তুষার

তুষার

ছেলেটা লম্বা। শরীরের তুলনায় হাত পায়ের নখগুলো একটু বেশিই শীর্ণ। সামনের দুটি দাঁত অতি মাত্রায় বড়। মুখটা বামদিকে একটু বাঁকা। সারাক্ষণ সেই বাঁকা মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা। হাত পায়ের শীর্ণকায় আঙুলগুলোও বেঁকে আছে ষাট ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে। কিছুক্ষণ পর পরই কোমর থেকে মায়ের গুঁজে দেওয়া রুমাল বের করে লালা মোছার বৃথা চেষ্টা করছে তুষার। কোমরের কালো সুতার সাথে ঝুলছে অনেকগুলো তাবিজ, দুটো চাবি। সাইকেলে তালা লাগিয়ে রেখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান কক্ষের সামনে এসে দাঁড়ায় তুষার।

পঞ্চম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষক শাহানা আফরোজ ইংরেজি নিচ্ছিলেন। তুষার অনুমতি চাইতে কিছু একটা বলল। শাহানা আফরোজের কানে তা গোঙানী মনে হলো। পড়ানোর মাঝখানে ছেদ পড়লে খুব বিরক্ত হন তিনি।

– কী চাই? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুচকে জানতে চাইলেন তিনি।

ক্লাসের সব ছাত্র একসাথে বলে উঠল, ম্যাম তুষার কথা বলতে পারে না। সবার একত্রিত চিৎকারে শাহানা আফরোজের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল, ধমক দিয়ে তুষারকে ভেতরে আসতে বললেন। তুষারের জন্য প্রথম বেঞ্চটিতে বসার জায়গা নির্দিষ্ট করা। বসে পড়ল তুষার।

তুষারের অস্বাভাবিক চেহারা দেখলেই বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে শাহানা ম্যামের। যতটা পারা যায় তিনি তুষারকে এড়িয়ে চলতে লাগলেন। ওর দিকে না তাকানোর চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু কেন যেন চোখটা তুষারের দিকেই চলে যায়।

তুষার সবসময়ই যেন তার দিকে তাকিয়েই হাসছে, বাঁকা মুখ দিয়ে লালার স্রোত বয়ে চলছে। ভয়ংকর মনে হয় সে হাসি শাহানা ম্যামের কাছে।

কয়েক দিন পরের চিত্র…

শাহানা আফরোজ প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন করতে যাচ্ছেন, যাতে তাকে অন্য ক্লাস দেওয়া হয়। ঘুমের মধ্যেও তিনি তুষারের ভয়ংকর হাসি দেখে জেগে উঠছেন, মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে গিয়ে আর ঘুমাতে পারছেন না তিনি। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, চোখ দুটোও ডুব দিয়েছে যেন কোন গর্তের মাঝে। এর সমাধান দরকার,

“এভাবে চললে পাগল হয়ে যাবো আমি।”, মনে মনে ভাবেন শাহানা ম্যাম। কিছুতেই তিনি তুষারের ক্লাসে যাবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জানেন না স্কুলের বাকিরা বিষয়টা কিভাবে দেখবেন!

প্রধান শিক্ষক বসেন মাঠের অন্যপাশের ভবনটিতে। আবেদনপত্রটি হাতে নিয়ে মাঠের একপাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন শাহানা ম্যাম। মাঠে এলাকার ছেলেরা ফুটবল খেলছে। হঠাৎ করেই বলটা এসে লাগে শাহানা ম্যাম-এর মুখে। ব্যালেন্স ঠিক রাখতে না পেরে পড়ে যান তিনি। চশমার কাঁচ ভেঙ্গে কেটে গেছে বাম চোখের কোণ, তা থেকে রক্তের ফোটা গড়িয়ে সাদা শাড়িটাকে যন্ত্রণার রঙে রঙিন করে তুলছে। যেসব ছাত্ররা হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল, তার মধ্যে ম্যামের প্রিয় আর মেধাবী ছাত্রদের দেখে লজ্জা আর বেদনায় মুষড়ে পড়লেন তিনি! যেন হাসির বন্যা মাঠজুড়ে! ঠিক তখনি… ছলছল চোখে বাঁকা শীর্ণ কতগুলো আঙ্গুল বাড়িয়ে দিল কেউ তার দিকে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত