বুদ্ধিমতী

বুদ্ধিমতী

আজ পাত্রপক্ষ আমাকে দেখতে আসবে। সকাল থেকে আব্বা চিৎকার চেচাঁমেচি করে বাড়ি মাথায় তুলছে। আমার আব্বা ভিষণ রাগী মানুষ। আব্বার পূর্ব পুরুষরা জমিদার ছিল। জমিদারি চলে গেছে, পূর্বপুরুষরা মারা গেছে কিন্তু রাগটা আব্বার ভিতর রয়ে গেছে। আব্বা রাগ মা এর উপরই বেশি করে,আমাদেরও বঞ্চিত করে না। কথায় কথায় গাধা বলা আব্বার স্বভাব।

আব্বা হুংকার দিয়ে উঠলো, কই হলো তোমার? আর কতো দেরি?সামান্য কয় পদ রান্না করতে রাত বানিয়ে দেবে দেখছি, যত্তসব নিঃগুণে মেয়েমানুষ।তোমার মেয়ে জামাইরা আসছে না কেন? যেমনি মা তার তেমনি মেয়েরা। মা করুণ গলায় বললো,এইতো হয়ে যাচ্ছে আপনি টেনশন করবেন না, শরীর খারাপ করবে। আমার মা অসম্ভব ভাল মানুষ। আব্বাকে ভিষণ ভয় পায়।আব্বার জমিদারি মেজাজের সামনে মা কেঁচো হয়ে থাকে।

আমরা তিন বোন মিনু, তনু আর আমি অনু।আব্বা ভিষণ রকমের প্রেমের বিপক্ষে। প্রেম করা একেবারেই পছন্দ করে না। বড়ো আপা উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় প্রেমে পড়ে।প্রেম পত্র আপা বই এর ভিতর সেরে রেখেছিল। আব্বা হঠাৎ আপাকে ডেকে বলল,মিনু আমি তোর পড়া ধরবো। দেখি কেমন পড়াশোনা করছিস।বলতে বলতে আব্বা বই টেনে পাতা উল্টাতে লাগলো,যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয় চিঠিটা আব্বার হাতে পড়লো আর যায় কোথায়।

আব্বা চিৎকার করে উঠলো,তোর এতো বড়ো সাহস প্রেম করিস! বেয়াদব মেয়ে। এত্তবড় গাধা!প্রেমপত্র রেখেছে বই এর ভিতর। গাধা ওখানেই তো মানুষ আগে হাত দেবে। সেরে রাখবি এমন জায়গায় যেখানে মানুষ দেখবে না। মা যেমন গাধা, মেয়ে হয়েছে তেমনি গাধা। এইচ এস সি পরীক্ষা দিয়ে নে আগে,তারপর তোর প্রেমকুমারী হওয়ার সাধ আমি ঘুচাচ্ছি।

এইচএসসি পরীক্ষার পরপরই আব্বা বড়ো আপার বিয়ে দিয়ে দিলো।আপা খুব কান্নাকাটি করেছিল কিন্তু লাভ হলো না। আব্বা মেজ আপা আর আমাকে ডেকে বললো, তনু অনু মন দিয়ে শোন খবরদার প্রেমের ধারেকাছে যাবি না, তাহলে কিন্তু সাথে সাথে বিয়ে দেবো তার আগে চাবকে পিঠের ছাল তুলবো। আমি আর মেজআপা ভয়ে প্রেমের ধারেকাছে যাইনি।এইচএসসি পরীক্ষায় কিভাবে জানি মেজ আপা ফেল করলো।

আব্বা অগ্নিমূর্তি ধারণ করে চিৎকার করে বলল,কত্তবড় গাধা পরীক্ষায় ফেল করে, আমার বাড়িতে ফেলকুমারীর কোন জায়গা নেই। তোর তাড়াতাড়ি বিয়ের ব্যবস্হ্যা করবো।মেজ আপার ও বিয়ে হয়ে গেল। আমি বাড়িতে একা প্রেম করিনি মন দিয়ে পড়াশোনা করি না হলে আব্বা কখন না জানি আমাকেও বিয়ে দিয়ে দেয়।ভালভাবে এইচএসসি পাশ করলাম।

অনার্স পড়ার সময় কিভাবে যেন আমার ক্লাসমেট সাব্বিরের প্রেমে পড়লাম। গোপনে চুপিসারে প্রেম করছি।আব্বা তো কি কোন আত্মীয় স্বজন যেন জানতে না পারে সেদিকে খুব খেয়াল রেখেছি। আমি আর সাব্বির এম এ পাশ করেছি, এখন আব্বাকে বলতে হবে কিন্তু সাহস পাচ্ছি না।এর মধ্যে আব্বা পাত্র জোগাড় করে ফেলেছে আজ দেখতে আসবে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুই আপা দুলাভাই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে চলে এসেছে।দুই আপা মিলে আমাকে সুন্দর করে সাজালো।নিজেকে দেখে চমকে উঠলাম, কি সুন্দর লাগছে!

পাত্রপক্ষ চলে এসেছে, আব্বা সুন্দর করে হেসে হেসে কথা বলছে।আমি শান্ত ভঙ্গিতে পাত্রপক্ষের সামনে বসলাম।আমাকে ওরা খুব পছন্দ করলো।যাওয়ার সময় বলে গেল পরশুদিন এনগেজমেন্ট ঐ দিনই বিয়ের দিন তারিখ ঠিক হবে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। পরেরদিন সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার নাম করে সাব্বিরের সাথে দেখা করলাম।

সাব্বির আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আগামীকাল এনগেজমেন্ট তারপর ই বিয়ে। বলো কি! এখন উপায়? চলো আমরা পালিয়ে বিয়ে করি। তোমার মাথা খারাপ! তুমি তো আব্বা কে চেনো না যেখানেই যাই না কেন খুঁজে এনে জ্যান্ত কবর দেবে। তাহলে কি করতে চাও? চলো দু’জনে আব্বার সাথে দেখা করে ভালভাবে বুঝাই।আব্বা মানলে তো ভাল না হলে ইঁদুর মারা বিষ খেয়ে দু’জনে শিরী ফরহাদ হয়ে যাবো। পালিয়ে বিয়ে করবো না।

আমি আর সাব্বির বাড়িতে এসে,সাব্বির কে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে আমি ঘরে ঢুকলাম। আব্বা সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়ছে।আস্তে করে আব্বার পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম, বুকের ভিতর ড্রাম বাজছে। দম আটকিয়ে যাচ্ছে। সাহসে ভর করে চোখ বন্ধ করে বলে ফেললাম, আব্বা আমি একজন কে ভালবাসি। বাজখাঁই গলায় আব্বা চিৎকার করে বললো, কি বললি? আব্বার চিৎকারে বাড়ির সবাই ছুটে আসলো।

আমি এক নিঃশ্বাসে চোখ বন্ধ করে বলে ফেললাম, আব্বা সাব্বির নামে একজনকে ভালবাসি আমার সাথে পাশ করেছে চাকরি পেয়েছে আগামীমাসে এক তারিখে জয়েন করবে ওর বাবা স্কুল মাষ্টার। চোখ খুলে দেখি বাবা অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, ছেলেটাকে একদিন বাসায় নিয়ে আয় কথা বলি। আব্বা ও এসেছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। গাধা মেয়ে ছেলেটাকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিস কেন?ভিতরে নিয়ে আয়।

আমি তাড়াতাড়ি সাব্বির কে ভিতরে নিয়ে আসলাম। আব্বা মার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো, তুমি তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকলে কেন?ছেলেটার জন্য মিষ্টি নিয়ে এসো।গাধা মহিলা গাধাই থেকে গেল। মা হাসি মুখে মিষ্টি আনতে গেল।আমার আনন্দে চোখে পানি চলে আসছে। এই প্রথমবার বুঝলাম আমার আব্বা অসাধারণ একজন মানুষ। একদম নারকেলের মতো উপর শক্ত ভিতর নরম। বড়ো আপা আস্তে করে করুণ গলায় বলল, আব্বা আপনি তো প্রেমের বিপক্ষে অথচ অনুর প্রেম মেনে নিচ্ছেন!

গাধার মত কথা বলবি না তো মিনু। অনু কি তোর মত গাধা যে এইচএসসির আগে প্রেম করে বসে আছে? রীতিমতো এম এ পাশ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যোগ্য ছেলের সাথে প্রেম করেছে। সন্তান যদি যোগ্য ছেলের সাথে প্রেম করে তাহলে কোন বাবা মা মেনে নেয় না শুনি? সন্তানের সুখই তো বাবা মায়ের সুখ। নিজেকে আগে যোগ্য হতে হবে আর যোগ্য ছেলের সাথে প্রেম করতে হবে। আমার ছোট মেয়েটা কিভাবে যে গাধার মেয়ে হয়ে বুদ্ধিমতী হলো! তোরা দুইটা গাধার মেয়ে গাধা আর অনু হচ্ছে গাধার মেয়ে বুদ্ধিমতী।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত