বিশ্বাস

বিশ্বাস

‘ভাই, এই থ্রি-পিসের দাম কত?’

‘সাড়ে আট হাজার টাকা৷’

‘দামাদামি করা যাবে?’

‘না, ম্যাডাম। এইটা ফিক্সড প্রাইজের দোকান৷ তবে আপনার সম্মানার্থে পাঁচশো টাকা কম রাখতে পারি৷ আপনাকে এই থ্রিপিসে দারুণ লাগবে৷ একেবারে হিন্দি সিনেমার নায়িকার মত।’ দোকানদারের কথায় নুসরাত কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়েছে৷ সে জানে-সে এতোটা সুন্দরী নয়। এই থ্রিপিস পরলে তাকে মোটেও নায়িকার মতো লাগবে না৷ দোকানদারদের অভ্যাসই হলো একটু বাড়িয়ে বলা৷

নুসরাত ঈদের শপিং করছে৷ সে বাসায় বসে একটি কাগজে লিখে এনেছে কার জন্য কি কিনবে। প্রত্যেকের জন্য আলাদা বাজেট করেছে৷ বাজেটের বাহিরে সামান্য তারতম্য হয়তো করতে পারবে, তবে সম্মিলিত বাজেট ঠিক রাখতে হবে৷ তার কাছে পঁচিশ হাজার টাকা আছে। এই টাকা-ই হলো মোট বাজেট৷ পরিবারের সবার জন্য ঈদের কেনা-কাটা সারতে হবে৷ সর্বমোট দশ জন৷ এই বাজেটে এতো জনের শপিং করা সহজ কাজ নয়৷ তাই-তো নুসরাতকে এক দোকান থেকে আরো দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। বাজেটের মধ্যে কাপড় কিনতে পারছে না৷ তবে নুসরাত মোটেও হাল ছাড়ছে না৷ সে এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোরে উঠছে আর নামছে৷ শপিং করা বেশিরভাগ নারীর-ই পছন্দের কাজ। তবে সীমিত বাজেটে এতো মানুষের কেনাকাটা খুবই কঠিন কাজ৷ নুসরাতকে এই কঠিন কাজের দ্বায়িত্বটি দিয়েছে তার স্বামী আজিজুল৷

মার্কেটটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। তবুও নুসরাত ঘেমে যাচ্ছে৷ সে থ্রি-পিসটি হাতে নিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে। দোকানদার বলে উঠলেন, ‘ম্যাডাম, এতো দেখতে হবে না৷ ভাল জিনিস৷ ঈদ কালেকশন৷’ ‘ভাই আমার বাজেট তিন হাজার টাকা৷ এতো দামি থ্রি-পিস কিনতে পারবো না৷ তবে থ্রি-পিসটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে৷’ ‘আপা এই মার্কেটে তিন হাজার টাকায় ভাল থ্রিপিস পাবেন না৷ কেউ যদি বিক্রি করে থাকে, তা হবে খুবই নিম্ম মানের৷’

নুসরাত থ্রি-পিসটি রেখে দিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালো৷ দোকানদার তাকে বললেন, ‘আপা, আপনি আরেকটু বাজেট বাড়ালে দিয়ে দিবো৷’ ‘ভাই, দু’একশো টাকা হয়তো বাড়াতে পারবো, তার বেশি নয়৷’ ‘আপা, পাঁচ হাজার টাকা হলে নিয়ে যাবেন৷ আপনার জন্য স্পেশাল ডিসকাউন্টে দিচ্ছি। আমার লস হবে, তবু দিয়ে দিবো৷’ দোকানদারের ভাবখানা এমন যেন তিনি সত্যি-ই লসে বিক্রি করছেন৷ দোকানদারদের এসব মন ভুলানো কথায় অনেক কাস্টমারের মন গলে যায়৷ তবে বেশিরভাগ কাস্টমার দোকানদারের কথাগুলো বিশ্বাস করে না।

নুসরাত পাঁচ হাজার টাকায় থ্রি-পিস কিনলে সবার জন্য কাপড়-চোপড় কিনতে পারবে না৷ সে থ্রিপিসের দোকান থেকে বের হয়ে গেল৷ সে ভাবছে, সবার জন্য কাপড়-চোপড় কেনার পর যদি টাকা বাঁচাতে পারে, তবে একটু বেশি দামি থ্রি-পিস কিনতে পারবে৷ এতো কম বাজেটে এতো মানুষের শপিং করার পিছনে কারণটি হলো- নুসরাতের স্বামী আজিজুল একজন সরকারি কর্মকর্তা৷ ঈদের বোনাস পেয়েছে পঁচিশ হাজার টাকা৷ বোনাসের টাকাগুলো তুলে দিয়েছে স্ত্রী নুসরাতের হাতে৷ আজিজুল নুসরাতকে বলেছিল, ‘আমি ভাল কাপড়-চোপড় চিনি না৷ তুমি সময় করে ধীরে ধীরে কিনে নিও৷’

নুসরাত ইতস্ততভাবে বলল, ‘এতো কম বাজেটে দশ জনের কাপড় কেনা যাবে কি?’ ‘আমি একজন সৎ সরকারি কর্মকর্তা৷ যা বেতন-বোনাস পাই তা দিয়েই সবকিছু সারতে হবে৷’ ‘আমি চেষ্টা করবো৷’ নুসরাত তার স্বামীর সততা নিয়ে গর্ব করে৷ তাইতো কষ্ট করে শপিং করছে৷ নুসরাত একটি জুতার দোকানে ঢুকলো৷ স্বামীর জন্য এক জোড়া জুতা কিনবে৷ জুতার বাজেট দুই হাজার টাকা৷ সে অনেক জুতা দেখে একজোড়া চকলেট কালারের জুতা পছন্দ করেছে৷ জুতা জোড়া হাতে নিতেই সেলসম্যান বললেন, ‘ম্যাডাম, ঈদ কালেকশনের জুতা৷’

‘দাম কত?’

‘ম্যাডাম, জুতার গায়ে লেখা আছে৷’ নুসরাত জুতার স্টিকারের দিকে তাকিয়ে দেখলো, ভ্যাট ছাড়া পঁচিশশো টাকা৷

‘ম্যাডামকে কত নম্বর সাইজ দিবো?’

‘বেয়াল্লিশ নম্বর হবে?’

‘হবে।’

‘ভাই, দামাদামি করা যাবে?’

‘ম্যাডাম, এটা ফিক্সড প্রাইসের দোকান। আপনি মনে হয় আগে কখনো আসেন নাই৷’

নুসরাত হিসাব মিলাতে পারছে না৷ কিছুক্ষণ আগে একটি ফিক্সড প্রাইসের দোকানে ঢুকে সাড়ে আট হাজার টাকার থ্রি-পিস পাঁচ হাজার টাকায় দিতে চাইলো, অথচ এখানে তাকে রীতিমতো অপমান করছে৷ সেলসম্যান তার সাথে যেভাবে কথা বলেছে তাতে যে কারো মন খারাপ হওয়ারই কথা৷ নুসরাতেরও মন খারাপ হয়েছে৷ তবে এই জুতা জোড়া তার খুব পছন্দ হয়েছে৷ সে ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিলো-এই জুতা জোড়াই কিনবে৷ দাম একটু বেশি তাতে কি? অন্যদের জন্য একটু কমে কিনে টাকা বাঁচিয়ে নিবে৷ প্রয়োজনে নিজের জন্য কিছু কিনবে না৷

সেলসম্যান বললেন, ‘আপা, আমাদের আরো কম দামি জুতা আছে৷ দেখবেন?’ সেলসম্যানের কন্ঠের সুর কিছুটা পরিবর্তন হয়ে গেছে৷ আগে তাকে যতটা সম্মান দেখিয়েছেন, এখন ততটা না৷ আগে নুসরাতকে ম্যাডাম বলে সম্বোধন করেছিল, এখন আপা বলে ডাকছেন৷ নুসরাত প্রশ্ন করেছিলো দামাদামি করা যাবে কিনা- এতে দোষের কি হলো? আমাদের সমাজের চিত্রটাই এমন- সবাই টাকাকে সম্মান করে, মানুষকে নয়৷
নুসরাত বলল, ‘আমাকে এই জোড়া জুতা-ই দিন৷’

সেলসম্যান জুতা জোড়া প্যাকেটে ঢুকিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে নিয়ে গেল৷ সেখানে আরেকজন লোক জুতার প্যাকেটের বার কোড স্কান করলো৷ তারপর অটো বিল জেনারেট হলো। নুসরাত বিলের কাগজটি হাতে নিয়ে দেখলো তাতে লিখা আছে- ছাব্বিশশো পঁচাত্তর টাকা৷ সে কাউন্টারের লোকটিকে প্রশ্ন করলো, ‘ভাই দাম তো পঁচিশশো টাকা৷ বিল এতো বেশি কেন?’ ‘আপা, আপনি মনে হয় আগে কখনো ব্রান্ডের জিনিস কিনেন নাই৷ জুতার মূল্যের সাথে পাঁচ শতাংশ ভ্যাট যোগ করতে হয়৷ জনেন না মনে হয়।’ লোকটি কথাটি বলতে-ই একটি বাঁকা হাসি দিলো। এটি তাচ্ছিল্যের হাসি৷ তিনি নুসরাতকে ঠিক সরাসরি লজ্জা দিলেন না৷ তবে এমনভাবে কথাটি বললেন তাতে সে ঠিকই লজ্জা পেয়েছে৷

নুসরাত বলে উঠলো, ‘আমাকে ভ্যাটের রশিদ মূসক-১১ দিন৷’ কথাটি শুনে লোকটির হাসি মুখ গম্ভীর হয়ে গেল৷ সে আমতা আমতা করে বলল, ‘ম্যাডাম, আমাদের ভ্যাটের চালান বইটি খুঁজে পাচ্ছি না৷’ নুসরাতকে এবার আবার ম্যাডাম বলে ডাকতে শুরু করলো৷ মূসক-১১ সব কাস্টমার চিনে না৷ তারা দোকানদারের কাছে এটি চায়ও না৷ লোকটি ভাবছে, নুসরাত সাধারণ কেউ নন৷ তাকে তাচ্ছিল্য করলে হয়তো ঝামেলায় পড়বে।

নুসরাত বলে উঠলো, ‘তাহলে আপনারা পণ্য বিক্রি করছেন কিভাবে? এটি কিন্তু অনিয়ম।’ লোকটি এবার নুসরাতকে একটি চেয়ার এনে দিলো৷ সে অত্যন্ত বিনয়ের সহিত বলল, ”ম্যাডাম, ঠান্ডা না গরম খাবেন?’ ‘কিছু না৷ আমাকে মূসক-১১ দিন৷’ ‘ম্যাডাম, বসুন৷ ভ্যাটের রশিদ বই খুঁজছেন সবাই৷’ জুতার দোকানে প্রচুর বিক্রি হচ্ছে৷ অনেক মানুষ ঈদের কেনা-কাটা করছে৷ সবাই ভ্যাট দিয়ে পন্য কিনছে, অথচ ভ্যাটের রশিদ ছাড়া টাকা দিয়ে চলে যাচ্ছে। দোকানদার তার ভ্যাটের টাকা কি করছে কেউ ভাবছে না৷ আসলে দেশের কথা কেউই ভাবে না৷ মনে হচ্ছে, ‘সাধারন মানুষ এ বিষয়ে কিছুই জানেই না৷’

কাউন্টারের লোকটিকে নুসরাত বলল, ‘এটি সবাইকে দেওয়ার কথা৷ আপনারা যদি ভ্যাটসহ দাম লিখতেন তাহলে এটি আপনাদের দায়িত্ব হতো৷ যেহেতু ভ্যাটের টাকা আমার কাছ থেকে নিয়েছেন, সেহেতু আমাকে ভ্যাটের রশিদ দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব৷ আপনারা কাস্টমারকে ভ্যাটের রশিদ না দিয়ে জালিয়াতি করছেন৷’

অতঃপর তারা মূসক-১১ খুঁজে পেলেন৷ নুসরাতকে ভ্যাটের রশিদ যথাযথ ভাবে লিখেও দিলেন৷ সে জুতা কিনে দোকান থেকে বের হচ্ছিলো- তখন লোকটি বলল, ‘ম্যাডাম, আমরা দুঃখিত। আপনাকে কষ্ট দিলাম৷ এখন থেকে সবাইকে ভ্যাটের রশিদ দিবো৷’ নুসরাত জানে তারা নিছকই কথাটি বলছেন৷ কাজটি তারা করবে না৷ তারা ফাঁকি দিয়ে যাবে। মানুষের পকেট কেটে বড় লোক আরো বড় হবে৷ তবে সরকারের উচিত এই বিষয়টিতে নজরদারি বাড়ানো৷

নুসরাত তৃতীয় তলায় একটি শাড়ির দোকানে গিয়ে কিছু শাড়ি দেখছে৷ তাকে দুটি শাড়ি কিনতে হবে৷ একটি মায়ের জন্য, আরেকটি শাশুড়ি জন্য৷ নুসরাত তার মায়ের পছন্দ-অপছন্দ খুব ভাল জানে, কিন্তু শাশুড়ির ব্যাপারে তেমন ধারনা নেই৷ বিয়ের পর এটি তার প্রথম ঈদ৷ শশুরবাড়ির জন্য আগে কেনা-কাটা করার অভিজ্ঞতা নেই৷ তবে উনার কাপড়-চোপড় পরিধানে রুচিবোধ খুব ভাল৷ দুটি শাড়ির বাজেট পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিটি আড়াই হাজার করে৷ তারপর দেখেশুনে আড়াই হাজার দিয়ে মায়ের জন্য একটি কাতান শাড়ি কিনেছে৷ এই দোকানে শাশুড়ির জন্য কোন শাড়ি পছন্দ হয়নি৷

নুসরাত পাশের দোকানে শাশুড়ির জন্য শাড়ি কিনতে ঢুকলো৷ দোকানদার পছন্দমতো কিছু শাড়ি বের করলেন৷ আগের দোকান থেকে মায়ের জন্য যে শাড়িটি কিনেছে ঠিক সেই রকম একটি শাড়ি নুসরাতের চোখে পড়লো৷ দাম যাচাই করার জন্য সে জিগ্যেস করল, ‘ভাই, এই শাড়িটার দাম কত?’ ‘আপা, এই শাড়িটাতো আপনি ঐ দোকান থেকে কিনেছেন৷ আপনার হাতে দেখতে পাচ্ছি৷’ দোকানদার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো নুসরাতের হাতের শাড়িটি৷ একই শাড়ি। নুসরাত বলল, ‘হ্যাঁ, আমার মায়ের জন্য কিনেছি৷ দামটা যাচাই করতে জিগ্যেস করলাম আরকি। একন আমার শাশুড়ির জন্য একটি শাড়ি কিনবো, ঐ দোকানে পছন্দ হয়নি, একটু ভিন্ন ডিজাইনের হলে ভাল হয়।’

দোকানদার উত্তর দিলেন, ‘আপা, এই শাড়িটার দাম দুই হাজার টাকা৷ আপনি নিশ্চয় বেশি দিয়ে কিনেছেন৷ আপা, ওরা তো দোকানদার না, ওরা হলো ডাকাত, কাস্টমার ঠকায়৷ আমার দোকানে নিয়মিত আসবেন, আমি কাউকে ঠকাই না।’ দোকানদারের কথা শুনে নুসরাতের মন খারাপ হলো৷ এমনিতেই বাজেট কম, এর উপর চারশো টাকা বেশি দিয়ে মায়ের জন্য কিনেছে। নুসরাত দোকানদারকে বলল, ‘ভাই, আমাকে আড়াই হাজার টাকা দামের মধ্যে কিছু শাড়ি দেখান৷’

দোকানদার বেশ কয়েকটি শাড়ি বের করে তার সামনে রেখেছে। কোন শাড়িই নুসরাতের পছন্দ হচ্ছে না৷
দোকানদার দুটি শাড়ি হাতে নিয়ে নুসরাতকে বলল, ‘আপা শাড়িগুলো কিন্তু খুব ভাল৷ আপনি যে শাড়িটা কিনেছেন তার থেকেও ভাল৷’ নুসরাত বুদ্ধি করে বলল, ‘ভাই, আমাকে ঐ কাতান শাড়িটাই দিন যেটা আমি পাশের দোকান থেকে চারশো টাকা ঠকে কিনেছি৷’ ‘আপা, একই রকম দুটো শাড়ি কেন কিনেবেন? যাদের দিবেন তারা মন খারাপ করবে না? ধরুন, একটি অনুষ্ঠানে তারা দুইজন একই রকম শাড়ি পরে গেছেন৷ তাদের দেখতে কি ভাল লাগবে?’

‘কোন সমস্যা নাই৷ তারা দুইজনই আমার মা৷’ লোকটি ইতস্ততভাবে বললো, ‘আপা, এই শাড়িটাতে একটু সমস্যা আছে৷ আপনি অন্য ডিজাইনের শাড়ি নিন।’ নুসরাত এখন পরিস্কার বুঝতে পেরেছে, লোকটি ইচ্ছা করে এই শাড়িটির দাম কম বলেছিল, তাকে টোপ দিয়েছে। নুসরাত একই শাড়ি আবারও কিনতে চাইবে, দোকানদার ভাবতেও পারে নি৷

নুসরাত আবার বলল, ‘ভাই, সমস্যা থাকলেও দিন৷’ দোকানে আরো কিছু কাস্টমার শাড়ি দেখছেন৷ দোকানদার মন খারাপ করে শাড়িটি দুই হাজার টাকায় নুসরাতের কাছে বেচতে হলো৷ এটি বেচে দোকানদারের তেমন কোন লাভ হলো না৷ তিনি বেশি চালাকি করতে গিয়ে নুসরাতের কাছে ধরা খেলো৷ কম দামে শাড়িটি কিনতে পেরে নুসরাত বেজায় খুশি হলো৷ সে ভাবছে, মা ও শাশুড়ির শাড়ি একই রকমের-কাজটা কি ঠিক হলো?

সে দোকানে দোকানে ঘুরাঘুরি করে কয়েকজনের জন্য কিনেছে। হঠাৎ তার মনে হলো এক কাপ চা কিংবা কফি খেতে পারলে ভাল হতো। মার্কেটটির উপরের তলায় একটি রেস্টুরেন্ট আছে৷ নুসরাত লিফটে করে সেখানে চলে গেল৷ সে এক কাপ কফির অর্ডার দিলো৷ এখানে অনেক মানুষ খাবার খাচ্ছে৷ বেশিরভাগের হাতে-ই একাদিন শপিং ব্যাগ৷

কফি এলো৷ কফিতে চুমুক দিতেই তার সামনে হিজাব পরা দুইজন মহিলা বসলেন৷ হিজাবে মেয়েদের কতটা সুন্দর দেখায় তা যদি সব নারী বুঝতো, তবে সবাই হিজাব-ই পরতো৷ আচ্ছা হিজাব কেন শুধু নারীরা পরে? পুরুষ কেন হিজাব পরে না? ধর্মীয় পোশাক তাই হয়তো। এটি কি শুধু ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি? খৃষ্টানদের গীর্জায়ও নারীরা এই রকম পোশাক পরতে দেখেছি, তবে কিছুটা ভিন্ন স্টাইলের। একজন মহিলা নুসরাতকে বলল, ‘আপু, শাড়ি কত দিয়ে কিনেছেন?’

‘একটা দুই হাজার, আরেকটা আড়াই হাজার টাকা৷ কিন্তু দুটিই একই শাড়ি৷’

‘একই শাড়ি ভিন্ন দামে কেন?’

‘দুটি দুই দোকান থেকে কিনেছি, তাই৷’

‘ফিক্সড প্রাইসের দোকানে দামাদামি করতে হয়৷ দোকানদারেরা সত্যি কথা বলেই না৷ যার থেকে যেমন পারে ঠকিয়ে নেয়৷’ নুসরাত বলল, ‘আপনি ঠিক-ই বলেছেন। আপনারাও কি শপিং করতে এসেছেন?’

‘হ্যাঁ, তবে একটি থ্রি-পিস বদলাতে এসেছি। দোকানদার যদি আমাদের ঠকাতে পারে, তবে আমরা কেন তাদের ঠকাতে পারবো না?’

‘মানে?’

‘আজ আমরা দুই বোন মিলে দোকানদারকে ঠকিয়েছি। সব বলছি আপনাকে। তার আগে কফির অর্ডার দিয়ে নিই৷’ তারা দুই মগ কফি অর্ডার দেয়ার পর দুই বোন ঘটনাটি খুলে বলল৷ এক সাপ্তাহ আগে একটি দোকান থেকে মিলি একটি থ্রি-পিস কিনলো৷ থ্রিপিসের গায়ে দাম লেখা ছিল- পাঁচ হাজার টাকা৷ দামাদামি করার পর সাড়ে তিন হাজার টাকায় দিয়ে দিলো৷ মিলি আর সুমি দুই বোন৷ পরের দিন মিলি একটি ছোট মার্কেটে গিয়ে দেখলো, এই একই থ্রিপিসের দাম আড়াই হাজার টাকা৷ এটি দেখে মিলির খুব রাগ হলো৷ বাসায় এসে সুমিকে বিষয়টি বলে৷ তাদের ইচ্ছা হচ্ছিলো থ্রি-পিসটি ফেরত দিতে৷

কিন্তু দোকানে বড় করে লেখা আছে- ‘বিক্রিত মাল ফেরত নয়৷ তবে বদল হয়৷’ ঈদের বাজারে প্রচুর ক্রেতা৷ দোকানদার মিলিকে চিনার কথা নয়৷ কত টাকায় মিলির কাছে থ্রি-পিসটি বিক্রি করেছে তাও মনে থাকার কথা নয়৷ কোন মানি রিসিটও দেয় নি৷ দুই বোন মিলে একটি বুদ্ধি করলো। তারা দুইদিন পর ঐ দোকানে গেল৷ ঈদের কারনে ক্রেতার চাপ আরও বেড়েছে৷ দোকানে তারা দুই বোন অপরিচিত মানুষের মতো ভাব ধরে থ্রি-পিস দেখছে৷ মিলি সাত হাজার টাকা দামের একটি থ্রি-পিস সুমির সামনে দামাদামি করছে৷ দোকানদার পাঁচ হাজার টাকায় বেচতে রাজি হলো৷ পাশে বসা সুমি দোকানদারকে আগের কেনা থ্রি-পিসটি দিয়ে বলল, ‘ভাই, আমাকে এই থ্রি-পিসটি বদলে দিন৷ আগেরটা পছন্দ হচ্ছে না৷’

‘আপা, আগেরটা কত দিয়ে নিয়েছেন?’

‘কেন পাঁচ হাজার টাকায়৷’

‘আচ্ছা নিন৷ আর কিন্তু বদল হবে না৷’

সুমি আগের থ্রি-পিসটি বদল করে দোকান থেকে বের হলো৷ সাত হাজার টাকার থ্রি-পিস সাড়ে তিন হাজার টাকায় কিনেছে৷ কিন্তু মিলি একটি চালাকি করলো৷ সে তার ভ্যানিটি ব্যাগে টাকা খুঁজতে থাকে৷ সে ভাব নিচ্ছে, টাকা পাওয়া যাচ্ছে না৷ সুমি দোকানদারকে বলল, ‘ভাই, আমি বাসায় টাকা রেখে এসেছি৷ থ্রি-পিসটি রেখে দিন৷ আমি টাকা নিয়ে আসছি৷’ ‘ঠিক আছে, আপা৷’ নুসরাত তাদের দুই বোনের কাহিনী শুনে অবাক হলো৷ একেই বলে সেরের উপর সোয়া সের৷ নুসরাত তাদের বলল, ‘আমি আপনাদের সাথে একমত নই৷ কুকুর আমাকে কামড় দিলে, আমিও কি কুকুরকে কামড় দিবো?’

দুই বোনের কাহিনী শুনে তার মনে বিভিন্ন প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে৷ আজ নুসরাতের আর কেনা-কাটা করতে ভাল লাগছে না৷ নিজের জন্য এখনো কিছু কিনেনি৷ রাতও বেড়ে গেছে৷ নুসরাত মার্কেট থেকে বের হয়ে গেল৷ তারপর একটি রিক্সা নিয়ে সোজা বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো৷ রিক্সা চালক রিক্সা চালাতে চালাতে নুসরাতকে বলল, ‘ম্যাডাম, দিনকাল ভাল না৷ একা একা এতো রাতে বাহিরে চলাফেরা ঠিক না৷’ নুসরাত বলল, ‘ভাই, রাত বেশি হয় নাই, মাত্র এগারোটা বাজে৷’

‘গত কাল এমন সময় সামনের মোড়ে একটি ছিনতাই হয়েছিল৷ ছিনতাইকারী একজন মহিলার কানের দুল টান দিয়ে নিয়ে গেছে৷ এতে ঐ মহিলার কান ছিঁড়ে রক্তপাত হয়েছিল৷ তবে আমার রিক্সায় কখনো হয় নাই৷ সামনে ঈদ। চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারী সবাই পাগল হয়ে গেছে৷ মাঘ মাস আসলে যেমন কিছু কুকুর পাগল হয়ে যায়, তেমনি রোজার মাসে কিছু খারাপ লোক পাগল হয়ে যায়৷’

‘তোমার নাম কি?’

‘রহমত৷ রহমত আলী৷’

‘তোমার বাসায় কে কে আছে?’

‘একমাত্র অসুস্থ মা আছেন৷’

‘এখনো বিয়ে করো নাই?’

‘না, বিয়ের বয়স হয় নাই৷’

‘তোমার মায়ের কি অসুখ?’

‘আমার মায়ের লিভার নষ্ট হয়ে গেছে। মায়ের চিকিৎসার জন্য দিনে-রাতে কাজ করছি৷ কয়েকদিন ধরে মায়ের অবস্থা খুবই খারাপ৷ ডাক্তার বলেছেন, আর বেশি দিন বাঁচবে না৷’ নুসরাত বলল, ‘বাঁচা-মরা আল্লাহর হাতে৷’ রহমত রিকশা চালিয়ে যাচ্ছে৷ পিছন থেকে নুসরাত বলল, ‘রহমত, এই টাকাগুলো রাখো৷ তোমার মায়ের চিকিৎসার জন্য দিলাম৷’ ‘আপা, টাকা লাগবে না৷’

নুসরাত এক প্রকার জোর করেই রহমতকে টাকা দিলো৷ রিক্সা চৌরাস্তা পার হলে রহমত বলল, ‘ম্যাডাম, আমি একটু হিসু করবো৷ আপনি বইসা থাকেন৷’ রহমত হিসু করতে একটি গাছের আড়ালে গেল৷ হঠাৎ একজন ছিনতাইকারী নুসরাতের ভ্যানেটি ব্যাগ নিয়ে দৌড় দিলো৷ রহমত দূর থেকে দেখেই ছিনতাইকারীর পিছুপিছু দৌড় দিলো৷ নুসরাত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রিকশায় বসে রইল৷ কিছুক্ষণ পর নুসরাত শপিং ব্যাগগুলো নিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরে এলো৷ ছিনতাইকৃত ব্যাগটিতে কিছু কসমেটিক, মোবাইল ফোন ও কিছু টাকা ছিল৷ নুসরাত ভাবছে রহমতের কথা৷ তার মা অসুস্থ। মায়ের চিকিৎসা খরচের জন্য ছেলেটি দিন-রাত কাজ করছে৷ এই যুগে এমন ছেলে পাওয়া যায় না৷ সে কেন যে ছিনতাইকারীর পিছনে ছুটলো, তার যদি কোন বিপদ হয়?

আজিজুল এক মগ কফি বানিয়ে নুসরাতকে দিতে দিতে বলল, ‘তুমি, টেনশন করো না৷ আমি টাকার ব্যবস্হা করছি৷ তুমি আবার শপিং করে নিও৷ এখন কফি খাও, ভাল লাগবে৷ টেনশনের সময় কফি ভাল কাজ করে৷’ নুসরাত রিক্সা চালক রহমতের কথা আজিজুলকে বলল। আজিজুল শুনে উত্তর দিলো, ‘তার সাথে ছিনতাইকারীর যোগসাজশ থাকতে পারে৷ হয়তো সেও ছিনতাইকারীর লোক৷’ ‘আমার মনে হয় না রহমত খারাপ ছেলে৷’ ‘ছেলেটি তার মায়ের গল্প তোমাকে হয়তো বানিয়ে বলেছে।’ ‘হয়তো৷’ ‘আজকাল মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না৷’

নুসরাতের মনে অনেক বিষয় খেলা করছে। সে বিছানায় শুয়ে রহমতের কথা ভাবছে- মানুষ এতোটা নিখুঁতভাবে অভিনয় করতে পারে? আসলেই কি মানুষের মধ্যে বিশ্বাস উঠে গেছে? অন্যদিকে আজিজুল নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে৷ রাত আড়াইটা বেজে গেছে৷ নুসরাত ভাবলো আর ঘুমিয়ে লাভ কি? সেহেরি খাওয়ার সময় প্রায় হয়ে-ই গেছে৷ পরেরদিন সকালে আজিজুল অফিসে যাচ্ছে৷ সে বাসা থেকে বের হতেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গেল৷ এবং নুসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যা হওয়ার হয়ে গেছে। মন খারাপ করো না৷ আপাততঃ পুরানো মোবাইলটা ব্যবহার কর৷’

আজিজুল অফিসে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরই নুসরাত তার মাকে ফোন করে গতকাল রাতের ছিনতাইয়ের পুরো ঘটনাটি জানায়৷ ঘটনাটি শুনে তার মা আৎকে উঠলেন৷ এবং নুসরাতকে বললেন, ‘তোর কোন ক্ষতি হয়নি তো, মা? তুই আর একা একা বাহিরে যাবি না৷ এখন দিনকাল ভাল না৷’

মায়ের সাথে কথা বলে সে টিভি নিয়ে বসল৷ রোজার মাসে রান্নাবান্নার ঝামেলা কম৷ আজকাল ঢাকা শহরে বাসায় ইফতারি বানানো কমে গেছে৷ বেশিরভাগ মানুষ দোকান থেকে ইফতারি কিনে আনেন৷ বিভিন্ন রকমের ইফতারি নিয়ে লোকজন রাস্তার পাশে বসে আছেন৷ এগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও মজাদার৷ তবে স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ভাল তা পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা-ই বলতে পারবেন৷

নুসরাত তার ছিনতাইকৃত মোবাইল নম্বরে ফোন দিলো৷ মোবাইলটি বন্ধ আছে৷ এর মানে হলো- ছিনতাইকারী মোবাইলটি বন্ধ রেখেছে৷ নুসরাত দুপুর বেলায় বাহিরে গিয়ে নতুন সিম তুলে আনলো। এবার ছিনতাইকারী চাইলেও তার মোবাইল নম্বর থেকে কাউকে ফোন দিতে পারবে না৷ তাছাড়া ছিনতাইকৃত মোবাইলটিতে বায়োমেট্রিক সিকিউরিটি লক করা আছে৷ ছিনতাইকারী চাইলেও ব্যবহার করতে পারবে না৷ ঘটনাটির তিনদিন পর, আজ শুক্রবার৷ আজিজুল জুমার নামাজ পড়ে বাসায় এলো৷ সে পাঞ্জাবি খুলতে যাবে, ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠলো। আজিজুল পাঞ্জাবি না খুলেই দরজাটি খুলে দিলো৷ একটি ছেলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেটি বলে উঠলো, ‘এটা কি নুসরাত ম্যাডামের বাসা?’

‘হ্যাঁ৷ কেন?’ ‘একটু দরকার আছে৷’ আজিজুল ছেলেটিকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলল৷ ছেলেটির পাতলা চেহারা৷ বয়স বাইশ-তেইশ হবে৷ আজিজুল ভিতরের রুমে গিয়ে নুসরাতকে বলল, ‘তোমার খুঁজে একটি ছেলে এসেছে৷ তাকে আগে কখনো দেখি নাই৷ ড্রয়িং রুমে বসতে বলেছি৷ চলো ড্রয়িং রুমে৷’ নুসরাত ও আজিজুল ড্রয়িং রুমে গেল৷ ছেলেটি নুসরাতকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো। নুসরাত বলে উঠলো, ‘রহমত তুমি?’ ‘ম্যাডাম, এই নিন আপনার ব্যাগ৷’ ‘ব্যাগ কোথায় পেয়েছো?’

‘ঐ দিন ছিনতাইকারীর পিছু নিয়েছিলাম৷ এক সময় ছিনতাইকারী ব্যাগ রেখে পালিয়ে গেছে৷ ব্যাগ নিয়ে রিকশায় ফিরে এসে দেখি আপনি নাই৷ আপনার ঠিকানাও জানি না, তাই আপনার বাসায় আসতে পারি নি৷ আপনার ব্যাগটি আমার বাসায় নিয়ে গেলাম। বাসায় গিয়ে দেখি, আমার মায়ের শরীর খুব খারাপ৷ তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিলাম৷ কিন্তু আমার মা আমাকে এতিম করে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন৷ তারপর আজ সকালে আপনার ব্যাগটি খুললাম৷ একটি ভ্যাটের রিসিটে আপনার ঠিকানা পেয়ে সোজা চলে এলাম৷’

নুসরাত ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘তুমি খুব ভাল ছেলে৷ কেউ চিরকাল বেঁচে থাকে না৷’ ‘ম্যাডাম, এই নিন আপনার টাকা৷’ ‘টাকা কেন?’ ‘আমার মা বেঁচে নেই৷ আপনার টাকা নিবো কেন?’ আজিজুল জিগ্যেস করলো, ‘তোমার বাবা কোথায়?’ ‘জানি না, স্যার৷’ রহমত উঠে দাঁড়ালো৷ ‘ম্যাডাম আসি৷ স্যার আসি৷ আমার জন্য দোয়া করবেন৷’ রহমত একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলেন৷ মানুষের মধ্যে আজো বিশ্বাস উঠে যায়নি৷ এই পৃথিবীতে রহমতের মত মানুষদের বেশি দরকার৷

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত