পাপের শাস্তি

পাপের শাস্তি

তোমার মা আমার একার নাকি?তোমার তো আরও দুই ভাইয়ের বউ আছে।একজন জামাইয়ের সাথে বিদেশে গিয়ে সংসার করছে।অন্যজন চাকরির দোহাই দিয়ে জামাই নিয়ে শহরে বাসায় থাকছে।তোমার একমাত্র আদরের ঘরের দুলালী বোন তো পারে কিছুদিন তোমার মাকে নিজের শ্বশুর বাড়ী নিয়ে রাখতে।তা উনি করবেন না কোন দিন।কিছুদিন পরপর এসে মায়ের জন্য আলগা পিরিতি দেখিয়ে চলে যায়।এসব দেখলে ঘেন্না লাগে আমার।যে যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত।এই বুড়ির ভার কেউ নেয় না।বোঝাটা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে সবাই দিব্বি যে যার সংসার সামলাচ্ছে।আমার বাবা মা কি আমাকে এসব করার জন্য বিয়ে দিয়েছে….

– চুপ করো।আমার মাকে নিয়ে বাজে কথা বলবে না।আর বুড়ি ডাকছো কাকে?ভুলে যেও না তুমিও একদিন বুড়ি হবে।

– কেনো চুপ হবো।যা সত্য তাই বলেছি।তোমার ভাইদের বলো তোমার মাকে কিছুদিন ওদের কাছে নিয়ে যেতে।

– আস্তে কথা বলো।মা শুনতে পাবে।আমার মাকে নিয়ে ভাগাভাগি করো না সেলিনা।

– শুনলে শুনুক।আমি মিথ্যা বলছি না।

মামুন সাহেব ও তার স্ত্রী সেলিনার মধ্যে আজ কুলসুমা বেগমকে নিয়ে তুমুল ঝগড়া বেঁধেছে। আর কুলসুমা বেগম পাশের রুম থেকে ছেলে আর ছেলের বউয়ের ঝগড়া শুনে নীরবে চোখের জল ফেলছে।

৮০/৮৫ বছর বয়সী কুলসুমা বেগম আজকাল ছোট বাচ্চাদের মতো হয়ে গেছে।দিনের বেশিরভাগ সময় শোয়াতে কেটে যায় উনার।ভালো করে নিজ হাতে খাবার খেতে পারে না।লোকমা ধরে ভাত খেতে পারে না।হাত কাঁপতে কাঁপতে ভাতের লোকমা নিচে পরে যায়।দুই দিন আগেও উনার হাত থেকে চায়ের কাপ ছুটে পরে গিয়ে ছিলো।শখের কেনা ডিনার সেটের কাপ ভেঙে ফেলাতে শাশুড়িকে অনেক অকথ্য ভাষায় কথা বলেছিলো সেলিনা।কুলসুমা বেগম ছেলের বউকে কোন প্রতিউত্তর দিতেন না।শুধু ভয় ভয় চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন ছেলের বউয়ের দিকে। একদিন সন্ধ্যায় ফ্লোরে পানের রস দেখতে পেয়ে সেলিনা শাশুড়িকে বললো,

– আপনাকে কতোবার বলেছি পান খেয়ে পানের পিক যেখানে সেখানে না ফেলতে।ঘরের দেয়ালে রং করিয়েছি এক মাস হয়নি।আপনি পানের পিক দিয়ে দেয়ালের অবস্থা বারোটা বাজিয়েছেন।ফ্লোরেও দাগ করে ফেলেছেন।আমাকে কি কাজের বুয়া পেয়েছেন?কতোবার বলেছি ওয়াশরুমে বেসিন আছে,সেখানে পানের পিক ফেলতে।আমার কথা কি আপনার কানে ঢুকে না?

– মারে বয়স হয়ছে।কিছু মনে রাখতে পারি না।আমি আগেরকার যুগের মানুষ।এতো নিয়মকানুন জানি না।মারে আর ভুল হবে না।

– আপনি একের পর এক ছেলে মানুষী করে যাবেন,আর আমি সহ্য করে যাবো।আজ থেকে আপনার পান খাওয়া বন্ধ।আর আমি যে এসব বলেছি আপনার ছেলের কানে তুলবেন না।

আমার ঘাড়ে বুড়ির বোঝা চাপিয়ে দিয়ে সবাই যে যার বউ বাচ্চা নিয়ে মজা করছে।কোন কপাল নিয়ে এই সংসারে আসলাম।ঝামেলা সব আমার কাঁধে তুলে দিয়ে সবাই দিব্বি আরামে আছে।

কথাগুলো বলতে বলতে সেলিনা হনহন করে কুলসুমা বেগমের রুম থেকে চলে গেলেন।আর বৃদ্ধা কুলসুমা বেগম অসহায়ের মতো ছেলের বউয়ের পথ চলা দেখে আছে। ৮০/৮৫ বছর বয়সী কুলসুমা বেগমের কোন খাবারের প্রতি লোভ নেই।ভাতও তেমন খেতে পারেন না।অনেক সময় না খেয়েই ঘুমিয়ে যান।সারাদিন মুখে পান চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে উনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতো।সেই পানও আজ রিজিক থেকে উঠে গেলো। কুলসুমা বেগম মনে মনে বলতে লাগলো,

– মামুনের বাপ,আপনে ঐ পারে চইলা গিয়া ভালাই করছেন।এই পারে থাকলে এতো অপমান সইতে পারতেন না।মরার আগে আপনে আমারে বলছিলেন,আমার তিন ছেলে আমারে মাথায় তুইলা রাখবো।আমার সুখের অভাব হইবো না। হ আমি মেলা সুখে আছি।তিন ছেলে মিইলা আমারে নিয়া ভাগাভাগি করতেছে।আমি মেলা সুখে আছি গো মামুনের বাপ,মেলা সুখে আছি।

প্রায় চার/পাঁচ দিন হতে চললো।কুলসুমা বেগমের পান খেতে ইচ্ছা করলেও ছেলের বউ সেলিনার ভয়ে মামুন সাহেবকে পান আনার কথা বলতে পারছেন না। অনেক দিনের অভ্যাস সহজে পরিবর্তন করা যায় না। একদিন ৭/৮ বছর বয়সী ছেলে রিহান( মামুন সাহেব ও সেলিনার ছেলে) স্কুল থেকে এসে কুলসুমা বেগমের রুমে এসে একটা প্যাকেট হাতে দিয়ে বললো,

– দাদু মনি এগুলো নাও।

– এগুলা কি দাদু ভাই।

– তোমার জন্য পান এনেছি দাদু মনি।

– তুমি টাকা কোথায় পেলে দাদু ভাই?

– আমি আমার ২/৩ দিনের টিফিনের টাকা জমিয়ে তোমার জন্য পান এনেছি দাদু মনি।এতো কিছু ভেবো না তো।তুমি পান খেয়ে নাও। কুলসুমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে রিহানকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করতে লাগলো।

– তুই অনেক বড় মানুষ হবি দাদু ভাইভাই।আল্লাহ আমার নাতীকে অনেক হায়াত দান কর।

রিহানের হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে চোখ মুছতে মুছতে পান খাওয়া শুরু করে দিলো কুলসুমা বেগম।পান পেয়ে যেনো তিনি অমৃত কিছু পেয়েছেন।কুলসুমা বেগমের চোখে মুখ সেই কি আনন্দের হাসি। একটু পরেই সেলিনা এসে কুলসুমা বেগমকে পান খেতে দেখে চিৎকার শুরু করে দিলো।

– এই ছোট্ট বাচ্চাকে বাজারে পাঠিয়ে আপনি পান আনিয়েছেন?পান না খেয়ে কি কোন মানুষ মারা যেতে শুনেছেন?রাস্তায় যদি রিহানের কোন সমস্যা হতো? কোন ক্ষতি হলে তো আমার ছেলের হবে।তাতে আপনার কি?আপনি আছেন আপনার পান নিয়ে।

– আম্মু দাদু আমাকে পান আনতে বলেনি।আমি নিজে এনেছি।আমি বাজারে যাইনি।দারোয়ান চাচার হাতে পান আনিয়েছি।তুমি অযথা দাদুকে বকছো।

– চুপ কর তুই।কোন সাহসে তুই আমার থেকে লুকিয়ে পান আনতে গেছিস?

গালে ও পিঠে মারতে মারতে ছেলেকে রুম থেকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন সেলিনা।রিহানের পিঠের প্রতিটা মার যেনো কুলসুমা বেগমের গায়ে পরছে। কুলসুমা বেগমের বুঝতে বাকী নেই,সেলিনা শাশুড়িকে কিছু করতে পারছে না।তাই রাগ গুলো ছেলের উপর ঝাড়ছেন। সেদিন রাতে খাবার না খেয়ে শুয়ে গেলেন কুলসুমা বেগম।রিহানের আনা সব পানগুলো খুব তৃপ্তির সাথে খেয়ে চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে গেলেন তিনি। সকালে হাজার ডাকাডাকির পর কুলসুমা বেগমের ঘুম আর ভাঙেনি। শাশুড়ির মৃত্যুতে সেদিন সকালে সেলিনা বেগমের মাথার উপর থেকে যেনো আকাশ সমান বোঝা নেমে গেছে।

২৫ বছর পর বৃদ্ধাশ্রমে আধাপাকা চুলের বয়স্ক বিধবা মহিলা সেলিনা হুইল চেয়ারে বসে আছে।একমাত্র ছেলে রিহান তার বউ বাচ্চা নিয়ে কানাডায় থাকে।সবার ভিসা বের হয়েছিল।কিন্তু সেলিনার ভিসা বের করতে না পারাই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যান। সেলিনার মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছা হয় নাতী নাতনী নিয়ে খেলতে।মুহূর্তেই তার আগেরকার দিনের কথা মনে পড়ে যায়।সামান্য পানের জন্য রিহানের সামনে শাশুড়িকে কতো অপমান করেছিলো।সেলিনা বুঝতে পারে সে তার পাপের শাস্তি পেয়েছে।সেলিনার খুব ইচ্ছা করছে শাশুড়ির পা ধরে ক্ষমা চায়তে।কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে।

কিছু কিছু পাপের শাস্তি পাওয়ার জন্য পরকালে যেতে হয় না।আল্লাহ দুনিয়াতে দিয়ে দেন। একজন মা একাই তার ছোট্ট একটা পেটে দুই/তিন জনের অধিক সন্তানকে দশ মাস দশ দিন ধারণ করে পৃথিবীর আলো দেখান।লালন পালন করে প্রতিটা সন্তানকে বড় করে তোলেন।আর বড় হওয়ার পর সেই সন্তানেরা মা বাবা নিয়ে ভাগাভাগি শুরু করে দেন।মা বাবার ভার একা বহন করতে তারা নারাজ। পৃথিবীর সব বাবা মা ভালো থাকুক। কোন বাবা মায়ের স্থান যেনো বৃদ্ধাশ্রমে না হয়।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত