মারাত্মক সমাধান

মারাত্মক সমাধান

হারামজাদা! তোরে আমি বিরিয়ানির সাথে শসার মতো কামড়াই খামু! তোরে ব্লেন্ডার মেশিনে ঢুকাইয়া শরবত বানাইয়া এক ঢোকে গিলে ফেলমু! তোরে..তোরে..তোরে.. আটার মতো মাঞ্জা দিয়া রুটি বানাইয়া ছিড়ে ছিড়ে খামু। কুত্তা, বিলাই, সাপ, বিচ্ছু, কচ্ছপ, হাঁস, মুরগি, কমলা, আপেল, আঙ্গুর, টমেটো, ঢেঁড়স…তাড়াতাড়ি আমার ফোন ধর!

ঘুম থেকে উঠেই দেখি ফাহাদ এত্তোবড় একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। কল লিস্ট চ্যাক করে দেখি ফাহাদের ফোন থেকে ১৯৯ টা কল এসেছে। ফোন সাইলেন্ট থাকার কারণে শুনতে পাইনি। আর মেসেজ তো মেসেজ না একগাদা হত্যার হুমকি। হুমকি গুলোও অতি কঠিন ও জটিল। সে যেমন খাদক, হুমকিগুলোও খাদক টাইপের।

মেসেজ পড়ে ভয়ে আমার গলা শুকিয়ে গেলো। গপাগপ তিন গ্লাস পানি খেয়ে ভয়ে ভয়ে ফাহাদকে ফোন করে বললাম:- বন্ধু আমার, শুভ সকাল! এই বৈশাখের আনন্দমুখর দিনে তোমার প্রাণে নেমে আসুক অনাবিল সুখ এবং আনন্দ। তোমার মুখে হাসি ফুটুক, জীবনটা ভরে উঠুক সাফল্যের পদ্মফুলে। তোমার প্রতিটি পুরো কথা বলার আগেই ফাহাদ রেগে মেগে বললো:- হারামজাদা! চুপ..একদম চুপ। মোনার সাথে আমার ব্রেকআপ করিয়ে এখন সাহিত্য মারানো হচ্ছে? ভেতরে কালবৈশাখি ঝড় তুলে এখনো বলছো অনাবিল সুখ, আনন্দে ভরে উঠতে? কই তুই? এক্ষুণি আমার বাসায় আয়!

ফাহাদের ব্রেকআপের জন্য আমি কেন দায়ী হবো? ব্যাপারটা আমার মাথায় আসলো না। মিন মিন করে বললাম:- আমি তো তোর বন্ধু, অতি কাছের বন্ধু। আমি তো সবসময় ই তোর ভালো চাই? আমি কেন তোর ব্রেকআপের কারণ হবো, বল?  ফাহাদ আবারো রেগে মেগে চেঁচিয়ে বলল:- এই..একদম ন্যাকামি করবি না! এক্ষুণি আমার বাসায় আয়… এক্ষুণি। আর আসার সময় আন্টি আঙ্কেল কে সালাম করে চিরবিদায় নিয়ে আসবি! বলবি কোনো ভুল করলে ওনারা যাতে তোকে ক্ষমা করে দেয়।

:- কি বলছিস এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
:- কথা না বলে চুপচাপ আমার বাসায় আয়!

ফাহাদের রুমের সামনে দাড়িয়ে আছি। তার দরজায় একটা পোস্টার ঝুলানো। পোস্টারে বেশ বড়সড় করে লেখা “আমায় দেবদাস হতে দিন; দয়া করে বিনা অনুমতিতে রুমে ঢুকে দেবদাস সাধনায় ব্যাঘাত ঘটাবেন না!” অতি অদ্ভুদ লেখা। লেখাটা পড়ে আমি ভ্রুকুঁচকালাম। ফাহাদের জন্য একটু মায়াও হলো, আহারে বেচারা.. এই বয়সেই দেবদাস হওয়ার চেষ্টা করছে। তারপর, আমি দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে তাকিয়ে দেখি ফাহাদ দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে বাঁকা হয়ে বসে আছে। তারমানে প্রেমে “ছ্যাঁকা খেয়ে ব্যাকা” হওয়ার উক্তিটা মিথ্যা নয়; পুরোপুরি সত্যি? ফাহাদ তো দেখছি ছ্যাঁকা খেয়ে সত্যি সত্যিই বাঁকা হয়ে গেছে। খেয়াল করে দেখলাম ওর হাতে ‘মদের বোতলের’ মতো একটা বোতল। একটু পর পর দেবদাস ভঙ্গিতে সেটা মুখে নিচ্ছে আবার নামাচ্ছে! আমি প্রায় দৌড়ে গিয়ে বললাম:- সে কিরে ফাহাদ, প্রেমিকা চলে গেছে বলে তুই মদ খাবি? এটা কোনো কথা? সে গম্ভীর ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো:- এটা মদ না, এটা কোকাকোলা! আপতত এটা দিয়েই দেবদাসের মতো মদ খাওয়ার প্রাকটিস করছি। ইউ নো, প্রাকটিস মেইকস্ এ ম্যান পারফেক্ট!

:- সে ভালো! কিন্তু দোস্ত তোর তো আরেকটু পরিবর্তন আনতে হবে। এই যেমন:- তোর চুলগুলোকে পাগলের মতো আউলা-ঝাউলা করতে হবে। ছেড়া ময়লামাখা পাঞ্জাবি পড়তে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, খাবার-দাবার কমিয়ে তোকে আরো চিকন হতে হবে। দেবদাস তো তোর মতো এত্তো মোটা ছিল না। তুই কি শাহরুখ খানের “দেবদাস” মুভিটা দেখিস নি?

:- ঐ..তুই আমার সাথে একদম মজা করবি না! আমি এখন মজার মুডে নেই। সব দোষ তোর, সেদিন যখন আমি মোনার সাথে কথা বলছিলাম তুই আমার কানের কাছে এসে বললি “দোস্ত, এটা কয় নাম্বার”? তুই কি জানিস, সেদিন তোর এই কথা মোনা শুনে ফেলেছিল। মোনা ভাবল সত্যি সত্যিই বোধহয় আমার অনেকগুলো গার্লফ্রেন্ড আছে। তারপর, সে আমায় ইচ্ছেমতো গালাগাল করলো এবং ব্রেকআপ করে চলে গেল। তোর জন্য, শুধু তোর ঐ কথার জন্য আমার আজ এই অবস্থা? কথাটা বলেই ফরহাদ কান্না শুরু করলো!

:- ইয়ে.. মানে দোস্ত। আমি তো একটু মজা করেছিলাম মাত্র। আচ্ছা বাদ দে, আমি যখন তোর ব্রেকআপের কারণ আমিই তোর প্রেম আবার জোড়া লাগিয়ে দেবো। সব সমস্যা সুন্দর করে সমাধান করে দেবো। কান্নাকাটি বন্ধ কর। কিন্তু দোস্ত..

:- আবার কিন্তু কি?

:- সকাল থেকে কিচ্ছু খাইনি..বুঝলি। বড্ড বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছে করছিল রে। মানিব্যাগটা ও আনতে ভুলে গেছি!

:- হয়েছে আর বলতে হবে না..বুঝে গেছি। কাজ করার জন্য ইনডিরেক্টলি ঘুষ চাইছিস। আচ্ছা চল..হোটেলে চল!

ধোয়া উঠা গরম বিনিয়ানি খাচ্ছি, সাথে কুচি কুচি করে কাটা শসা, আর কুল ড্রিংকস্ তোহ্ আছেই! আহ্ এ যেন অমৃত ! আমার খাওয়ার দিকে ফাহাদ হা করে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম:- শোন ফাহাদ..তোকে ও বিরিয়ানি খেতে বলতাম, কিন্তু তুই এমনিই অনেক মোটা, মোটা মানুষের বিরিয়ানি খাওয়া ঠিক না। এতে মেদ বাড়ে, চর্বি বাড়ে, হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকিও বাড়ে। বন্ধু হিসেবে আমি চাই না তুই এই অল্প বয়সেই উপরে চলে যা! তাছাড়া তুই উপরে চলে গেলে মোনার কি হবে বল?

কথাটা শেষ করেই ওয়েটারের কাছে চার নাম্বার বিরিয়ানি প্লেটের ওর্ডার করলাম। ফাহাদ আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল:- তুই মানুষ না হাতি? যা একেবারে বিরিয়ানির পাতিলের ভেতর ঢুকে যা! চারনাম্বার প্লেটের বিরিয়ানি মুখে দিতে দিতে বললাম:- রাগিস না দোস্ত! শুন, তুই তোর গার্লফ্রেন্ডকে ফোন করে আসতে বল। আমি সব বুঝিয়ে বলবো। আজকেই সব সমাধান হবে! তারপর ফাহাদ মোনাকে ফোন করে আসতে বলল। বিরিয়ানির বিল চুকিয়ে আমরা ও মোনার সাথে দেখা করতে গেলাম।

মোনা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আর ফাহাদ আমার পাশে। আমি মোনাকে বললাম:- আসলে… মোনা! অতি দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, ঐদিন ঐ কথাটা আমার বলা উচিত হয়নি। কথাটা তোমায় আরো আগে বলার উচিত ছিল! তুমি যা শুনেছো সব ই সত্যি! আসলেই ফাহাদের সাত-আটটা গার্লফ্রেন্ড আছে। তুমি খুব সম্ভবত ওর পাঁচ কি ছয় নাম্বার হবে? তাই নারে ফাহাদ?

আমার কথা বলার সময় ফাহাদ বারবার আমার হাতে চিমটি কাটছে! এবার আমি ফাহাদের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলাম:- দোস্ত, সত্যটা লুকাতে নেই। তাছাড়া এমনিতেও সত্য কোনো না কোনোদিন প্রকাশ পেতোই!

খেয়াল করলাম আমার কথা শুনে মোনা রেগে অগ্নিমূর্তি হয়ে যাচ্ছে। সে ভয়ংকর দৃষ্টিতে ফাহাদের দিকে তাকিয়ে আছে! হঠাৎ ই সে তার পায়ের জুতা খুললো। জুতা খোলা দেখেই ভয়ে ফাহাদ দৌড়া শুরু করলো। পিছন পিছন মোনা ও দৌড়াতে লাগলো। গার্লফ্রেন্ড তার বয়ফ্রেন্ডকে জুতা নিয়ে ধাওয়া করছে। অতি চমৎকার দৃশ্য। সচরাচর এসব দৃশ্য চোখে পড়ে না। আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের দৌড়াদৌড়ি দেখছি। প্রেমের মধ্যে শুধু ভালোবাসা থাকবে এ কেমন কথা? মাঝেমধ্যে মারপিট থাকতে হবে, দৌড়াদৌড়ি থাকবে হবে, ছুটোছুটি থাকতে হবে তবেই না প্রকৃত প্রেম।।

(ওহ্ ভালোকথা.. তাদের দৌড়াদৌড়ির শেষে অবশ্য মোনাকে সত্যিটা বলেছিলাম যে:- আমি আসলে মজা করেছি ; ফাহাদের অন্যকোনো গার্লফ্রেন্ড নেই! একথা শুনার পর মোনা ও ফাহাদ দুজন মিলে আমায় দৌড়িয়েছিল সে কি দৌড়ানি)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত