Life Hacks

Life Hacks

Life Hacks ভিডিওগুলা দেখলে মনে হয় দুনিয়াতে আমার কতকিছু অজানা! এইত সেদিন দেখলাম ছেলেদের আন্ডারওয়্যার কেটে মেয়েটা ব্রেসিয়ার বানায় ফেলল! সেই ব্রেসিয়ার পরে আবার ডানে বামে মোচড় দিয়ে দেখাল কত কম্ফোর্টেবল! কি ক্রিয়েটিভিটিরে বাপ!

ভিনেগার দিয়ে শাওয়ারের মুখ বেঁধে পরিষ্কার করা, কোকের বোতল কেটে ফুলের ঝুলন্ত টব বানানো, টুথপেস্ট দিয়ে মোবাইলের স্ক্রিনের দাগ মুছে ফেলা, বোতলের মুখ কেটে গুড়া মশলার প্যাকেট আটকানো, রংপেন্সিল গলিয়ে লিপস্টিক বানানো, মানসিক প্রশান্তির জন্য বেলুনে টুথপেস্ট ঢুকিয়ে টিপাটিপি করার মত ভিডিওগুলা দেখে আমারো ইচ্ছা হয় ক্রিয়েটিভ হওয়ার। এত সহজ সমাধান চারিদিকে আর আমি কি না জানিই না!

ঠিক এমনি এক দিনে আমার চোখে পড়ল টিশার্ট থেকে দাগ দূর করার একটি ভিডিও। মেয়েটা প্রথমে ইচ্ছা করে হাত দিয়ে ঠেলে কালো রং ভর্তি ডিব্বা টিশার্টের উপরে ফেলে বুঝাতে চাইল ভুলে হয়ে গেছে। তারপরে চেহারায় এমন একটা ভাব করল যেন বিশাল বড় এক ক্ষতি হয়ে গেছে।

এরপরে সে টিশার্টটা একটা টেবিলে রাখল। যে জায়গায় দাগ তার উপরে ট্যালকম পাউডার দিয়ে একটু ঘষাঘষি করল। তারপরে একটা টুথব্রাশে টুথপেস্ট নিয়ে আবার ঘষাঘষি করল। দাগ ততক্ষণে হালকা হয়ে গেছে। এরপরে সে একটা পাত্রে ভিনেগার আর লেবুর রস মিলেয়ে দাগের জায়গায় ঢেলে দিল।

এর পরের দৃশ্যে দেখা গেল মেয়েটা একটা চেয়ারে বসে উপরের দিকে তাকিয়ে তর্জুনি আঙ্গুল দিয়ে গালে টিপটিপ করছে। নিচে লেখা দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে। যদিও দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়নি, ১০ সেকেন্ডের মাথায় সে বেকিং সোডা এনে দাগের জায়গায় ঢেলে আবার ব্রাশ দিয়ে ঘষাঘষি করল। এবং আশ্চর্যজনকভাবে সম্পুর্ন দাগ মুছে টিশার্ট একদম নতুন হয়ে গেল! মেয়েটা টিশার্ট তুলে ধরে বাঁকা হয়ে রাজ্য জয়ের হাসি হাসল।

ভিডিওটা দেখার পরে আমার তৎক্ষণাৎ মাথায় আসল সাদা টিশার্টটার কথা। আগের শুক্রবার জুম্মার নামাজের পরে বাসায় এসে পাঞ্জাবী খুলে সাদা টিশার্টটা পরে খেতে বসছি। আম্মা গরু রান্না করছে। গরুর কেজি ছয়শ টাকা হওয়ার পর থেকে এখন আর প্রতি শুক্রবার গরুর মাংস হয় না, বড়জোর মাসে একদিন। সেদিন মাসের তেমনি একটা দিন ছিল। খাওয়ার মাঝামাঝি সময়ে একটা বড় হাড়ে কামড় দেয়ার মুহুর্তে সেইটা পিছলে যেয়ে টিশার্টে পড়ল।

ডিটারজেন্টে ভিজিয়ে রেখে লাভ হয়নি। দাগ থেকে গেছে। ভিডিওটা দেখার পরে আমার ক্রিয়েটিভ মন আমাকে তাগাদা দিতে লাগল। আমিও দাগ থেকে যদি নতুন কিছু হয়, তাহলে দাগই ভাল মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে কাজে লেগে পড়লাম। প্রথমেই দরকার ট্যালকম পাউডার। ঘরে কোন বাচ্চাকাচ্চা নেই। বড় আপা আসলে একটা কথা ছিল, ওর বাচ্চার পাউডার দিয়ে কাজ চালানো যেত। যেহেতু বড় আপা প্রতিমাসে আসে এবং এমাসে আসার সময় সন্নিকটে, আমি ফোন দিলাম বড় আপাকে,

-হ্যালো আপা, তোমরা কবে আসবা?

-কেন? কি দরকার?

-না মানে অনেকদিন দেখি না। খবরাখবর নিতে হয়না?

-আগে কোনদিন তো ফোন দিয়ে খবরাখবর জিজ্ঞেস করস নাই। এমনকি বিয়ের দিন হাতে পায়ে ধরেও তোরে আমার সাথে পাঠাইতে পারে নাই। জামাই বাড়িতে আমি একলা আসছি। তোর মতলব কি?

-কোন মতলব নাই। আজকে কালকের মধ্যে আসবা?

-না রে, তোর দুলাভাই ব্যাস্ত। সামনের সপ্তাহে আসতে হবে। আব্বা আম্মা কেমন আছে?

-ওনাদের ফোন দিয়া জিজ্ঞেস করো, রাখলাম।

ফোন কেটে দিলাম। রাগ লাগছিল খুব। অন্যসব বারে ঠিকই এসে আমার রুমটা দখল করে, আর এবার আমার দরকার, সে আসতে পারবে না। তাই বলে তো আমার ক্রিয়েটিভিটি থেমে থাকবে না। নিচের তলার ভাবীর বাচ্চা আছে। ওনার কাছ থেকে চেয়ে নেয়া যাবে।

ফ্রিজ খুলে দেখি লেবুও নাই। আমি যেসব জিনিস কিনতে হবে তার একটা লিস্ট করি। টুথপেস্ট বাসায় আছে। ভিনেগার, লেবু আর বেকিং সোডা কিনলেই হবে। রইল বাকি টুথব্রাশ। প্রথমেই গেলাম আম্মার কাছে। এক্সট্রা টুথব্রাশ আছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই বলল আছে। বারান্দায় একটা পিরিচের উপর রাখা। আনন্দে আমার চোখ চকচক করে উঠল। বারান্দায় যেয়ে দেখি ঐটা আব্বার চুলে কলপ দেয়া ব্রাশ। আমার ব্রাশটা দুই সপ্তাহ আগে কেনা। এই ব্রাশ দাগ উঠাতে ব্যবহার করতে মায়া লাগে। আমি ছোট বোনের কাছে যেয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

-তোর পুরান টুথব্রাশ আছে?

-না, কেন?

-দরকার। তোর ব্রাশ কতদিন হইছে কিনছিস?

-দুই মাস হয়ে গেছে

-আচ্ছা, তোর ব্রাশটা লাগবে। আমি নতুন একটা কিনে এনে দিব।

-আমার ব্রাশ একশ বিশ টাকায় কেনা। সেইম এনে দিতে হবে কিন্তু। দশটাকা দামের সস্তা ব্রাশ আনলে কিন্তু নিব না।

-ব্রাশ কি জাদুঘরে রাখবি? প্রদর্শনী করবি? দাঁত পরিষ্কার হলেই তো হয়। আসছে একশ বিশ টাকার ব্রাশ। নিলাম না তোর ব্রাশ।

ব্রাশের জোগাড় হল না, তবে বাজারে দশ টাকায় ব্রাশ পাওয়া যায় সেইটা মনে পড়ে গেল। আমি লিস্টে দশটাকার টুথব্রাশ যোগ করে বাজারের দিকে রওনা দিলাম। মুদির দোকানে যেয়ে বেকিং সোডা চাইতেই দোকানদার জিজ্ঞেস করল,

-কত কেজি নিবেন?

-কেজি না ভাই, সামান্য লাগবে। এই ধরেন ২০ গ্রাম।

-সবচে ছোটটা ১০০ গ্রাম। ত্রিশ টাকা।

-ঐটাই দেন। ভিনেগার আছে? কমদামে ছোটটা?

-আশি টাকা। একদাম।

-দেন একটা। ব্রাশ আছে?

-টয়লেটের না দাঁত মাজার?

-টুথব্রাশ, দশ টাকা দামেরটা আছে?

-মালের রাজ্যে নতুন আসছেন নাকি? দশ টাকায় এখন ব্রাশ খুঁজতেছেন! ঐ ব্রাশ এখন ত্রিশ টাকা। দাম বাড়ছে।

-ভাই কমায় রাখা যায় না? একবার ইউজ করব মাত্র। ত্রিশ টাকায় পোষাবে না।

-আচ্ছা যান, কনসিডার করলাম। বিশ টাকা দিয়েন।

দোকানদারের প্রতি আমার সম্মান বেড়ে গেল। এই যুগে কে কাকে কনসিডার করে? ভিনেগার, বেকিং সোডা আর টুথব্রাশ নিয়ে গেলাম লেবু কিনতে। লেবুর হালি বিশ টাকা। একটা লেবু কিনতে চাওয়াতে রীতিমত অপমান করে দিল। শেষ পর্যন্ত বিশ টাকায় এক হালি লেবু কিনে বাসায় ফেরার পথে দেখি এক লোক ফেরি করে দশ টাকায় ব্রাশ বিক্রি করছে। মানব জাতির উপর থেকে বিশ্বাসটাই উঠে গেল।

সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় মনে পড়ল ট্যালকম পাউডার লাগবে। নিচতলার দরজা নক করতেই ভাবী দরজা খুললেন। আমাকে দেখে বুকের কাপড় ঠিক করা শুরু করলেন। কি অভিনয় মহিলার! উনি যে দরজার ফুটো দিয়ে আগেই আমাকে দেখেছেন সেইটা কিন্তু আমি টের পেয়েছি। আমি ভাবীকে সালাম দিয়ে বললাম,

-ভাবী কেমন আছেন?

-ভাল আছি, আপনার ভাইয়া তো বাসায় নাই।

-না ভাবী, একটা ছোট দরকার। ট্যালকম পাউডার আছে বাবুর? একটু লাগবে।

-আছে তো, আপনি ভিতরে আসেন। চা বানাই।

-না ভাবী, আমাকে একটু পাউডার এনে দিলেই হবে।

ভাবী পুরা পাউডারের কৌটাই এনে দিলেন। যতই বলি কৌটা লাগবে না, একটু হলেই হবে। ভাবী বলেন, নিয়ে যান- কাজ শেষে দিয়ে যাইয়েন। আমার আবার ভাবীর কাছে আসতে ইচ্ছা করে না। কৌটা ফিরত দিতে এলেই উনি আবার কাপড় ঠিক করার অভিনয় করবেন, যেন আমি ইঁদুর তরমুজ ক্ষেতে নজর দিয়েছি। আমার নিজেকে অপরাধী মনে হয়।

বাসায় ঢুকেই আমি কাজে লেগে পড়লাম। সাদা টিশার্টটা খুঁজে বের করলাম। টেবিলে রেখে পাউডার ঢেলে এরপর টুথপেস্ট ব্রাশ দিয়ে ঘষাঘষি করলাম। তারপরে লেবু আর ভিনেগার মিশিয়ে আবার ঘষাঘষি করলাম। দশ মিনিট অপেক্ষা করলাম। শেষে বেকিং সোডা ঢেলে আবার ব্রাশ দিয়ে ঘষাঘষি করলাম। সব প্রসেস শেষে দেখি দাগ তো উঠেই নাই, বরং টিশার্টে ছোট ছোট ছিদ্র হয়ে গেছে।

Life Hacks ভিডিও থেকে বিশ্বাস সেদিনই উঠে গেছে। আমি হিসাব করতে বসলাম কত খরচ হয়েছে। বেকিং সোডা ত্রিশ টাকা, ভিনেগার আশি টাকা, ব্রাশ বিশ টাকা, লেবু বিশ টাকা, যাওয়া আসার রিক্সা ভাড়া বিশ টাকা। টোটাল একশ সত্তর টাকা হিসেব করার পরে আমার মনে পড়ল টিশার্টটা আমি বঙ্গমার্কেট থেকে মাত্র ১২০ টাকায় কিনেছিলাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত