ভাই বড় ধন

ভাই বড় ধন

রাগ করে বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে! সিদ্ধান্ত নিলাম কোনো চাকরি না জোটার আগ পর্যন্ত বাসায় ফিরবো না!
বাসায় থাকি আমি, ভাইয়া-ভাবি এবং আমার ভাতিজা রাহি। গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করেও আমি বেকার, আমার কাজ শুধু রাহিকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া আর বাজার করা। অনেক ইন্টার্ভিউ দিয়েও চাকরি পাইনি। আমি তেমন আহামরি মেধাবী নই যে চাকরি পেতেই হবে, কিন্তু আমার বিশ্বাস চাকরি পেলে অবশ্যই ভালোভাবে কাজ করব।

ভাইয়া অনেক বড় চাকরি করে, আমি না করলেও তাতে কোনো সমস্যা হয় না! তবুও আমার হিংসুটে ভাবী দিনরাত আমাকে খোটা দেয়, আমি বসে বসে তার স্বামীর অন্ন খাচ্ছি এসব তার সহ্য হয় না! ভাইয়াও কেমন হয়ে গেছে বিয়ের পর, প্রথম প্রথম ভাবীকে বলতো, ‘আরে বাদ দাওতো হিমা, ওতো চেষ্টা করছে’, কিন্তু এখন সেটাও বলে না!! আমার কাছে সেই উক্তিটাই সঠিক মনে হচ্ছে “”ভাই বড় ধন, রক্তের বাধন, যদি পৃথক হয়, নারীর কারণ””! তাই আর থাকবোই না ভাইয়ার বাসায়, আমিতো তার বোঝা হয়ে গেছি! একরাশ দূখঃ আর অভিমান নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে বাইকটা নিতে ভূলিনি, এটাতে ভাইয়ার কোনো অধিকার নেই, বাবা বেঁচে থাকতে আমাকে কিনে দিয়েছিলেন! আমার সার্টিফিকেট, কাগজপত্র, কাপড় এসব একটি ব্যাগে ভরে বাসা ত্যাগ করলাম বাইক নিয়ে।

প্রথমে চললাম আজিমপুর গোরস্থান এর দিকে, সেখানে শায়িত আছেন আমার জন্মদাতা বাবা ও মা! সেখানে গিয়ে অনেক চোখের পানি ফেলে কিছু সময় কবর জিয়ারত করলাম। কেঁদে কেঁদে মোনাজাত করলাম , “তুমরা বলেছিলে, দুইভাই আজীবন একসাথে থাকতে, কোনো ঝগড়া না করতে, কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছেনা, আমি একজন বেকার হয়ে তুমাদের চাকরিজীবী বড় ছেলের সাথে কিভাবে থাকবো?” তারপর গোরস্তান থেকে বের হয়ে উরাধুরা বাইক চালাতে লাগলাম। কি করব, কোথায় যাবো কোনো কিছুই ডিসাইড করিনি। মাথা আউলিয়ে যাছিলো! চৌহাট্টা পয়েন্টে আসতেই জিন্দাবাজার রোড থেকে আসা একটি প্রাইভেট কারের সাথে সজোরে ধাক্কা খেলাম! ছিটকে পড়লাম কিছু দূরে, মাথায় হেলমেট ছিলো, হাটুতে সামান্য ব্যাথা পেলাম।

-দিলে তো একেবারে ভেঙ্গে!! খেয়াল করে দেখলাম ভদ্রলোকের শখের গাড়ির ডানপাশের হেডলাইটটা ভেঙ্গে ঝাঁজরা হয়ে গেছে!
-স্যরি আংকেল,
-এখন স্যরি বলে কি হবে? লাইটটাতো ভেঙ্গেই গেলো!

আমি আর কথা না বাড়িয়ে সোজাসুজি বাইক স্টার্ট দিলাম। পিছনে ভদ্রলোক দাত কটমট করে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। খেয়াল করে দেখলাম সন্ধ্যা হয়ে গেছে, রাস্তার পাশে বাইক দাড় করলাম। বাসা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। ফোনে ভাইয়ার অনেক মিসকল জমা হয়ে আছে, ফোন সাইলেন্ট করাছিলো। চিন্তা করলাম অফ করে দেই, পরে ভাবলাম এই এলাকায় আমার এক বন্ধু থাকে, তাকে ফোন দিলাম।

-হেলো রাশেদ,
-কিরে বন্ধু?
-(তাকে সবকিছু খুলে বললাম)
-এসব অভিমান, টভিমান ভুলে যা বন্ধু, বাসায় চলে যা,তোর ভাইয়া চিন্তা করবে।
-বন্ধু, যে ডিসিশন নিয়েছি সেটাই ফাইনাল। এখন তোর এলাকায় একটা মেস ঠিক করে দেয়।
-আচ্ছা থাক, তোর সাথেতো তর্কে পারা যাবেনা। আর একদিনের ভিতরেতো কোনো মেস পাওয়া যাবেনা, তুই বরং একদিন আমার বাসায় থাক। কাল দেখা যাবে মেস পাওয়া যায় কিনা।
-আচ্ছা ঠিক আছে আমি আসছি।

চলে গেলাম রাশেদের বাসায়। পরদিন সকালে উঠে তাকে নিয়ে খুঁজাখুঁজি করে একটা মেস ঠিক করলাম। কিন্তু মেসে থাকার মতো যথেষ্ট টাকাপয়সা আমার কাছে নেই। রাশেদ কে বললাম, “বাইকটা বিক্রি করে দেই?” সে দ্বিতীয়বারের মতো আমাকে বুঝালো, বললো, “শেষ পর্যন্ত বাইকটাই বিক্রি করে দিবি? তারচেয়ে ভালো হবে বাসায় চলে যা।” কিন্তু আমি নাছোড়বান্দা, শেষ পর্যন্ত বাইকটা বিক্রিই করে ফেললাম। এর টাকা দিয়ে কিছুদিন মেসে থাকা যাবে। কিছুটা খারাপ লাগছিলো, কারণ বাইকটির সাথে বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে!

২/৩ দিন কেটে গেছে। তারমধ্যে ভাইয়া কয়েকবার ফোন দিয়েছিলো। আমি বলে দিয়েছি, “আর কল দিয়োনা, সময় হলে এমনিতেই চলে আসবো”। সে কিছু টাকা পাঠাতে চাইছিলো, আমি সোজা না করে দিলাম। মেসে থেকে চাকরির জন্য অনেক খোজ খবর নিয়েছি। আজ সকালে একটা ইন্টার্ভিউ আছে, রাশেদের মাধ্যমে এটির সন্ধান পেয়েছি। চাকরি পাওয়ার আশা নেই, তবুও গেলাম।

ওয়েইটিং রুমে অনেকজন বসে আছি, একেএকে সবাই যাচ্ছে আর বের হয়ে আসছে! একসময় আমার ডাক আসলো। ইন্টার্ভিউ রুমে প্রবেশ করেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! টেবিলে বসে আছেন সেদিনের সেই ভদ্রলোক, যার গাড়ির হেডলাইট আমি ভেঙ্গে দিয়েছিলাম! এবার তাহলে নিশ্চিত চাকরিটা আর আমার কপালে নেই। ভদ্রলোক ও আমাকে দেখে কিছু অবাক হলেন। বললেন, ‘বসেন’, আমি ধন্যবাদ দিয়ে চেয়ারে বসলাম। উনি শুরু করলেন সমস্ত আজগুবি, কঠিন এবং চাকরির সাথে রিলেটেড নয় এরকম প্রশ্ন। বুঝতে পারলাম আমাকে সিলেক্ট করার ইচ্ছা তার নেই। আমি অনেক কষ্ট করে কিছু প্রশ্নের আন্সার দিলাম। ইন্টার্ভিউ শেষ হওয়ার পর বাইরে আসলাম। বলা হলো যারা সিলেক্ট হবেন পরবর্তীতে তাদের জানানো হবে।

৩/৪ দিন পর একটি মেসেজ আসলো, তাতে লেখাছিলো, “আপনি চাকরির জন্য সিলেক্টেড হয়েছেন, আগামীকাল অফিসে আসবেন, কাজ বুঝিয়ে দেয়া হবে”। মেসেজটি দেখে নিজ চোখকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো! সেদিন রাতে উত্তেজনায় চোখের পাতা এক করতে পারছিলাম না। মনে মনে ভাবলাম, এবার ভাবীকে দেখিয়ে দিবো আমি যে তার স্বামীর প্রতি নির্ভরশীল না।

পরদিন সকালে অফিসে গেলাম। বাইরের রুমে বসে আছি, পিওন এসে বললো, ভিতরে আসেন, স্যার আপনাকে ডাকছেন। ভিতরে গিয়ে দেখলাম সেই ভদ্রলোক আজও সেখানে বসা। তবে আজ তার মুখে সেই ধরণের কোনো ছাপ লক্ষ্য করলাম না। উনি বললেন, বসো, আমি অবাক হলাম কিন্তু তা প্রকাশ করলাম না। চেয়ারে বসার পর উনি তার কথা শুরু করলেন “”আমি জানি, আমাকে তুমি করে বলতে দেখে অবাক হচ্ছো। আমি হলাম আনোয়ার, তুমার ভাই হিমেলের ভার্সিটি ফ্রেন্ড, আমরা একসাথে ভার্সিটিতে পড়ালেখা করেছি।

হিমেল আমাকে তুমার ব্যপারে সবকিছু বলেছে। তুমি যখন বাসা থেকে বের হয়ে এসেছো, তখন সে আমাকে ফোন করে সবকিছু খুলে বলে, তুমার বাসা ত্যাগ করার কারণ, চাকরি খোজা সবকিছু আমাকে জানায়। আমার অফিসে তুমার তুমার চাকরির ব্যবস্থা করতে বলে। আমি তাকে বলি, “দোস্ত, আমার এখানে কিছু পোস্ট খালি আছে, দুইদিন পর ইন্টার্ভিউ নেয়া হবে, তোর ভাইকে সেখানে পাঠিয়ে দিস।” তারপর সে তুমার বন্ধু রাশেদের সাথে যোগাযোগ করে তুমাকে এখানে আসতে জানায়, সে রাশেদকে তার কথা গোপন রাখতে বলেছিলো। এখানে আসার পর ইন্টারভিউয়ের সময় তুমাকে যেসব প্রশ্ন করেছিলাম, সবই ইচ্ছা করে।

আমি তার কথা শোনে যারপরনাই অবাক হলাম। আমি ভাইয়াকে যেমন ভাবছিলাম তিনি তেমন না। মি. আনোয়ার বললেন, তুমি ঐ রুমে যাও, সেখানে তুমাকে কাজ বুঝিয়ে দেয়া হবে। তারপর আবার এখানে এসো। কাজ বুঝে নেবার পর আবার উনার কাছে আসলাম। উনি বললেন, আমার সাথে আসো, আমি উনাকে অনুসরণ করতে লাগলাম। উনি আমাকে পার্কিং ফ্লোরে নিয়ে আসলেন। পকেট থেকে একটি গাড়ির চাবির রিং বের করলেন, তারপর রিংয়ের মধ্যে থাকা ব্লুটুথ সুইচে চাপ দিলেন। সাথেসাথে ফ্লোরের মধ্যকার একটি বাইক স্টার্ট হয়েগেলো। বুঝতে পারলাম মি. আনোয়ারের প্রাইভেট কারের পাশাপাশি একটি মোটরসাইকেল ও আছে।

সবচেয়ে অবাক হলাম তখন, যখন উনি চাবিটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা তোমার ভাইয়ার গিফট, সে আমার একাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে এটা কিনে দিতে বললো’। আনন্দে চোখে পানি চলে আসলো! বাইকটি নিয়ে মেসে গেলাম। তখন ফোনে আরেকটা মেসেজ আসলো, তবে সেটা ভাইয়ার নাম্বার থেকে। মেসেজটিতে লেখা ছিলো, “”রাশেদের কাছ থেকে শোনলাম, তুমি তুমার বাইকটি বিক্রি করে দিয়েছো। তখন অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। চিন্তা করলাম, মেসে থাকতে আমার ভাইটির কতোই না কষ্ট হচ্ছে। সেই বাইকটা বাবার দেয়া স্মৃতি ছিলো, এবার নাহয় ভাইয়ের দেয়া বাইকটা উপহার হিসেবে নাও!!

হিমা যখন তুমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতো তখন আমারও অনেক খারাপ লাগতো। আমি তাকে বুঝাতাম, কিন্তু তুমার সামনে তাকে কিছু বলিনি, তাতে সে কষ্ট পাবে।কারণ ম্যাচিউড মানুষকে সবার মন রক্ষা করে চলতে হয়।
আমি অনেক বড় চাকরী করি, তাই তুমার চাকরির ব্যপারে তেমন গুরুত্ব দেইনি। আমি চাইলে আরো আগে তুমার যেকোনো চাকরির ব্যবস্থা করে দিতাম। কিন্তু যখন দেখলাম তুমি বাসা ছেড়ে চলে গেলে তখন বাধ্য হয়ে তুমার জন্য আমার বন্ধু আনোয়ারের অফিসে চাকরির ব্যবস্থা করলাম। একটা কথা মনে রেখো, ‘ভাই বড় ধন রক্তের বাধন, তবে অনেক সময় নারী এসেও সেই বাধন ছিন্ন করতে পারেনা ‘। একদিকে মেসেজটা পড়ছিলাম অন্যদিকে অশ্রুজলে গলা পর্যন্ত ভিজে গিয়েছিলো! আর একমূহুর্ত দেরি করা চলবেনা। ভাইয়াকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি, আজই তাকে sorry বলতে হবে।

বাসার কলিংবেল চাপ দেয়ার পর রাহি এসে দরজা খুলে দিলো। আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠলো, ‘চাচ্চু এসেছেন, চাচ্চু এসেছেন’। আমি তাকে কোলে তুলে নিলাম। রাহির চিৎকার শোনে ভাবি এসে আমাকে দেখে মাথানিচু করে ফেললেন লজ্জায়। বললেন, ‘আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও ইফতি, আমি তুমার সাথে যেসব ব্যবহার করেছি, তার জন্য আমি অনুতপ্ত’। রুম থেকে ভাইয়া বের হলেন, তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলাম! খেয়াল করে দেখলাম, ভাইয়াও কাঁদছেন।

-কেঁদে কেঁদে বললাম, sorry ভাইয়া, আমার অনেক বড় ভুল হয়ে গেছে, আমায় তুমি ক্ষমা করে দাও!!!
সবার চোখই অশ্রুসজল! এতো মিলনের অশ্রু, আনন্দাশ্রু!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত