বিয়েই কি জীবন

বিয়েই কি জীবন

– খুব কষ্ট করে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি।

আমার বিয়ে নিয়ে আমার পরিবারের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের অনেক মাথাব্যথা। ছেলেপক্ষ বারবার আসে দেখে চলে যায়। কারও পছন্দ হয়

– পড়াশোনা, কারও বা আমার পরিবার। কিন্তু কারোরই আমাকে পছন্দ হয় না। কারণ আমি এ যুগের সুন্দরীদের তালিকাভুক্ত নয়। যতটুকু পারি ধর্মকর্ম করি, অবসর সময়ে ছোট বাচ্চা পড়াই।

– কিন্তু ইদানিং বিভিন্ন জায়গা থেকে দেখতে আসছে। কারও পছন্দ হচ্ছে, কারও হচ্ছেনা ব্যপারটা এমনই।

কিন্ত গত তিনমাস ধরে এক পক্ষ দেখতে এসে আমাকে পছন্দ করে গেল। ছেলে দেখতে ভালো, পড়াশোনাও নাকি করেছে, ভালো একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করে। পরিবার বংশীয়, এক কথায় আমাদের মতো ফ্যামিলির মেয়ে এত ভালো পরিবার ডিজার্ভ করেনা। ভেতরে ভেতরে অনেকটা খুশি হলাম।

যাক এবার অন্তত মানুষের কথা থেকে বাঁচবো। তাছাড়া যেমন ভেবেছি ঠিক তেমন সংসার আল্লাহ মিলিয়ে দিচ্ছেন।
কিন্তু তারপরও ভেতরে ভেতরে খটকা লাগলো। এমন ফ্যামিলির ছেলে তো আমাদের পরিবারে আসার কথা নয়। তবুও কেনো আসলো? মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিলো। তারপর পরিবার অনেক খোঁজ নিয়ে দেখলো নাহ্ সব ঠিকঠাকই আছে। আর আমি নতুন করে শুনলাম ছেলের ভালোই বয়স হয়েছে। মনে চাপা কষ্ট থাকলেও মেনে নিলাম আমাদের এই সমাজব্যবস্থা। তারপর প্রায় দুমাস অনেক দেখাশোনার পর আমার এনগেইজমেন্ট হলো। কিন্তু এমন কপাল আমার একটা আংটি ও আমায় পরায়নি।

খুব কষ্ট পেলাম আর অবাক হলাম। তাহলে এ কেমন ভালো বংশ শুধু কিছু মিষ্টি আর পান নিয়ে ফর্দ করে যায়।
তাও মেনে নিলাম। তারপরও কেনো জানি মনের ভেতর থেকে খটকা গেলোনা। চিন্তা হচ্ছিল বেশ, দেরিতে বিয়ে হয়েও ভুল সিদ্ধান্ত নিলাম না তো! তারপর বিয়ের তারিখ পড়লো। আজ আমার বিয়ে ছিলো। দুপুর বারোটার দিকে অপ্রত্যাশিত কিছু কথা শুনলাম। যা শোনার পর ইচ্ছে হচ্ছিলো কেউ বিষ এনে দিতো যদি খেয়ে মরে যেতাম। সবাই ফিসফিস করে বলাবলি করছিলো, ছেলে পড়ালেখা আমার চেয়ে কম। মেনে নিলাম আমি।

তারপর শুনলাম ছেলে নাকি বিয়ে করেছে। কিছুক্ষণ পর শুনলাম, আমাকে বিয়ে করার জন্য ছেলেকে এক ভরি ওজনের সোনার চেইন আর ঘর সাজানোর জন্য ফার্ণিচার দিতে হবে। এসব শোনার পর ঘৃনা জন্মে গেছিলো নিজের প্রতি। চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বললাম, ছোটবেলা থেকে কষ্ট করে এত পড়াশোনা কার জন্য করলাম। আজ আমাকে জেনেশুনে তোমরা জলে ভাসিয়ে দিলে। এ কি আমার প্রাপ্য ছিলো। এসব বলতে এত কষ্ট হচ্ছিলো বোঝানোর মত না। তখন আরও কষ্ট হচ্ছিল যখন দেখলাম আমার ইমিডিয়েট ছোট দু ভাই আজ প্রথম এসব জানলো এবং নিরবে চোখের পানি ছাড়লো। চুপসে গেলাম আমি।

অনেকে বলাবলি শুরু করলো, সব বাপ ,মায় জানতো পেটে পেটে রাখছে মাইয়্যাটারে জানায় নাই। এত পড়াশোনা করাইয়া অবশেষে বয়স্ক ছেলের লগে বিয়া দিবো। আমার মা তখন কঠিন কথায় চিৎকার দিয়ে বলল, আত্মীয় স্বজন তো কম না আমগো, কইই কোনদিন তো কেউ একটা প্রস্তাব দিলো না। ক্যান আমার মাইয়্যা কালো বইলা। আজ এত কথা ক্যান! কেউ কোন উল্টাপাল্টা কথা কইবেন না। আমার মাইয়্যা আমি মারমু, আমি কাটমু গাঙে ভাসাইয়া দিমু। এই বলে মা কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরে ছুটলো।

মায়ের এই সত্য কথা, দৌড়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে রান্নাঘরে যাওয়া আমাকে দমিয়ে দিলো। হঠাৎ মনকে স্বান্তনা দিয়ে চুপসে গেলাম। কিন্তু ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। একটু পর বর আসবে বিয়েও হবে। কিন্তু আমার কথা শোনা শেষ হবেনা। শশুরবাড়িতে আরও কঠিন কঠিন কথা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। কালো বলে কথা, সব দায় আমার। যার বয়স বেশি, তার দায় নেই। যিনি যৌতুক নিচ্ছেন তার দায় নেই। যিনি আগে বিয়ে করছেন তার দায় নেই। সব দায় আমার, আমি কালো। আর তার কোন দায় নেই, সে ছেলে। মরলেও তার দাম লাখটাকা। আর আমার দাম তো রংয়ের কাছে হারিয়ে গেছে। তবুও আমি সব মেনে নিয়ে সুখী হতে চাই। জানিনা কতটুকু সুখ প্রাপ্য আমার।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত