নিয়োগ পত্র

নিয়োগ পত্র

ভর দুপুরে রাজিবের হাতে একটা খাম এসে পৌঁছায়। চাকরির নিয়োগ পত্র। অন্যরা চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পেলে যেমন করে আনন্দে আত্মহারা হয়, রাজিব তেমন করে হল না। এই খামের ছোঁয়া পেয়ে যেন সে লজ্জাবতী পাতার মতো চুপসে যেতে লাগল। রাজিব বেশ কিছুক্ষণ নিরব হয়ে রইল।

এক টান দিয়ে খামের উপরের অংশ ছিঁড়ে ফেলে রাজিব। নিয়োগ পত্র। বের করে একবার চোখ বোলায়। তাতে লেখা আছে, আপনাকে অত্র প্রতিষ্ঠানে ভিক্ষুক পদে নিয়োগ দেওয়া হল। বেশ কয়েকবার চোখ বোলায় রাজিব। এর আগে বি,এ অনার্স কমপ্লিট করে কোথাও একটা চাকরি মেলাতে পারেনি। পথে পথে অনেক ঘুরতে হয়েছে। কত জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছে। কিন্তু না, কোনো নিয়োগ পত্র তার হাতে আসেনি। অথচ গতকালই সে ভিক্ষুক পদে অ্যাপ্লাই করেছে। আর আজই তার এপোয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে এলো। রাজিবের চোখে দু’এক ফোঁটা অশ্রু এসে জমা হয়। আগামী তিন দিনের মধ্যে তাকে চাকরিতে যোগ দিতে হবে। না হলে চাকরিটা হবে না।

তার মনে পড়ে পঞ্চাশ-ষাট বছরের সেই ভিক্ষুকটার কথা। সে রাজিবের জন্য বসের কাছে সুপারিশ করেছিল। নয়তো এই চাকরিটাও হত না। তাকে না খেয়ে হয়ত মরতে হত শেষকালে। যাক, বড্ড কৃতজ্ঞ সে ঐ লোকটার প্রতি। রাজিব নিয়োগ পত্রটা আর একবার পড়ে নিল। সেখানে লেখা আছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-কানুন কঠোরভাবে পালন করতে হবে। একটু ব্যতিক্রম হলেই চাকরি থেকে বরখাস্ত। প্রতিষ্ঠান থেকে পোশাক দেবে। বিভিন্ন জায়গায় ফাটা ছেঁড়া থাকতে পারে; তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। একটা মোবাইল দেবে। মোবাইল খরচ কোম্পানি বহন করবে। এবং এক মাস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে। কী করে কানা, খোঁড়া, ল্যাংড়া সাজতে হয়। ভিক্ষা করার বিভিন্ন কৌশল শেখানো হবে। দ্বিতীয় মাস থেকে বেতন গণনা। প্রতি মাসে সাত হাজার টাকা, থাকা ও পোশাক ফ্রি। এবং ভিক্ষার সমস্ত টাকা কোম্পানির নিকট জমা দিতে হবে। নিজের পকেটে একটাকা রাখলে এবং কোম্পানি তার প্রমাণ পেলে সাথে সাথে বরখাস্ত।

রাজিব মনে মনে ভাবে– কালই চাকরিতে যোগ দেবে। বেতন তো আর কম নয়। থাকা, পোশাক একদম ফ্রি। এছাড়া ভালো আর কী হতে পারে। রাজিব ভাবে– ঐ ভিক্ষুকটির সাথে দেখা করবে। তাই রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। খুঁজতে থাকে কালকের সেই ভিক্ষুকটিকে। খুঁজে তাকে পেতেই হবে। তার জন্য সে সুপারিশ করেছে। এটা কী যা তা ব্যাপার। কে করবে এমন সুপারিশ! এর আগে একটা সুপারিশের অভাবে তার চাকরি হয়নি। কলেজের অধ্যক্ষের সুপারিশে কাজ হয়নি। প্রশ্ন এসেছে কোন দল করো? কোনো দলই করিনা শুনে চাকরি মেলেনি। এসব ভাবতে ভাবতে রাজিব আল-আমিন হোটেলের সামনে এসে পৌঁছায়। এখানে খেতে এসেই ঐ ভিক্ষুকটির সাথে দেখা।

সেদিন রাজিবের পকেটে সামান্য কিছু টাকা অবশিষ্ট ছিল। পেটের ক্ষুধায় হোটেলে ঢুকেছিল। বসেছিল লোকটির পাশে। ভিক্ষুকটি সেদিন রাজিবকে জিজ্ঞেস করেছিল, সেরকম ভালো ফ্লাটের সন্ধান দিতে পারে কিনা? শহরে সে একটা সুন্দর ফ্লাট কিনতে চায়। রাজিব একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে– ফ্লাট কিনতে অনেক টাকার প্রয়োজন। এতো টাকা পেলেন কোথায়?

– ভিক্কে করে।

খুব স্বাভাবিক ভাবে লোকটি বলে।

লোকটির মুখে তখন গৌরবের হাসি ফুটে উঠে। অবাক হয় রাজিব।

তার মনে পড়ল, কী একটা পত্রিকায় যেন পড়েছিল, ‘দুবাইয়ে পাঁচ তারকা হোটেলে ভিক্ষুকেরা বিলাসবহুল জীবন-যাপন করছে।’ রাজিব ভাবে, আমাদের দেশটা কি উন্নত হয়ে গেল! তাহলে আমাদের মধ্যবিত্তদের এত কষ্ট কেন? সে অবাক নয়নে লোকটার প্রতি দৃষ্টিপাত করে।

– কত টাকার মধ্যে নিতে চান? মনের ভিতর থেকে আপনা আপনিই প্রশ্নটি বেরিয়ে আসে।

– তা প্রায় পঁচিশ-ত্রিশ লাকের মদি।

খুব সহজে উত্তরটি আসে।

লোকটি তখন খাসির মাংশ দিয়ে ভাত খাচ্ছিল। রাজিব খাচ্ছিল ডাল দিয়ে। খেতে খেতে প্রশ্নের তীর ছোঁড়ে রাজিব।

– দিনে আপনার কত আসে?

– বসের নিষেধ আছে। কওয়া যাবে না। পেপারে লিকলি মেলা ঝামিলা।

– আমার সাথে বললে অসুবিধে নেই। আমি কোনো পত্রিকা অফিসের লোক নই।

– তালি গোপনে বুলি। দিন হাজার পনেরশ আবার কুনু কুনু দিন তারও বেশি আসে।

বেকার রাজিব আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারে না। সে খাওয়া বন্ধ করে ডাল মাখানো হাত দিয়ে ভিক্ষুকের পা জড়িয়ে ধরে। এ কাজের ব্যবস্থা তাকে করতেই হবে। ভিক্ষুকটি তখন ভীষণ বিরক্ত হয়। রাজিব বলে– বস আমাকে এ কাজ দিতেই হবে। আমি করব।

ভিক্ষুক লক্ষ করে তার ছেঁড়া লুঙ্গিটিতে ডাল মাখানো হাতের ছাপ পড়েছে। এতে ভিক্ষুক রেগে না গিয়ে বরং মনে মনে খুশি হয়। এতে করে ভিক্কে করার সুবিধা হল।

লোকটি তখন শান্ত হতে বলল রাজিবকে। রাজিব আবার চেয়ারে বসে ঐ হাত দিয়ে খেতে বসল।

– প্রথমে এতো টেকা আপনি আয় করতি পারবেন না। ইর জন্যি অভিজ্ঞতা লাগে। এক কাজ করেন, দৈনিক ভিক্ষাবৃত্তি পত্রিকায় ফকির নিয়োগ পদে আবিদন করেন। বাকি কাজ আমি করবুনে। অভিজ্ঞতা নি দু’দিন পর নিজিই ব্যবসা খুলবা। ফকির ব্যবসা। আশা করি, তুমুও ফ্লাট বাড়ি কিনবা।

তার আকস্মিক আপনি থেকে তুমি বলাতে রাজিবের মনে কোনো রেখাপাত করেনি। বরং তাকে সে অনেক বেশি পাওয়ারফুল মনে করেছে।

তারপর আবেদন করে রাজিব। আর আজ এই নিয়োগ পত্রটি হাতে এল। রাজিব ঐ ভিক্ষুকটির সাথে দেখা করে।

তার পর পরই প্রশিক্ষণে চলে যায়। সেখানে প্রায় ৭০-৮০ টি ভিক্ষুক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। রাজিবকে ল্যাংড়া সাজার প্রশিক্ষণ নিতে হবে। সে তার বাম পা পিছনে ভাঁজ করে কষে বাঁধে। খুঁড়িয়ে চলার প্রশিক্ষণ দেয়।

না আর পারে না রাজিব। পায়ে ব্যাথা করে। শিরে টান ধরে। মনে হয় এ কাজ তার শরীরে পোষাবে না। খুব কষ্ট করে প্রশিক্ষণ দেয়।

পরবর্তী দিন আসে শরীরের গোশতো পচানো প্রশিক্ষণ। এতে এক ধরনের শিক গরম করে শরীরের বিভিন্ন অংশে ঢোকানো হবে। তারপর দেওয়া হবে মেডিসিন। ব্যাস, এতেই শুরু হবে পচন। রাজিব দেখে পাশে কাকে যেন পচন শেখানো হচ্ছে। এরপর রাজিবের পালা। ভয়ে রাজিবের মুখ শুকিয়ে যায়। বুকের মধ্যে হার্ট-বিট দুপ দাপ করে বাঁজতে থাকে। সে ভাবে, আর না, এখনই এখান থেকে পালাতে হবে। তার চোখে ক্রমেই যেন চৈত্রের খরা নামতে থাকে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত