নিলু আপু

নিলু আপু

যেদিন রাস্তার পাশের বখাটে ছেলে গুলো নিলু আপুকে টিজ করেছিল।সেদিন আমার খুব রাগ হয়েছিল।রাগে ওদের গোশত ছিড়ে খাই,এমন অবস্হা।সেদিন আমি আপুকে বলেছিলাম,’আপু,তুই চিন্তা করিস না।দেখে নিস,একদিন আমিও বড় হবো।সেদিন ওদেরকে এমন মাইর মারবো না,দেখবি?’

সেদিন আপু আমার কথা শুনে ম্লান হেসেছিল।আর আমার ফর্সা গালদুটো টেনে বলেছিল, হুম,জানি তো।আমার লক্ষি ছোট্ট ভাইটা একদিন বড় হবে।সেদিন আমার এই ভাইটাকে দেখে সব বখাটেরা পালাবে’ সেদিন আপুর ওই একটি কথাই আমাকে সুপারম্যান বানিয়ে দিয়েছিলো।আমি আমার নিজস্ব আমিটাকে আপুর কথা মতোই তৈরী করেছিলাম। ক্লাসে আমার আগে কেউ পড়া দিতো পাড়তো না।যদি কোনদিন কেউ দিত তাহলে,তার গায়ে কাঁমড় দিতাব কিংবা চুল টেনে ধরতাম এমন রেকর্ডও অজানা নয়।আমার এই কান্ড দেখে বাবা-মা বিরক্ত হলেও,আপু তখন আমার এই পাগলামি দেখে একগাল হেসে বলত, এভাবেই সারাজীবন পড়ালেখা করে যাবি।মানুষের মতো মানুষ হবি।আমাদের পরিবারে নাম উজ্জ্বল করবি’ সেদিন আপু সেই কথাটি আমার বুকে মালার মতো গেথে গিয়েছিল।যার ফলে জীবনে কোনদিন আর এক ছাড়া দুই রোল হয় নি।

যেদিন জিএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দেয় সেদিন বাবা-মা সহ পরিবারের সবাই খুব চিন্তায় ছিল।কিন্তু আপুর মুখে চিন্তার কোন আভা ছিল না।সে সবাইকে বলেছিল, আমার ভাইয়ের প্রতি আমার অঘাত বিশ্বাস আছে।সে কখনো খারাপ রেজাল্ট করতেই পারে না’ সেদিন আপুর এই কথাটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মধুময় বাক্য হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম।খাতা,ডায়েরি সব জায়গা এমনকি বেঞ্চেরর মধ্যেও লিখে রেখেছিলাম। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন যখন আপু জানতে পারল,আমি গোল্ডেন A+ পেয়েছি তখন আপুর সে কি কান্না।সেটা ছিল সুখের কান্না।আপু সেদিন এতটাই খুশি হয়েছিল যে পুরো পাড়ার সবাইকে মিস্টি খাইয়ে দিয়েছিল।আর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলছিল, ‘জীবনে কখনো কোন জিনিসের দরকার হলে তুই আমাকে বলবি।যেহেতু,তুই আমার কোন ইচ্ছে অপুর্ন রাখিস নিই।তাই তোর চাওয়াও আমি অপুর্ন রাখব না।জীবন দিয়ে হলেও আমি তোর সেই ইচ্ছেকে আমি পুরন করবো’ সেদিন আপুর কথা শুনে নিজেকে পৃথিবীর সেরা ভাগ্যেবান ভেবেছিলাম।সত্যিই আমার বোনের মতো কারো বোন হয় না।

যেদিন ঢাকা মেডিকেলেরর ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরুল,সেদিনই আমিই আপুকে প্রথম কাদতে দেখেছিলাম।সে নামাজে বসে ডুকরে ডুকরে কেদে বলেছিল, হে আল্লাহ।আমার ভাইটা যেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে চাঞ্জ পায়’ সেদিন হয়তো আল্লাহ নিলু আপুর কথা শুনে ছিল।যার দরুন আমি টপ টেনে থাকতে পেরেছি।সেদিন আমার চেয়ে খুশি মনে হয় আমার বোনই হয়েছিল।এলাকার সবার বাড়িতে মিস্টির হাড়ি পাঠানোর জন্য কি খাটনিই না করতে হলো মতি কাকাকে।৭০ কেজি মিস্টি বানাতে হয়েছিল তাকে।আর সেই মিস্টি নিলু আপু সবার বাড়িতে বিলি করে বলেছিল, ‘আমার ভাই,ঢাকা মেডিকেলে টপ টেনে থেকে চাঞ্জ পেয়েছে।সেটা আপনাদের জানাব না? জানেন,আমার এই ভাইটা আমার জন্য কত্ত ত্যাগ করেছে’ সেদিন আপুর কথা শুনে আমি মনে মনে খুব হেসেছি।কারন আমি জীবনে আপুর জন্য একটা মশাও মারি নি। যেদিন আমার ফাইনাল পরীক্ষার ফরম-ফিলাপ করার লাস্ট ডেট ছিলো, সেদিন আপু হুট করে হোস্টেলে এসে আমার হাতে টাকাগুলো দিয়ে বলল, তোর ফরম ফিলাপের টাকা লাগবে আমাকে বলিস নি কেন? এক চর মেরে তোর সব দাত ফেলে দিব।খুব বড় হয়ে গেছিস তাই না?’

সেদিন আপুর এই কথা শুনে আমি খুব কেদেছিলাম।সত্যি বলতে কি,আমার পরিবারের আর্থিক অবস্হা ঠিক ততটা ছিল না যে ৩ লক্ষ টাকা দিবে।কিন্তু আপু তিন লক্ষ টাকা কোথায় পেয়েছে,অনেক জিঙ্গেস করেও সেদিন সেটা জানতে পারি নি।আপুর এক কথা, কোথায় পেয়েছি,সেটা তোর না জানলেও চলবে’ মেডিকেল পরীক্ষার ঠিক দশদিন আগে যখন জানতে পারলাম আপুর সময় শেষ।আপু একজন ব্লাড ক্যান্সারের পেশেন্ট।সেদিন যে ফরম-ফিলাপের টাকা দিয়েছিল,সেটা ছিল তার অপারেশনের টাকা।সেদিন আমি কতটা কস্ট পেয়েছিলাম বলে বোঝাতে পারব না।ছুটে গিয়েছিলাম আপুর কাছে।হাতে স্যালাইন,মুখে মাস্ক পড়া রোগীকে দেখে কেউ বলবে না,এটা আমার নিলু আপু।আমার বিভ্রান্ত চাহনি দেখে আপু বলেছিল, চিন্তা করিস না পাগল ছেলে।আমি তোকে ছেড়ে কোথ্থাও যাবো না।আমি সব সময় ছায়ার মতোন তোর পাশে থাকব।’

এটুকু বলেই সেদিন আপু থেমে গেয়েছিল।আর কোন কথা বলে নি।অনেক চিৎকার করেও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারি নি,না ফেরার দেশ থেকে।সেদিন আপুর এই কথাটাকে সঙী করে মনের মধ্যে তিব্র জিদ নিয়ে পড়ালিখা করেছিলাম।সারা বাংলাদেশে প্রথম হয়েছিলাম।কিন্তু নিলু আপু না থাকায় সেই আনন্দের ‘ক’ ও উপলব্ধি করতে পারি নি আমি। আজ আমি বাংলাদেশের সেরা ডাক্তারের একজন।১০ টারও বেশি ফ্রি চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরি করেছি।এখন আমার মনের মধ্যে শুধু একটাই চিন্তা, ‘আমার মতো কাউকে যেন তার নিলু আপুকে বিনা চিকিৎসায় হারাতে না হয়?’

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত