চ্যালেঞ্জ

চ্যালেঞ্জ

ছোট বোনের সাথে আমার বউয়ের সেইরকমের ঝগড়া চলছে ৷ আমি গেস্টরুমে শুয়ে থেকে মোবাইল টিপছি ৷ তাদের ঝগড়া চলছে চলুক, আমি ওদের মধ্যে নেই ৷ হঠাৎ, আমার বউ ফাইজা গেস্ট রুমে আসলো ৷ তাকে তেড়ে আসা দেখে মনে হলো আজ আমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে ৷ সেইরকম মজাদার গালিগালাজও করতে পারে ৷ কিন্তু নাহ কিছুই বললনা সে, ৷ গায়েও হাত তুললনা ৷ শুধু হাতটা ধরে বিছানা থেকে উঠতে বাধ্য করলো আমাকে ৷ টেনে নিয়ে গেল ড্রয়িংরুমে ৷ রুমে ঢুকেই ছোট বোনটা ক্ষ্যাপাস্বরে বলে উঠল,

__আজ থেকে মনে করব আমার কোনো ভাই ছিলনা ৷ ওরকম ভাই থাকার চেয়ে না থাকাই ভাল ৷ যে ভাই বউয়ের কথায় বোনের বিপক্ষ নেয় সে আবার কেমন ভাই? চুপ রইলাম বোনের কথা শুনে! ওদিকে ফাইজা বলে উঠলো,

__ঐ ছেরি, তোর ভাই কখন আমার পক্ষে নিলো? তোর ভাইকে এখন বিচার করতে হবে ৷ যদি বিচার না করে তবে তোর ভাইয়ের একদিন কি আমার একদিন!

ফাইজার কথা শুনেও নির্বাক হয়ে রইলাম ৷ এদের কথার জবাব দেওয়া মানেই ঝগড়াটাকে বড় করা! তাছাড়া যদি বোনের পক্ষ নিয়ে কথা বলি তবে বউ রেগে যাবে আমার উপর, আবার বউয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বললে বোনটা রেগে যাবে ৷ তারচেয়ে ভাল চুপ থাকা! ফাইজা আমাকে চুপ থাকা দেখে ক্ষ্যাপা বাঘিনীর রুপ নিয়ে ক্ষিপ্তস্বরে বলল,

___তুই চুপ কেন রে কুত্তা? আজ কি কথা বের হবেনা তোর? কথা বল বলছি ৷ নইলে বাপের বাড়ি চলে গেলাম বলছি! ছোট বোন তানিয়া তার ভাবির কথাকে অযাচিত কথা বলে প্রমাণিত করতে বলে উঠল,

___দেখছিস ভাই, তোকে কেমনে গালি দিচ্ছে? এই বজ্জাত মহিলাটাকে নিয়ে তুই সংসার করছিস কেমনে? ফাইজা আরো বেশি চটে গেল ৷ তানিয়ার কথার জবাব দিয়ে বলল,

___এই ছেরি, তোরে না বলছি চুপ থাকতে? আমি তোর সাথে কথা বলছি না, বলছি আমার স্বামীর সাথে ৷ ওরে গালি দিই যা ইচ্ছা তাই করি তাতে তোর কি? তানিয়া জবাব দিলো,

___ঐ বুড়ি মহিলা, আমি কি তোরে এখন কিছু বলছি? আমি আমার ভাইকে বলছি ৷ তোর চেয়ে আমার দরদ বেশি ভাইয়ের প্রতি ৷ একই রক্ত বহন করছি আমরা! তুই আর একটা কথাও বলবিনা ৷ একদম চুপ থাকবি!
___তুই চুপ থাক, তোর কথা দূর্গন্ধ লাগে!
___চুপ বুড়ি মহিলা!
___তুই চুপ ছেরি!

___এই বুড়ি মহিলা, আমি তো চুপ হবই না ৷ দেখব কত ঝগড়া করতে পারিস ৷ চ্যালেঞ্জ! কখনোই আমার সাথে ঝগড়ায় জিততে পারবিনা!
___ঠিক আছে চ্যালেঞ্জ

এবার আর চুপ থাকা গেলনা ৷ চোখ বন্ধ করে দুজনকে হুংকার মেরে ধমক দিতে চাইলাম ৷ ধমক দিলাম কিন্তু আওয়াজ বের হলো বেড়ালের মত! এমন সাইজের ধমক শুনে কেউই চুপ হলোনা ৷ ফাইজা আমাকে বলল,

__আচ্ছা, তোর বোন কিসের জন্য বলল আমার নাক বোচা? আমার কি নাক বোচা?

ফাইজার কথা শুনে তব্দা খেয়ে গেলাম ৷ খুব জোরে খিলখিল করে হাসতে মন চাচ্ছিল ৷ কিন্তু হাসলাম না, হাসলে যদি বউ মারে? মনে মনে বললাম, “আমার বউটা কত বোকার বোকা! এই কথার জন্য পিচ্চি একটা মেয়ের সাথে ঝগড়া করতে হবে? আর তার নাক তো বোচা নয়! হাসিটা জোর করে থামিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বউকে নরম করে আদুরে গলায় বললাম,

__কি যে বলোনা, তোমার নাক কই বোচা? তোমার নাক তো তিরতিরা, পিরামিডের মত! তানিয়া চেঁচিয়ে একটা গালি দিয়ে ফাইজাকে বলল,
___আস্ত একটা! ওর নাক বোচা কথাটি বলছি মজা করে ৷ আর ওটাই ধরে নিছে সে! ফাইজাকে বললাম,

___বউ, সে তো মজা করে বলছে ৷ তুমি ক্ষেপলে কেন? ফাইজা এবার কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,
___তোর বোন নাহয় ওটা মজা করে বলছে!

পরে সে কিসের জন্য বলল আমার নাক বোচা, দেখতে বুড়ি বুড়ি আর এজন্য নাকি আমাকে কেউ প্রেমের প্রস্তাব দেয়নি ৷ প্রেমের প্রস্তাব দিলে নাকি অনেক আগে বিয়ে হয়ে যেত আমার ৷ বুড়ি বয়সে এসে বিয়ে হতোনা তোমার সাথে ৷ এতবড় মিথ্যা আর ফালতু কথা সে কি করে বলল? তোর বোন জানে আমাকে ১হাজারটা ছেলে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল? কিন্তু প্রেম করিনি হবু বরের জন্য ৷ বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল ৫০০ টি সবাইকে না করে দিয়েছিলাম কারণ কাউকে সৎ মনে হয়নি ৷ তোমাকে মনে হয়েছিল বলে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলাম! শেষের এই কথাটি শুনে খুব খুশি হলাম ৷ লজ্জাও পেলাম ৷ লজ্জায় লাজরঙ্গা হয়ে দাঁতে নখ ঢুকিয়ে দুলছিলাম এরপর বউয়ের হাতটা ধরে ফেললাম ৷ বউ হাতটা ঝাড়ি মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,

___কিন্তু বিয়ের পর দেখি তুই একটা আস্ত খাটাস ৷ তোর বোনের মত!

মলিন হয়ে গেল আমার মুখটা ৷ আর বাসায় থাকা যাবেনা ৷ এটা বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম ৷ পরে মধ্যরাতে বাসায় এসে দেখি তারা ভাবি ননদ মিল হয়ে গেছে ৷ এজন্য মনটা আনন্দে ভরে গেল ৷ কিন্তু যখন দেখলাম তারা ভাবি ননদ একসাথে ঘুমায়ছে তখন মনটা খারাপ হয়ে গেল ৷ গেস্টরুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম! সকালে ঘুম থেকে উঠে জানার কৌতূহল হলো তানিয়ার সাথে ফাইজার মিল হলো কেমনে? বউকে বললাম,

___তোমাদের মিল হলো কিভাবে বলো তো? বউ মিষ্টি হেসে বলল,
___তিনটার দিকে তানিয়ার এসএসসি পরীক্ষার বোর্ড চ্যালেঞ্জের রেজাল্ট পেয়েছিল তার স্যারের থেকে ৷ জানোই যে মূল পরীক্ষায় অল্পের জন্য তার A+ মিস হয়েছিল ৷ এজন্য সে বোর্ড চ্যালেঞ্জ করল ভুলে গেছো? চ্যালেঞ্জে তানিয়া সফল হয়েছে ৷ সে গোল্ডেল A+ পেয়েছে! এই খবর পেয়ে কি ননদের প্রতি রাগ করে থাকা যায়? তাছাড়া, আমার ছোট ভাই তানিয়ার রেজাল্টের খবর পেয়ে ফোন দিয়ে কান্নামাখা স্বরে বলেছিল,

___আপু, তুই যদি পাশে না থাকিস তবে আমি শেষ ৷ তানিয়া তো গোল্ডেন পেয়ে গেল ৷ এবার তো ওর অহংকার বেড়ে যাবে ৷ আমি তো ওর সমকক্ষের ছাত্র নই ৷ ইন্টারে টেনে টুনে পান করছি ৷ তানিয়াকে তো শুরু থেকে ভালবাসতাম ৷ সে ছোট ছিল তাই এতদিন তাকে মনের কথাটা খুলে বলিনি ৷ কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বলতে হবে ৷ না বললে সে তার সমমানের ছেলের সাথে লাইন মারবে ৷ আর আমি তখন দেবদাস হবো, যা মেনে নিতে পারবনা ৷ আপু, আগামীকাল দুপুরে তোর বাসায় যাব ৷ তানিয়াকে প্রোপজ করব ৷ এর আগে ওকে একটু বলিস আমার বিষয়ে!” এসব শুনে বুঝতে পারলাম আমার ভাই তোমার বোনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে ৷ দুদিন পর সে আমার ভাইয়ের বউ হবে তার সাথে ঝগড়া করা কি চলে? বলো? তাই মিল হয়ে গেছি!

ফাইজার কথায় মনটা ফুরফুরা হয়ে গেল ৷ তানিয়ার রেজাল্ট শুনে মনটা খুশিতে নেচে উঠলো ৷ ঝগড়ার কারণে রেজাল্টের কথা ভুলেই গেছিলাম ৷ কাল বাসা থেকে ঝগড়ার কারণে বের হবার পর ফোনটা বন্ধ রেখেছিলাম তাই কাল রেজাল্ট জানতে পারিনি ৷ এখন জানলাম ৷ সত্যি খুশি হয়েছি ৷ কিন্তু চিন্তা হলো শালাবাবুর ব্যাপারট নিয়ে ৷ তানিয়া কি ফাইজার ভাইকে মেনে নিবে? তানিয়া আমাদের কাছে আসলো ৷ ফাইজা হেরফের না করে তাকে বলে দিলো,

__প্রিয় ননদ আমার, তোমাকে রাতে একটা কথা বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু বলিনি চমকে দিতে ৷ এখন বলছি, আমার ভাই তন্ময় তোমাকে ভালবাসে ৷ ওকে মেনে নিও! তানিয়া বিদ্রুপের হাসি হেসে মুখ বাকা করে বলল,

___ইশ ভাবি! এটা আগে বলতে পারলেন না? আমি তো ক্লাস ৯ থাকতেই একজনকে ভালবেসে আসছি ৷ আপনার ভাই যদি আগেই প্রোপজ করতো ৷ তবে কিছু হতো! ব্যাড লাক!  এটা শুনে ফাইজা বেহুশ! আমি বেহুশ হবো নাকি অজ্ঞান হবো বুঝতেছিলাম না, প্রাণ হারিয়ে ফেলার শঙ্কা হলো ৷ তানিয়া আমার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে বলল,

___ভাইয়া, তুই বেহুশ হইসনা ৷ ভাবিকে একটু কিক মারলাম ৷ তাকে জ্বালাতে বড্ড ভাললাগে ৷ একমাত্র ভাইয়ের বউ বলে কথা ৷ সত্যটা শোন, তোর শালা তন্ময়ের সাথে আমার ১ মাস হলো প্রেম শুরু হয়েছে ৷ কাউকে জানাইনি ৷ আজ বোর্ড রেজাল্ট পাবার পর তন্ময়কে ফোন দিয়ে বলেছিলাম, তোমার বোনকে এরকম এরকমটা বলবে, অন্যথায় আমাদের প্রেমের ডিভোর্স হবে ৷ সে ভয়েই তার বোনকে ঐ কথাগুলো বলছে যা তুই ভাবির থেকে শুনছিস ৷ আমি তন্ময়কে দিয়ে এসব বলিয়েছি ৷ যাতে ভাবি একটু ছ্যাকা খেতে পারে ৷ ছ্যাকা দিয়েছি ৷ এবার তুই যা তার জ্ঞান ফিরা! ছোট বোনের কথা শুনে নিজেই অজ্ঞান! বউয়ের জ্ঞান কেমনে ফিরাই? দুপুরে শালা বাবু এলো ৷ মাগার সিঙ্গেল না ডাবল হয়ে ৷ একজন অপরুপা সুন্দরী তার সঙ্গে ছিল ৷ ফাইজা তার ভাইকে দেখে খুশি হলো ৷ তানিয়া তন্ময়ের সাথে একটি মেয়েকে দেখে বলল,

___এসব কি তন্ময়? তন্ময় বলল,
___“হে এক্স-গফ, শোনো তবে; এই মেয়েটা আমার নিউ গার্লফ্রেন্ড ৷ ওর নামও তানিয়া ৷ বলো তোমার চেয়ে সুন্দরী কিনা?” এটা শুনে তানিয়া বেহুশ! আমি বেহুশ হলাম না, প্রচন্ড কষ্ট পেলাম ৷ তখন ফাইজা আমার হাতটা ধরে রুমে নিয়ে গিয়ে তীব্র খুশির ঠ্যালায় তৈরি হওয়া হাসিতে বলল,

___আরে বোকা, তুমি কষ্ট পাও কেন? তোমার বোন আমাকে কিক মেরেছিল কিন্তু আমি পেনাল্টি কিক মারলাম ৷ একদম গোলপোস্টে সে ৷ সত্যটা শোনো, তন্ময়ের সাথে ঐ মেয়ের কিছুই নাই ৷ ওরা ক্লাসমেট মাত্র ৷ আমার কথাতে তন্ময় নাটকটা করেছে ৷ সে তার বোনকে বিজয়ী করল ৷ তোমার বোন হয়তো জানেনা আমি ঝগড়ায় মেডেলপ্রাপ্ত! পাড়ার মেয়েদের সাথে ঝগড়া হলে কেউ পারতোনা ৷ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঝগড়া হলে নিশ্চিত নোবেল পেতাম!
বউয়ের কথা শুনে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলাম না ৷ হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেয়ে বেহুশ হয়ে রইলাম!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত