শূন্যতা

শূন্যতা

– আমার বিয়ের পর শাশুড়িকে আমি অসুস্থ দেখেছি। একরকম বিছানায় শোয়া। হাই প্রেশার, ডায়বেটিকস, হার্টে ব্লক নানান রোগের রোগী ছিলেন তিনি।
– আমার বরেরা দুই ভাই। দেবর বউ নিয়ে আলাদা থাকে। আমি আদি আর শাশুড়ি একসাথে থাকি। নিজে জব করে, সংসারের রান্না বান্না, শাশুড়ির সেবা যত্ন, স্বামীর দায়িত্ব সব আমাকেই করতে হতো একা হাতে।

– জবের পাশাপাশি সবকিছু করতে একরকম হাঁপিয়ে উঠতাম। তবুও সব নিজের হাতে করতাম। কাজের মেয়ে পর্যন্ত ছিলোনা। নয়টা, পাঁচটা অফিস শেষে বাসায় এসে রান্না করা, শাশুড়ির দেখভাল করা সব আমিই করতাম।
কখনও মনে হয়নি শাশুড়ির সেবা করছি। সব সময়ই মনে হতো আমার মায়ের সেবা করছি। শাশুড়ি ও নিজের মেয়ের মতন দেখতেন। একদিন রাতে শাশুড়ির শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। আমি নিজের হাতে খাইয়ে দিলাম, বাথরুমে যেতেও উনার কষ্ট হচ্ছে। পরে থাকার জায়গাটা নোংরা করে ফেলল। আমি সব ধুয়ে পরিষ্কার করলাম। সেদিন শাশুড়ি সম্ভবত খুব লজ্জা পেয়েছিলেন। আমি বৌ হয়ে এত সেবা করছি উনার বিবেকের কাছে খারাপ লাগতো। সেদিন সব কাজ শেষে আমি যখন রুম থেকে বের হয়ে আসছিলাম! উনি আমার হাতটা টেনে বলল, আমার কাছে একটু বসবি তন্দ্রা!

– কিছু লাগবে মা, বলেন!
– তোর কাছে আমার শুধু দরকার ছাড়া আর কিছু থাকতে নাই বুঝি!
– কেনো থাকবেনা, বলেন মা কি?
– তোর চাকরি বাকরি করে সংসার সামলাতে খুব কষ্ট হয় না রে মা!
– কষ্ট একটু তো হয়ই, কিন্তু আমার মায়ের এমন হলে আমি সেবা করতাম না বলেন!
– শাশুড়ি বুকের মধ্যে আমায় চেপে ধরে বলল, আমি জীবনে কোন পূন্যের কাজ করেছি।

যার কারনে আল্লাহ  আমাকে এরকম একটা মেয়ে উপহার দিয়েছেন। এটা বলেই কাঁদতে শুরু করলেন। আমি উনার কোল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বললাম, আপনি এমন করলে আমি কিন্তু বাপের বাড়ি চলে যাবো। সাথে সাথে চোখের পানি মুছে বলল, তন্দ্রা আমার না আজকাল একটা কথা খুব মনে হয়।

– কি মনে হয় মা, বলেন!
-মনে হয় আমি যেদিন মারা যাবো সেদিন তুই পাশে থাকতে পারবিনা।
– ছিঃ মা, এসব বলবেন না। বললে আমার কষ্ট হয়।

তারপর শাশুড়ি আমার মাথাটা ধরে কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, যাহ্ অনেক খাটিস সারাদিন। এখন ঘুমাতে যা, সকালে তো আবার অফিস আছে তোর। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুমে এসে দেখি আদি শার্ট খুলছে।

– তুমি কখন আসলে?
– এইতো অনেকক্ষণ প্রায়।
– ডাকলেনা যে!
– মায়ের সাথে কথা বলছিলে, ভাবলাম ডিস্টার্ব না করি।
– ওহ্, এখন খাবে না কি আরও পরে? তন্দ্রা একটু পাশে বসবা! শাড়িতে হাত মুছতে মুছতে বললাম, হুম বসলাম। বল এবার কি বলবা?
– আমার দুহাত ধরে আদি বলল, তোমার উপর খুব চাপ যাচ্ছে নাহ্!
– আমি হাতটা ছাড়িয়ে ওর হাত ধরে বললাম, আমাকে নিয়ে এত ভাবার কিছু নেই। তোমার ও তো খুব চাপ কাজের। আজকাল আবার ওভার টাইম করছো! মায়ের ওষুধ, বাসা ভাড়া, সংসার খরচ মিলিয়ে এসব তো করতে হয় বলো?

– কিন্তু আদি আমিও তো জব করছি। কিছু কন্ট্রিউশন তো পরিবারে আমিও করতে পারি!
– এই যে তুমি মায়ের সেবা করছো, আমাদের সন্তানটাকে সময় দিচ্ছো, এগুলোই তো কন্ট্রিবিউশন তন্দ্রা।

ওর কথা শুনে চোখে পানি চলে আসলো। আমাকে বুকে জড়িয়ে আদি বলল, তুমি কাঁদছো কেনো ? তাছাড়া তোমার কিছু টাকা সঞ্চয় থাকুক। আর মাঝে মধ্যে আব্বা, আম্মার জন্য ও তো মেয়ে হিসেবে তোমার করা উচিত কি বলো?

– তুমি এত ভালো কেনো আদি?
– তুমি ভালো যে তাই।

– চল, খেতে যাবে অনেক রাত হয়েছে।
– হ্যাঁ চল, মা ঘুমাইছেন?

– আমি তো শুইয়ে দিয়ে আসলাম। এতক্ষণে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।

– খাওয়ার টেবিলে বসতে আদি হঠাৎ বলল, আম্মা আজ ফোন দিয়েছিলেন। বলল, তোমার নাম্বারে কল যাচ্ছেনা।
– কেন, কি বলল আম্মু?
– বাবার শরীরটা একটু খারাপ। তোমাকে যেতে বললেন। কিন্তু মাকে এই অবস্থায় রেখে আমি কিভাবে যাই বলতো?

– এক কাজ করো শুক্র, শনি দুইদিন তো অফিস নাই তোমার। তুমি রুপায়ণ কে নিয়ে কালই যাও।

আমি আবিদকে বলি ওর বউকে নিয়ে আসতে। সে কি বলছো তুমি? ওরা আমার বাসায় আসবে, আমি থাকবোনা! তা হয় নাকি? এত কথা বলোনা, তুমি জব করো। এছাড়া তো সময়ই নেই তোমার। তাছাড়া মায়ের শরীরটাও ভালোনা। কখন কি হয়, তার আগে যেয়ে এসো। আচ্ছা, ঠিক আছে । শুক্রবার সকাল বেলা শাশুড়ির জন্য নাস্তা আর টুকটাক রান্না করলাম। আদিও আজ বাসায় থাকবে। মাকে বললাম, মা আমি তো আজ বাবার বাসায় যাচ্ছি। আপনি একা থাকতে পারবেন তো!

– মন খারাপ করে বলল, হুম পারবো। কবে আসবি তুই। এইতো আজ আর কাল থেকে রবিবার ওখান থেকে অফিস করে বাসায় ফিরবো।

– মা, আপনার মন খারাপ করার কিচ্ছু নেই। আবিদ বউ নিয়ে বিকেলের মধ্যেই এসে পড়বে। দুইদিন ওরাই আপনাকে সময় দিবে।
– কিন্তু মা, আমার শরীরের যা হাল অবস্থা। কখন কি হয়। সারাবছর পানি সেচ দিলি, মাছ ধরার টাইমে যদি না থাকিস। তবে আজীবন দুঃখ থাকবে তোর।
– কি যে বলেন মা, তাইলে আমি না যাই!
– তোর ও তো বাপের শরীর ভালোনা ,দেইখ্যা আয়।

আসলে সারা বছর সেবা করলি, শেষ কালে দুই কথা কেউ তোরে নিয়া বলুক আমি চাইনা। আচ্ছা বললাম, আর কি! মন খারাপ করিসনা। যাহ তুই, আর ফোন দিয়া কথা বলিস। আমি মনের ভেতর উশখুস নিয়া বাবার বাসায় গেলাম। এক রাত কোন মতে কাটালাম। পরেরদিন আদি ফোন দিয়া বলল, মায়ের শরীরটা বেশিই খারাপ। যদি সব সামলাতে পারো তো, চলে আসো।

– আমার মনে হচ্ছে, শাশুড়ি আর নেই।

আদি আমার সাথে কিচ্ছু লুকাচ্ছে মনে হলো। তারপর আমি রূপায়ণকে নিয়ে চলে গেলাম।  গিয়ে দেখি আমার শাশুড়ি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আমার জা, কান্নাকাটি করছে। সবাইরে নিয়া খুব ব্যস্ত। সবাই ওরেই স্বান্তনা দিচ্ছে। পাশের বাসার একজন বলেই ফেলল, ছোড বউডা কাল সারারাত জাইগা ছিলো। খুব খাটছে মেয়েটা। এই যুগের মেয়ে শাশুড়ির জন্য এমন করে আগে দেখিনাই। বড় বউটা তো এমন অসুস্থ শাশুড়িরে রাইখা চলে যেতে একবার ভাবলো না। ভাগ্যিস ছোড বউটা আইছে, নাইলে আর কত কেলেংকারী অইতো!

মা চলে যাওয়াতে আমার এত কষ্ট হচ্ছে। আর মহিলার শুনে আরও কষ্ট হচ্ছিল। শাশুড়ির কথাই সত্যি হইলো। সারা বছর এত সেবা করলাম। শেষ কালে আজ বদনামের ভাগি হইলাম। এত লোকজন আর দুঃখের ভীড়েও আমার দুই ননদ বলে উঠলো। বড় ভাবি সারাজীবন করছে, শেষ কালে ছিলোনা এটা নিয়া এত বলার কিছু নাই। কে কতটুকু করছে না করছে আল্লাহ্ দেখছে। এসব নিয়া আর কেউ কথা বইলেন না। বলেই ওরা কান্না শুরু করলো। আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্যটা আমি পেয়ে গেলাম। তারপর শাশুড়ির মাটি হলো।

– তিনদিন পর ননদরা চলে যাবে।

তখন আমার দুই হাত ধরে বলল, ভাবি মা নাই। বাবা তো অনেক আগেই ছেড়ে চলে গেছে। হয়তো আর আগের মতো আসা হবেনা। নিজেরা নিজেদের খেয়াল রাইখো। তুমি মায়ের জন্য অনেক করছো। আমরা মেয়ে হয়েও সময় দিতে পারিনাই।

– কি বলছো তোমরা এগুলা। আমিও তোমাদের আরেকটা বোন। মা নাই কি হইছে? যখন মন চাইবে চলে আসবা তোমরা জামাই নিয়া।
– আমি সাধ্যমত করতে চেষ্টা করবো। দুজনেই এমনভাবে বুকে জড়িয়ে নিলো। যেনো পারলে আমাকে আর ছাড়বে না এমন! তারপর ওরা চলে গেলো।

– পুরো বাসায় মায়ের রুমে আর যাইনি আমি। আদি নিজে শক্ত থেকে আমাকে স্বান্তনা দিয়ে যাচ্ছে। এখন পুরো বাসা খালি। আমি, আদি আর রূপায়ণ।

– অথচ ভেতরটা এত ভারি লাগছে।

হঠাৎ আদি এসে আমার পিঠে হাত রেখে বলল, তন্দ্রা খুব খারাপ লাগছে তোমার জানি! কিন্তু কি করবে বল, মানুষ তো আর চিরদিন থাকেনা। এ কথা বলে আদি নিজেই কেঁদে দিলো। আমাদের কান্না দেখে রূপায়ণ ও কেঁদে উঠলো। তারপর ওকে কোলে নিয়ে, মায়ের হারিয়ে যাওয়ার শূন্যতা কমাতে দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত