ঘাই হরিণীর ডাক

ঘাই হরিণীর ডাক

মাথার উপরে আস্ত একটা পাহাড় নিয়ে রাজিব চেয়ারম্যান স্যারের রুম থেকে বের হলো। রাজিবের শরীর পাহাড়ের ভর সহ্য করতে না পেরে টলছে, পা দুটো শেকল দিয়ে বেঁধে যেন কেউ সামনের দিকে আর কেউ পেছনের দিকে টানছে। চোখদুটো খোলা থাকলেও সেগুলোতে দৃষ্টি নেই। টানা দুই দিন না ঘুমানোর ফলে মানুষের চোখ যেমন দর্শন বন্ধ করে দিয়ে স্বস্তি খোঁজে, রাজিবের চোখেরও এখন সে অবস্থা। রাজিব কি করবে বুঝতে না পেরে করিডোরেই শরীরটা ছেড়ে দিয়ে শান্তি পেতে যাচ্ছিলো, কিন্তু ফারহানার ডাকে তা আর করতে পারলো না।

– কী আলাপ হলো ভিতরে? তোমার চেহারা এমন ফ্যাকাসে হয়ে গেছে কেন?

রাজিব জবাব খুঁজে পায় না। বুঝতে পারছে না ফারহানাকে সত্যিটা এখনই বলা ঠিক হবে কিনা। নাহ, কী দরকার এখনই মেয়েটাকে আশাভঙ্গের যন্ত্রণা দেয়ার? রাজিব নিজেকে স্বাভাবিক প্রমাণ করতে হাসার চেষ্টা করে, তবে প্রাণহীন, নিঃশব্দ সে হাসি তার অসহায়ত্বকে লুকাতে ব্যর্থ হয়।

– কি হয়েছে? কথা বলছ না কেন?

– কিছু না, খিদা লাগছে। চল ক্যান্টিনে যাই।

রাজিব ফারহানার হাত ধরে ক্যান্টিনে গিয়ে বসে, চারটা সিঙ্গাড়া আর দু’কাপ চায়ের অর্ডার করে।

– স্যার কি বললেন?

রাজিব বুঝতে পারে চেয়ারম্যান স্যারের রুমে সে ত্রিশ মিনিট ধরে কি নিয়ে কথা বললো সেটা না শুনে ফারহানার কলিজা ঠান্ডা হবে না।

– তেমন কিছু না, ওই চাকরির ব্যাপার নিয়েই আলাপ হলো স্যারের সাথে, ভার্সিটির একজন সিনেট মেম্বারও ছিলেন।

– কংগ্র‍্যাটস!কিছুদিনের মধ্যেই তাহলে তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক হতে যাচ্ছ।

রাজিবের বিষণ্ণ চেহারা দেখে ফারহানার মনে যে দুশ্চিন্তা ভর করেছিলো, সমুচায় কামড়ের শব্দ কিংবা এর ফলে পাওয়া তৃপ্তির ঢেঁকুরের সাথে সাথে তাও তরঙ্গায়িত হয়ে মিলিয়ে গেলো।

– চল আজকে ঘুরতে যাই, বাসায় বাবা-মা কেউ নাই। সো, দেরী হলেও সমস্যা নাই।

– না। আজ থাক ফারহানা, মাথাটা খুব ব্যাথা করছে।

– তা আগে বলবে না? ফারহানা নিজের ব্যাগ হাতড়ে একটা ট্যাবলেট বের করে। টাফলিন খাও, দশ মিনিটের মধ্যে ব্যাথা সেরে যাবে।

রাজিব ট্যাবলেটটা খেয়ে উঠে পড়ে। ফারহানাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে হেঁটে মেসে ফিরে।

২.

সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। মাগরিবের আজানের শব্দ কেন জানি মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। মেসের জানালাবিহীন ছোট্ট প্রকোষ্ঠে রাজিবের দম বন্ধ হয়ে এলো। সে আর ঘরে বসে থাকতে পারলো না। ওজু করে অনেকদিন পর মসজিদের দিকে হাঁটা দেয়। কৈশোর থেকে দুশ্চিন্তার সময়ে নামাজ পড়লে রাজিব এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে। কিন্তু আজকে নামাজের মধ্যেও কান্না পাচ্ছে।

রাজিব মসজিদ বের হয়ে মেসে ফিরছে এমন সময় ফোন বেজে ওঠে। রাজিবের ছাত্র সুমন ফোন করেছে। ফোনের স্ক্রিনে সুমনের নামটা দেখে রাজিবের মনে পড়ে টিউশনির কথা। সপ্তাহে চারদিন বিকাল পাঁচটা থেকে ও সুমনকে পড়ায়। কিন্তু রাজিব আজ টিউশনির কথা ভুলেই গিয়েছিল।

শুধু কি টিউশনি! চেয়ারম্যান স্যারের রুম থেকে বেরুনোর পর থেকে রাজিবের মস্তিষ্কে অন্য কোনো ভাবনা জায়গা পাচ্ছে না। মশার গুঞ্জনের মতো কানে বাজছে শুধু স্যারের কথা-শোনো রাজিব, যে কয়জন ক্যান্ডিডেট আছে, তাদের মধ্যে তোমার রেজাল্ট সবচেয়ে ভালো। তোমার ইমেজও ক্লিন। কিন্তু তোমার কোনো পলিটিক্যাল সাপোর্ট নাই। ঝামেলা হচ্ছে যে, ক্যান্ডিডেট লিস্টে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বড় এক নেতা আছে। খুব উপর মহলের সুপারিশ নিয়ে আসছে সে। সেই সুপারিশ উপেক্ষা করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

রাজিব সুমনের কলটা রিসিভ করলো না। মেসে ফিরে রুমের দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লো। চোখের পাতা বন্ধ করলেও হারামজাদা মস্তিষ্কটা বিশ্রামে যাচ্ছে না। কি করবে এখন রাজিব? দুঃস্বপ্ন দেখতে থাকা মানুষের মত কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে রাজিব বিছানার উপর উঠে বসলো। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না সে। অনেকদিন পর রাজিব হু হু করে কাঁদতে থাকে।

৩.

মাইজপাড়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক ফরমান আলীর চতুর্থ সন্তান রাজিব ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র হিসেবে বেশ নাম করেছিল। ফরমান আলীর প্রথম দুই পুত্র এবং এক কন্যা কারোরই লেখাপড়া বেশিদূর এগুতে পারেনি।

একমাত্র কন্যার বিয়ে হয়েছে অল্প বয়সেই। বড় ও মেজো পুত্র কোনোমতে মাধ্যমিক পাশ করে পৈত্রিক পেশাতেই যুক্ত হয়। রাজিবের ক্ষেত্রেও এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু ক্লাস সিক্সের ফাইনাল পরীক্ষায় হঠাৎ করে সে ফার্স্ট হয়ে যাওয়ায় মাইজপাড়া হাইস্কুলের শংকর স্যারের নজরে পড়ে যায়। শংকর স্যারই উৎসাহ ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে রাজিবের পড়াশুনা এতদূর নিয়ে এসেছেন।

উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে জেলা শহরের একটা ছোট্ট সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে পড়ার সুযোগ পায় রাজিব। কিন্তু সেবারই প্রবল বন্যায় ফরমান আলীসহ দশ গাঁয়ের প্রত্যেক কৃষকের জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কয়েক বছরে এমন প্রলয়ংকরী বন্যা কেউ দ্যাখেনি।

কৃষিতে এমন ধরা খাওয়ার পর রাজিবকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির টাকা দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না ফরমান আলীর। শংকর স্যার তখন কয়েকজন ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা তুলে রাজিবের ভর্তির ব্যবস্থা করেছিলেন। অন্যের অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে রাজিব সেদিন মনে মনে শপথ করেছিল– সে সফল হবেই।

নিজের কাছে করা সেই প্রতিজ্ঞা পূরণের লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পড়াশুনা ছাড়া অন্য কিছু রাজিব করেনি। আড্ডাবাজ বন্ধুবান্ধব, ছাত্র রাজনীতি থেকে নিজেকে সব সময় দূরে রেখেছে। পড়াশুনার বাইরে আরেকটা কাজ অবশ্য রাজিব করতো টিউশনি। মেসে থেকে নিজের পড়াশুনা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে এ ছাড় রাজিবের আর কোনো বিকল্প ছিল না।

প্রথম বর্ষে ক্লাসমেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কারোর কাছেই রাজিব তেমন পাত্তা পায়নি। ওর গা ও মানসিকতায় তখনো অজপাড়াগাঁয়ের গন্ধ লেগে আছে। ক্লাসে প্রফেসরদের প্রশ্ন করারও সাহস পেতো না রাজিব।

তবে এ অবস্থা বদলে যায় প্রথম বর্ষ ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট দিলে। সবাইকে বেশ অবাক করে দিয়ে ক্লাসে সব সময় চুপচাপ থাকা রাজিব ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়।

এক ধাক্কায় শিক্ষকদের পছন্দের ছাত্রের তালিকায় চলে আসে রাজিব। রাতারাতি ক্লাসের অন্যান্য ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের ঈর্ষার কারণ ও দুর্বল শিক্ষার্থীদের আশ্রয় হয়ে ওঠে। ফেলের শঙ্কায় থাকা বন্ধুবান্ধব পরীক্ষার আগে রাজিবের কাছে সাজেশন নিতে আসতে লাগলো, নোট-পত্র ও পরামর্শ নিতে আসতে লাগলো জুনিয়ররা। সে প্রক্রিয়াতেই একদিন নোট নিতে এসেছিল ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র ফারহানা। তারপর দ্রুত নিজেকে জড়িয়ে ফেলে রাজিবের সঙ্গে।

নিঃসঙ্গ রাজিব রূপবতী ফারহানার ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেনি। ক্রমেই রাজিবের নীরস-নিরানন্দ জীবনে ফারহানা একটুখানি সুখ আর স্বস্তির আশ্রয় হয়ে ওঠে।

ফার্স্ট হওয়ার পর থেকে রাজিবের উপর একটা উপভোগ্য মানসিক চাপ তৈরি হলো।

বন্ধুবান্ধবরা সবাই টিচার টিচার বলে ক্ষ্যাপাতে শুরু করে। এই প্রত্যাশার চাপ থেকে রাজিবের মনেও স্বপ্ন জাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। আরও বেশি খাটাখাটুনি করে অনার্সের বাকি তিন বছরেও সে ফার্স্ট হয়, মাস্টার্সে তো ডিপার্টমেন্টে রেকর্ড পয়েন্ট হাসিল করলো। মাস্টার্স কম্পলিট করার পর থেকে রাজিব প্রতীক্ষায় থাকে প্রভাষক নিয়োগের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বদ্ধ কক্ষে রাজিব আজই প্রথম ডাক পায়নি। মাস ছয়েক আগে প্রথমবার রাজিবকে ডাকা হয়েছিল। তবে চেয়ারম্যান স্যারের রুমে না, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন চেয়ারম্যান স্যার, বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন কর্মকর্তা আর এক স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ।

রাজিবকে সেদিন বলা হয়েছিল দশ লাখ টাকা যোগাড় করতে। তাহলেই চাকরিটা নিশ্চিত। কথাটা শুনে রাজিব ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছিল। ওর কৃষক পিতার সামর্থ্য নেই এত টাকা যোগাড় করার। পরামর্শ নিতে রাজিব ছুটে যায় প্রিয় শিক্ষকের কাছে। প্রফেসর কালাম ওকে বলেছিলেন– এসবের কোনো দরকার নেই। তুমি বাইরে যাও, পিএইচডি কর। এর চেয়ে ভালো জায়াগায় চাকরির সম্ভাবনা তোমার আছে।

কিন্তু রাজিবের তখন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়, তাৎক্ষণিক চাকরির দরকার। বৃদ্ধ বাবা আর মাঠে কাজ করতে পারেন না। বড় দুই ভাই বিয়ে থা করে নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। চাকরিটা রাজিবের খুব জরুরি।

চেষ্টা করলে রাজিব হয়তো দ্রুতই ভালো চাকরি যোগাড় করতে পারতো। কিন্তু ওর উপরে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার প্রত্যাশার চাপ। শুধু শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রত্যাশাই নয়, এ কয় বছরে রাজিব নিজেও ঠিক করে নিয়েছিল সে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই হবে।

দশ লাখ টাকার কথা শুনে সেদিন মাথা খারাপ হয়ে গেছিল রাজিবের, গত কয়েক বছরের পরিশ্রমে তিলতিল করে গড়ে তোলা ঘরটা যেন ঝড়ের প্রথম আঘাতেই ভেঙে পড়ে।

রাজিব সোজা চলে যায় মাইজপাড়ায়। পিতার হাত ধরে বলেছিল– আব্বা, যেভাবেই হোক দশ লাখ টাকা আমার লাগবেই। বৃদ্ধ ফরমান আলী একমাত্র সম্বল ধানী জমি বিক্রি করে টাকাটা যোগাড় করেন।

সেই টাকা দেওয়ার পর থেকে রাজিব হিসাব করতে থাকে চাকরি পাওয়ার পর কয় মাস লাগবে এই দশ লাখ তুলতে। গত ছয় মাস রাজিব ঠিকমতো ঘুমুতে পারেনি, ক্ষণিকের জন্যেও পারেনি দুশ্চিন্তামুক্ত থাকতে। প্রায় প্রতিদিন ডিপার্টমেন্টে গিয়েছে খোঁজ খবর নিতে। অবশেষে কাল চেয়ারম্যান স্যার ওকে ফোন করে আজ দেখা করতে বলেন।

স্যারের ফোনটা আসার পর থেকে রাজিবের মন খুব ফুরফুরে ছিল। সে ধরেই নিয়েছিল, এবার শুভ সংবাদ পাবে। কিন্তু আজকে স্যারের অফিসরুমে রাজিবের ওপর আস্ত একটা পাহাড়ই ভেঙে পড়েছে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের পাঁচ লাখ টাকা খাওয়াতে হবে। তা না হলে চাকরিটা রাজিব নয়, পাবে ছাত্র সংগঠনের সেই নেতা। কথাটা শুনে স্যারের রুমেই চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল রাজিবের।

৪.
কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টেরই পায়নি রাজিব। রুমমেট সাকিবের ডাকাডাকিতে ঘুমটা ভাঙে। রাজিব বিছানা ছেড়ে দরজা খুললো।

রাজিবের বিষণ্ণ চেহারা সাকিবের নজর এড়ালো না।

– কি রে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছিস যে! শরীর খারাপ নাকি?

– নাহ, এমনিতেই, ঘুম ধরেছিল।

– রাতে খাইছিস?

– বাইরে থেকে খেয়ে আসছি। রাজিবের মুখ থেকে অকারণেই মিথ্যাটা বেরিয়ে গেল।

– মন খারাপ?

– আরে নাহ। রাজিব হাসার চেষ্টা করে।

রাত দশটা বাজে। রাতে খাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই রাজিবের। রুমে সাকিবের উপস্থিতি অসহ্য লাগছে। রাজিবের এখন একা থাকা জরুরি। সে তাই মেস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামলো। মফস্বলের রাস্তা রাত দশটা না বাজতেই প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। পাকা সড়ক ছেড়ে রাজিব কাঁচা রাস্তায় নামলো। হাঁটতে লাগলো ফসলের মাঠের পাশ দিয়ে। হেমন্তের ঠাণ্ডা বাতাস শরীরকে আরামদায়ক স্পর্শ দিলেও অস্থির হৃদয়কে শান্ত করতে পারছে না।

কান্নাকাটি করলে নাকি মন হালকা হয়! কিন্তু সন্ধ্যায় ঘণ্টা খানেক কাঁদলেও রাজিবের মন থেকে দুশ্চিন্তার পাহাড় এক বিন্দুও সরেনি। এখন কি করণীয় বুঝে উঠতে পারছে না সে।

পাঁচ লাখ টাকা যোগাড় করা অসম্ভব একটা ব্যাপার। এদিকে সবাই ধরেই নিয়েছে রাজিব প্রভাষক হতে যাচ্ছে। দশ লাখ টাকা কাজে না আসার কথা আব্বা শুনলে মরেই যাবেন। কালই ফোনে কথা হয়েছে উনার সাথে। চাকরিটা কবে হচ্ছে জানতে চেয়েছিলেন।

নিজের উপর রাজিবের প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। ধুর শালা! কেন যে কালাম স্যারের কথা শুনলো না! লোভে পড়ে পাপ করলে পরে পস্তাতে তো হবেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরিটা যেন ঘাইহরিণী যার ডাক রাজিব উপেক্ষা করতে পারেনি। কামাতুর হরিণের মতো ছুটে এসেছিল হরিণীর কাছে, আর ধরা পড়ে গেল শিকারীর পাতা ফাঁদে।

এলোমেলোভাবে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে রেল লাইনের পাশে চলে এসেছে রাজিব তা বুঝতেই পারেনি। মেস থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে চলে এসেছে।

রাজিব রেল লাইনের উপর দিয়ে হাঁটতে লাগলো। রাতের অন্ধকারে রেল লাইনের পাথুরে পথে হাঁটা বেশ কঠিন। তবে আজ মাথার উপরে অসংখ্য শ্বেতনক্ষত্র মেঘহীন আকাশের বুকে সাদা বাল্বের মতো জ্বলছে। চারদিক বেশ আলোকিত। ফলে লাইনের উপরে হাঁটতে রাজিবের খুব একটা সমস্যা হচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পর রেল লাইনটা কাঁপতে শুরু করলো। দূরের কোনো জেলা থেকে ট্রেন আসছে, অথবা স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। রাজিব হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। রেল লাইনের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে। ট্রেনটা খুব কাছে চলে এসেছে। খানিক পরেই ঝিকঝাক শব্দ শোনা গেল।

শব্দটা রাজিবের কর্ণকুহরে হাসপাতালের মেঝেতে স্ট্রেচারের চাকার ঘর্ষণের শব্দ হয়ে প্রবেশ করলো। পাশেই কোথাও জঙ্গলের ভেতরে করুণ স্বরে শেয়াল ডাকছে। রাজিবের মনে হলো কেউ যেন মরাকান্না শুরু করেছে। কান্নার শব্দ আর স্ট্রেচারের চাকার শব্দ মিলেমিশে ভয় জাগানিয়া এক তরঙ্গ সৃষ্টি করেছে। নিমীলিত চোখে রাজিব দেখতে পাচ্ছে হাসপাতালের লম্বা করিডোর। সেই করিডোর দিয়ে মরাকান্নার শব্দ তুলে একটা স্ট্রেচার যেন অনন্তকাল ধরে ছুটে চলেছে, কিন্তু পথটা আর শেষ হচ্ছে না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত