লাশ

লাশ

রিকশাটা কোন রকমে সাইডে করে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ঢুকল রফিক। তাড়াহুড়ো করে কেবিনে ঢুকেই চিল্লিয়ে বলল,

-রিতা ( আশেপাশের সবাই একবার তাকাল রফিকের দিকে। রিতার সাথে চোখাচোখি হতেই হাতের ইশারায় চুপ করতে বলল। রফিক এবার রিতার কাছে গিয়ে বলল) ও রিতা ডাক্তার আফায় কি কইলো? আমাগো মাইয়া হইবো না পোলা হইবো?

– রিতা হতভম্ব হয়ে বলল, আগে কন আপনি কান্দেন ক্যান? (রফিকের ছলছল চোখ দেখে বলল রিতা)

– প্রথমবার বাবা হমু তো হের লাইগ্যা খুশির কান্দন কান্দি। ও তুমি বুঝবা না, তুমি কও তো ডাক্তার আফায় কি কইল।

– রিতা লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, মাইয়া হইবো কইলো..

– সত্যি!!! ওরে খোদা,তোমার অশেষ দয়া। ( রফিকের চিল্লানিতে আবারও সবার নজর ওদের দিকে গেলো) রফিক এসব তোয়াক্কা করে বলল,শোন রিতা আমার মাইয়ার নাম রাখুম রিমা। বাপের নামের সাথে মিল কইরা রাখে না? ওইরকম নাম হইব।

– রিতা মুচকি হেসে বলল, আইচ্ছা আফনের ইচ্ছাই থাকব।
– আর শোন শোন, ওরে শুদ্ধ ভাষায় কথা শিখাইবা। আমাগো ভাষার কথা কেউ বুঝে না। আর শোন আমাগো মাইয়ারে ওই ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করামু। পটর পটর কইরা ইংরেজি কইবো।
– তাইলে তো আমাগোরেও শুদ্ধ ভাষা কওন লাগব।
– ও তুমি টেনশন কইরো নাম। আমি এখন সব পারি।
– তাই নাকি? কে শিখাইলো আফনেরে?
– জানো রিতা ওই যে,দীপক স্যারের মাইয়ারে প্রতিদিন স্কুল দিয়া আসিনা,

সে সেদিন হঠাৎ কইরা আমারে ইংরেজিতে কয় হাউ আর হউ আঙ্কেল? আমি তো হা কইরা তাকাই রইলাম, কি কমু খুঁইজ্যা পাইলাম না। পরে শিখাইলো হেইডার মানে হইলো, কেমন আছ? এহন আমিও কইতে পারি গুড মর্নিং, হাউ আর হউ? হাহাহাহা বলেই হাসতে লাগল রফিক। (আশেপাশের মানুষ বেশ বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে আছে রফিকের দিকে।)

– রিতা রাগী চোখে বলল, আস্তে কথা কন না। মানুষজন চাইয়া রইছে আফনের দিকে।
– আরে মানুষ এমনই হয়, তুমি আমার কথা শুনো।

জানো মেয়েটারে নিয়ে যাওনের সময় সারাটা রাস্তা আমারে পিছনে তাকাইয়া থাকতে হয়। ও কথা কইতেই থাকে কইতেই থাকে। আর আমি শুধু হা কইরা গিলতে থাকি। খুব পাকনা মাইয়াটা, তয় বেশি পটর পটর করাও ভালা না।

– রিতা অবাক হয়ে বললো, হঠাৎ আফনে আমারে তুমি কইরা ডাকতাছেন ক্যান?
– আরে না তুই কইরা ডাকতে কেমন জানি লাগে। ভাল শোনায় না, হের লাইগ্যা এখন থাইকা তুমি কইরা ডাকমু। রফিক কিছুটা লজ্জা পেল।

– না হইবো না।তুই কইরা ডাকলে আমার ভাল্লাগে। আফনে আমারে তুই কইরা ডাকবেন। আমার অত তুমি টুমি ভাল্লাগে না। এতদিন পরে আফনে পরিবর্তন করবেন ক্যান।

– রফিক মিয়া হেসে দিলেন। রিতার গাল টেনে বললেন,আমার লক্ষী বউটা আইচ্ছা। এরই মধ্যে পাশের ঘরের চম্পা খালা এলেন।
– কি রে তোরা জামাই বউ মিইল্লা কি ফুটুস ফুটুস করতাছস?
– আরে কিছু না খালা। তুমি খাওয়া দাওয়া করছ তো?
– হ রে বাপ।

( রফিকের বাবা-মা মারা যায় সেই ছোটবেলাতেই। ওর আর আপন বলতে কেউ নেই। রিতারও মা নেই, তাই পাশের ঘরের চম্পা খালাই ওদের সবচেয়ে বেশি আপনজন। রিতা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই চম্পা খালা তাকে আর কোন কাজ করতে দেন নি। রান্না বান্না সব উনিই করতেন। এখনও ওদের সাথে হাসপাতালে আছেন। দুঃসময়েও যে পাশে থাকে সেই সবচেয়ে বড় আপনজন হয়।) রিতার দিকে তাকিয়ে রফিক বলল,

– শোন রিতা ডাক্তার আফায় কইছে কালকা অপারেশন করবো কইছে। আমি সব টাকা রেডি করতাছি। এহন গেলাম..

– আফনে এত টাকা কই পাইবেন?

– তোমার এত কিছু ভাবন লাগবো না। টেনশন কইরা শরীর নষ্ট কইরো না। তুমি আরাম কইরা ঘুমাও।
– রিতা অভিমানের সুরে বলল, আফনে সবকিছু লুকান ক্যান?
– রফিক কথা কাটিয়ে বলল, মসজিদে দুইটা মোমবাতি দিমু?
– রিতা হেসে ফেলল। আইচ্ছা শুক্রবার বিকাল ৫ঃ২৫ মিনিট…

– স্যার আফনে অন্য রিক্সা দেখেন আমি যাইতে পারুম না। আইজকা আমার বউয়ের অপারেশন হাসপাতাল যাউন লাগবো তাড়াতাড়ি।

– ভাইরে হাতজোড় করে বলছি,আমার বাসায়ও মা অসুস্থ, তাড়াতাড়ি যেতে হবে প্লিজ। আর কোন রিক্সা খালি নাই এজন্য এত রিকুয়েষ্ট করছি।

– রফিক মিয়া মন খারাপ করে বললো, কি আর করার মায়ের দোয়াই দিয়া নিতাছেন।আইচ্ছা চলেন।

(রফিক সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে আজ তার মা আসবে। মিষ্টিও কিনে রেখেছে রিকশার সিটের নিচে। অনেক কষ্ট করে অপারেশনের টাকা জোগাড় করতে পেরেছে। ঋণ কবে শোধ করতে পারবে সেটাও জানে না। কিন্তু মানুষ যে তারে বিশ্বাস করে টাকা দিছে এতে সে ভীষণ খুশি।) যাত্রী’কে নিয়ে পৌঁছাতে অনেকটা সময় চলে গেছে। নামিয়ে দিয়ে বড় রাস্তা ধরে হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলেন রফিক মিয়া এমন সময় একটি কল আসলো চম্পা খালা অনেক কষ্ট করে রিসিপশনের মেয়েটিকে দিয়ে রফিককে কল দিয়েছে। মেয়েটি বলছে, আপনি কি মি.রফিক বলছেন?

– জি আফা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল রফিক।

– আপনার স্ত্রী রিতা ও তার সন্তান’কে বাঁচানো সম্ভব হয় নি। আপনি হাসপাতাল থেকে লাশগুলো দাফনের জন্য নিতে পারেন।

কথাটা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলেন রফিক মিয়া। পা দিয়ে প্যাডেল দিচ্ছেন না। তারপরও রিক্সা একটু একটু করে চলছেই। এরই মধ্যে কোথা থেকে যে একটা ট্রাক এসে সজারো ধাক্কা দিলো তাও বুঝতে পারলেন না। রফিক মিয়া সাথে সাথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। সাথেসাথেই আশেপাশের অনেক লোকজন জড়ো হয়েছে আরেকটা লাশ দেখতে। লাশপ্রিয় মানুষগুলো লাশ দেখতেই ব্যস্ত বেশি।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত