মায়ের আঁচল

মায়ের আঁচল

এই রে সেরেছে! ৩৩ টা মিস কল।আমার কপালে আজ দুঃখ আছে রে।তার মধ্যে মা দিয়েছে ২২ টা,তাবিহা দিয়েছে ৩ টা,অপরিচিত নাম্বার থেকে ৮ টা।ঘড়ির কাটা তখন ঠিক রাত ১২ টা।কেরাম খেলতে খেলতে কখন যে সময় পার হয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না।ফোনটাতে রিংটোনও বাজে না।ব্যাটারি, চার্জ,মাইক্রোফোন সমস্যা তো আছেই।টেপ দিয়ে কোন মতে মোবাইলের ক্যাসিংটা রেখেছি। কি করবো বলেন নতুন ফোন কিনবো সে সমর্থ নেই।আব্বু ৫ বছর আগে ব্রেইন স্টোকে মারা গিয়েছে।যাই হোক মা রে ফোন দেই কি বলে শুনি।

কুত্তার বাচ্চা রাত কত হয়েছে হ্যাঁ? বাড়ি আসার নামে কোন খোজ নাই!পাইছিস টা কি? এই তো মা ৫ মিনিট লাগবে।আমি চলে আসতেছি। আইজকে আয় তোর খবর আছে,তোর জন্য আমার ঘরের দরজা বন্ধ। তোরে কতবার বললাম বাড়ি চল,বাড়ি চল শুনলি না তুই। আর এ দিকে মা কথা শুনালো আমারে।না জানি বাড়িতে গেলে কি হয়। দূর চল তো! যা হবে দেখা যাবে নে, আগে বাড়ি তো যাই। আপু! আপু! এ আপু দরজা খোল। আপু! এ আপু দরজা খোল। চুপ আস্তে মা মাত্র ঘুমাইছে।শয়তান তোরে কতবার বলেছি যে রাত করে বাড়ি ফিরবি না।এখন বড় হচ্ছিস বদ অভ্যাসটা ছাড়। তোর বকবকানি থামা,কি রান্না করছে খাইতে দে প্রচুর ক্ষুধা লেগেছে। আস্তে আস্তে আমার ঘরে আয়।আমি খাবারটা এনে লুকাইয়ে রেখেছি।মা বলেছে তোকে যেন খাবার না দেই।

আপু শুটকি ভর্তাটা কে করেছে রে? আমি করেছি তোর পছন্দ তাই করেছি। অনেক মজা হয়েছে রে।তুই খাইছিস আপু? হ্যাঁ ৮টার সময় খেয়েছি। আচ্ছা তাবিব,তাবিহা ফোন দিয়েছিলো মা’র নাম্বারে।ভাগ্যিস ফোনটা আমি ধরেছিলাম তা না হলে তোর আর রক্ষা হতো না।আর হ্যাঁ তুই ফোন ধরছিস না কেন জিজ্ঞাসা করেছিলো।ফোন দিতে বলেছে তোকে।হুমম! কেরাম খেলতে ছিলাম ধরতে পারি নি। এভাবে রাত করে কেরাম খেলা ও বাড়ি ফেরা বাদ দে ভাই।লোকে যদি তোরে খারাপ কিছুতে ঢুকায় দেয় তখন কী হবে বল।দেখিস তো কতটা টানাপোড়ার মাঝে আমাদের সংসার।তুই রাত করে বাড়ি ফিরিস মা’র তো চিন্তা হয় নাকি।আজকে রান্না করতে গিয়ে হাত পুড়ে গেছে। কিহ বলিস কতটা পুড়ছে। মা! ওমা! কই দেখি কতটুকু হাত পুড়েছে। না রে বাবা বেশি পোড়ে নাই ঐ একটু ছ্যাক লেগেছে। ইশশশ! ঠোস পড়ে গিয়েছে হাতে। আরে বাবা কিছু হয় নি ঠিক হয়ে যাবে তুই এমন পাগলামো করিস না।যা এখন ঘুমাতে যা।কাল থেকে যেন এত রাত না হয়।

এই নে! মা তোর জন্য পায়েস রান্না করেছে খেয়ে নিস।আর হ্যাঁ! বেশি রাত জেগে ফোনে কথা বলিস না শরীর খারাপ করবে।আর কাল একটু ইকবাল ভাইয়ের সাথে দেখা করিস।তোকে ফোনে না পেয়ে আমাকে বলেছে।আচ্ছা ঠিক আছে! দেখা করে নিবো। হ্যাঁ তাবিহা বলো,ফোন দিয়েছিলে? তোমার এখন ফোন দেবার সময় হলো।সারাদিনে ফোনে পাই না তোমাকে এখন আসছে। তুমিও মায়ের মত কথা শুনানো শুরু করলে।কই তুমি একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে তা না কথা শুনাচ্ছে।শুনাবো না তো কি করবো? সারাদিনে কোন খোজ নিয়েছো আমার।ঐ একটু ব্যস্ত ছিলাম কেরাম খেলায়।থাকো তোমার কেরাম নিয়ে আমি এখন ঘুমাবো। এই শোনো! শোনো! ফোন রেখো না। নাহহ! কোন শোনা-শুনি হবে না। আচ্ছা সরি কাল থেকে আর হবে না কেমন। সরি! এবার অন্তত ক্ষমা করে দাও।আচ্ছা ঠিক আছে! কাল থেকে যেন এমন না হয়।কথাটা যেন মাথায় থাকে।যথা হুমুক মহারাণী। হয়েছে! এখন ঘুমাও রাত অনেক হয়েছে।

এই তাবিব ওঠ সকাল হয়ে গিয়েছে।বাজার থেকে মরিচ,পেয়াজ আর মাছ কিনে নিয়ে আয়।বাজারের ব্যাগটা হাতে নিয়ে চোখ ডলতে ডলতে বাজারে গিয়ে পৌছাই।৩০ টাকার মাছ ১৫ টাকার মরিচ ও ২৫ টাকা দিয়ে এক কেজি পেয়াজ কিনে বাড়িতে চলে আসি।বাজারের ব্যাগটা আপুর হাতে দিয়ে আবার বিছানায় এসে সুয়ে পড়ি।সুতে না সুতেই মায়ের ডাকে রান্না ঘরে গিয়ে হাজির হই। এ কি মাছ কিনে এনেছিস? পচা,গলা মাছ গন্ধ বের হচ্ছে।তোরে দিয়ে বাজার করিয়ে শান্তি পেলাম না। সর আমার চোখের সামনের থেকে সর তুই। হ জানোই তো আমি বাজার করতে পারি না।আমারে পাঠাও কেন তুমি। তুই যাবি নাকি আমার আসা লাগবে। কি হয়েছে মা তুমি চেচাচ্ছো কেন? দেখ তোর ভাই কি মাছ কিনে এনেছে সবগুলো মাছ পচা।আচ্ছা থাক তুমি চেচাইও না।তুমি যাও আমি রান্না করছি।

চোখটা আমার ঝাপসা হয়ে আসছে।আজ এই অপরিচত শহরে নিস্তব্ধ রাতে মা ও আপুর কথা খুব মনে পড়ছে।১২ টি বছর লন্ডনের মাটিতে কাটিয়ে দিলাম প্রতিরাতে এভাবে চোখের বৃষ্টিতে।আজও যে ব্যতিক্রম নয়।মা,আপুর কথা মনে পড়লে বুকটা ফেটে যায়।কত দিন দেখিনা মায়ের মুখ।শুনি না আপুর বকবকানি।অন্য দিনের তুলনায় আজ আমি একটু বেশিই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছি।তাইতো নিজেকে আর সামলে নিতে পারছি না।চোখের পানি আড়াল করে মায়ের সাথে যখন কথা বলতে যাই তখন চোখে থাকে কালো চশমা।যাতে আমার রক্তিম বর্ণের চোখটা মা দেখতে না পায়।শত কষ্টের পরেও মুখের হাসিটা ধরে রাখতে হয় মায়ের মুখের হাসির জন্য।

কিরে তুই খুশি হস নি ইকবালের সাথে আমার বিয়ে হবে শুনে? জানিস আমি ইকবাল কে সেই ছোট বেলা থেকে পছন্দ করতাম কখনো বলিনি।তবে ইকবাল ভাইও যে আমাকে পছন্দ করতো কিন্তু বলতো না।আজ আমি অনেক খুশি ভাই।উনি চাকরিটা পেয়েই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলেন।মানুষটা নিজেকে প্রতিষ্ঠিত না করে তার মনের কথা গুলো বললো না। জানিস ইকবাল তিন মাস পর অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে ওখানে একটা কম্পানিতে চাকরি হয়েছে।আমাকেও নিয়ে যাবে। কিরে তোর চোখে পানি কেন?

আরে বোকা ভাই আমার কাঁদছিস কেন? বলবি তো আমায়? এমনিতেই আমি খুব খুশি, তোর ইকবাল ভাইয়ার সাথে বিয়ে হবে শুনে।আমি নিজ দায়িত্বে তোর বিয়ের আয়োজন করবো। ধুমধাম করে তোর বিয়েটা সেরে ফেলবো।ভাই শোন আমি চলে গেলে তুই রাত করে বাড়ি ফিরবি না।মা ঘরে একা একা থাকবে তুই রাত করে ফিরলে।জানিসই তো মা একটু বেশি বকাঝকা করে।আমি চলে গেলে মায়ের দিকে খেয়াল রাখবি। আমি চলে গেলে তোর জন্য কিন্তু কেউ লুকাইয়ে ভাত নিয়ে রাখবে না,তোর প্রিয় শুটকি ভর্তা করে রাখবে না।তুই নিজের যত্ন নিবি একদম বেখেয়ালি ভাবে চলবি না। কথা শেষ করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে দিলো আপু।আমিও সামলে নিতে পারি নি।আপুর সাথে আমিও কেঁদে দেই।আমাদের কান্না শব্দ শুনে আশেপাশের লোকজন ভিড় জমাতে থাকে।

ভাই-বোনের কন্না নিয়ে লোকে কানাকানি শুরু করে দেয়।ভাই -বোনের সম্পর্ক এমন হয় আগে জানা ছিলো না।বোনের বিয়ে হবে তাই নিয়ে দুজনে কান্না করছে গলা ধরে।ওদের কে দেখে আমারও যে দিদির কথা মনে পড়ে গেল।এই দেখেন আমার চোখেও জল এসেছে।কথা গুলো পাশের বাসার আন্টি বললেন। মা এসে আমাদের তার আঁচলে মুড়ে নেয়।কেন জানি মায়ের আঁচল এক প্রশান্তির স্থান।আমাদের কান্না মূহুর্তেই থেমে গেল।মা জিনিস টা আসলেই একটা জান্নাত।যার আঁচলে সন্তানের প্রশান্তির আস্থানা।

আপু কাল তোরা সত্যিই চলে যাবি অস্ট্রেলিয়াতে?? হ্যাঁ রে তোর দুলাভাইর হাতে সময় নেই রে।কালই যেতে হবে।রাত ১০:৩০ মিনিটে ফ্লাইট।ওহহহ! কিরে তাবিব তোর কন্ঠটা এমন ভেজা ভেজা কেন? তুই কি কেঁদেছিস? আরে না ও কিছু না।যাই তোদের জন্য গাড়ি ঠিক করে আনি।এখনই তো রওনা হবি তাই না।হুমম! তোর ভাইয়া আসলেই বের হবো।উনি টাকা তুলতে গেছে।আচ্ছা ঠিক আছে!সব কিছু গুছিয়ে নে আমি গাড়ি নিয়ে আসি। চোখটা মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসি।বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে আমার, কিন্তু পারছি না।খুব খারাপ লাগতেছে আমার।মা যে আঁচলটা মুখ থেকে সারাচ্ছে না।ভেজা ভেজা অনুভব হলো মায়ের আঁচলটা।ধারণাটাই ঠিক আপুর জন্য হয়তো কাঁদছে।কেনই বা কাঁদবে না মেয়েটা যে দূর দেশে পাড়ি দিচ্ছে।থাক নিজেকে কেঁদে হালকা করুক। আপু চল গাড়ি এসে গেছে সব কিছু তুলে নে গাড়িতে।তুই এই ব্যাগ গুলো গাড়িতে তোল আমি আসছি।

এইটা নিয়ে কি করবি তুই?যখন তোদের কথা খুব মনে পড়বে তখন এই ছবিটা দেখে নিজেকে শান্ত করবো।মা তুমি নিজের যত্ন নিও।ভাই কে বকাবকি করো না।ও রাগ হলে ভাত খায় না।আমি তো থাকবো না তুমি ওরে খাইয়ে দিও।শুটকি ভর্তাও করে দিও মাঝে মাঝে। আমি কেমন জানি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছি।শত আটকাতে চেঁয়েও পারি নি।অবশেষে কেঁদেই দেই।আপু মাকে জড়িয়ে কাঁদতে শুরু করে দেয়।মাও যে কান্না করতে থাকে।

সেদিন আমরা কেঁদেছিলাম খুব।আমি,আপু ও মা তিনজনে মিলে।সেদিন আমারা কেউই নিজেদের সামলে রাখতে পারি নি।আজ যে ঐ সময় গুলো আবার মনে পড়ে গেলো।বুকটা কেমন জানি পাথর চাপা পড়ে আছে।চোখটা কিছু সময়ের জন্য ঝাপসা হয়ে গিয়েছিলো।বড্ড ইচ্ছে হয় মায়ের আঁচলের তলে গিয়ে নিজেকে শীতল করে নিতে।কিন্তু সেটা যে হচ্ছে না।মা যে রয়েছে আমার থেকে অনেক দূরে। আচ্ছা তাবিব ভাই আপনি দেশে গিয়ে কিছুদিন মায়ের কাছে থেকে আসেন।হুমমম! রোজার ঈদে বাড়িতে যাবো। আপুও তখন দেশে যাবে।ওদিকে আবার তাবিহার সাথে কাবিনটা হয়ে গিয়েছে। ঈদের পরের শুক্রবারে তুলে আনবো তাবিহাকে।আচ্ছা যান ঘুরে আসেন কিছুদিন দেখবেন মনটাও ভালো হয়ে যাবে।

আপুর সাথে প্রায় ৬ বছর পর দেখা হবে।মাঝে ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়েছিলাম আপুর কাছে।তবে আপু প্রতি বছরই বাংলাদেশে আসে।আমি নিজের ব্যবসাটা ঠিকমত গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত ছিলাম।যার কারণে দীর্ঘ ১২ বাছর দেশে যেতে পারি নি।অবশেষে আজ সেই অপেক্ষারর প্রহর শেষ হলো।এখন শুধু বাড়ি ফেরার পালা।এইতো ৪৫ মিনিট পরেই ফ্লাইট দেশে যাবার। আরফি বাবাটাকেও অনেক দিন দেখি না।দুজনে মিলে দুষ্টামিও করা হয়না। ভাগ্নেটা আমার প্রচুর ভক্ত। সামনা সামনি দেখা হয় নি তবে ভিডিও কলে কথা হয় প্রতিনিয়ত। আপু আরফি বাবাকে খুব সুন্দর করে বাংলা ভাষাটাও শিখিয়েছে।আমাকে মাম্মু বলে যখন ডাক দেয় তখন ভিতরটা কেমন কেমন জানি করে।এখন অব্দি অরফিকে বুকে জড়িয়ে নেওয়া হয় নি।

আমার আসার ১ সপ্তাহ পর আপু ও আরফি আসে।দুলাভাই অফিসের জরুরি মিটিং এর কারণে আসতে পারে নি।এয়ারপোর্টে মা আর আমি অপেক্ষায় ছিলাম।কখন আপুর কে দেখবো।আরফিকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিতে পারবো। ঐ যে আমার মেয়ে তান্নি,আপুকে দেখে মা চোখের পানি ছেড়ে দেয়।আমি দৌড়ে গিয়ে আরফি বাবাকে কোলে তুলে নিয়ে গালে মুখে চুমু খেতে থাকি।মাম্মু তুমি আমাকে এভাবে চুমু দিচ্ছো কেন? বাবা তোমাকে এতদিন পর কোলে নিলাম তাই নিজেকে সামলে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো।মাম্মু আসো তোমাকেও চুমু দেই। বাবা টা আমার দুই গালে ৪টা চুমু দেয়।ও দিকে মাকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে আপু।মা ও আপুর কান্না থামিয়ে মাইক্রোবাসে বাড়ির পথে রওনা হই।

সুজন ভাই এই খানে একটা লাইট দিয়েন।আর গেটের লাইটিং টা কি শেষ হয়ে গিয়েছে? গেটের দুই পাশে দুইটা ফুলের টপ দিয়েন। বাবা হামিম লাইটিং টা যেন সুন্দর হয়।কোন প্রকার সমস্যা হলে আমাকে জানিও। আন্টি চিন্তা করবেন না দায়িত্বটা যেহেতু আমাকে দিয়েছেন নিশ্চিন্তে থাকুন।হুমমম! তোমাকে দায়িত্বটা দিয়ে আমি কিছুটা নিশ্চিন্ত বটে।বাবা তোমার বাকি বন্ধুরা কই।তাবিহাদের বাড়িতে হলুদের ঢালা নিয়ে যেতে হবে তো।ওরা ১০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে। আম্মু, নানু দেখো বাবা এসেছে।বা বা দৌড়ে যায় আরফি। কেমন আছেন দুলা ভাই? এই তো ভালোই,তোমার কিহ অবস্থা? এই তো আলহামদুলিল্লাহ। আসেন ভিতরে আসেন।ভালো আছেন আম্মু? হ্যাঁ বাবা ভালো আছি,তুমি কেমন আছো? হ্যাঁ ভালোই আছি। আসতে দেরি হলো যে? ঐ একটু ব্যাংকে সমস্যা হয়েছিলো সেজন্য।আচ্ছা হাত মুখ ধুয়ে এসো বাবা খাবার দিচ্ছি। তাবিব তোমার আপুকে দেখছি না যে কোথায়? ভাইয়া আপু একটু বাহিরে গিয়েছে তবিহাকে নিয়ে।

তাবিব নীল শেরওয়ানীটা পরবি আজ আর বউ ভাতের দিন সাদাটা।আচ্ছা আপু খাটের উপর রেখে যা।এই তন্নী দেখতো আমি কোন কাপড়টা পরবো আজ? আজ যে আমার তাবিবের বিয়ে।মা তাবিব তোমাকে যে কাপড়টা দিয়েছে ওটাই পরো।আমিও ভেবেছি এটাই পরবো।আমি যাই মা আমারও যে তৈরী হতে হবে।মাম্মু আমি তৈরী এই দেখো।বাপরে আমার বাপজানকে তো আজ সুন্দর দেখাচ্ছে।মাম্মু মাম্মুনি কি তোমাকে খুব ভালোবাসে? আম্মু বলেছে এই নীল শেরওয়ানী টা মাম্মুনি কিনেছে পছন্দ করে।হ্যাঁ বাপজান খুব ভালোবাসে।চলো এবার আমাদের বেরুতে হবে।তোমার মাম্মুনিকে আনতে হবে তো।মাম্মু মাম্মুনিকে এনে কি হবে?? তুমিও কি মাম্মুনিকে অনেক ভালোবাসো? হ্যাঁ বাপজান হ্যাঁ! তোমার আর পাকামো করতে হবে না। বাহহ! আমার তাবিব সোনাকে তো বেশ মানিয়েছে।আয় বাবা আয় এদিকে আয় তোকে মিষ্টি মুখ করিয়ে দেই। কই আমাদের নোয়াশাহ কই এত দেরি কেন?? এই তুমি চুপ করো তো! সারাদিন আমার ভাইয়ের পিছনে লেগে থাকা। দুলা ভাই আমি তৈরীই আছি আজ নোয়াশাহগিরী করবো যে।তো এবার চলো সময় যে পেরিয়ে যাচ্ছে আবার ফিরতে হবে তো।

তাবিব এই তাবিব তুই এতো রাতে এখানে কেন? আর ওদিকে তাবিহা তোর জন্য অপেক্ষা করছে তো।আপু একটা ঝামেলা হয়ে গিয়েছে।কি ঝামেলা বল আমায়।তাবিহা সকালে আমার ফোনে মেসেজ দিয়ে ছিলো যে, বকুল ফুলের মালা গেঁথে ওর গলায় পরিয়ে দিতে হবে রাতে কিন্তু ব্যস্তায় মেসেজ চেক করি নি। সারাদিন ফোনটাই যে কোথায় ছিলো জানি না।আর এটাও বলেছে যদি বকুলের মালা না নিয়ে যাই তাহলে আমার সাথে কথা বলবে না। এখন কি করি বলতো। এত রাতে বকুল ফুল কোথায় পাবো? এ তো চিন্তায় ফেলে দিলি।আচ্ছা দেখছি কি করা যায়। ইকবাল এই ইকবাল কই তুমি এদিকে একটু আসো তো।

হ্যাঁ আসছি! বলো ডাকছো কেন? তাবিহা সকালে মেসেজ করেছিলো তাবিবকে।বলেছে বকুলের মালা গেঁথে রাখতে। কিন্তু তাবিব মেসেজ চেক করার সময় পায় নি।এখন কি করার বলো তো।মালা না নিয়ে গেলে তাবিহা কথা বলবে না তাবিবের সাথে।তাবিব তো চিন্তায় পড়ে গেছে এত রাতে বকুল ফুল পাবে কই। এত ফুল থাকতে বকুল ফুল কেন?
দুলাভাই বকুল ফুল তাবিহার পছন্দ।আমাকে আগেও বলেছে কিন্তু আমি ভুলেই গেছি।এগুলো ভুলে গেলে চলে শালাবাবু।আচ্ছা চিন্তা করো না আমি দেখছি।

একি মা আপনি এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন? ঐ শফিক দের বাড়িতে।তাই বলে এত রাতে? তাও একা একা।কি এমন জরুরি কাজ ছিলো যে এত রাতে গেলেন।আস্তে ইকবাল আস্তে বলো তাবিব শুনতে পাবে।এই নাও ফুলগুলো তাবিবকে দিয়ে আসো।আমি তোমাদের কথা শুনেছিলাম তাই তোমাদের না বলেই গিয়েছিলাম শফিকদের বাড়িতে বকুল ফুল আনতে।আমার ছেলের বিষন্ন মুখটা দেখে নিজে আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না।যাও বাবা দিয়ে আসো তাবিবকে।মাম্মু দেখো নানুভাই তোমার জন্য বকুল ফুল নিয়ে এসেছে।তুমি একদম চিন্তা করো না। নানু ভাই চুপ করো মাম্মু শুনতে পাবে। মা তুমি এত রাতে বকুল ফুল আনতে গিয়েছিলে? হ্যাঁরে বাবা তোর মন খারাপ দেখে আর নিজেকে গুটিয়ে রাখতে পারি নি।

বউমা যে কতটা আশা নিয়ে বলেছে আর সেটা যদি না পায় তখন তোর মাথাটা যে নিচু হয়ে যাবে।মা হয়ে যে সেটা সইতে পারবো না বাপ।তোর বাবা তোদেরকে আমার হাতে তুলে দিয়ে চলে যান।তোদের কখনো বুঝতে দেইনি বাবার আভাবটা। আজ যদি তোদের বাবা বেঁচে থাকতেন হয়তো তিনিই নিয়ে আসতেন। কথা গুলো আর সইতে পারলাম না।অশ্রুরা চোখটা ঝাপসা করে দিচ্ছে।কিছু সুখের মূহুর্তের সাক্ষী এই দুফোটা অশ্রুজলই হয়ে থাকে।টপ টপ করে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়লো। মা এসে তার আঁচলে মুড়ে নেয়।মা হাত প্রসারিত করে দেয় আপু,দুলাভাই সবাই মায়ের আঁচলের নিচে আশ্রয় নেয়।আমাদের চেঁচামেচিতে তাবিহাও বেরিয়ে আসে। হাতের ইশারায় মা তাবিহাকে ডেকে নেয়।মায়ের আঁচলের তলে মিলে যায় তাবিহার জায়গাটাও।

মা এমন একটা পাওয়া যেটা এই পৃথিবীতে সব থেকে বড় উপহার আমাদের জন্য।আর মায়ের আঁচল হচ্ছে সব থেকে নিরাপদ আশ্রায়তল।যে আশ্রায়তলে আমরা নিরাপদেই থাকি।কোন ঘাত-প্রতিঘাত বুঝতেই দেয় না এই মা নামের মানুষটা।যেখানে গিয়ে আশ্রায় নিলে অশান্ত মন শান্ত হয়ে যায়।মায়ের এই আশ্রায়তলে কাটিয়ে দিতে চাই আমার বাকিটা জীবন।নতুন জীবনের পথচলাটা এই মায়ের আঁচলের থেকেই শুরু হোক।মায়ের আঁচলের তলে যতদিন থাকবো ততদিন বিপদমুক্ত থাকবো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত