মেয়ের কোরবানি

মেয়ের কোরবানি

আমার বিয়ের কয়েকদিন আগেই বাবা মারা যান। আমাদের এদিকে রেওয়াজ আছে বিয়ের প্রথম বছর কোরবানির জন্য মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে গরু বা ছাগল দিতে হবে। প্রায় প্রতি পরিবারেই এমনটা হয়ে আসছে। আমার যেহেতু বাবা মারা যায়, মায়ের টেনশন খুব বেড়ে গিয়েছিল, একদিকে আমার শ্বশুর বাড়িতে গরু দেওয়ার টাকা কীভাবে আসবে সেই চিন্তা, অন্যদিকে আমার আরো তিন ছোট ভাই বোনের ভবিষ্যৎ কীভাবে এগুবে? বাবার টাকা ছিল না এমন নয়, তবে বাবা মারা যাওয়াতে বাবার সমস্ত টাকা ছড়িয়ে, ছিটিয়ে গিয়েছিল। টাকাগুলো তো আর একাউন্টে জমা ছিল না, বরং বিভিন্ন ব্যবসাতে লাগানো ছিল।

এদিকে শ্বশুর বাড়িতে আমার দুশ্চিন্তা ছিল, এত বড় পরিবারে আমার সম্মান কোথায় যাবে, যদি আমার বাবার বাড়ি থেকে গরু দেওয়া না হয়। এমনিতেই ওরা কম করেনি, বাবা মারা যাওয়ার পরও অপয়া উপাধি দেওয়া এক মেয়েকে সমাজের মানুষের কথা উপেক্ষা করে ছেলের বউ করে নিয়ে আসে। কিন্তু আমার করার কিছুই নেই, মায়ের পক্ষে আমার শ্বশুর বাড়িতে গরু দেওয়া সম্ভব নয়।

আমি চাই না, মা আমার জন্য এক টাকাও খরচ করুক, মা’কে কামাই করে এক টাকা দেওয়ারও কেউ নেই। আমার মনের অবস্থা মা’কে না জানালেও আমার দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। প্রতি রাতে কান্না করতাম, কীভাবে মুখ দেখাব।
ওরা যেহেতু অনেক ধনী নিশ্চয় ওদের মেয়ের বাড়িতেও গরু দিবে।

যতই কোরবানির দিন ঘনিয়ে আসছে ততই আমার কান্না, দুশ্চিন্তা বেড়ে যাচ্ছিল। শুধু বাবাকে প্রচণ্ড মনে পড়ছিল, আজ বাবা থাকলে আমার এসব ভাবতে হত না। একটা রাতও ঘুমাতে পারছিলাম না। সেদিন তো স্বপ্নেও দেখলাম আমার শাশুড়ী আমাকে বাড়ির সবার সামনে অপমান করছে, আমার বাড়ি থেকে কিছু দিতে পারিনি বলে। কোরবানির প্রথম গরুর বাজার যখন শুরু হয়, আমি নিজের ঘর থেকে বের হতে পারতাম না লজ্জায়। নিজে নিজেই লজ্জায় মরে যেতাম, মনে হতো সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

সেদিন যখন শাশুড়ী, মা’কে আসার জন্য খবর পাঠাল, আমি জায়নামাযে সিজদায় পড়ে গিয়েছিলাম, শুধু আল্লাহর কাছে একটা জিনিসই চেয়েছিলাম, হে আল্লাহ আমার মা’কে অপমান কর না। আমার মা’য়ের সবচেয়ে উত্তম সম্পদ তুমি নিয়ে গেছ, মা’কে আর কষ্ট দিও না। মা’কে অপমানিত কর না। দুনিয়াতে আমাদের তুমিই একমাত্র ভরসা। ইয়া আল্লাহ অনেক আশা নিয়ে দুই হাত তুলেছি, দয়া করে নিরাশ কর না।

মা আসার পর রুম থেকে বের হওয়ার সাহস পাচ্ছিলাম না কিছুতেই। মা’কে কীভাবে ফেইস করব, মায়ের অপমান কীভাবে সহ্য করব। শাশুড়ী ডাকা পাঠানোতে না গিয়ে পারলাম না। এক পাশে মাথা নিচু করে বসে আছি এমনকি মায়ের কাছে গিয়ে, মা’কেও জড়িয়ে ধরিনি এতই দুশ্চিন্তায় ছিলাম। শেষে শাশুড়ী মা যা বললেন তা শুনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। উনি মা’কে বললেন,

— বেয়াই, সুমাইয়া আমার বউমা নয় আমার মেয়ে। আমি জানি মেয়েটা আজ চার পাঁচ দিন ধরে মন খারাপ করে আছে, কেন করে আছে সেটাও জানি। এবং এটাও জানি আপনিও দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছেন না। আপনাকে একটা কথা বলি, সুমাইয়ার আগে আমার আরো দুইটা বউ। দুই বউয়ের বাবার বাড়ির অবস্থাও মোটামোটি ভালই। তাদের সামর্থ্য আছে আমাকে গরু বা ছাগল দেওয়ার। কিন্তু জানেন তো, আমার ইসলাম তো আমাকে বউমার শ্বশুর বাড়ি থেকে কোরবানির পশু নেওয়ার অনুমতি দেই নি তাহলে আমি কীভাবে আমার ধর্মের বিরুদ্ধে যেতে পারি। আপনি আমার বাসায় কোন কিছু পাঠিয়ে দয়া করে গুনাহের ভাগীদার করবেন না। মায়ের চোখে পানি এবং আমার চোখ দিয়েও টপটপ করে পানি পড়ে ফ্লোর ভিজে যাচ্ছে। মা চোখে জল নিয়ে সহাস্যে বলল,

: বেয়াই আমি গরু দিতে না পারলেও আলহামদুলিল্লাহ ছাগল দেওয়ার সামর্থ্য আমার আছে। তাই আপনি অন্তত ছাগল দিতে মানা করবেন না। আমি প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি।

— না, না বেয়াইন, যদি আপনি গরু, ছাগল তো দূরের কথা এক পেয়ালা মাংসও পাঠান তাহলে মনে করব আমার বউমা সুমাইয়া আছে আমার আপন কিন্তু ওর বাবার বাড়ির কেউই আমার আপন নয়।।

মায়ের সব প্রস্তুতি নেওয়া থাকলেও শাশুড়ীর ভাল, নেক মানসিকতার কারণে ছাগল দেয়নি। আমি নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি, দৌড়ে গিয়ে শাশুড়ী মা’কে জড়িয়ে ধরে অনেক অনেক কাঁদলাম আর শুকরিয়া আদায় করলাম। উনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললাম,

–সুমাইয়া, মা’রে এত শুকরিয়া আদায় করার কিছু নেই। জানিস, তোর দাদা শ্বশুর থেকেই আমাদের সংসার কোনদিন অভাব কি দেখেনি।

আমার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আমার দুই মেয়ের বিয়েতে কোন ঝাক ঝমক ছিল না, আমি করতে দিইনি। মেয়েদের শ্বশুর বাড়িতে কোন হাদিয়া পাঠাইনি। এক প্রকার জেদ করেই, এমন নয় যে ওরা চায়নি। কেন দিইনি জানিস, কারণ, রাসুল (স:) বলেন, “রাসুল (স:) বলেছেন, যে বিয়েতে খরচ কম এবং সহজ হয়,সেই বিয়ে বেশী বরকতময় হয়। (মিশকাত -২৬৭)”

তেমনি কোরবানিতেও গরু, ছাগল দিইনি কারণ আমার সামর্থ্য আছে বলে আমি দিতে পারতেছি কিন্তু যার সামর্থ্য নেই সে দিতে না পারলে হীনমন্যতায় ভুগবে যা আমার ধর্ম মোটেও সমর্থম করে না। আমার আছে বলেই কেন দিতে হবে? তখন থেকেই নিয়ত করেছিলাম মেয়েদের বিয়েতে যেমন দিচ্ছি না, ইন শা আল্লাহ ছেলেদের বিয়েতেও নিব না। তুই মনে করছিস তোর বাবা নেই বলেই তোদেরকে ফার্নিচার দিতে মানা করেছিলাম? তা নয়, আমার অন্য দুই ছেলের শ্বশুর বাড়িকেও কঠোরভাবে মানা করেছিলাম এই বাড়িতে যেন কিছুই দেওয়া না হয়। একটা সূতার আঁশও যেন দেওয়া না হয়। তাহলে ওই বাড়ির সাথে সম্পর্ক থাকবে না। পরিপূর্ণ সুন্নত অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। জানিস মা, আমার ছেলেদের শ্বশুর বাড়ি থেকে কিছু নিইনি বলে আমার সম্মান মোটেও কমেনি বরং বেড়েছে আলহামদুলিল্লাহ৷ বড় বউমার বিয়ের প্রথম বছর কোরবানিতে আত্নীয়দের মধ্যে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছিল, ওর বাবার বাড়ি থেকে কি দেওয়া হয়েছে? আমি খুব কড়া করে বলেছিলাম,

— ওর বাবার বাড়ি থেকে কেন দিতে হবে? আমার সামর্থ্য থাকলে কুরবানি দিব, না থাকলে দিব না। ওর বাবার বাড়ি থেকে গরু, ছাগল নিলে তো আমার জন্য কুরবানি ওয়াজিব হবে না। আমি কেন নিব? তেমনি বড় বউমার বিয়ের সময়ও নানী, দাদীদের শাড়ি দেওয়া হয়নি বলে অনেকেই কথা বলে উঠছিল, তখনও আমি কড়া ভাষায় জবাব দিয়েছিলাম। অনেকেই বলেছিল, ধনী পরিবার থেকে বউ এনেও কেন কিচ্ছু নিইনি। আমি বলেছি,

— ইসলামি শরিয়ত, ধনী -দরিদ্র, সামর্থ্যবান-সামর্থ্যহীনদের জন্য নিয়ম আলাদা নয়। সবার জন্য সমান। শুধু হজ্জ্ব, যাকাত, কুরবানির ক্ষেত্রে ধনীদের জন্য নিয়ম আলাদা।

তাই বলে বউয়ের শ্বশুর বাড়ি থেকে ভিক্ষার মতো কোরবানির গরু বা অন্য কিছু চাইতে পারবে না। সেদিন আমার কাছে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার ভাষা জানা ছিল না। জায়নামাযে শুধু দু চোখ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আমার শাশুড়ীর কোন কাজ যদি অপছন্দ হয় পর মূহুর্তেই মনে আসত, ইনিই তো সেই মহিলা যিনি কারো উপর জবর করেন না। আমি তাকে কীভাবে কষ্ট দিব, কীভাবে তার কথা অমান্য করব?!

সেইবার কোরবানির দিন, আমার শ্বশুর বাড়ি থেকেই একটা গরুর রান এবং কোরবানির মাংসের প্রথম পাতিল থেকে রান্না করা মাংসের বিশাল বড় ক্যারিয়ার পাঠানো হয়েছিল আমার বাবার বাড়িতে। আমার বাবার বাড়ির সবাই অবাক হয়ে গিয়েছিল, এমনও কি হয়? হুম হয়, যদি সে দ্বীনের রজ্জুকে কঠিনভাবে আকড়ে ধরে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত