আইসক্রিম

আইসক্রিম

আধা ঘন্টা ধরে এক চায়ের দোকানে বিনা‌ পয়সায় খাটছি । কাস্টোমার দের সামনে চায়ের কাপ নিয়ে যাচ্ছি । দৌড়াদৌড়ি করতে করতে আমার পা ব‍্যাথা হয়ে গেছে । দুই তিনবার গরম চা পড়েছে হাতের ওপর । জ্বলছে খুব, কিন্তু কিছু করার নাই, খাটতে তো হবেই ভুল যখন করে ফেলেছি । আমি চায়ের দোকানে কাজ করি না । একটা ভুলের শাস্তি হিসেবে এতোক্ষণ ধরে চা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছি ।

ঘটনা হলো, সকালে আটটার সময় ঘুম থেকে উঠেছি খুব ফুরফুরে মেজাজে । আজকের আবহাওয়া টা সুন্দর ছিল । ঘুম থেকে ওঠে ব‍্যালকনিতে বসে শুক্রবারের শান্ত শহরটাকে দেখছিলাম । কিন্তু একটু পর ই মেঘ কানের কাছে এসে ভাঙা রেডিও চালু করে দিলো, ” তরকারি,মাছ-মাংস কিছু নেই আর উনি দার্শনিক ব‍্যালকনিতে বসে ভাবনায় মগ্ন । যা !! তাড়াতাড়ি বাজারে যা !!” তুই করে বলছে !!! তার মানে আজকে মেজাজ বেশি গরম । ওল্টা জবাব দিলে আমার ওপর সাইক্লোন বয়ে যাবে ।

বউয়ের মুখে তুই কথাটা শুনতে খারাপ লাগছিলো । নিজের মনকে স্বান্তনা দিলাম এই বলে, “আরে ব‍্যাটা !! মেঘ তোর থেকে দুই বছরের বড় । তুই বলতেই পারে” । কিছুক্ষণ ঘ‍্যানর ঘ‍্যানর করার পর মেঘ তার বিশাল বাজারের ব‍্যাগ আর একটা লিস্ট এনে হাতে ধরিয়ে দিলো । প‍্যান্ট আর টি-শার্ট পড়ে রওনা দিলাম বাজারের উদ্দেশ্যে ।একঘন্টা ধরে বাজার করে হাত, পিঠ, মাজা ব‍্যাথা হয়ে গেছে । বাড়িতে গিয়ে মেঘের হাতে বাজারের ব‍্যাগ ধরিয়ে দিলাম । মানিব‍্যাগ বের করে দেখি আর মাত্র ১৬০০ টাকা আছে । যদিও মাস শেষ , আর টাকা লাগবে না । কিন্তু আমি একটা জিন্স প‍্যান্ট দেখছিলাম ২২০০ টাকা । ওটা আর একটা ঘড়ি কিনতে চাইছিলাম । কিন্তু সেটা আর হলো না । ফোনটা চার্জে লাগিয়ে চা খেতে বের হলাম । চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম । মামাকে এককাপ মালাই চা দিতে বলে দুইটা বেনসন নিলাম । একটা ধরিয়ে টানছি । আর একটা চায়ের সাথে খাবো ।

একটু পর দোকানদার মামা চা নিয়ে এলো । আহ !! চা টা দারুন হয়েছে ।ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে । চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি আর সিগারেটে একটা করে টান দিচ্ছি । কম্বিনেশন টা দারুন হয়েছে ।চা খাওয়া শেষ হলে মামাকে বললাম, মামা বিল কতো হয়েছে ??

মামা: দুইটা‌ বেনসন ২৪ টাকা, একটা কাঠি ম‍্যাচ ১ টাকা আর এক কাপ মালাই চা ১০ টাকা । মোট ৩৫ টাকা হয়েছে ।
টাকা দেওয়ার জন্য পকেট থেকে মানিব‍্যাগ বের করবো । কিন্তু একি !! মোর মানিব্যাগ কোনহানে গেলো !! এই রে !! বাজার থেকে ফিরে বিছানার ওপর রাখছিলাম আর তো পকেটে ভরি নাই । দোকানদার মামাকে বললাম,

আমি: মামা টাকা তো আনি নাই । আপনি বাকি লিখে রাখেন ।

দোকানদার: আমি বাকির কারবার করি না । আফনে টাকা দেন আমার ।

আমি: আরে মামা মানিব‍্যাগ ফেলে আসছি । পরে দিয়ে দিবো আপনাকে ।

দোকানদার: তা হইবো না । আফনেরে দেইখাই ফাকিবাজ মনে হইতাছে । টাকা না দিয়া কোথ্থাও যাইতে পারবেন না । যারা বইয়া আছে হেগোর কাছে ধার করেন ।

দোকানদার এর কথা শুনে খুব ই কষ্ট পেলাম । আমাকে নাকি ফাকিবাজদের মতো দেখতে লাগে । হায় রে দোকানদার !! মানুষ চিনলি না !! আমি করুণ চোখে আশেপাশে তাকিয়ে চেনা পরিচিত কাওকে দেখতে পেলাম না । যারা বসে আছে তারা দোকানদারের মুখে আমার নামে ফাকিবাজ অপবাদ শুনে পকেটে হাত দিয়ে রেখেছে । একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দোকানদার কে আবারো বুঝাতে চেষ্টা করলাম । কিন্তু হারামজাদা বুঝতে নারাজ । অগত‍্যা আমাকে তার দোকানে কামলা খাটতে হচ্ছে । একঘন্টা খাটতে হবে এটা দোকানদারের শর্ত । অনেক ছোট ছোট, কম বয়সী ছেলেদের সামনে চায়ের কাপ হাতে যেতে হচ্ছে । নেহায়েৎ আমার শরম লজ্জা কম । নইলে আমি আজকে শরমে মরে যেতাম । একঘন্টা কাজ করা হলে দোকানদার আমার সামনে এসে বললো,”কি স‍্যার ? কেবা লাগলো আমার প্রতিশুধ ??”
আমি অবাক হয়ে বললাম, কিসের প্রতিশোধ ??

দোকানদার: জরিনার কথা মনে আছে নি ? আফনের বাড়িতে কাম করতো ।

আমি: হ‍্যা । খাটো করে গোলগাল চেহারার মেয়ে ।

দোকানদার: ও আমার মাইয়া । ওর পায়ে সমস‍্যা ছিল । তাই একটু কম কাজ করতো । আপনি তাই ওরে বিদায় করে আরাকজন কামের বেডি আনলেন ??

আমি: তো কি করবো ? যে কাজ করতে পারে না তাকে রেখে শুধু শুধু বেতন দিবো ??

দোকানদার: এর লাইগাই তো আমি আজকে প্রতিশুধ নিছি ।

দোকানদারের কথা শুনে আমি পুরাই আবুল হয়ে গেলাম । মনে মনে ব‍্যাটাকে ১০০+ গালি দিলাম । তারপর দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে হাটতে শুরু করলাম ।প‍্যান্টের পিছনের পকেটে হাত দিয়ে হাটছি । প‍্যান্টের পিছনের বা পাশের পকেটে কাগজের মতো কি যেন অনুভূত হলো ।বের করে দেখি একটা দুই টাকার নোট । দুই টাকার নোট টা বের করে হাতে নিলাম । একটা ফকিরকে ভিক্ষা করতে দেখলাম চার রাস্তার মোড়ে । আমি কাছে যেতেই ভিক্ষুক টা হাত পেতে বললো, বাবাগো, দুইদিন ধরে আমার মাইয়াডার জ্বর । ওষুধ কেনার লাইগা কিছু ট‍্যকা দেন । লোকটার চেহারা দেখে বুঝতে পারছি মিথ‍্যা কথা বলছে । যদিও তার বাটিতে অনেক টাকা আছে , তারপরো ভিক্ষা করেই যাচ্ছে করেই যাচ্ছে। আমি দুই টাকার নোটটা তার হাতে দিয়ে দিলাম । লোকটা আমাকে বললো, বাবা এইডা কি দিলেন ?

আমি: ওহহহ !! আপনি চোখে দেখেন না ?

লোকটা: দেহি দেহি । চোখে দেহি । কিন্তু দুই ট‍্যাকা দিয়া তো আজকাল কিছু হয় না । আমি সবগুলো পকেট বের করে দেখিয়ে বললাম , এই যে দেখেন আর একটা টাকাও নাই । লোকটা আমাকে অবাক করে দিয়ে ওই দুই টাকা সহ আরো দশ‌টাকা আমার হাতে গুজে দিয়ে বললো, ‘বাবাজি!! আজকে অনেক রোইদ । আইসক্রিম খাইয়েন !!”

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত