পেঁয়াজময় জীবন

পেঁয়াজময় জীবন

মাশাআল্লাহ মেয়ে আমাদের পছন্দ হয়েছে এবং আমাদের কোনো দাবিদাওয়া নেই। তবে আপনারা চাইলে গিফট হিসেবে আপনাদের মেয়েকে কয়েক কেজি পেঁয়াজ দিতে পারেন।”

পাত্রের মায়ের হাসি হাসি মুখে এভাবে ইনডিরেক্টলি একটা-দু’টো নয় পুরো কয়েক কেজি পেঁয়াজ যৌতুক চাওয়ায় আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রত্যেকের মাথায় বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল দিয়ে গোটা কয়েক বাজ পড়ার কথা,কিন্তু পড়ল না!
কারণ আমার বাবা একজন পেঁয়াজ ব্যবসায়ী।

শহরের বিশিষ্ট শিল্পপতি মিস্টার তারছেঁড়া খান তার একমাত্র ছেলে জেনারেটর খানের জন্য আমাকে বউ করে নিতে চান বলে কথা!

তিনশো টাকার এনার্জি লাইট একশো টাকায় প্রচারের জন্য বিক্রি করা কোম্পানিটা তাদেরই।
এটা তাদের পূর্বপুরুষদের শুরু করা বিজনেস।
এখন বংশগত বিজনেসে পরিণত হয়েছে।

এরকম পাত্র তো আর মেয়ের জন্য রোজ রোজ পাওয়া যায়না।তাছাড়া আমি আর জেনারেটর একে অপরকে অনেকটা পছন্দও করি। এটা ভেবেই আমার বাবা আমার সুখের জন্য এ বিয়েতে রাজি হয়েছেন। আমার সুখের জন্য আমার বাবা যেকোনো সাইজ এবং পরিমাণের পেঁয়াজ খরচা করতে রাজি আছেন।
তাই পাত্রপক্ষের কথামতো সামনের শুক্রবারই জেনারেটর খানের সাথে আমার বিয়ে পাকা হলো।

আজ বৃহস্পতিবার,আমার “গায়ে পেঁয়াজ” এর অনুষ্ঠান।কথাটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগল তাইনা? আসলে “গায়ে হলুদ”কে “গায়ে পেঁয়াজ” বললে অদ্ভুত তো শোনাবেই।

কিন্তু এটাই বাস্তব, আমিই হয়তো বিশ্বের প্রথম বাঙালি মেয়ে যার কিনা গায়ে হলুদ এর বদলে “গায়ে পেঁয়াজ” হবে।
হয়তো আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো আমারও গায়ে হলুদই হতো,কিন্তু পেঁয়াজের এই সুদিনে একমাত্র মেয়ের বিয়েতে “গায়ে হলুদ” এর পরিবর্তে “গায়ে পেঁয়াজ” এর মতো এক্সপেন্সিভ এবং ইম্পোর্টেড রিচুয়াল পালন করার সিদ্ধান্ত নিতে আমার বাবার দু’বার ভাবার দরকার পড়েনি।
পরবর্তীতে হয়তো অন্যান্য পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরাও এটাকে ট্রেন্ড হিসেবে ফলো করতে পারেন।

শুভদিনে দুঃখের কথা মনে করতে নেই তবুও মনে পড়লো যখন পেঁয়াজের দাম কম ছিলো তখন আমার বাবার এত বেশি কদর ছিলোনা। আত্মীয়ের মধ্যে কেউ কেউও কটাক্ষ করে বলতো,
“একটা ছেলে নেই, মেয়ের রূপ ধুয়ে আর জল খাওয়া যাবেনা।এই পেঁয়াজের ব্যবসায় করে কত ভালো জায়গায় আর মেয়ের বিয়ে দিতে পারবেন?
এই মেয়ে পার করতে দুঃখ আছে।”
তাদের কটাক্ষ শুনে সারাদিন পেঁয়াজ বাটতে বাটতে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলাম সেদিন।
তাই তাদের সবাইকে বিশেষ নিমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে আজকের অনুষ্ঠানে।
বাবা ঠিক করেছেন আজকের অনুষ্ঠান শেষে তাদের মাঝে অর্ধেক করে পেঁয়াজ বিলি করে তাদের যোগ্য জবাব দেবেন।

দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসেছে আমার গায়ে পেঁয়াজের অনুষ্ঠান দেখতে। এই অনুষ্ঠান এর আগে কেউ কখনওই দেখেনি।

আমার বেশ এক্সাইটেড লাগছে। আমাকে পেঁয়াজ কালারের পাড়ওয়ালা একটা হলুদ শাড়ি আর পেঁয়াজের গহনা পরানো হয়েছে।
পেঁয়াজ কালারের লিপস্টিকও পরেছি।
আমি যে জায়গাটাতে বসেছি তাজা তাজা পেঁয়াজ দিয়ে সাজানো হয়েছে।
আমার সামনে রাখা সেন্টার টেবিলে সাজানো রয়েছে ইউটিউব থেকে অনুপ্রাণিত থিমে পেঁয়াজ দিয়ে বানানো বিভিন্ন আইটেম এই যেমন, পেঁয়াজের কার্ভিং করা বিভিন্ন ফুল,আঙুরের ময়ূরের বদলে পেঁয়াজের ময়ূর,গায়ে হলুদের কুলার উপরে পান বিবির বদলে পেঁয়াজ বিবি- ইত্যাদি ইত্যাদি।

এলাহী আয়োজনে সবার চোখ তাক লেগে গেছে। কটাক্ষকারীদের মধ্যে কেউ কেউ এ আয়োজন আর পাত্রপক্ষের পরিচয় শুনে হিংসায় জ্বলে পুড়ে কাউয়া হয়ে অর্ধেক পেঁয়াজ লাভের সুবর্ণ সুযোগ ভুলে অনুষ্ঠান ত্যাগ করলো কেউবা হাত কামড়ে,দাঁতে দাঁত চেপে সব সহ্য করতে লাগল অনুষ্ঠান শেষে পেঁয়াজ লাভের আশায়।

আজ শুক্রবার,জেনারেটর খানের সাথে আমার বিয়ে।গতকাল আমার “গায়ে পেঁয়াজ” এর অনুষ্ঠান ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে পেঁয়াজ নয় হলুদ মেখেই আমাকে গোসল করানো হয়েছে৷ পেঁয়াজে বিশ্রি উগ্র র্গন্ধ কিনা!

আমাকে কনে সাজে সাজানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
আজকে আর পেঁয়াজ কালারের নয়,বরং গোটা পেঁয়াজের পাড় বিশিষ্ট টুক টুকে বেনারসি শাড়ি পরেছি আমি।সেই সাথে পেঁয়াজের টায়রা টিকলি,কানের ঝুমকো,কন্ঠহার,সীতাহার,হাতের চুড়,রাখি,কোমরের বিছাও পরেছি। আঙুলের আংটি আর নাকের নথটি কেবল পেঁয়াজকলির তৈরি।আঙুলে আর নাকে তো আর গোটা পেঁয়াজ পরা যায়না!
নিজেকে বধূ সাজে আয়নায় দেখে লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম একবার। জলপরী,লাল পরী,নীল পরী ছাড়া নতুন একটা পরীর নাম মনে পড়ল “পেঁয়াজ পরী”।

অবশেষে জেনারেটর খানের সাথে বিয়েটা হয়ে গেলো আমার।
বিয়ের মেনুতে ছিলো পেঁয়াজের রোস্ট,পেঁয়াজের পোলাও,পেঁয়াজের শাহী জর্দা,পেঁয়াজের দোপিয়াজা,পেঁয়াজের কালাভুনা, পেঁয়াজ মুলার কষা।

ডেজার্টে আছে পেঁয়াজের ইটিস পিটিস, পেঁয়াজের ফালুদা,গোটা পেঁয়াজের পেঁয়াজ জাম মিষ্টি ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা কোনো কমতি রয়নি পেঁয়াজের।

সবশেষে এবার আমার শশুর বাড়ি যাওয়ার পালা।
আমি কেঁদে কেঁদে অস্থির হচ্ছি,বাবা-মা ও খুব কাঁদছেন। আমার বরের হাতে আমার হাতটা তুলে দিয়ে মা আঁচলে মুখ ঢেকে হু হু করে কেঁদে বললেন, ” বাবা আমার মেয়েটাকে দেখে রেখো। জীবনে পেঁয়াজ ছাড়া তরকারি খায়নি,একটু মানিয়ে-গুছিয়ে নিও বাবা।” বলেই মা ভেতরে চলে গেলেন।

বিয়ে মিটিয়েই মিস্টার অ্যান্ড মিসেস তারছেঁড়া খান এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছেন। লন্ডনে তাদের এনার্জি লাইটের প্রচার বিষয়ক জরুরি মিটিং আছে।কবে ফিরবেন নিশ্চয়তা নেই।

অগত্যা আমি জেনারেটরের সাথেই শশুর বাড়ি এলাম এবং তারপরই জীবনের সেরা ধাক্কাটা খেলাম আমি!
জেনারটর ভালো মানুষ নয়।সে আমাকে ভালোবাসেনা। সে আমাকে বিয়ে করেছে শুধুমাত্র আমার বাবার পেঁয়াজের ব্যবসায় হাতিয়ে নেওয়ার জন্য। আমাদের পেঁয়াজের জমি নিজের নামে লিখিয়ে নেওয়ার জন্য।

“নাআআআআ এ হতে পারেনা” বলে বিকট চিৎকার করে আমি নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করলাম।তারপর মাথা ঠান্ডা করে ভাবলাম বিয়ে যখন হয়েই গেছে আমাকে এখানেই মানিয়ে নিতে হবে,স্বামীর মন জয় করতে হবে।
সে রোজ পেঁয়াজের খোসা ভেজানো পানি খেয়ে নেশা করে বাড়ি এসে আমাকে নাচতে বলে।

“কারো পেঁয়াজ বড়,কারো পেঁয়াজ ছোট
কারও লম্বা পেঁয়াজ কারো একটু খাটো
আমি বলি সবাই সমাআআআন
আমি বাংলাদেশের দামি পেঁয়াজ, আমি বাংলাদেশের দামি পেঁয়াজ। ”

তার কথামত এই গানে নেচে আমি তার মন পাওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু না! অতিরিক্ত পেঁয়াজের লোভ ওকে অন্ধ করে দিয়েছে। রোজ গাদা গাদা পেঁয়াজ দিয়ে তরকারি তার চাই-ই চাই।
ফলে আমার বাপের বাড়ি দিয়ে যৌতুক দেওয়া পেঁয়াজগুলো অল্পদিনেই ফুরিয়ে গেলো। আর এরপরই শুরু হলো আমার উপর ওর নির্যাতন।

সে রোজ আমাকে বাপের বাড়ি থেকে পেঁয়াজ আনার জন্য চাপ দিতে লাগলো।
এদিকে আমার বিয়েতে লাখ লাখ পেঁয়াজ খরচা করায় বাবারও দিনকাল ভালো যাচ্ছেনা। এমন অবস্থায় কিভাবে এই পোড়া কপালের কথা তাদের বলি?

তার চেয়ে ভালো জেনারেটরের সব অত্যাচার আমি মুখ বুজে সহ্য করতে লাগলাম।
আমার সহনশীলতায় অতিষ্ঠ হয়ে জেনারেটর আমার বাবা-মাকে তুলে আনলো।
আমাদের সবাইকে ওদের পুরানো খামার বাড়ির খাম্বার সাথে দাঁড় করিয়ে সবার পা বেঁধে আমাদের পেঁয়াজ ক্ষেতের জমির দলিল নিয়ে বাবাকে সই করার জন্য জোর করতে লাগলো।

“নাআআআ বাবা নাআআআ তুমি কিছুতেই ঐ দলিলে সই করবেনা বাবা” বলে চিৎকার করে লুটিয়ে পড়লাম আমি।
জেনারেটর দৌড়ে এসে আমার মাথায় পিস্তল চেপে ধরলো।ভয় পেয়ে বাবা-মা দুজনেই চিৎকার করে উঠলেন।
“মা রে তোর জন্য আমি সব করতে পারি রে মা সব করতে পারি।”বলে দলিলে সই করতে রাজি হলেন বাবা। এই ঘটনায় জেনারেটর মুখ বাঁকিয়ে এমন ভাবে হাসছে যেনো প্যারালাইসিস রোগে ওর মুখ অমন হয়ে গেছে।
ছিঃ এমনভাবে কেউ হাসে নাকি!

ওর অমনোযোগীতার সুযোগ নিয়ে ওর হাত থেকে পিস্তলটা কেড়ে নিয়ে আমি ওর ভুঁড়ি বরাবর পিস্তল তাক করে বললাম, “তোর খেল খতম পেঁয়াজ লোভি অমানুষ জেনারেটইরর‍্যা। গুলি করে তোর ভুঁড়ি আমি গেলে দেবো দাঁড়া।” বলেই আমি সিরিয়াসলি ওকে গুলি করতে উদ্যত হলাম।

“ঢিঁয়া ঢিঁয়া” করে গুলি করে এরই মধ্যে কোত্থেকে যেনো পুলিশ উদয় হলো। এনাদের কে খবর দিলো আর এনারা কীভাবে চিনে চিনে এখানে আসলেন কে জানে!

যা-ই হোক পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে গেলো। কোর্ট ওকে যাবজ্জীবন সশ্রম পেঁয়াজদন্ডে দন্ডিত করেছে।
তারই মাঝে আমি ওকে ডিভোর্সও দিয়ে দিয়েছি৷ এবার বোঝ মজা,টান সারাজীবন পেঁয়াজের ঘানি!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত