তোমায় সত্যি ভালবাসি

তোমায় সত্যি ভালবাসি

বিয়ের পর থেকে আমি পেশাদার মিথ্যেবাদী হয়ে গিয়েছি। পেশাদার বলছি এই কারণে, আগে এমন মিথ্যে আমি বলতাম না। এখন মিথ্যে বলাই যেন আমার পেশা হয়ে গিয়েছে। বিয়েটা আমার পছন্দে করিনি। বাবা মা মেয়েটার সাথে বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। আমি না বলতে পারিনি। তার কিছু কারণ আছে। আমি ছোটবেলা থেকেই বাবা মাকে দুঃখ কষ্ট ছাড়া আর তেমন কিছুই দেইনি।

তারা যখন মেয়েটির ছবি দেখালো আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। যাকে ভালবাসতাম তার মনটা কি সহজে ভেঙ্গে দিলাম। অভিশাপও পেলাম অনেক। যদিও জানতাম আমার বাবা মা সেই মেয়েটাকে মেনে নিতো না। যাক সে কথা। এই একটা জায়গায় একটা মেয়ের কাছে আমি সারাজীবনের জন্য প্রতারক হয়ে রইলাম। যদিও আমি যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারি আমি কোন প্রতারণা করিনি। কিন্তু এই কাজটা আমি কখনোই করি না। কেউ ভুল বুঝলে সেই ভুল ভাঙাই না। বরং তাকে আরো ভুলের দিকে ঠেলে দেই যেন সে আমায় আরো ভুল বুঝে ষোলকলা পূর্ণ করে।
বাবা মা মেয়েটার ছবি দেখানোর পরে মেয়েটিকে আংটি পরানোর দিন ঠিক করা হলো। আচ্ছা বারবার মেয়েটাই বা বলছি কেন! সেতো এখন আমার বউ।

পাঁচ মাসের সংসার আমাদের। ওর নাম নিনা। আংটি পরানোর দিন ওকে দেখেই আমার প্রথমে যেটা মনে হলো, এই মেয়ের সাথে থাকা অসম্ভব। আমি যেই অক্ষরেখা দিয়ে চলি নিনা ঠিক তার বিপরীত। অন্য দশজনের মতো আমিও সুন্দরী মেয়ে পছন্দ করি। আকর্ষণীয় ফিগার। বিছানায় ঝর উঠে যেন। বিয়ে নিয়ে আমার সব চিন্তাভাবনাই ছিল শরীর কেন্দ্রিক। কিন্তু নিনার মধ্যে যেন তার কোনটাই নেই। হয়তো আছে। সেটা অন্য কারো মনে হতে পারে। কিন্তু আমার মনে ওকে দেখে কোন শিহরণ জাগেনি। কিন্তু যেহেতু আমাদের জোড়া লিখাই ছিল সেহেতু ঠিকই আমাদের বিয়ে হয়ে গেল। সেদিন মনে মনে ভেবে কুল পাই নাই এই মেয়ে কি করে আমার বাম পাঁজরের হাড় হয়!

আংটি পরানোর পরে আমরা চলেই আসতাম হঠাৎ নিনার ভাবী বলল, “ওদের একটু আলাদা কথা বলার সুযোগ দিলে ভাল হয় না। এই যুগের ছেলে মেয়ে।” বস্তাপচা সস্তা উপন্যাসের ডায়ালগ দিলো ভাবী। আমি কোন আগ্রহই পেলাম না কথা বলার। কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে যেহেতু জুয়া খেলতে বসেছি চাল তো দিতেই হবে। ওর রুমে চলে এলাম আমরা। নিনার ভাবীই আমাদের নিয়ে এসে আমায় একটা চিমটি দিয়ে বলল, “দরজা কি বন্ধ করে দেবো!”

ভাবী মনেহয় আমার গোবেচারা মুখ দেখে ভেবেছিল আমি ঘাবড়ে যাবো। ভাবীকে বললাম, “আপনার ননদিনী না থেকে শুধু আপনি যদি থাকেন তাহলে দরজা বন্ধ করে দেন।” আমার কথা শুনে নিনা ফিচ করে হেসে দিলো। ভাবী ভয় পাওয়ার ভান করে বুকে ফুঁ দিয়ে হাসি দিয়ে পালালো। যাওয়ার আগে নিনাকে চোখ নাচিয়ে বলল, “দেখিস ভাই সামলে রাখিস।” বিশ্বাস করুন নিনার সেই ফিচ করে হেসে দেওয়াটা আমার ঠিক বুকের ভিতরে গিয়ে লাগলো। অদ্ভুত একটা ভাল লাগায় ছেয়ে গেল মন। সেই সময়ই বুঝতে পারলাম একটা মানুষের চেহারা যেমনই হোক হাসি মনে হয় স্বর্গের একটুকরো ঝিলিক। হাসি কখনোই অসুন্দর হয় না।

রুমের এক পাশে বিশাল একটা বুক সেলফ। শত শত বই। চোখ ধাঁদিয়ে গেল। এই মেয়ে দেখি দুনিয়ার সব বই পড়ে বসে আছে। বইয়ের তাক থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার নিনার দিকে ফিরলাম। আগের চেয়ে বরং একটু সুন্দরীই মনে হলো ওকে। যেই মেয়ে এতো বই পড়ে সেই মেয়ে কিছুতেই অসুন্দরী হতে পারে না। নিজের ভিতরেই কেমন একটা পরিবর্তন দেখতে পেলাম। আমার ভিতরে যেন একটা অন্য আমি জেগে উঠছে। বইয়ের তাক থেকে নিকোলাই অস্রভস্কির ইস্পাত বইটা হাতে নিয়ে বললাম, “তোনিয়াকে বেশ পছন্দ আমার।”

সাথে সাথে নিনা বলে উঠলো, “আমার পাভেল কোরচাগিনকেই বেশি পছন্দ।” যাহ বাবাহ! এই মেয়ে দেখি চটাং চটাং করে কথাও বলতে জানে। নিনার দিকে তাকাতেই দেখি লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। এই মেয়ে এতো লজ্জা পাচ্ছিলো কেন বুঝতে পারলাম না। নাকি কনে দেখতে এলে কনেদের লজ্জা পাওয়ার রেওয়াজ আছে তাও জানি না। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লিখা কিছু কথা। বইটা কেউ একজন ওকে উপহার দিয়েছে। তার নাম লিখা নাই। শুধু লিখা, “পৃথিবীর সব ভালবাসা থেকে এক বিন্দু ভালবাসা দিলাম তোমায়। বেঁচে থাকো ভালবাসায়। আশায় আশায়…।” বেশ ভালবাসাময় কথা গুলো। নিনাকে জিজ্ঞাস করলাম কে দিয়েছে বইটা।

নিনা আমাকে খাটে বসতে বলে ও আমার সামনে একটা চেয়ার টেনে বসে বলল, “আমার সাথে একটা ছেলের সম্পর্ক ছিল। সেই উপহার দিয়েছিল। সস্তা করে বললে বলা যায় আমার প্রথম ভালবাসা সেই ছেলেটা।” নিনার কথা শুনে চমকে উঠলাম। এতোটা স্মার্টনেস আশা করিনি। খুবই বড় মনের একটা মেয়ে মনে হলো ওকে। কি নির্দিধায় বলে দিলো কথা গুলো। যেহেতু নিনা বলেছে সম্পর্ক ছিল। তার মানে এখন নেই। তাই এই ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞাস করার কোন ইচ্ছে হয়নি।

আমি সাধারণত কারো ব্যাক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না।
বিয়ে হয়ে গেল এক মাস পরেই। আংটি পরিয়ে আসার পরে তেমন একটা কথা ওর সাথে আমার হয়নি। কিংবা ওকে নিয়ে যে কোথাও একটু ঘুরতে যাবো সেই ইচ্ছেটাও হয়নি। আংটি পরিয়ে আসার পরে লাভের লাভ একটাই হয়েছিল ওর প্রতি সামান্য ভাল লাগা তৈরি হয়েছে। বাসার সবার চাপাচাপিতে ওকে নিয়ে একদিন ঘুরতে গেলাম বিয়ের ১১ দিন আগে। আমাদের চট্টগ্রাম শহরের মধ্যে ঘুরার জায়গায় হাতে গোনা কয়েকটা। ফয়’জ লেক, পতেঙ্গা সীবিচ, ডিসিহীল এই সব জায়গায় আমার যেতে ভাল লাগে না। ভিড়ভাট্টা পছন্দ করি না। নিনাকে নিয়ে সি.আর.বি চলে গেলাম। টাইগার পাসের রাস্তা, সার্সন রোড, চট্টেশ্বরী রোডে হাঁটতে আমার অনেক ভাল লাগে।

সি.আর.বি তে গিয়ে গগন শিরিশ গাছের নিচে বসলাম। এসে মনে হলো যেন ভুল করেছি। এই জায়গার খোঁজও এখন অনেকেই পেয়ে গেছে। বেশিরভাগই টোনাটুনির জুটি। কথা তেমন হলোই না নিনার সাথে। এক সাথে হাঁটতেও কেমন অস্বস্তি হচ্ছিলো। আমার বারবার মনে হচ্ছিলো এই মেয়ের সাথে আমায় মানায় না। নিনার কেমন লাগছিলো বুঝতে পারছিলাম না। ও চুপচাপ মাথা নিচু করে ছিল প্রায় পুরোটা সময়। আমি সিগারেট ধরিয়ে ওর সাথে এই ব্যাপারে কথাটা ফাইনাল করে ফেলা ঠিক করলাম।

“নিনা আমি কিন্তু চেইন স্মোকার। সিগারেট নিয়ে তোমার আপত্তি থাকতে পারে। থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমি এই ব্যাপারে কোন ছাড় দিতে পারবো না। আমাকে সিগারেট ছাড়ার কোন রিকোয়েস্ট না করলেই ভাল হয়।”
নিনা কিছুই বলল না। ওকে আবারো জিজ্ঞাস করলাম ও কিছু বুঝেছে কিনা কি বললাম। ও মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো বুঝেছে। কিছু খাবে কিনা জিজ্ঞাস করলাম। কিছু বলে না। অন্য কোথাও যাবে কিনা জানতে চাইলাম তাও কিছু বলে না। কি জ্বালায় পড়লাম। কিছু না বললে বুঝবো কি করে। আমি তো অন্তর্যামী নই যে সব কথা বুঝে নেবো। রিক্সা ঠিক করলাম মেহেদী বাগ যাওয়ার জন্য। রিক্সায় উঠে জিজ্ঞেস করলো ওখানে কেন। বললাম বিশদ বাংলায় যাবো। দেখি উজ্জ্বল হয়ে উঠলো নিনার মুখ।

বিয়ের পরেও আমরা বেশ কয়েকবার বিশদ বাংলায় গিয়েছি। সেখানে বইয়ের কালেকশন, টি শার্টের কালেকশন, খাবার দাবার ভালোই লাগে আমাদের। মূলত দুইটা জায়গাতেই আমরা বিয়ের পরে ঘুরতে যাই, বিশদ বাংলায় আর জামালখানে বাতিঘর বুকশপে। নিনার সাথে আমার মোটামুটি ভাল একটা বন্ধুত্ব হয়ে গেছে বইয়ের কারণে। ওর সাথে কথা বলার জন্য বইয়ের প্রসঙ্গ তুললেই ওর মুখে খই ফুটে। এমনিতে চুপচাপ।

আগেই বলেছি নিনা দেখতে তেমন সুন্দরী নয়। বাবা মা যে কি দেখে পছন্দ করেছে ওকে জানি না। কিন্তু আমি মনে মনে এক চরম জুয়া খেলার জন্য মন স্থির করেছিলাম। সেইদিকেই এগিয়ে গেলাম। মিথ্যে ভান করতে শুরু করলাম যে নিনাকে অনেক ভালবাসি আমি। মনের বিরুদ্ধে অনেক মিথ্যে ভালবাসার কথাও শুনাই ওকে। একদিন নিনা গোসল করে ভেজা কাপড় নিয়ে বারান্দায় যাচ্ছিলো কাপড় মেলে দেওয়ার জন্য। মাথায় তাওয়াল পেচানো। ওর একটা বাহু ধরে টান দিয়ে ওকে আমার দিকে ফিরিয়ে মাথা থেকে তাওয়াল খুলে নিয়ে ও কিছু বুঝে উঠার আগেই ওর ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে দীর্ঘ একটা চুমু এঁকে দিলাম। ওর সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। ওর হাত থেকে ভেজা কাপড় গুলো পড়ে গেল আমার পায়ের উপর।

দুই হাত দিয়ে ওকে জড়িয়ে আরো কাছে টানলাম। কতোক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না। হঠাৎ ওকে ছেড়ে দিতেই দেখি ও অপলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কতো মুগ্ধতা সেই চোখে। আমি ভেবেছিলাম এই নাটকটা করে আমার বিচ্ছিরি লাগবে। কারণ বিয়ের চার দিন পরে সেটাই ছিল নিনাকে প্রথম চুমু খাওয়া। আমি নিজেও অবাক হয়ে গেলাম এই প্রথম চুমুতে। কি স্নিগ্ধতা, কি মায়া। বোকা হৃৎপিণ্ডটা দ্রুত সারা শরীরে রক্তের সরবরাহ বারিয়ে দিলো। আমি কয়েকটা চোরা ঢোক গিলে নিনার দিকে তাকাতেই ও তাড়াতাড়ি মেঝে থেকে ভেজা কাপড় হাতে নিয়ে ঘর থেকে পালালো। সেদিন একবারের জন্যও নিনা আমার সামনে আসেনি পারতপক্ষে। কিন্তু ওর চারপাশে আসা যাওয়া খুব খেয়াল করছিলাম। ওর মধ্যে একটা উৎফুল্লতা ছিল।

সেদিন রাতেই ঘুমুতে যাওয়ার আগে মিথ্যে করেই বলেছিলাম, “তুমি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে।” বলেই ওর সারা গালে চুমু দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছিলাম। নিনা আমায় জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলো। আমি মনে মনে খুব খুশি হলাম। আমার মিথ্যে তাহলে নিনা ধরতে পারেনি। ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে কানে ফিসফাস করে বলল, “আমি জানি আমি সুন্দরী না। কিন্তু তুমি যে আমায় সুন্দরী বললে এতেই আমার মন ভরে গেছে।” মেয়েটাকে মিথ্যে বলে সেই প্রথম আমার বুকে কেমন যেন করে উঠলো। কিন্তু কি আশ্চর্য সেদিনের পর থেকে সত্যি সত্যি নিনাকে সুন্দরী লাগতে শুরু করলো।

সেই রাতের পরে সকালে চোখ মেলতেই দেখি নিনা ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছছে। হলুদ একটা ড্রেস পরে আছে। পিঠের কাছে জামাটা ভিজে আছে ভেজা চুলের কারণে। চুল থেকে ভেসে আসছে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ। সেই সাত সকালে ঘ্রাণটা আমার ভিতরে কিছু একটা অঘটন করে দিলো। আমার কি হলো জানি না। বিছানা ছেড়ে পিছন থেকে নিনাকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর কাঁধে আলতো চুমু দিলাম। আয়নায় দেখলাম ওকে। ও আমার বুকে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সারা শরীর কাঁপছে ওর। আয়নায় পাশেই নিনার বুক সেলফ। বিয়ের পরে ও নিয়ে এসেছে। হঠাৎ আবারো সেই কথাটা বুকে এসে বাজলো, যেই মেয়ে এতো বই পড়ে সে অসুন্দর হয় কি করে! সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম বই পড়ার সাথে সুন্দর অসুন্দরের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু সৌন্দর্যের সাথে একটা গভীর সম্পর্ক আছে। যারা বই পড়ে তাদের মধ্যেও সেই সৌন্দর্য আভা ছড়ায়। দেখতে সুন্দরী নয় নিনার মাঝে আমি সেই সৌন্দর্যই যেন দেখতে পেলাম।

ওকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই একটা না একটা বই গিফট করি। এইখানেও একটা মিথ্যের আশ্রয় নিলাম। ভাবলাম এই সুযোগে ওকে চমকেও দেওয়া যাবে। ওকে বই দেওয়ার সময় সাবধান করে দিতাম বইয়ের পৃষ্ঠা গুলো যেন আগেই উলটে পালটে না দেখে। আমি জানি ওকে যেহেতু মানা করেছি ও এই কাজ করবে না। ওকে কেন যে এতো বিশ্বাস করা শুরু করেছি জানি না। এই বিশ্বাসটুকু নিনাই আমার মাঝে কি করে যেন রোপন করে দিয়েছে। আমি জানি নিনা কেমন চমকে যায় বই পড়তে পড়তে। কল্পনা করার চেষ্টা করি ওর মুখটা। বইয়ের ভাজে ভাজে আমি চিরকুট লিখে রাখি, “ভালবাসি নিনা! অনেক ভালবাসি তোমায়।”

মিথ্যে কিছু কথা। কিন্তু জানি এই মিথ্যে কথা গুলোই কতটা সুখ দেয় আমার নিনাকে। আমার! হ্যাঁ আমার নিনা! ইদানীং ওকে খুব করে আমার মনে হয়। প্রায়ই বইয়ের পৃষ্ঠার ভাজে ভাজে চিরকুট দিয়ে দিতাম। আবার কোনো বইয়ে দিতামই না। জানতাম ও প্রতিটা পৃষ্ঠা উল্টানোর আগে হয়তো ভাবে পরের পৃষ্ঠায় চিরকুট আছে। বইটা শেষ করেও যখন পেতোনা নিশ্চয়ই অনেক কষ্ট পেতো। সে পাক গিয়ে। মিথ্যে ভালবাসায় কষ্ট না থাকলে মজা থাকলো কই। কিন্তু আমার কেন যেন ওকে কষ্ট দিতে মন সায় দিতো না। ওর তো কোন দোষ নেই। আমি সুন্দরী মেয়ে পছন্দ করি। ও সুন্দরী না। এটাতে ওর তো কোন হাত নেই। ও তো আর ওকে সৃষ্টি করে নাই। সৃষ্টিকর্তা ওকে যেভাবে ভাল মনে করেছে সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন। আমি সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে কি করে খারাপ বলি। নিজের কাছে নিজেকেই অপরাধী মনে হতে থাকলো।

আমি এটাও বুঝতে পারছি না মিথ্যের জুয়াখেলা খেলতে খেলতে নিনাকে কেন এতো আপন মনে হচ্ছে। হয়তো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকে অবহেলা করতে পারছি না বলেই। অথচ ওকে বউ করে পাওয়ার কোন ব্যাকুলতা তো আমার ছিল না। আমার বাম পাঁজরের হাড় হিসাবে নিনাকে আমার পছন্দ হয়নি। শুধু মিথ্যেবাদী হয়ে ওকে ভালবাসার অভিনয় করে চলেছি। বাইরে থাকা অবস্থায় ওর নাম্বারে এসএমএস দিয়ে বলি ওকে ভালবাসি। সকাল বেলায় ঘুম থেকে জেগে উঠে বলি ভালবাসি। মিথ্যে মিথ্যেই বলি। যাদের মধ্যে অনেক ভালবাসা থাকে তাদের ভালবাসা শব্দটা খুব একটা উচ্চারণ করতে হয় না।

কিন্তু আমি দিনে অসংখ্যবার মিথ্যে অভিনয়ে নিনার উদ্দেশ্যে ভালবাসার শব্দটা উচ্চারণ করি। অবাক লাগে ও একটাবারের জন্যও বিরক্ত হয় না। ও কিন্তু একটা বারের জন্যও আমায় বলেনি আমাকে ও ভালবাসে। ও হয়তো সত্যিই ভালবাসে তাই মিথ্যে করে বলার প্রয়োজন দেখেনি। ও ওর ভালবাসা গুলো আমায় তীব্র অনুভূতি দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। আমি তা এড়াতে পারি না। ওর প্রতিটা স্পর্শ ভালবাসার গান গায়। সেই গানের সুর হৃদয়হীন মানুষের মনেও ভালবাসার অনুভূতি জাগিয়ে দিতে বাধ্য।

মিথ্যে বলতে বলতে কি করে যেন ওকে অন্য রকম লাগা শুরু করলো আমার। মিথ্যে করেই বলতাম ওর চোখ, ওর ঠোঁট, ওর চুল সুন্দর। ইদানীং আমি মুগ্ধ হয়েই ওর চোখের দিকে তাকাই। কি শান্ত শান্ত এক জোড়া চোখ। জাগতিক কোন আকর্ষণীয়তা তেমন নেই। কিন্তু যা আছে তার বর্ণনা আমি দিতে পারবো না। শুধু অনুভব করতে পারি। ঠিক যেমন ওর ঠোঁটের স্পর্শ, চুলের গন্ধও অনুভব করি। কি করে যেন আমি হারিয়ে যেতে থাকতাম দিনের পর দিন নিনার মাঝে।

হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ঠিক করলাম নিনাকে আর মিথ্যে মিথ্যে ভালবাসার কথা বলবো না। কেমন যেন মিথ্যে বলতে গেলে কথা গুলো গলার কাছে আটকে যায়। অনেক কষ্টে বের করতে হয় মিথ্যে ভালবাসার কথা। আমি হেরে গেছি। জুয়া খেলা খেলতে গিয়ে মিথ্যে মিথ্যে ভালবাসতে গিয়ে সত্যি সত্যি নিনাকে ভালবেসে ফেলেছি। ওর সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত আমি অনুভব করি। মনে হয় যেন দুনিয়াতে আর কিছু না হলেও আমার চলবে। আমার তো নিনা আছে। কথা গুলো যতো সহজে বলে ফেললাম ততো সহজে কিন্তু ব্যাপার গুলো আমার মাঝে ঘটেনি। ঠিক বোঝাতে পারবো না আসলে। আমার মন নিনার দিকে ছুটে যাচ্ছিল। আর আমার মিথ্যে অহমিকা আমাকে নিনার কাছে যেতে দিচ্ছিলো না। এই মিথ্যে অহমিকা নিয়ে চলতে চলতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। মনটা শান্তি চায়। আশ্রয় চায়।

ওর অসুন্দর চেহারার মাঝে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য আমি খুঁজে পাচ্ছি একটু একটু করে। ও আসলে অসুন্দর নয় মোটেও। বরং ওকে সুন্দর করে দেখার চোখটাই আমার ছিল না। আমাকে নিনাই সেই চোখের সন্ধান এনে দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার সেরা সৃষ্টি কোন মানুষই আসলে অসুন্দর নয়। অসুন্দর আমাদের মনটা, দেখার চোখটা। নিনা আমার জীবনে না এলে আমিও এমন মানুষিক প্রতিবন্ধীই হয়ে থেকে যেতাম। নিনা আমায় এই প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে। অথচ ও কিছুই করেনি। শুধু প্রচণ্ড ভালবেসে গেছে। যেই ভালবাসা আমি এড়াতে পারিনি।
এই যে নিনা সকালে ভেজা চুল মুছে; আমাকে চা দেওয়ার আগে কাপে চুমুক দিয়ে দেখে চিনি হয়েছে কিনা; বাইরে থেকে এলে ওড়নায় মুছতে মুছতে পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয়; ভর পেট খাওয়ার পরেও যখন আলতো করে বলে, “আমার থেকে আর একটু খাও;” এইসবের মাঝে যে প্রচণ্ড এক ভালবাসা লুকিয়ে থাকতে পারে তা আমার জানা ছিল না। প্রতিটা দিন যেন নিনাকে নতুন করে আবিষ্কার করেই চলেছি। আর বুকের মধ্যে নিজের অজান্তেই গড়ে চলছিলাম ভালবাসা।

ঘুম থেকে উঠে নিনাকে ডাকার আগেই দেখি নিনা হাসি হাসি মুখে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। ওর চোখে ছল ছল করছে জল। আমার কাছে এসে আমার বুকের উপরে জাপটে পড়লো। ওর ভেজা চুল আমার মুখের উপরে পড়লো। নিনা হাত দিয়ে আমার মুখের উপর থেকে চুল সরিয়ে দিয়ে কপালে চুমু দিলো। খুব অবাক হয়ে গেলাম নিনার এই আদরটুকু পেয়ে। নিনাকে যে আর মিথ্যে মিথ্যে ভালবাসার কথা বলবো না এটা কি ও বুঝতে পেরেছে। আমি কিছু বলতে গেলাম ও আমার ঠোঁটে আংগুল দিয়ে আমার একটা হাত ওর পেটের উপরে রাখলো। এই প্রথম কেঁপে উঠলো আমার সর্বস্ব। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেড়িয়ে এলো, “বা…বাবা হবো।”

নিনা আমায় আরো শক্ত করে ওর বুকে জড়িয়ে ধরলো। আনন্দে ফুঁপিয়ে কাঁদছে নিনা। ওর পেটে হাত বুলিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠছি, যখনই মনে হচ্ছে আমার আরেকটা অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে নিনার শরীরে। ভাবতেই সারা শরীরে কি এক আলোড়ন হলো। নিনা আমার চুলে নাক ডুবিয়ে আমায় ওর বুকের ভিতরে লুকিয়ে রাখছিলো। মনে হচ্ছে ওর কোন সেরা সম্পদকে বুকে তুলে আগলে রাখছে; যেন কেউ দেখতে না পায়। ওর বুকে মুখ লুকিয়ে প্রথমবারের মতো সত্যি সত্যি উচ্চারণ করলাম, “ভালবাসি নিনা ভালবাসি। অনেক অনেক অনেক… অনেক অনেক ভালবাসি।”
মিথ্যেবাদী আমি তোমায় সত্যি ভালবাসি

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত