নায়িকার প্রবেশ ও প্রস্থান

নায়িকার প্রবেশ ও প্রস্থান

একটা মানুষ খুঁজতে বেরিয়েছে সুলতানা রাজিয়া। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে এই মানুষ খুঁজে বের করা কত কঠিন, সেটা জেনেই তো সৈয়দপুর থেকে রাতের ট্রেনে চেপেছিল। কিন্তু পথ আসলে কতটা কঠিন, পথে নেমে না পড়লে তা বোঝে কজনে? এখন ভাপ ওঠা চৈত্রের ছায়াহীন দুপুরে দাঁড়িয়ে মনে হলো, কী ভরসায় এতটা পথ এল সে। যার খোঁজে বিনিদ্র রাতের ক্লান্তি, অচেনা শহর, অচেনা পথঘাট, মানুষের ভিড় ঠেলে গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি এল, তার দেখা পেলেই কী জীবনটা সরল পথে নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের ঠিকানায় পৌঁছে যাবে?

বেশ খানিকটা সেজেগুজে ঢাকাগামী রাতের ট্রেনে চেপেছিল। সাজগোজ মানে, মুখে রুজ পাউডার, চোখে গভীর রেখার কাজল আর ঠোঁটে একটু চড়া রঙের ওষ্ঠরঞ্জনী। টেম্পল পাড়ের একটি কাতান শাড়িও পরেছিল। এটুকু সাজপোশাক না হলে রাখী আক্তারকে কি আর সুলতানা রাজিয়া নামে মানায়!

রাখী আক্তারই ছিল আসল নাম। ‘নিউ বিউটি অপেরা’ যেবার ‘সুলতানা রাজিয়া’ পালাটি নামাল সেবারই, তা-ও বোধ হয় বছর আট-দশ হয়ে গেল, তার অভিনয় দেখে পালাকার ধীরেন ঘোষ স্বয়ং তার নামটা পাল্টে দিয়ে সুলতানা রাজিয়া রেখেছিল। প্রথম রজনীর অভিনয় শেষে পালাকার আবেগ-কাঁপা গলায় প্রায় যাত্রার সংলাপ উচ্চারণের ঢঙে বলেছিল, ‘আমি যখন এই পালা লিখছি, তখন ভাবতেও পারি নাই, আমার ভাবনায় থাকা মেয়েটি এমন জীবন্ত হয়ে স্টেজে এসে দাঁড়াবে। রাখী নামটা তোকে মানায় না রাখী, আজ থেকে তোর নাম দিলাম সুলতানা রাজিয়া।’

একজন কেউ বললেই নিজের নামটা পাল্টে ফেলতে হবে, এমন দাসখত তো দেয়নি সে। কিন্তু ধীরেন ঘোষের গলায় আবেগের পাশাপাশি চোখেও কী যেন ছিল। সেই চোখে তো তার দিকে তাকায়নি কখনো কেউ, যাত্রাদলের মালিক-অধিকারী থেকে শুরু করে পালার বুকিং দিতে আসা গ্রাম্য চেয়ারম্যান পর্যন্ত সবার চোখ শুধু শরীরের দিকে, সবাই শুধু শরীর হাতড়াতে চেয়েছে। ধীরেন ঘোষের চোখে অন্য কিছু ছিল, তাই তার আবেগটাকে বিশ্বাস হয়েছিল। তা তার দিকে ছাড়া রাখী নামটা খুব যে আদরে-যত্নে–ভালোবেসে কেউ রেখেছিল, তা-ও তো নয়। পরপর তিনটা মেয়ে হলে গ্রামের দরিদ্র পরিবারে কেউ পাখি তো কেউ রাখী, একটা কিছু হলেই হয়। সুলতানা রাজিয়া নামটা তাই মনে ধরেছিল। ‘বিউটি অপেরা’র লোকজন আড়ালে যে যা–ই বলুক, মুখ টিপে হাসাহাসি করুক, তখন তার তো এক-আধটু নাম-দামও হয়েছে, নিজের নামটা সে পাল্টে ফেলতে কারও হাসি-কাশির তোয়াক্কা করেনি। দলের লোকেরা অবশ্য অকারণে হাসেনি। হ্যালোজেন লাইট বা হ্যাজাক বাতির উজ্জ্বল আলোর নিচে সিন্থেটিক কাপড়ের ঝলমলে পোশাক পরে, মুখে চড়া মেকআপ দিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যতই উদ্ধত-গর্বিত ভঙ্গিতে সংলাপ উচ্চারণ করুক, যাত্রামঞ্চের নায়িকার চেহারায় আদতে আর দশটি গ্রাম্য যুবতীর চেয়ে বাড়তি কিছু নেই। শ্যামল দেহবর্ণ, গোলগাল মুখ, নাকটা একটু চ্যাপ্টা; কম বয়সে গুটি বসন্ত হয়েছিল, তার দু–একটি চিহ্ন এখনো বাড়তি মেকআপ দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। শুধু চোখ দুটোই যা একটু গভীর, ধীরেনদা নাটকীয় গলায় বলেন, ‘বাঙ্​ময়’।

পালাকারের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল নায়িকা। মনে মনেই, মুখ ফুটে বলার সাহস ছিল না। কিন্তু ধীরেন ঘোষের তো সাহসের অভাব নেই। একদিন পালা শেষে পর্দাঘেরা ছোট্ট সাজঘরে ঢুকে বলে ফেলেছিল, ‘আমার কী হবে রে সুলতানা, তোকে তো ভালোবেসে ফেলেছি…।’

আঁতকে উঠেছিল, ‘কিন্তু দাদা, তুমি তো বিধর্মী।’

হো হো করে হেসে উঠে দাদা বলল, ‘শিল্পীর আবার জাত কি রে সুলতানা, আমরা তো শিল্পধর্ম।’

বড় মানুষ, বড় কথা—এসব কথা সুলতানা রাজিয়া বোঝে না। তবে কথাটা তার ভেতরে কোথাও যেন ধাক্কা দিয়েছিল। সেই কবে মা–বাবা, বাড়িঘর ছেড়ে এসেছে, দলের সঙ্গে এই গ্রাম সেই গঞ্জে ঘুরে বেড়ায়। বেদে দলের সঙ্গে তফাত শুধু এটুকু, ওরা সাপ
খেলা দেখায়, তুকতাক জাদুটোনার ভেলকি দেখিয়ে ওষুধ বিক্রি করে আর ‘নিউ বিউটি অপেরা’ নেচে-গেয়ে অভিনয় করে মানুষের মন জোগায়। তো, এই জীবনে হিন্দুই কী আর মুসলিমই কী!

সুলতানা রাজিয়ার মনে স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল পালাকার, সংসারের স্বপ্ন। কিন্তু একদিন ধুম করে মরে গেল রাজিয়ার সুলতান। রাত-দিন মদ গিলত, সেই মদই খেয়ে নিল তাকে। ডাক্তার-ওষুধেও আর কোনো কাজ হলো না। সুলতানার স্বপ্নও মরে গিয়েছিল সেদিন থেকে।

কয়েক দিন গোপনে অশ্রুপাত করে লোকটাকে ভুলতে শুরু করেছিল রাজিয়া। কিন্তু শেষ বিদায় পালায় স্বামীর মৃতদেহের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়া এক হিন্দু নারীর ভূমিকায় অভিনয় করতে গিয়ে হঠাৎ টের পেয়েছিল অভিনয় নয় তো, তার বুকফাটা বিলাপের মধ্যে বারবার জেগে উঠেছে ধীরেন ঘোষের মুখ!

জীবন নিয়ে আর কোনো স্বপ্ন ছিল না। রমরমা দিনগুলোও আর নেই। চাহিদা-বাজার দিন দিন কমছে। এতকাল ধরে গ্রামগঞ্জের মানুষ এই সব পালা দেখে হাসি-কান্না-আনন্দে ডুবেছে, এখন একদল লোক বলছে ‘নাজায়েজ’। এই নাজায়েজ কাজ-কারবার বন্ধ করার জন্য লাঠিসোঁটা নিয়ে নানা সময় নানা জায়গায় হামলা করছে এই লোকগুলো। কত জায়গা থেকে তাঁবু গুটিয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে।

কোনোমতে টিকে আছে ‘নিউ বিউটি অপেরা’। সুলতানাও টিকে আছে কোনোমতে। আয়-উপার্জনের অবস্থা খুবই খারাপ। কিন্তু আর কিছু তো শেখেনি। তা ছাড়া সে নায়িকা, বিউটি অপেরার নায়িকা ধান মাড়াইয়ের কামলা খাটবে, সেটা সম্ভব? বিয়ে-শাদিইবা কে করবে তাকে, চারপাশে ছোঁকছোঁক করতে থাকা মানুষগুলোর হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে কোনোরকম টিকে আছে, সব সময় বাঁচতেও কী পারছে! কিন্তু যাত্রাপালার রঙিলাকে বিয়ের কথা বলতে আসবে কে?

বোয়ালখালী গ্রামে তিন রজনীর বুকিং পেয়ে এসেছিল গত বছর। সেটা ডিসেম্বর মাস। বিজয় মেলা উপলক্ষে যাত্রাপালার আয়োজন করেছিল মেলা কমিটি। বীরাঙ্গনা পালা নিয়ে এসেছিল ‘নিউ বিউটি অপেরা’। এর আগে কখনো চট্টগ্রামে আসেনি। তিন দিনই সামনের সারিতে চেয়ারে বসে একই পালা দেখেছিল একটা মাঝবয়েসী লোক। মঞ্চে অভিনয় করতে করতেও কেন জানি লোকটাকে চোখে পড়েছিল। তো তৃতীয় দিন পালা শেষে মঞ্চের পেছনে এসে তার সঙ্গে দেখা করেছিল মুখে দাড়ি আর চোখে সুরমা টানা লোকটা। সাদা ধবধবে পাঞ্জাবি থেকে ভুরভুর করে সুগন্ধি বেরোচ্ছিল। পরনে একটা সাদা লুঙ্গি আর পায়ে চামড়ার পাম শু। এ রকম কত রসিক নাগর তো দেখল জীবনভর। কিন্তু লোকটা অন্য কোনো ধানাইপানাই না করে সরাসরি বলেছিল, ‘তোমারে আমি বিয়া করতে চাই রাজিয়া।’

অবাক হয়েছিল, আবার হয়ওনি। হ্যালোজেন আলোর নিচে চড়া মেকআপে পালার নায়িকাকে দেখে অনেকের চোখে মুগ্ধতা দেখেছে, তবে আতশবাজির মতো তার আয়ু যে কত অল্প, তা কি আর সে জানে না? জানে। জানে বলেই না নানা কিসিমের স্তুতিবাক্য শুনে একটু হেসে, হাসির রেশ ফুরাবার আগেই তা ভুলে যেতে শিখেছে।

তবে এই আলী হোসেন লোকটা কড়া পাকের আবেগের ধারে কাছে না গিয়ে সরাসরি কিছু বাস্তব–বিবেচনার কথা বলেছিল। দীর্ঘদিন দুবাই শহরে চাকরি করেছে আলী হোসেন। এখন দেশে ফিরে এসে এখানকার বাজারে বড় একটি হোটেল খুলেছে। আয়-রোজগার ভালো, তা ছাড়া দুবাই থেকে আনা অর্থের সঞ্চয় তো আছেই। সমস্যা হচ্ছে, এর মধ্যে একটা কন্যাসন্তান রেখে বিবি মারা গেছে তার। এমন কিছু বয়স নয় যে মরহুমার শোকস্মৃতি নিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। সুতরাং আবার বিয়ে করতে চায়। রাজিয়াকে দেখে তার পছন্দ হয়েছে। সে যদি রাজি থাকে, তাহলে রাজরানির মতো থাকতে পারবে সে।

‘রাজরানি’ কথাটা শুনে হাসি পেয়েছিল। মঞ্চে কতবার রানি সেজেছে। কিন্তু রাত পোহালে আবার যেই কি সেই। গোসলের সময় পুকুরের জলে মহারানিকে ডুবিয়ে এসে সামান্য ভাত–ডাল আর কখনো একটু মাছ পেলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে দিন কেটে গেছে।

চোখে সুরমা আঁকা লোকটার মুখের ওপর কিছু বলতে পারেনি সেদিন। তার দোনোমনা দেখেই বোধ হয় বলেছিল, ‘ভাইবা দেখো, যদি রাজি থাকো এইখানে আপাতত আমার কুনো আত্মীয়র বাড়িতে থাকনের ব্যবস্থা কইরা দিব, দুই-চার দিনের ভিতর বিয়া কইরা ঘরে তুলব তুমারে।’

‘সেইটা কী করে সম্ভব?’ হতবিহ্বল রাজিয়া প্রশ্ন করেছিল।

‘সম্ভব না অইলে দলের লগে ফিইরা যাও, যদি মন টানে তাইলে চইলা আইসো, আমি কিন্তু অপেক্ষায় থাকলাম…।’

‘আমারে ক্যান বিয়া করত চান আপনে, এই দেশে মাইয়া মানুষের অভাব পড়ছে?’ এই প্রশ্ন করে একবার সুরমা আঁকা চোখের দিকে তাকিয়েছিল রাজিয়া।

এইবার লোকটাকে একটু শরমিন্দা দেখাল, কঠিন চেহারার মানুষটা লাজুক গলায় দুটো শব্দ উচ্চারণ করেছিল, ‘মনে ধরছে।’

পকেট থেকে পাঁচ শ টাকার একটা নোট বের করে জোর করে গছিয়ে দিয়েছিল তার হাতে, ‘এইটা রাখো, গাড়ি ভাড়া…, মন টানলে আইসো, আমি কিন্তু অপেক্ষায় থাকব কইলাম।’

লোকটার সোজাসাপ্টা বলার ধরন দেখে তার কথা অনেকটা বিশ্বাস হয়েছিল, কিন্তু সত্যি বলতে কী, মন টানেনি। পাঁচ শ টাকার নোটটা কোমরে গোঁজার সময় ভুলেও একবার ভাবেনি আবার কোনো দিন আসবে এই গাঁয়ে। পালা নিয়ে এখানে–ওখানে গেলে কত কী ঘটে, সেই সব মনে রাখলে চলে না। আলী হোসেনকেও মনে ছিল না। কিন্তু আজ কালুরঘাটের ব্রিজ পেরিয়ে এর–ওর কাছে জানতে চাইছে বোয়ালখালীর আলী হোসেন সাহেবের বাড়ির ঠিকানা।

ভুলেই তো গিয়েছিল, কিন্তু যাত্রাদলটার দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না। খেপ নেই, নতুন পালা নেই, নিয়মিত রিহার্সালও নেই। আগে মাসের বেতন হতো ৫ তারিখে, সেটা ১৫ থেকে ২০–এ গিয়ে ঠেকল। তার তো তবু হয়, এক্সট্রা আর্টিস্ট, বাজনদার বা মেকআপম্যানদের তা–ও নিয়মিত হয় না, মাঝেমধ্যে অল্প কিছু ধরিয়ে দেয়। কেন জানি মনে হচ্ছিল বন্ধ হয়ে যাবে দলটা। অন্য কোনো দলে যে যাবে, সে রকমও সুযোগ নেই। সব কটিরই তো একই অবস্থা। দলটা উঠে গেলে থাকা-খাওয়া জুটবে কী করে, সেই চিন্তায় অতল পানিতে ডুবতে বসে হঠাৎ দাড়ি আর সুরমা আঁকা চোখের কথা মনে পড়েছিল রাজিয়ার। বছর পেরিয়ে গেলেও লোকটার কথা ভাবেনি কোনোদিন, তাকেই কেন জানি শেষ পর্যন্ত ভরসাস্থল মনে হয়েছিল।
লোকটার সঙ্গে যে একবার যোগাযোগ করবে, সেই ব্যবস্থাও নেই। মোবাইল ফোনের নম্বরটা অন্তত নিয়ে আসতে পারত, আফসোসে হাত কামড়াতে ইচ্ছা করছিল।

যশোরে বাপের বাড়ি ফিরে যাওয়ারও পথ নেই। বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট ভাইটা বউ-বাচ্চা আর আম্মাকে নিয়ে থাকে। রাজিয়া ফোনে কথা বলে মাঝেমধ্যে। কিন্তু সে যেন আর কখনো বাড়িতে না আসে, সে কথাটা মুখের ওপরই বলে দিয়েছিল ছোট ভাই। যাত্রাদলে নেচে–গেয়ে বেড়ায় এমন বোনটা বাড়ি ফিরে এলে সমাজের কাছে নাকি মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না তার। শুনে হাসি পেয়েছিল। দিনের পর দিন নেচে-গেয়ে বেড়ানো বোনের মানিঅর্ডারের টাকা বুঝে নিতে মানসম্মানের সমস্যা হয়নি! ক্ষোভ-অভিমানে মনটা বুজে এসেছিল, আবার অদ্ভুত এক বৈরাগ্যের মধ্যে সেই অভিমান থেকে বেরিয়ে আসতে সময়ও লাগেনি বিশেষ। অভাবের সংসার, বোন ফিরে এলে যদি ছোট্ট এক টুকরো ভিটের ওপর ভাগ বসায়, এই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে বেচারা।

‘আলী হোসেন সাহেবের বাড়িটা কোথায় বলতে পারেন? হোটেলের ব্যবসা আছে…আলী হোসেন…।’ পান-বিড়ি-সিগারেটের এক দোকানিকে জিজ্ঞেস করল রাজিয়া।

পানে চুন মাখাচ্ছিল, হাতের কাজ থামিয়ে একবার আগাগোড়া পরখ করল বৃদ্ধ, দৃষ্টিতে কৌতূহল, কিন্তু আপাতত সেটা চাপা দিয়ে হাত তুলে দেখাল, ‘ওই যে আলী হোটেল, হোসেন সায়েবরে হোটেলেই পাইবা, ওই যে…।’

বৃদ্ধের আঙুল নির্দেশিত পথে দৃষ্টি পাঠিয়ে বেশ বড়সড় একটা হোটেল দেখতে পেল। সেদিকে হাঁটতে শুরু করে বুঝতে পারে, লোকটা তখনো পান-চুনে মনোযোগ দিতে পারেনি, তার চোখজোড়া লেগে আছে পিছে।

‘আলী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’–এ লোকজনের ভিড়। ব্যস্তসমস্ত বয়-বেয়ারারা গ্রাহক সামলাচ্ছে। হোটেলের সামনের দিকের একটি কাউন্টারে বসে আছে আলী হোসেন। বুকটা ধক করে উঠল। লোকটাকে একটু দূর থেকে একনজর দেখেই চিনতে পারল রাজিয়া। লোকজনের ভিড়ের মধ্যে কাছে যাওয়ার ভরসা পেল না। পাশেই ঘুরঘুর করতে থাকা একটা ছেলেকে বলল, ‘ওই লোকটাকে একটু ডেকে আনতে পারবা?’

‘ম্যানেজার সায়েব রে?’

‘হ্যাঁ।’

ছেলেটা গিয়ে আলী হোসেনকে পৌঁছে দিল তার বার্তা। দূর থেকে বোধ হয় একটু ভ্রুকুঞ্চিত চেহারায় তার দিকে তাকাল আলী হোসেন। সেই বিস্মিত কৌতূহলী চেহারা নিয়েই উঠে এল।

চিনতে পারেনি। তার বিস্মিত দৃষ্টির সামনে কিছুটা কুঁকড়ে গিয়ে রাজিয়া বলল, ‘আমি সুলতানা রাজিয়া।’

আলী হোসেনের চেহারায় বিস্ময় আরও বিস্তৃত হলো, ‘তুমি সুলতানা রাজিয়া…! মানে যাত্রাদলের…?’

‘জি।’

এবার খুঁটিয়ে দেখছে তাকে। দৃষ্টিতে অদ্ভুত সংশয়। হ্যালোজেনের উজ্জ্বল আলোয় চড়া মেকআপে দেখেছিল তাকে। এখন অনিদ্র রাত ও দীর্ঘ ভ্রমণ ক্লান্তির পর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় প্রায় বিধ্বস্ত চেহারা!

আগের দিন নিজের সঙ্গে নানা বোঝাপড়া করে হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল রাজিয়া। ঢাকার ট্রেনে উঠে পড়েছিল রাতে। সকালের দিকে কমলাপুর পৌঁছে স্টেশনের পাশে টংয়ের দোকানে চা-নাশতা খেয়ে আবার বাসে চেপে চট্টগ্রাম। আরও একবার বাস বদল করে খুঁজেপেতে হাজির হয়েছে এখানে। সারাটা দিন পেটে দানাপানি পড়েনি। এখন আলী হোসেনের দৃষ্টির সামনে যেন ক্রমে সংকুচিত হয়ে পড়ছে রাজিয়া। আয়নায় নয়, চেহারার কী হাল হয়েছে, আলী হোসেনের দৃষ্টিতেই যেন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। মুখে গুটি বসন্তের দাগগুলো কী রকম নোংরা হয়ে বেরিয়ে আছে, ভাবতেই শিউরে ওঠে একবার।

‘তুমি সুলতানা রাজিয়া?’ আবারও নিশ্চিত হতে চায় আলী হোসেন।

‘জি, আপনি আসতে বলছিলেন।’

এবার হাসল আলী হোটেলের মালিক, ‘সেইটা তো কোন কালের কথা। এক বছরের বেশি অইয়া গেল মনে অয়, হইছে না?’

‘জি, এক বছরের বেশি।’

‘দেরি কইরা ফেলছ তো, অনেক দেরি কইরা ফেলছ। আমি তো শাদি কইরা ফেলছি…।’

কী বলার আছে সুলতানা রাজিয়ার। সে নিরুত্তর নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।

‘তোমারে তখন বলছিলাম, সময়মতো আইলা না। যাক, যা হয় ভালার লাইগাই হয়…।’

রাজিয়া নিরুত্তর। যা হয় তা যে ভালোর জন্যই হয়, আলী হোসেন বোধ হয় এটা এইমাত্র টের পেল। যাত্রামঞ্চের নায়িকাকে দেখে রূপমুগ্ধ দর্শকের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া যে মোটেই বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ছিল না, এত দিন পরে সেই নায়িকার আসল রূপ দেখে হয়তো নিশ্চিত হলো আলী হোসেন। মনে মনে শোকর করছে নিশ্চয়।

‘আমি তাহলে আসি।’ কোনোমতে উচ্চারণ করল রাজিয়া।

লোকটা সহৃদয়, বলল, ‘আরে, এত দূরের পথ আসছ, দুইটা খাইয়া যাও।’

এই আতিথেয়তা অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য নেই রাজিয়ার। একটা ঠিকানা খুঁজে পাওয়ায় উদ্বেগ-আকুলতায় ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলতে বসেছিল। এখন প্রচণ্ড ক্ষুধা ছাড়া আর কোনো অনুভব অবশিষ্ট নেই শরীরে ও মনে।

আলী হোটেলে ভাত আর সুস্বাদু মুরগির মাংস দিয়ে উদরপূর্তির পর পথে বেরিয়ে পড়ল সুলতানা রাজিয়া। বেলা পড়ে এসেছে। গরমের তীব্রতাটাও একটু কম। দ্রুত হেঁটে গিয়ে বাস ধরা দরকার। কিন্তু পা দুটি যেন চলতেই চায় না। চারপাশের লোকজন কি তাকাচ্ছে তার দিকে? কে জানে। বছরখানেক আগে বিউটি অপেরার নায়িকা হয়ে এই গ্রামে এসেছিল, তখন রাত জেগে যারা পালা দেখেছে, নায়িকার রূপে-গুণে-অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে হাততালি দিয়েছে, সিটি বাজিয়েছে, তারা কী এখন আর চিনবে তাকে! অবসন্ন শরীরের বোঝাটা টেনে নিয়ে পথ পাড়ি দিচ্ছে, নিজেকে ভিখিরি মনে হচ্ছে সুলতানা রাজিয়ার।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত