অপূর্ন স্বপ্ন

অপূর্ন স্বপ্ন

-“বাজান,আমি পিএসসি পরীক্ষায় A+ পাইছি।”

-“তুই না কেলাস ফাইভের পরীক্ষা দিলি?তাইলে এই পরীক্ষা কহন দিলিরে মা?”

-“আরে বাজান,ক্লাস ফাইভের পরীক্ষারেই পিএসসি কয়।আর আমি স্কুলের সবার চাইতে সবচেয়ে ভালা রেজাল্ট করছি।”

-“তাইনি?!!!! শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্‌।তুই বাইত্তে গিয়া তোর মায় রে,দাদিরে জানা।আমি ক্ষেতের কাম শেষ কইরা বাজার থেইকা মিষ্টি নিয়া আইতাছি।”

-“আইচ্ছা বাজান।”

-“সাবধানে যাইস রে মা।”

এতক্ষণ কথা হচ্ছিল করিম মিয়া আর তার একমাত্র মেয়ে ফাতেমার সাথে।করিম মিয়া একজন গরিব দিন মজুর।পরের জমিতে ধান চাষ করে অনেক কষ্টে তার সংসার চালায়।সংসারে তার স্ত্রী,মেয়ে আর অসুস্থ মা আছে।

মেয়ে ভাল রেজাল্ট করেছে শুনে খুশিতে তার চোখে পানি চলে আসে।কত কষ্ট করেই না পড়ালেখা করেছে।আর তার পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে তার স্কুলের শিক্ষকদের।তারা বিনা বেতনে ফাতেমাকে পড়ালেখা করার সুযোগ করে দেয়।সবরকম সাহায্য সহযোগিতা করে তারা।

করিম মিয়া বাজার থেকে মিষ্টি কিনে সবার আগে স্কুলের শিক্ষকদের দেয়।তারপর বাড়ির জন্য সামান্য মিষ্টি আর বাকি মিষ্টিগুলো পাড়া-প্রতিবেশীদের দেয়।সবাই ফাতেমার রেজাল্ট শুনে খুব খুশি হয় আর অনেক দোয়া করে। রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমানোর সময় করিম মিয়া তার স্ত্রী মরিয়মের সাথে কথা বলছে।

-“ফাতেমার মা,ভাবতাছি ঢাহা শহরে যামু।”

-“এইডা কি কথা কন আফনে?ঢাহায় যাইবেন কেন আফনে?আর ওইহানে গিয়াই বা কি কইরবেন?কিছুইতো চিনেননা জানেননা।”

-“ইস্কুলের স্যার গো যহন মিষ্টি দেই,তারা তহন কয় অন্য ইস্কুলে ফাতেমারে পড়াইতে অনেক টাহা লাগব।এত টাহা কই পামু কও?এই কথাডা আমার দোস্ত সগীররে কই।ওর মাইয়াওতো ফাতেমার লগে পাশ করছে।

সগীর কইল ওর লগে ঢাহায় যাইতে।ওইহানে আমাগো এই গেরামের মতন আরো গেরাম আছে।ওইহানে ক্ষেতে কাম করলে মেলা পয়সা পামু।আমার মাইয়াডারেও আরো পড়াইতে পারুম।আমাগো সংসারের-ও আর কোনো কষ্ট থাকবনা।মার-ও চিকিৎসা করাইতে পারুম।কি কও তুমি?”

-“আফনে যেডা ভালা বুঝেন,হেইডাই করেন।কিন্তু আমাগো একা রাইখা যাইবেন আমরা কেমনে থাকুম আফনারে ছাইড়া?”

-“আল্লাহ্‌ আছেগো বউ।তিনিই দেইখা রাখবেন।অতো চিন্তা কইরনা।কাল সগীরের লগে কথা কইয়া দেহি কি কয়।অনেক রাত হইছেগো।ঘুমাও।”

-“হ।আফনেও ঘুমান।” পরদিন করিম তার বন্ধু সগীরের সাথে কথা বলল।তারা দুজন ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করল।তার দুইদিন পর করিম আর সগীর ঢাকায় যাবে।করিম যখন বের হবে তখন বাসার সবাই খুব কান্নাকাটি করতে থাকল।

-“মা,তুমি যদি এমনে কানতে থাহো তাইলে আমি কেমনে বাইর হই কও?আর তোমার লগে তো ফাতেমা,ফাতেমার মায় আছেই।তুমি শুদু দুয়া কর মা।”

-“বাজান রে,তোর বাপের মরার পর তোরে কহনও দূরে রাহিনাই।তাই এত চিন্তা লাগে।সাবধানে যাইস।চলাফিরা করিস।ভালামতো খাওন খাইস রে বাজান।খিদায় কষ্ট করিসনা।আর তাড়াতাড়ি চইলা আসার চেষ্টা করবি।আল্লাহ্‌র নাম নিবি সবসময়।”

-“ঠিক আছে মা।তুমি চিন্তা কইরনা।আল্লাহ্‌ ভরসা।” করিম তার মায়ের সাথে কথা শেষ করে পায়ে হাত ছুঁয়ে সালাম করে তার স্ত্রী মরিয়মের কাছে গেল।

-“তুমি অহনো কানতাছো?কাইন্দনাগো।আমি তাড়াতাড়ি চইলা আসুম।ফাতেমা আর আমার মায় রে দেইখা রাইখো।ফাতেমারে ইস্কুলে ভর্তি করায় দিও।ঠিকমতন খাইয়ো আর সাবধানে থাইকো বউ।”

-“আফনেও সাবধানে থাইকেন।ঠিকমতন খাইয়েন আর তাড়াতাড়ি চইলা আসেন।”

-“আইচ্ছা বউ।ফাতেমা কই?”

-“বাইরে।কানতাছে আফনের লেইগা।” করিম বাহিরে বের হতেই ফাতেমা তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে আরো কাঁদতে থাকল।

-“বাবা আমি স্কুলে ভর্তি হমুনা।তারপরও তুমি আমাগো ছাইড়া যাইওনা বাবা।যাইওনা।”

-“আরে পাগলি,এইভাবে কেউ কান্দে নাকি?আমার খারাপ লাগেনা ক?আমিতো তাড়াতাড়ি চইলা আসুম।ক মা,তোর জইন্য কি আনুম?”

-“কিচ্ছু লাগবনা।শুদু তুমিই তাড়াতাড়ি আইয়া পইড়ো।”

-“আমার পরির জইন্য কিছু আনুমনা তা কি অয়?চিন্তা করিসনা আমি তাড়াতাড়ি-ই চইলা আসুম।ক কি লাগব?”

-“তাইলে একটা লাল জামা আনবা আমার লেইগা।”

-“আইচ্ছা মা আনুম।অহন যাই?”

-“যাই না।কও আহি।”

-“আইচ্ছা আহি।ভালা থাকিস মা।”

করিম সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ঢাকা জেলায় অবস্থিত একটি গ্রামে করিম আর সগীর ধানের জমিতে দিন মজুরের কাজ করে।বাসা-বাড়িতে গাছ কাটা,মাটি কাটা,ধান নেয়ার কাজ করে।

সগীর যখন মাঝে মাঝে গ্রামে যায়,তখন করিম কিছু টাকা বাসায় দেয়ার জন্য সগীরের সাথে পাঠিয়ে দেয়।আর করিমের স্ত্রী মরিয়ম কিছু খাবার সগীরের সাথে পাঠায় করিমকে দেয়ার জন্য।করিম যখন খায়,তখন তার বাড়ির কথা মনে পড়ে আর কাঁদতে থাকে। এভাবে প্রায় কয়েক মাস কেটে যায়।করিম বাড়িতে যাওয়ার সময় পায়নি এরমধ্যে।কারণ,করিমের কাজের দক্ষতা আর সততার জন্য সবাই তাকে খুব ভালবাসে আর বিশ্বাস করে।তাই প্রায় প্রতিদিনই করিমকে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। বাড়িতে যাওয়ার জন্য করিমের মন আর মানছেনা।তাই সে সগীরকে বলে,

-“দোস্ত,কতমাস হইয়া গেল বাইত্তে যাইনা।মা,বউ,মাইয়ারে দেহিনা কতদিন ধইরা।আমারে নিয়া যাইতে পারবি?”

-“এইডাতো খুবই ভালা কথা।ক কবে যাইবি?আমি তোরে নিয়া যামু।”

-“মাইয়াডা আমার কাছে একখান লাল জামা চাইছে।বউ আর মার লেইগা দুইডা শাড়ি আগেই কিনা রাখছি।কাল হকালে জামা কিনা দুপুরে খাইয়া বিকালেই বাইর হইয়া যামুনে।”

-“আইচ্ছা ঠিক আছে।” পরদিন সকালে করিম কাপড়ের দোকান থেকে খুব সুন্দর দেখে লাল ফ্রক কিনে।ফ্রকটি নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবে,

-“ফাতেমা এই জামা দেইখা কতই না খুশি হইব।এই জামা পড়লে আমার মায়েরে এক্কেবারে পরির লাহান লাগব।আমার ফাতেমারে অনেক লেহাপড়া করামু।বড় হইয়া ডাক্তার হইব আর আমাগো মতন গরিব মাইনসেগো টাহা ছাড়া চিকিৎসা করাইব।” এই সময় হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল।সাথে বজ্রপাতও শুরু হল।করিম দিশেহারা হয়ে গেল।কারণ আশেপাশে কোনো বাড়িঘর নেই যে সেখানে আশ্রয় নিবে।আর তার সাথে শুরু হল প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি।

-“ইশশশ!!!! আমার মাইয়ার জামাখান তো ভিজা যাইব।আল্লাহ্‌ তুমি ঝড় থামাইয়া দাও।আমার মাইয়ার জামা ভিজা গেলে আমি কেমনে ওর জামা ওরে দিমু?”

হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ার কারণে একটি বিরাট বড় গাছের বড় একটি ডাল করিমের উপর পড়ে যায়।করিম বড় ডালের নিচে চাপা পড়ে আছে।ডাল সরিয়ে উঠার শক্তি নেই তার।এই বুঝি দমটা বের হয়ে যাবে।তার বুকে আছে তার ভালবাসা,আদরের পরির লাল টুকটুকে জামাটি।

তখন আর একটি বড় ডাল করিমের মাথার উপর পড়ল।শেষ পর্যন্ত করিম মৃত্যুর কাছে হার মানল।তার দেহের রক্তে সেই লাল জামাটি ভিজে আরো লাল টুকটুকে হয়ে মিশে যায় বাবা-মেয়ের অকৃত্রিম ভালবাসা। আর অপূর্ণ রয়ে যায় এক মৃত্যুঞ্জয়ী বাবার স্বপ্ন। যেসকল মানুষ এরকম মৃত্যুর কাছে হার মেনেছে, তাদের প্রতি রইল আমার লাখো সালাম আর অনেক দোয়া। আল্লাহ্‌ তাদের জান্নাতবাসী করুক। তাদের পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য্যশক্তি আরো বাড়িয়ে দিক। আমিন।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত