চলে গিয়েও রয়ে যাওয়ার গল্প

চলে গিয়েও রয়ে যাওয়ার গল্প

যেদিন সাবিহার বিয়ে হয়, সেদিন আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে সাবিহা কাঁদবে না। এই মেয়েটা একটা চাপা স্বভাবের মেয়ে। মন খারাপ হলেও কখনো বলবেনা, তার মন খারাপ। ভীষন কষ্টে বুকের ভেতর আকাশ জমে গ্যালেও, মুখে হাসি নিয়ে বলবে “আমি ঠিক আছি”! বয়সের তুলনায় সাবিহার ম্যাচিউরিটির মাত্রাটা একটু বেশি। চিন্তার পরিপক্কতার কারনেই আমি সাবিহার প্রতি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হয়েছি।

একটা সময় যখন আমরা সম্পর্কে ছিলাম, তখন ও ই যত্ন করে সম্পর্কটা টিকিয়ে রেখেছিলো। আমি বহুগামিতায় বিশ্বাস করি। লিবারেল থাকতে পছন্দ করি। কোন ধরনের সোস্যাল কিংবা পারসোনাল ব্যারিয়ার আমাকে আটকাতে পারেনা। একটা মানুষের ভেতর কি করে মানুষ সারাজীবন আটকে থাকে এই চিন্তাটাই আমাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে রাখতো। এই যে মানুষ বছরের পর বছর একসাথে একই ছাদের নিচে কাটিয়ে দেয়, তাদের কি বিরক্তি আসেনা কখনো? আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে আমাকে দিয়ে ওসব ঘর-সংসার হবেনা।

সংসার মানেই একজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া একটা জীবন। এইসব প্রতিবন্ধকতার মাঝে বেঁচে থাকার জীবন আমি অপছন্দ করি। আমি প্রচুর পরিমানে মদ খাই, সিগারেট খাই। কেউ একজন এসে আমাকে সেসব করতে নিষেধ করবে, এসব অনধিকার চর্চা করা আমার পছন্দ হবেনা। আমার সাথে কারো থাকতে হলে, আমাকে ফ্রীডম দিয়ে থাকতে হবে। আমি তো ৫ বছরের বাচ্চা না যে, আমাকে সবকিছু শিখিয়ে শিখিয়ে করাতে হবে। I Know, what I am doing. প্রথম যেদিন সাবিহার সাথে পরিচয় হয়, সেদিন তাকেও আমি আর দশটা মেয়ের মতোই দেখেছি। ওই বয়সে সুন্দরী মেয়ে দেখলেই পটানোর চেষ্টা করাটা যেন একটা অভ্যাস ছিল। সাবিহাকেও সেই একই দৃষ্টিকোন থেকে পটাতে চেয়েছিলাম।

পরিচয় পর্ব শেষ হলো। কমিউনিকেশন করার জন্য নাম্বার আদান-প্রদান সম্পন্ন হলো। এরপর দ্বিতীয় বারের মতো যখন আমাদের দেখা হলো, কথার এক ফাঁকে সাবিহার কাঁধের দিকে চোখ পরলো। বয়সের অপরিপক্কতায় যা হয়, তাই হলো। সাবিহার ব্রার ফিতা দেখেও আমার কামনা জাগে। বারবার আড়চোখে তাকাই। দ্বিতীয় দিনেই একটা মেয়েকে ভালোবেসে ফেলবো এরকম সিনেমাটিক ব্যপার ঘটেনি। তবে তৃতীয় দিনে সিনেমাটিক কিছু একটা যেন ঘটে গেলো। প্রথমবারের মতো সাবিহার হাত ধরে যেন অন্য কিছু একটা টের পেলাম। নাহ, এটা কোন কামনার অনুভূতি না। বুকের ভেতরে কেমন একটা হাহাকার শুরু হলো। তৃতীয় দিনে এই প্রথমবার আমি সাবিহাকে অন্য এক চোখ নিয়ে দেখলাম।

আমি টের পাচ্ছিলাম, আমি সাবিহার নিশ্পাপ নির্লিপ্ত চোখ দুটোকে ভালোবেসে ফেলেছি একটু আগেই। গতকালও যে মেয়েটার বের হয়ে যাওয়া ব্রার ফিতা দেখে আমার কামনা জাগ্রত হয়েছিলো, একটু আগেই সেই মেয়েটার প্রতি ভালোবাসা ফিল করতে শুরু করেছি। জীবন মাঝে মাঝে সিনেমার চেয়ে লেম হয়। কে কখন হুট করে বুলেটের মতো বুকের ভেতর ঢুকে যায়, তার কোন পরিকল্পনা থাকেনা। আমাদের সম্পর্কটা চলেছিলো প্রায় ৪ বছর। এরমধ্যেই আমি খুব বদলে গিয়েছিলাম। যেই আমি ভাবতাম, কেউ আমাকে শাসন করবে, তাতে আমি বিরক্ত হবো, সেই আমিই একদিন কারো শাসন করার অপেক্ষায় থাকতাম।

যার ব্রার ফিতা দেখে আমার কামনা জেগেছিলো, একদিন দায়িত্ববোধ থেকে তার অজান্তে বের হয়ে যাওয়ার ব্রার  ফিতা ঠিক করে দিতাম। আমি মদ, সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিলাম। কেউ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে না দিলে, খেতে ইচ্ছে হতো না। কারো কন্ঠস্বর না শুনলে ঘুমাতে যেতে পারতাম না। আমার সমস্ত জগতটাই যেন বদলে দিয়েছিলো,সাবিহা। আমার অস্তিত্ব, স্বপ্ন, প্রত্যাশা সবকিছুই যেন সাবিহা দখল করে নিয়েছিলো। একটা মানুষের সাথে কি করে একটা সমস্ত জীবন কাটিয়ে দেয় মানুষ, তার উত্তর আমি পেয়েছিলাম। আমি বুঝতে শিখে গিয়েছিলাম, ভালোবাসা আসলে অভ্যাস। মানুষটাকে ছাড়া আসলে থাকা যায়না। আমি দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়ে পরেছিলাম এই ভেবে যে, এই এক জীবনে কি সাবিহাকে ভালোবেসে সন্তুষ্টি মিলবে! শুধু একজীবন না, আমি আরো কয়েকজীবন বাঁচতে চেয়েছিলাম তার সাথে।

৪ বছর পর একদিন যেন সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেলো। সাবিহার বিয়ে হয়ে গেলো। নাহ, হুট করে বিয়ে হয়ে যায়নি। পারিবারিক মতামতেই তার বিয়ে হয়েছে। আমরা মিচুয়াল ব্রেকাপ করললাম। আমাদের দূরত্বের শেষ মুহূর্তের বিদায়ে আমি সাবিহার কপালে চুমু খেয়ে সরে এসেছিলাম। একজন ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া বেকার ছেলে তার প্রেমিকাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সাহস করলেও, আমার সেই সাহস হয়নি। আমি পারিনি। প্রেমিকাকে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে যেয়ে পিতার কষ্টের টাকায় তাকে চালাবো এটাও মানতে পারিনি। আমরা দূরে সরে এসেছিলাম। আমাদের অনেক অনেক দূরত্ব হলো, তবুও আমরা যেন কেউ কারো থেকে দূরে যেতে পারিনি।

৩ বছর পর আমাদের আবার যোগাযোগ হলো। আমি তখন একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমাদের প্রায়ই কথা হয়। খোঁজ খবর নেওয়া হয়। যত্ন নেওয়া হয়। শুধু মুখে এখন আর কেউ কাউকে ভালোবাসি বলা হয়না। আমাদের অবশ্য সেসব ভালোবাসি বলার প্রয়োজনও ছিল না। কারন, আমাদের দূরত্ব বেড়েছিলো ঠিকই, বিশ্বাসটা নষ্ট হয়নি। এখনো আমাদের যোগাযোগ আছে। সে তার স্বামীর সাথে দিব্যি বেঁচে আছে। আমিও প্রেমিকা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। একজন অন্যজনের বিপরীত মানুষটার খোঁজ নিচ্ছি। সংসার এবং সম্পর্কে একটু ঝামেলা হলে, দুজন মিলে সমাধান করছি।

সাবিহা সাথে থাকলেও বোধয় তাই করতাম। সংসার মানে আসলে কি? সংসার মানে আসলে সাপোর্ট। আমরা এখনো অন্যজনের সাপোর্ট হয়ে রয়ে গেছি। শুধু পাশের বালিশে শোয়া হয়না, শরীর ভোগ করা হয়না, সে আমার জন্য টেবিলে খাবার নিয়ে রাত জেগে অপেক্ষা করেনা, চোখে কাজল দিয়ে বারান্দার গ্রিল ধরে পথের দিকে তাকিয়ে থাকেনা, সে শুধু ভালবাসতে জানে। দূর থেকে প্রার্থনা করতে জানে। দিনশেষে আমাকে ভেবে কেউ ঘুমাতে যায়, এই বিশ্বাসটাই আমাকে আরেক জীবন বেঁচে থাকতে শেখায়! মানুষের শরীরটাকে পাওয়া না গেলেও হৃদয়টা খুব প্রয়োজন হয়। হৃদয়বিহীন শরীর দিয়ে আসলে তৃপ্তি মিলেনা।

আমাদের মাথার উপর কোন ছাদ ছিল না কখনোই। এখনো কোন ছাদ নেই, কোনদিন হবেও না। আমরা আকাশটাকেই ছাদ বানিয়ে বেঁচে থাকি! আমাদের বুকের ভেতর শূন্যতা এবং ভালোবাসা পাশাপাশি শুয়ে থাকে। আমরা একে অন্যকে ছুঁয়ে দেখতে পারিনা, আঙুল ধরে বসে থেকে মুগ্ধ হতে পারিনা, একজন অন্যজনের কন্ঠনালীতে চুমু খেয়ে ঘোরগ্রস্থ হতে পারিনা। তবুও আমাদের মুগ্ধতা ফুরায়না কখনো। আমাদের কাছে আসার গল্পের শেষ পাতায় এসে আবার নতুন করে গল্প শুরু হয়। আমাদের দূরে যাওয়ার কোন গল্প নেই।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত