবতে নম্বরটাও মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছি না। লাকী আমার বউ ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে, অনেকদিন হলো সে আর আমার নেই কিংবা এখনো আছে হয়ত। সাহস করে ফোনটা দিয়েই বসলাম। রিং হচ্ছে। কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না। কয়েকবার চেষ্টার পর রিসিভ হলো। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে আমার। এর আগে লাকীকে কতবার ফোন করেছি। কই? এমন করে তো কাঁপিনি!

-হ্যালো

গম্ভীর একটা পুরুষ কণ্ঠ। বুঝতে পারলাম, উনি লাকীর বড় ভাই রাজীব দাদা। ফোন যেই ধরুক তাতে যায় আসে না, নম্বরটা যে খোলা পেয়েছি সেটাই শুকরিয়া।

– জ্বী! আমি অনীল বলছিলাম। লাকী ?
– এতো বছর পর হঠাৎ?
– দাদা লাকীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার একটা সুযোগ দেবেন? ওর কি বিয়ে হয়েছিল পরে?
– না। তোমার সাথে ডিভোর্সের সুযোগটাও তো দাওনি অনীল।
– বাকি যে কয়টা বছর বেঁচে আছি লাকীর নিশ্বাসের ছোঁয়ায় বাঁচতে দিবেন দাদা? হাউমাউ করে কাঁদছি। রাজীব দাদা শান্ত স্বরে বললেন,

– তোমার মনে আছে অনীল? লাকী সবসময় আমার সাদা ডুপ্লেক্স বাড়িটার মতো একটা বাড়ি চাইতো! পাশের জমিতেই ঠিক আমার বাড়ির মতোই একটা বাড়ি করে দিয়েছি তাকে। সে সেখানেই থাকে। তুমি বরং নিজেই চলে এসো। রাজীব দাদা ভয়ঙ্কর রাগী একজন মানুষ ছিলেন। তাকে নরম স্বরে কখনো কথা বলতে দেখিনি। আমার মতো অপরাধীর সাথে আজ তার এতো মধুর ব্যবহার! বয়স বাড়লে যৌবনের তেজ এমন করেই নিঃশেষ হয় বুঝি?
এতোকিছু ভাবতে ভালো লাগছে না। ট্রেনে বসে আছি। গন্তব্য ব্রাহ্মনবাড়িয়া।

” ঝকঝকঝক ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে ঐ ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই” লাকী যেন অনবরত ছড়াটা আওরাচ্ছে আর সাথে সুর মিলাচ্ছে আমার চার বছরের ছেলে জিসান। জিসানকে অামাদের ছেলে বলিনি। কারণ সে আমার একার ছেলে। লাকী তার সৎমা। প্রথম স্ত্রী জাবেদা মারা যাবার পর লাকীকে বিয়ে করি। রুপেগুণে লাকী ছিল অনন্য। লাকীর মতো সুন্দরী মেয়ে সচরাচর চোখে পড়ে না। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে বিচ্ছেদ কেন? উত্তরঃ ছেলের প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা আমাকে নরপিশাচ করে দিয়েছিল।

লাকী ভয়ঙ্কর রুপবতী ছিল। পাড়ার ছেলেরা তাকে পেতে মরিয়া ছিল। সবার স্বপ্নেই ছিল তার আধিপত্য। মেয়েদের অতিরিক্ত সৌন্দর্য একদিকে যেমন আশীর্বাদ, অন্যদিকে তেমনি অভিশাপ। ঘটনাক্রমে লাকী ধর্ষিত হয়। তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে কলঙ্করেখা। সবার চোখের মনি আজ পিত্তরস থেকেও তিক্ত। বড্ড অসহায় হয়ে লাকীকে আমার কাছে বিয়ে দেয়া হয়। লাকীকে বিয়ে করেছিলাম জিসানকে দেখভালের জন্য। আমি যে লাকীর প্রেমে পড়িনি তা কিন্তু না। সকাল-সন্ধ্যা তার নিষ্পাপ চেহারার প্রেমে মজে থাকতে চাইতাম। শহরের কৃত্রিম আলোর ছোঁয়ার বাইরে তার বেড়ে ওঠা। তার সরল গ্রাম্য চাহনি ছিল মনকাড়া। বিয়ের বছর খানেক পর-

– একটা ভালো সংবাদ আছে।

লজ্জায় লাকীর গালদুটো লাল হয়ে আছে। লজ্জা পেলে তাকে লাল মুলোর মতো লাগে। তার চোখ জুড়ে কথারা ছলছল করছে।

– কী নিউজ?
– আমার পেটে বাবু হয়েছে।

লাকী আমাকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকতে। খুশির কান্নাতে উঠা ঢেকুর অনেক শক্তিশালী হয়। অামার মাথা গরম হয়ে যায়। আমি লাকীর জন্য সবকিছু চাইলেও এটা চাই না যে, তার পেটে আমার বাচ্চা আসুক। নিজের সন্তান হলে সে জিসানকে অবহেলা করবে। হাজার হোক, সে জিসানের সৎমা। তার সন্তান না হলে সে জিসানকে আগলে মাতৃত্বের স্বাদ নিতে চাইবে। কিন্তু তার পেটে বাচ্চা! কী করে সম্ভব? লাকীকে নিয়ে ডক্টর মিজানের চেম্বারে যাই। ড.মিজানের পাখির অনেক শখ। চেম্বারে খাঁচায় বেশ কয়েক জাতের পাখি রাখা। একটা ময়না পাখিও আছে। লাকী ময়না পাখিকে দিয়ে কথা বলাচ্ছে,”ময়না দেবো তোমায় গয়না। বলতো আমার পেটে রাজপুত্র নাকি রাজকন্যা?” ময়না পাখিটাও বলছে, “ময়না দেবো তোকে গয়না। বলতো আমার পেটে রাজপুত্র নাকি রাজকন্যা?”

-সুর না মিলিয়ে উত্তর দে ময়না
– সুর না মিলিয়ে উত্তর দে ময়না

লাকীর কণ্ঠে অভিমান, ধূর! পাজি ময়না ভাল্লাগছে না কিন্তু! ময়না পাখির চাপা স্বরে জবাব, ধূর! পাজি ময়না ভাল্লাগছে না কিন্তু! কথোপকথন লাকী রেকর্ড করছে। নার্স এসে লাকীকে ডেকে নেয়। পার্স আমার কাছে রেখে পাশের রুমে চলে যায়। ভুলবশত তখনও রেকর্ডার অন ছিল।

– ডক্টর! লাকীর প্রেগনেন্সি কিভাবে সম্ভব?
– আমি লাইগেশন আরো অনেক করিয়েছি।

তাদের কারো কনসিভ হয়নি। ডক্টর মিজান কাঁচা কাজ করে না। ওয়েট! পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছি। রিপোর্ট আসুক। রিপোর্টও তাই আসলো। লাকী কনসিভ করেনি। ডক্টর মিজানকে মোটা অঙ্কের টাকা খাইয়ে অনেক সতর্কতার সাথে বন্ধ্যা করে দিয়েছিলাম লাকীকে। বেবী হচ্ছে না কেন! এমন বিভিন্ন অজিহাতে তাকে চেম্বারে নিয়ে এসেছি। গ্রামের একেবারে সহজসরল মেয়ে হওয়াতে সে বন্ধ্যাকরণ সম্পর্কে কিছু জানতোও না।

কাল হয়ে দাঁড়ালো সেই ফোন রেকর্ড। লাকী সব জেনে শোকে পাথর হয়ে যায়। একের পর এক এতোবড় বড় ধাক্কা সে সইতে পারেনি। নারী মানেই তো মাতৃত্ব; নারী মানেই তো সতীত্ব। সতীত্ব তো গেছে আরো আগেই। এখন আমার হাতে বলি হয়েছে মাতৃত্বটাও। সে পুরুষজাতিকে ঘৃণা করতে শুরু করে। তার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক সাইক্রিয়াটিস্ট দেখিয়েছি। কাজ হয়নি। অনবরত ঝগড়া বিবাদে বাড়তে থাকে আমাদের দূরত্ব। অতিষ্ঠ হয়ে তাকে গ্রামে পাঠিয়ে দেই। ছেলেকে নিয়ে নতুন বাসায় উঠি। ফোন নম্বর চেঞ্জ করে ফেলি।

– আসতে খুব বেশি সমস্যা হয়েছে? আমার ব্যাগটা এগিয়ে নিলো রাজীব দা’র কাজের লোক। হাতপা ধোয়ার পানি দেওয়া হল। আড়চোখে লাকীকে খুঁজছি। রাজীব দাদাকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছি না। অথচ আগে এই বাড়িতে পা ফেলেই লাকী লাকী ডেকে গলা ফাটাতাম। লাকী কি জানেনা আমি এসেছি? নাকি অভিমান?

– তুমি আসতেই তো রাত বারোটা বাজালে। লাকী পাশের বাড়িটাতেই থাকে। কাল ফযরের নামাজ পড়ে নিয়ে যাব। কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। সারারাত ঘুম আসেনি। এপাশ ওপাশ করেছি। লাকির সাথে আমার বিয়ের আগের রাতে যেমনটা অনুভূত হয়েছিল, আজ তেমনটাই অনুভূত হচ্ছে কেন? আচ্ছা! লাকী দেখতে কেমন হয়েছে এখন? সে হয়ত আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। নয়ত দাদা আমায় আসতে বলতেন না। নারীদের ধর্মই যে ক্ষমা। মসজিদ থেকে বের হয়েই লাকীর বাড়ির দিকে পা বাড়াই। রাজীব দাদা হাত ইশারা করলেন।

– এটাই লাকীর বাড়ি। বোনটাকে কত আদরে যুবতী করেছি, সে হিসেব তোমরা কোনো পুরুষেরাই মিলিয়ে দেখোনি। না সেই ধর্ষকেরা, না তুমি। তোমরা শুধু তার যৌবনটাই দেখলে। ভিতরটা দেখলে না। লাকীর বাড়িটার দিকে তাকালাম। প্রস্তুত ছিলাম না। মাথাটা ঝিম করে উঠলো। মনে হচ্ছে এই বুঝি জ্ঞান হারাবো। দাদার কথাগুলো মস্তিষ্কে আঘাত হানলো। তার বাড়িটাও দাদার বাড়ির মতোই। সেই একই ডিজাইন, একই রকম তকতকা সাদা রঙ। যেন রাজপ্রাসাদ! রাজীব দাদা চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন। বুঝতে পারলাম, আমাকে আর লাকীকে একান্তে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন।

– কেমন আছো সেটা জানার অধিকার আজও আছে আমার? লাকী কোনো জবাব দিলো না। আবার জিজ্ঞেস করলাম।
– কি গো বউ! কথা বলবে না? অভিমান নাকি ঘৃণা?
– জিসান কেমন আছে?
-অনেক ভালো আছে।

গেলো সপ্তাহে বউকে নিয়ে অ্যামেরিকা পাড়ি দিয়েছে। আমাকে একটা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেছে। একাকি সময়ে খুব মনে পড়ছিলো তোমায়। পা দুটো বাড়িয়ে দেবে? ক্ষমা চাইবো। মাটি খামচে কাঁদছি। কান্নায় আওয়াজ নেই। আওয়াজ করে কাঁদতে চাচ্ছি। কিন্তু আওয়াজ হচ্ছে না, কান্নার যেমন বৃথা চেষ্টা আমরা স্বপ্নে করে থাকি তেমনি। রাতে বৃষ্টি হয়েছে। ভেজা মাটি।

– দাড়িতে কাদা লেগেছে অনীল। চকচকে সাদা দাড়িতে একটু মেহেদী তো লাগাতে পারো। নবীজির সুন্নাত। চশমাটা কোথায় পড়ে গেছে। হাতড়ে খুঁজছি।
– বয়সের সাথে চোখ দুটোও গেছে? চশমা ছাড়া দেখতে পাও না বুঝি?

লাকীর কণ্ঠে কেমন যেন একটা দরদমাখা কান্না মেখে আছে। চশমা চোখে দিয়ে লাঠি ভর করে দাঁড়াই। লোক সম্মুখে কান্না করতে বেশ লজ্জা লাগছে। আশেপাশে মানুষজন জমে গেছে। ঢ্যাবঢ্যাব করে দেখছে সবাই। লাকীর সামনে কান্না করতে বেজায় লজ্জা লাগছে আমার। আগেও লাগত। একটা নির্জন বদ্ধ ঘর চাই আমার। যেখানে গলা ফাটিয়ে কান্না করতে পারবো। পাশ থেকে একটা বাচ্চা মেয়ে বলে উঠলো,’ দেখ এইডা নাকি লাকী বুজির জামাই! বুইড়া কালে আইছে খোঁজ করতে!’

রাস্তার দিকে পা বাড়াই। পিছন থেকে লাকী ভালোবাসা মাখা অভিমানী গলায় ডেকে উঠলো,”অনীল গনীল কনীল।”
অফিসে যাবার সময় মেইন দরজায় হেলান দিয়ে অভিমানী স্বরে ঠিক এভাবেই সে আমাকে ডাকতো, “অনীল গনীল কনীল।” আমি পিছন ফিরে মৃদু হেসে চোখ মেরে বলতাম, ” অফিস শেষে তাড়াতাড়ি চলে আসবো সখী।” আজও পিছন ফিরে তাকালাম। লাকীর সাড়ে তিন হাত বাড়িটার দিকে তাকিয়ে মৃদু কেঁদে বললাম, ” আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত