বিবাহ

বিবাহ

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে নাস্তার টেবিলে বসলাম নাস্তা করতে।পরিবারের সবাই আছে,নাস্তা করছে।আম্মু আমাকে জিজ্ঞাস করলো,কিরে বিয়ে খেতে যাবি না?

-কার বিয়ে?
-তোর আব্বার মামাতো ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে।
-ওও সেটাতো কাল রাতেই বলেছো।না আম্মু এসব বিয়ে টিয়েতে আমি যেতে পারবো না।নিকট আত্নীয় কারো বিয়ে হলে কথা ছিল।আব্বার কোন দূরসম্পর্কের ভাই না কার মেয়ের বিয়ে।আমি যেতে পারবো না।লোকে কি বলবে??
-লোকে আবার কি বলবে?লোকের তো খাইদাই কাজ না যে সারাদিন তোর পেছনে লেগে থাকবে।আর না গেলে খাবি কি?আমরা সবাই যাচ্ছি।আজ বাড়িতে রান্না হবে না।

-দূর ছাঁই ভালো লাগে না।এটা কোন কথা?আজ শুক্রবার অফিস বন্ধ,শান্তিতে একটু বাড়িতে থাকবো,তোমাদের জ্বালায় তাও হবে না।
-তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে।আমরা একটু পরই বের হবো। রুমে এসে রেডি হয়ে সবাই মিলে বের হলাম বিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে।বাড়ির একটু দূরে দোকানের সামনে গিয়েই সিএনজি তে উঠবো।আমাকে দেখে দোকানদার বলল,

-সাহেব সেজে সহপরিবারে কই যান ভাই?
-আরে আর বইলেন না।বিয়ে খেতে যাচ্ছি বিয়ে।দূরসম্পর্কের আত্নীয়ের বিয়ে।
-যান ভাই, আচ্ছা আপনার জন্যও তো পাত্রি খুঁজছে।বিয়ে বাড়িতে অনেক মেয়ে আসে।সুন্দর দেখে একটা খুঁজে নিয়েন।
-সে কথা আর বলতে?
-ওকে আল্লাহ হাফেজ।

ইতিমধ্যে সিএনজি চলে এসেছে।সবাই উঠে বসলাম।চলতে লাগলো সিএনজি।তাদের বাড়ির সামনে গিয়ে সিএনজি থামলো।আমরা গিয়ে তাদের বাসার ভেতরে বসলাম।নাস্তা-টাস্তা করালো।চারদিকে বিয়ের জমকালো পরিবেশ।আম্মু আর বোন ভেতরে চলে গেল।আমরা বসে আছি।এরই মধ্যে অনেক সময় পার হয়ে গেল।দুলা আসার সময় পার হয়ে গেছে এখনো দুলা আসার নাম নেই।বিকেল হয়ে গেলো,তারা দুলার বাড়ির খোঁজখবর নিচ্ছে নানা ভাবে।দুলা আসতে এতো দেরী তো হওয়ার কথা না।

অনেক সময় চলে গেছে।তবুও দুলা এলো না।সবাই চিন্তা করতে লাগলো বরযাত্রি গাড়ির কিছু হলো না তো?একটু পর ওই বাড়ি থেকে একটা লোক আসলো।লোকটার কাছে একটা ব্যাগ ছিলো।লোকটা মেয়ের বাবাকে বলতে লাগলো,

-বরযাত্রি আসবে না।ছেলের মেয়ে পছন্দ হয়নি।এতোদিন সাহস করে বলতে পারেনি।এখন শতজনে চেষ্টা করেও তাকে রাজি করাতে পারছে না।

এসব শুনে মেয়ের বাবা বাংলা ছবির আনোয়ারের মত নাআআআ বলে একটা চিৎকার দিয়ে স্টোক করার মত বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লো।এটা দেখে সবার চিল্লা-চিল্লি শুরু হয়ে গেল।আমি এসব চিল্লা-চিল্লি সহ্য করতে না পেরে সাইড করে চেয়ার একটা টেনে বসলাম।

সবার এখন একটাই চিন্তা।এই মেয়েকে বিয়ে করবে কে?এর মধ্যে আরেকটা কাহিনী হয়ে গেছে।ছেলেপক্ষ থেকে ওই লোকটা বিয়ের খরচ বাবদ দুইলক্ষ টাকা,মেয়েদের দেওয়া আংটি,সেরওয়ানি,পাগরি দিয়ে গেল।এসব দিয়ে যাওয়ার কারণ হচ্ছে,মামলা করে বেজাল-টেজাল যেন না করে।এতোগুলা টাকা তারা দিয়ে গেল সে দিকে কারো নজর নাই,সবার একটাই চিন্তা, এই মেয়ে বিয়ে করবে কে??

সবার মাঝখান থেকে আব্বা হাত তুললো।আম্মাতো এটা দেখে কান্না শুরু করে দিছে।আমরাও আব্বার কাছে গিয়ে তাকে বলতে শুরু করছি,আব্বা তুমি এসব কি বলছো?এই বয়সে এটা কি সম্ভব?তাইলে মায়ের কি হবে?আব্বা কয়, আমারে আগে বলতে দে বাপ।চারপাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে।কেউ তার কথা শোনার মুডে নাই।যে যার মত বকেই যাচ্ছে।আব্বা জোরে এক দমক দিয়ে সবাইকে চুপ করালো। আব্বা বলতে লাগলো,সবাই শোনের আমার কথা।এই মেয়ে যখন বিপদে পড়ছে, আমি তারে বিপদ মুক্ত করবো।এই মেয়েকে আমার ছেলেরে বিয়ে করাবো।ওই মুহুর্তে সেখানে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল।আম্মারও কান্না থেমে গেল।

আমি নতুন চাকরি পেয়েছি,বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছে।বিয়ে করবো ঠিক আছে,কিন্তু এরকম ভাবে বিয়ে করবো আশা করিনি।আশা ছিল জীবনে যেহেতু একটাই বিয়ে করবো, বড় সড় করেই করবো।কিন্তু কি হয়ে গেল এটা?আমি বললাম,আমি আগে মেয়ের সাথে কথা বলতে চাই।বাসার এক রুমে আমাদের কথা বলার ব্যবস্থা করা হলো। রুমে ঢুকে দেখি মেয়ে বসে বসে কান্না করছে।আমি বললাম মুখ ধুঁয়ে আসেন কথা আছে।আমি রুমে আসার আগে একজন এসে ওকে সব খুলে বলছে।মুখ ধুঁয়ে আসলো।আমি বললাম,

-আপনার কি মত?দুলার পরিবর্তন হয়েছে।আগের দুলা আসেনি।
-আমার কিছু বলার নেই।আপনি কি আমাকে করুণা করছেন?
-হ্যাঁ করুণাই বলতে পারেন।
-আবার বলছেন ও করুণা করে!!!
-যা সত্যি তাই বলছি।নাহলে কি আপনার প্রেমে পড়ে বিয়ে করছি??
-চলে যান,আপনাকে বিয়ে করতে হবে না।
-আরে দাড়াঁন আরো কথা আছে।মেকআপ করে এরকম ভূতের মত সেজেছেন কেন?
-আমি সাজিনি। পার্লার থেকে সাজিয়ে দিয়েছে।
-যানতো ভালো করে মুখ ধুঁয়ে আসুন।বিয়ের আগে আপনার বাস্তব চেহারাটা একটু দেখি।

কিছুক্ষণ পর…

-বসুন।দেখছেন আপনার চেহারা কত সুন্দর?শুধু শুধু মেকআপ করে ভূত সাজার কি দরকার ছিল?(মনে মনে বলি, ফর্সা না হলে কি হবে উজ্জ্বল শ্যামলা।কত সুন্দর মায়াবি একটা চেহারা।আমার স্বপ্নের সেই মায়াবিনীর মত।সবসময় চাইতাম এরকম মিষ্টি চেহারার একটা মেয়েকে বউ করে আনবো)

-এভাবে চেয়ে আছেন কেন?কথা শেষ হলে যান এবার।
-যাচ্ছি যাচ্ছি

ওদের ফিরিয়ে দেওয়া শেরওয়ানি,পাগরি পড়েই বিয়েটা করে ফেললাম।এবার বাড়ি ফেরার পালা। মেয়ের বাপ কান্না করতে করতে আমার হাতে তার মেয়েকে তুলে দিলেন।(মনে মনে বললাম,বাংলা ছবির আনোয়ারের মততো একটু ভাব নিলেন,স্টোকতো করলেন না।স্টোক করলে কি হতো?ছবি ছবি একটা ভাব আসতো।পরে বুক ফুলিয়ে সবার কাছে বলতে পারতাম,আমার বিয়েতে ছবির সুটিং হয়েছে।)।যাইহোক যাওয়ার জন্য দুইটা সিএনজি ভাড়া করা হলো।একটাতে আমরা দুজন,আরেকটাতে আব্বা,আম্মা আর বোন।বাড়ি ফেরার পথে বাড়ির সামনের দোকানদারের সাথে আবার দেখা।বলে,

-কি মিয়া,দেখলাম বিয়ে খেতে যাচ্ছেন।এখন দেখি বিয়ে করে নতুন বউ সাথে নিয়ে ফিরছেন।ব্যাপার টা কি?
-বাসায় যাইয়েন,সব বলবো।

বিয়ের পরের সব আয়োজন অনেক সুন্দর মতই হলো।নতুন একজনের দায়িত্ব নিলাম,ভাবতেই অন্য রকম লাগছে।হঠাৎ বিয়ে হলেও আজ তিন বছর আমাদের সংসার অনেক সুখেই চলছে।আমাদের ফুটফুটে একটা মেয়েও হয়েছে।তবে আমার বিয়ের সেই কাহিনীর কথা আমি সারাজীবনেও ভুলবো না।কারো বিয়ে খেতে গেলেই, আমার বিয়ের কথা মনে পরে যায়।বর আসতে একটু দেরী হলে মনে হয়,এই বুঝি কেউ বলে উঠবে, বর আসবে না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত