এক অবাধ্য

এক অবাধ্য

আমার স্ত্রী বিয়ের পর থেকেই নানারকম অবাধ্যতা করতো। পরপুরুষ এর সাথে মিলেমিশে থাকবে এমন অবাধ্যতা না। সকালে ঘুম থেকে উঠতে সে দেরি করতো। বাসায় নাহয় ৯টা পর্যন্ত ঘুমাতো। শ্বশুড়বাসায় ৭টায় না উঠলে আমার মানসম্মান থাকে? বিয়ের পরপর ৭টায় উঠার পারমিশন দিয়েছিলাম। কিন্তু কয়েকদিন পরে ভোর ৫টায় উঠে তাকে দিয়ে রান্না করাতাম। আব্বা সকাল ৬.৩০ এ অফিসে যায়। তার জন্য রান্না করা লাগতো তার। শ্বশুড় এর প্রতি দায়িত্ব আছেনা? অবাধ্য বউ প্রতিদিন রাতে কমপ্লেইন করতো স্ট্রেস নিয়ে। আমি বলতাম ছোটবেলা থেকে আমার বাবামা আমাকে বড় করেছে। তার দেখাশোনা করতে না পারলে আল্লাহ কত বড় গুনাহ দিবে জানো?

আমার স্ত্রী তখন বলেছিল, “তিনি তোমার বাবা মা, দেখাশোনা তোমার করেছেন। তাই তাদের দেখভালের দায়িত্ব তোমার। আমি।দেখাশোনা না করলে আমার কোনো গুনাহ নাই। আর এভাবে তাদের জন্য আমাকে বাসায় পাঠানোর যে হুমকি দিচ্ছো এটা করাই গুনাহের কাজ। বাসায় কতগুলো হাদিসের বই আছে এগুলা পড়লেই তুমি বুঝতে পারবে কার দায়িত্ব, কর্তব্য কিরকম” এমন কথা শুনে তাকে বললাম, “জানো এমন অবাধ্যতায় তোমার গায়ে হাত তোলার অধিকার আমার আছে?”

স্ত্রী বলে, “আমি কোনো অবাধ্যতা করছিনা, ভুলগুলো তুলে ধরছি। ইসলামে স্ত্রী অবাধ্যতা করলে আগে মুখে মানা করতে হয়, তারপর তার সাথে শয্যা পরিত্যাগ করতে হয়, তারপর একেবারেই সে না শুধরালে তালাকে পূর্বের ব্যবস্থা হিসেবে প্রহারের কথা বলা হয়েছে। তাও এমন আস্তে করে যাতে গায়ে দাগ না বসে। এখন তুমি আমাকে মারবা আর রাতে এসে লুতুপুতু কথা শুরু করবা এমন কথা বলা নাই” স্ত্রীর সাথে তর্ক করতে গেলেই মাথা গরম হয়ে যায়। নিশ্চয় বাসা থেকে এমন আস্কারা পায়। তাই বাসায় যাওয়া একদম নিষেধ করে দিলাম। শ্বাশুরি যেদিন অসুস্থ ছিল সেদিনও একবেলার বেশি যেতে দেইনি। আমার মাও ওইদিন অসুস্থ ছিল। আমার মা ‘আমাকে’ বড় করেছেন অনেক কষ্ট করে। আমার মায়ের উপর এজন্য “তার” অনেক দায়িত্ব!

বোনের প্রতিও তার ব্যবহার বলার মত না। আমার বোন তাকে বলে, “ভাবি এত ক্ষ্যাত হয়ে থাকো কেন? একটু স্মার্ট হও” সে তার কথায় পাত্তাই দেয়না। বোনের স্বামী, আমার দুলাভাই এসে কত কথা জমানোর চেষ্টা করে। সে উত্তরই দেয়না ঠিকমত। আমরা আধুনিক যুগের মানুষ এমন সেকেলে আচরণ করলে হবে? আমার কলিগেরা ফাইজলামি করে বলে, “আপনার স্ত্রী হেসে কথাও বলেনা কোনোদিন। কেমন করে সংসার করেন?” মাথা কাটা যায় আমার।

একবার বাথরুম থেকে বের হওয়ার সময় সে আমার বড় ভাই এবং দুলাভাই এর সামনে মাথায় কাপড় নামানো অবস্থায় চলে গিয়েছিল বলে কি কান্নাকাটিই না করলো আমার সামনে। আমাদের বাসায় আবার মাত্র দুইটা বাথরুম। সে বলে যে প্রাইভেসি মেইনটেইন করার জন্য থাকে যাতে আলাদা স্থান দেওয়া হয় যেখানে তার আলাদা ঘর, রান্নাঘর আর বাথরুম আছে। সে বাকি কাজগুলো করে দিবে কারো সমস্যা হবেনা। কিন্তু প্রতিদিন আমার দুলাভাই আর আমার ভাই এর গায়ে গা লেগে তার সাথে কথা বলা তার পছন্দ না।

এমন কথা বলার পার তাকে আর বাসায় রাখা চলেনা। চিৎকার করে বললাম, “মা আর ছেলেকে তুমি আলাদা করতে চাও তোমার লজ্জ্বা নাই? বউ গেলে বউ পাবো মা গেলে মা পাবোনা। বের হও তুমি বাসা থেকে.” স্ত্রী তখন বলেছিল আমাকে, “বাহ! কি ডায়ালগ দিচ্ছো, বউ গেলে তুমি নিজের বউ নাহয় পেলা কিন্তু তোমার সন্তানের মা সে কি হতে পারবে? আমি তো তোমাকে বাসা আলাদা করতে বলিনি। আমার জন্য খালি প্রাইভেসি চেয়েছি। স্বামী হিসেবে তোমার কি কোনো দায়িত্ব নাই? যখন তুমি তোমার বাবাকে সম্পত্তির জন্য চাপ দাও, বারবার বল বোনের সম্পত্তির কিছু অংশ তোমার নামে করতে, মায়ের সাথে রাগারাগি কর তখন সন্তানের দায়িত্ব মনে পড়েনা? খালি আমার উপরে কাজ চাপানোর সময় তোমার সন্তানের দায়িত্বের কথা মনে পড়ে? এজন্যেই বলি কুরআন হাদিস পড়ো আর নিজের জ্ঞান বিকশিত কর”.

বউ এমন আচরণ করলে কি করা উচিত তার শিক্ষা আমাকে সমাজ আর ফেসবুক দিয়েছে। এর জন্য আমার হাদিস পড়া লাগবেনা। পাঠিয়ে দিলাম ওইদিনই তাকে বাপের বাড়ি। মনে করেছিলাম যে কয়েকদিন পর হাতপা ধরে ফিরে আসবে। কিন্তু তার এতবড় সাহস আমার কাছে তালাকই চেয়ে বসে।

সে বলে, “তোমার সাথে সংসার করতে গেলে আমার ইহকাল পরকাল উভয়ই যাবে। তার দুইটা পর্যন্ত জেগে থেকে কাজ করা লাগে তোমার ছোটবোনকে নাস্তা দেওয়ার জন্য। তারও কয়েকদিন পরে বিয়ে হবে নিজের দুয়েকটা কাজ নিজে করতে পারেনা? আমাকে তো বিয়ের পরদিনই রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলা আর বাসার কাজের মেয়েকে ছুটি দিয়ে দিয়েছিলা। ফজরের নামায মিস হয়ে যায় এজন্য মাঝেমাঝে। যোহরের নামাযও তোমাদের খাওয়াদাওয়া করিয়ে তারপর পড়া হয়। ৩টা বেজে যায় মাঝেমাঝে। আওয়াল ওয়াক্তে কখনো নামায পড়া হয়না।

কতবার বলেছি তোমার দুলাভাই এর সমস্যা আছে। তার থেকেও আমাকে রক্ষা করতে পারনা তুমি। আমাকে তো বাসায় যেতে দাওনা তারা প্রায়ই এ বাসায় কি করে? আর তোমার দুলাভাই এর আমার সাথে এর ফাইজলামি কিসের?
তোমাকেও জীবনে সন্তুষ্ট করতে পারবনা। তুমি তোমার পরিবারকে খুব ভালোবাসো। আফসোস, আমাকে নিজের পরিবার হিসেবে না দেখে নিজের সম্পত্তি হিসেবে দেখলে। হয়তো আমার পরিবর্তে অন্য মেয়ে তোমাকে সুখী করতে পারবে। ভবিষ্যতে আমাদের সন্তান হওয়ার পরে যদি আমাদের বিচ্ছেদ হয় তাহলে তার উপর খুব খারাপ প্রভাব পড়বে। তাই এখনই অনুগ্রহ করে আমাকে মুক্তি দাও।” এ কথার পর তার সাথে সম্পর্ক রাখার প্রশ্নই উঠেনা। তালাক দিয়ে চলে এসেছি। আর ঘুরেও তাকাইনি। বিয়েশাদি করে সুখে আছি। বাবামার কাছ থেকে নিজের ভাগের সম্পত্তি নিয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনেছি। কি সুন্দর সংসার!!!

আজকে এসেছি বিয়ের দাওয়াতে। এখানে এসে তাকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। কি খারাপ! তালাক হওয়া মাত্র ৫বছর হয়েছে এরই মধ্যে তার কোলে দুইটা সন্তান। আমি পুরুষ মানুষ আমি নাহয় বিয়ে করলাম, সে কেন করবে মেয়ে হয়ে বিয়ে? কি হেসে হেসে কথা বলছে। আমাকে ছেড়ে যেয়ে এত সুখে থাকে কেমন করে সে? তার স্বামীর সাথে কথা বলতে গেলাম। দেখি বউ এর নামে দুর্নাম করি। তার আসল চেহারা দেখায়। কিন্তু আমার বউ এর দ্বিতীয় বর তার থেকেও বেয়াদব। আমি আমার মা বাবাকে দেখাশোনার কথা বলতেই দেখি সেও আমার বউ এর মত ডায়ালগ দেয় যে এটা নাকি স্ত্রীর দায়িত্ব না।

লোকটা এবার আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, “আপনি কোথায় থাকেন?” আমি বুক ফুলিয়ে বললাম, “গুলশানে।” লোকটি বলল, “বাহ! এই যুগে বাবামাকে নিয়ে কয়জন থাকে?” আমি আমতা আমতা করে বললাম, “ইয়ে মানে,বাবা মা আগের বাড়িতেই থাকে। তারা আসতে চায়নি তাই আমি আর জোর করিনি।” লোকটি অবাক হয়ে বলে, “আলাদা বাসায় থাকেন!! অথচ এই আলাদা বাসা আর প্রাইভেসি চাওয়ার জন্যেই না আপনি আপনার আগের স্ত্রী, মানে আমার বর্তমান স্ত্রীকে তালাক দিয়েছিলেন?. এখন সন্তানের দায়িত্ব পালন করবেননা?”

বেয়াদব বেয়াদব মিলে গেছে। এদের সাথে আর কথা বলা সাজেনা। চলে আসলাম। এছাড়াও আমার বর্তমান বউকে দেখছিনা। নিশ্চয় দুলাভাই এর সাথে গল্প করছে। ইদানিং তাদের বেশি মেলামেশা করতে দেখছি। আমি আধুনিক মানুষ তাই কিছু বলতে পারিনা। তাও মনে মনে রাগ হয় খুব। আগের স্ত্রীর কথা মনে হয় বারবার।

এমন সময় দেখি প্রাক্তন ডাক দিচ্ছে। আমি ফিরে তাকাতেই সে বলে, “আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। ওইদিন আপনি আমাকে না ছেড়ে গেলে আমার স্বামীর মত ভাল মানুষ আমার ভাগ্যে জুটতনা। আল্লাহ যা করেন আমাদের ভালোর জন্যই করেন। আশা করি আপনিও সুখে আছেন। আমি কথা বাড়ালামনা। আমার বর্তমান স্ত্রীকে খুজে পেয়েছি। আমার কলিগের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। খুব রাগ হচ্ছে কিন্তু কিছু বলতে পারবনা। আধুনিক ছেলে তো আমি!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত