পরোপকারী

পরোপকারী

ফাহিম ভাই ঠিকই বলেছেন দেশের জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে আর মানুষের সংখ্যা কমছে (আমি) অ্যা! এটা আবার কি করে সম্ভব।আমার তো কিছুই বুঝে আসছে না।দেশের জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু মানুষের সংখ্যা কমছে? তোরা যে কি বলিস কিচ্ছু মাথায় ঢুকে না আমার (ফারদিন) তমাল ফারদিনকে বুঝিয়ে বলো।ও এখনও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি (ফাহিম ভাই)ফাহিম ভাই আমিও কথাটা প্রথমে ধরতে পারি নি।

ছবিটা দেখেন গতকাল ফেসবুকে কে জানি পোস্ট দিয়েছে।ছবিটা দেখে আমার ভিতর কেমন জানি করে উঠলো।বৃদ্ধা বাবা এক পা হারিয়ে মানুষের কাছে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।পরিবারের মানুষগুলো যাতে দু মুঠো খেয়ে-পরে থাকতে পারে।কিন্তু দেখুন উনার সারা দিনের টাকাগুলো বৃষ্টির পানিতে ভেসে যাচ্ছে।এমনকি উনিও বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছে।তাকে বৃষ্টি থেকে সরিয়ে শুকনা জায়গাতে নিবে সেটা কিন্তু কেউ করছে না। ফাহিম ভাই দেখুন উনি উনার হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। কেন দিয়েছে বলতে পারেন? (আমি) না তো ধরতে পারছি না (ফাহিম ভাই) তমাল লোকটি মনে হয় কাঁদছে,ফাহিম ভাই দেখুন (ফারদিন) হুমমম! তাই তো মনে হচ্ছে (ফাহিম ভাই) হ্যাঁ উনি কাঁদছে মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।ক্যামেরার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য উনি মুখটা লুকিয়েছে কিন্তু সবাই ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত।কেউ উনাকে সাহায্য করলো না।

যে ছবিটা তুলেছে সে কি পারতো না উনাকে যেখানে বৃষ্টি নেই সেখানে নিয়ে যেতে।কি এমন ক্ষতি হতো ছবি না তুলে লোকটিকে সাহায্য করলে।ছবিটি দেখার পরই আপনার বলা কথাটি মাথায় আসলো তখন বুঝতে পারলাম আসলে জনসংখ্যা বাড়ছে কিন্তু মানুষের সংখ্যা কমছে।মানুষের বিবেক হারিয়ে যাচ্ছে,মানুষকে করে দিচ্ছে অমানুষ (আমি) আসলেই রে মানুষ দিন দিন পশুর থেকে অধম হয়ে যাচ্ছে।তবে সবাই কিন্তু এক নয় রে।কিছু মানুষের মধ্যে বিবেকটা জাগ্রত আছে (ফারদিন) তোমার সাথে আমিও একমত (ফাহিম ভাই) ভাই ধানের ভিতর চিটা, চিটার ভিতর ধান থাকবেই (আমি) ফাহিম ভাইয়ের সাথে থাকতে থাকতে মাঝে মাঝে তুইও এমন এমন কথা বলিস বুঝতে পারি না (ফারদিন) আরে ব্যাটা ধানের ভিতরে চিটা থাকে তুই বুঝিস না এটা (আমি) হুমমম!এটা তো বুঝছি কিন্তু চিটার ভিতরে ধান এটা বুঝি নাই (ফারদিন) ধান মাড়াই করার পর চিটা গুলো যখন এক জায়গায় গাটি করে রাখে।বৃষ্টি হলে কিছু দিন পর ঐ গাটি থেকে সবুজ পাতা বের হয়।চিটার ভিতর যদি ধান না থাকে তাহলে পাতা বের হলো কি করে বুঝেছিস এবার।

ঠিক তেমনি ভালোর ভিতরে খারাপ এবং খারাপের ভিতর ভালো বিদ্যমান (আমি) বাহহহ! তুই তো দেখছি ভালোই বুঝাতে পারিস (ফাহিম ভাই ও ফারদিন) আচ্ছা শোন আমাদের শুধু নীতি কথা বললে চলবে না।অন্যরা কেমন বা কি করলো সেটা আমাদের দেখার প্রয়োজন নেই।আমরা আমাদের নিজ নিজ সমর্থ থেকে অসহায় মানুষের পাশে দাড়াবো।তাদের বিপদে সাহায্য করবো।যার যতটা সমর্থ আছে ততটুকু দিয়ে মানুষের উপকার করবো (ফাহিম ভাই) আচ্ছা ফাহিম ভাই আমরা ১০ জন সদস্য নিয়ে একটা সংগঠন করি যেটার নাম হবে ”পরোপকারী”। আর প্রতি দিন প্রতিটা সদস্যদের থেকে ১০ টাকা করে নিবো। তাহলে দেখা যাবে ৭ দিন পর আমাদের সংগঠনে কিছু টাকা জমা হবে।সেই জমানো টাকা আমরা কোন এক অসহায় মানুষকে সাহায্য দিলাম। এভাবে আমারা প্রতি ৭ দিন পর পর একেক জনকে সাহায্য করবো এবং মাসে একদিন আমরা ১০ জনে মিলে কাজ করবো।কাজ করে যে টাকাটা পাবো সেই টাকাটাও অসহায়দের সাহায্য করবো (আমি)

বাহহ! তমাল বাহ! তোর কথাগুলো ভালো লেগেছে।আমি তোর সাথে একমত (ফাহিম ভাই) আমিও একমত।তবে আমরা তো তিন জন আছি বাকি ৭ জন পাবো কই? (ফারদিন) আমরা আগে শুরু করি পরে দেখবি অনেকেই আমাদের পাশে এসে দাড়াবে।মনে রাখবি এ দেশে এখনও মানবতা বেঁচে আছে (আমি) তাহলে আগামীকাল থেকে আমাদের “পরোপকারী” সংগঠেন যাত্রা শুরু করি বলিস তোরা (ফাহিম ভাই) হ্যাঁ ভাই জীবনে অনেক খারাপ কাজ করেছি এবার একটু ভালো কাজ করি(ফারদিন) জি ভাইয়া আপনি এই সংগঠনের সভাপতি(আমি) হুমম! ফাহিম ভাইকে সভাপতি করা হোক।উনি যেটা বলবে আমারা সে অনুযায়ী কাজ করবো (ফারদিন) আচ্ছা ফারদিন, তমাল শোন হ্যা ভাইয়া বলেন।

আবির,সাইফ আর যারা যারা আছে আছে ওদের এ বিষয়ে বল, যারা নিজের ইচ্ছায় সদস্য হতে চায় তাদেরকে নিয়ে আমরা আগামী শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর আমাদের পুকুর পাড়ের কাচারি ঘরে মতবিনিময় করা হবে।
আচ্ছা ভাইয়া ঠিক আছে।আমরা আমাদের সব বন্ধুদের বলবো। উদ্যোগ যেহেতু নিয়েছি সেহেতু যে করে হোক বাস্তবায়ন করবো ইনশা-আল্লাহ (আমি) আচ্ছা তাহলে তোরা বাসায় যা অনেক রাত হলো।কাল আবার দেখা হবে (ফাহিম ভাই) আচ্ছা চলুন এবার উঠি তাহলে।আগামীকাল বিকালে ৪টায় মাঠে আইসেন আমরা ওখানেই খেলা শেষ করে প্রাথমিক আলাপ সেরে নিবো।কেউ যদি রাজি হয় তাহলে তো আরো ভালো হবে। আচ্ছা ঠিক আছে!তোরাও বাসায় যা এখন।ঠিক আছে ভাইয়া।

কি খবর তোদের? ভালো আছিস তোরা? জি ভাইয়া ভালো আছি। কিরে আবির তোরে এত দিন পর দেখলাম কই থাকোস হ্যাঁ? মেয়েদের খপ্পরে পড়েছিস নাকি আবার। নাহহ! ভাইয়া কি যে বলেন আপনি। ইশশশ! শরম পাচ্ছে কচি খোকা। তারপর যাই হোক সবাই কি রাজি হয়েছে আমাদের সংগঠনে কাজ করার জন্য। হ্যাঁ ফাহিম ভাইয়া সবাই খুব ভালো ভাবেই মেনে নিয়েছে। আমরা আগামীদিন থেকে কার্যক্রম শুরু করতে পারি। আচ্ছা সেটা নিয়ে কোন সমস্যা নেই তবে টাকাটা জমা রাখবে কে? দায়িত্বটা আবিরকেই দেই কি বলিস তোরা? ফাহিম ভাই আপনার মতামতই আমাদের মতামত।তাহলে আবির টাকা জমা নেবে আর ফারদিন তুই একটা তালিকা করবি যারা অসহায় আছে।

আমরা তালিকা দেখে প্রতি সপ্তাহে একজনকে সাহায্য করবো। আর তমাল তুই সব হিসাব নিকাস রাখবি,আর একটা খাতা বানাবি যেখানে টাকা এবং তার স্বাক্ষর থাকবে। আর হ্যাঁ আমারা মনবতার সেবায় নিজেদের নিয়জিত করছি এখানে কোন প্রকার দুর্নীতি করা চলবে না।সর্বদা সৎ ও সততার সাথে মানব সেবায় নিয়জিত থাকবো। কি বলেছি সবাই বুঝতে পেরেছিস। জি ভাইয়া আমরা সকলে একই শপথে অঙ্গিকার বদ্ধ হলাম। এই নে ১০০ টাকা আমি অগ্রিম দিয়ে দিলাম ৭ দিনের টাকাটা।ফাহিম ভাই আপনি ৩০ টাকা ফেরত পাবেন।৭ দিনে ৭০ টাকা, বাকি ৩০ টাকা আপনি ফেরত পাবেন (আবির)। ফেরত না দিয়ে ওটা রেখে দে।আমি খুশি হয়ে ৩০ টাকা বেশি দিলাম।আর কেউ যদি সেচ্ছায় খুশি হয়ে কিছু দেয় সেটা নিবি এবং লিখেও রাখবি তাহলে হিসাবে গড়মিল হবে না।আচ্ছা তোরা থাক হ্যাঁ আমি একটু অবন্তীর সাথে দেখা করতে যাবো।

বাজান তাড়াহুড়া করে কই যাস আর হাতে ফাইলটা কিসের? (মা) মা আমরা বন্ধুরা মিলে একটা সংগঠন করেছি।সবাই মিলে টাকা জমা দেই প্রতিদিন ১০ টাকা করে এবং প্রতি শুক্রবারে সেই টাকা গুলো একজন অসহায়কে সাহায্য করি টাকাটা দিয়ে।আজ আমরা উত্তর পাড়ার আবুল চাচারে সাহায্য করবো টাকাটা দিয়ে।তুমি দোয়া কইরো পায়ে সালাম করে বলি। বাজান আয় এদিকে আয় আমার বাজান অনেক বড় হয়ে গেছে।কপালে চুমু খেয়ে মা বলেন, যা বাজান যা তোদের জন্য মন থেকে দোয়া করবো দেখবি তোরা অনেক বড় হবি জীবনে।আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে কটা শেষ করলো।আমিও মায়ের কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে আসি।

ফাহিম ভাই আমার মনে হয় এবারের টাকাটা রহিমা চাচিকে দিলে ভালো হয়।গত মাসের ১২ তারিখে কুদ্দুস কাকা অর্থাৎ রহিমা চাচির স্বামী হার্ট অ্যাটাক এ মারা যান।তার পর থেকে রহিমা চাচি দু বেলা খাবার জুটাতে মানুষের দারে দারে যেতে হয়।কোন দিন কিছু পায় আবার কখনও পায় না।ছোট মেয়েটা সবে মাত্র হাটতে শিখেছে।সেও পর্যাপ্ত খাবার খেতে পারে না।এবারের টাকাটা উনাকেই দেওয়া হলে ভালো হবে (আবির) আচ্ছা ঠিক আছে তবে তাই হোক।এবারের টাকাটা রহিমা চাচিকেই দেওয়া হবে।

আর হ্যাঁ আমাদের সংগঠনের ফান্ডে মোটামুটি ভালোই টাকা জমা আছে।রহিমা চাচির মেয়ের দায়িত্ব আমাদের সংগঠনের।ওর যাবতীয় যত খরচ সব আমরা বহন করবো কি বলিস তোরা? আমরা আপনার সাথে এক মত। আর হ্যাঁ আমি কিছু দিনের জন্য ঢাকায় যাচ্চি।আগামী ২৪ তারিখ আমার ও অবন্তীর বিয়ে। তাই কিছু কেনা-কাটা করতে যাবো।তোরা কিন্তু সবাই থাকবি আগে থেকেই জানিয়ে দিলাম।তমাল তুই এ দিকটা সামলে রাখিস। আচ্ছা ভাইয়া চিন্তা করবেন না,সব সামলে নিবো।তো ভাইয়া অবশেষে আপনাদের বিয়েটা হচ্ছে। আজই দাঁতে ধার দেওয়া শুরু করতে হবে। তমাল আমরা কিন্তু অনেক মজা করবো ফাহিম ভাইয়ার বিয়েতে (ফারদিন) তোরা ছাড়া কেউ আছে বল। আমার বলতে তো তোরা আর এই সংগঠনটা।

কিছু দিন পর ফাহিম ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যায়। বছর দুই পর ফাহিম ভাই এর চাকরি হয়ে যায়।চাকরির সুবাদে ফাহিম ভাই ঢাকাতে চলে যান।ফাহিম ভাই প্রতি রাতেই ফোন দিয়ে খোজ খবর নিতো।আমরা এখনও এইচ.এস.সি পাস করি নি কেউ ই।কোন সমস্যা হলে ফাহিম ভাই এর সাথে মতামত বিনিময় করতাম ফোনে ফোনে। ফাহিম ভাই প্রতি সপ্তাহে ৫০০ টাকা করে দিতেন। আর আমাদের জমানো টাকা দিয়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা হতো। কেউ ১০ কেউ ২০ কেউ কেউ ৫০,১০০,৫০০ করে টাকা দিতো।এভাবেই এগোতে থাকি আমরা।

১০ জন নিয়ে শুরু করা সংগঠনটা আজ ১৫০ জনের সংগঠন হয়ে গিয়েছে।গ্রামের চেয়ারম্যান চাচাও আমাদের সংগঠনের সদস্য।তিনিও আমাদের পরামর্শ দেন।আমাদের জন্য তার কার্যালয়ের পশ্চিম পাশের রুমটা ছেড়ে দিয়েছেন।আমরা ওখানেই আমাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ করি।সরাকরি ভাবেও অনেক অনুদান আসতে শুরু করে সংগঠনে। যেটা আমাদের জন্য একটা সস্তির বাহক হয়ে দাড়ায়।চেয়ারম্যান চাচা ও ফাহিম ভাই এর কল্যানেই এত দূর আসা।

তমাল তোমরা কিছু একটা করো।তোমরা আমার ছোট ভাইয়ের মত।তোমাদের ভাই খুব অসুস্থ। ডাক্টার বলেছে দুইটা কিডনি ই নষ্ট হয়ে গেছে।৭ দিনের মধ্যে যদি অপারেশন না করাতে পারি তাহলে তোমাদের ভাইকে বাঁচানো যাবে না। ভাবি আপনি চিন্তা করবেন না আমরা আছি তো। ভাবি অপারেশনের জন্য কত টাকা লাগবে? ১২ লাখ টাকা লাগবে।দুই দিনের মধ্যে যদি ৮ লাখ টাকা জমা দিতে পারি তাহলে অপারেশনের কাজ শুরু করবে।ভাই তুমি কিছু করো।আমার গর্ভের সন্তানের কথা ভেবে অন্তত কিছু করো।ও দুনিয়ার আলো দেখার আগেই বাপ হারা হোক এটা মেনে নিতে পারবো না ভাই।

অবন্তী ভাবির এই আর্তনাদ সয্য করার মত নয়।ফাহিম ভাই কে দেখেও বুকটা কেমন করে উঠলো।চিন চিন ব্যাথা হচ্ছে বুকের এক পাশে। আমরা ৪ জনে বেরিয়ে এলাম।ভাবিকে শুধু বলে এলাম আপনি চিন্তা করবেন না টাকার যোগাড় আমরা করছি।আমাদের সংগঠনে ১০ লাখ টাকা আছে বাকি টাকাটা আমরা যোগাড় করে ফেলবো চিন্তা করবেন না। ভাবি দু হাত প্রসারিত করে দিয়ে বুকে জড়িয়ে নেয় আমাদের।কান্নার মাত্রাটাও বেড়ে যায়।আমরা নিজেদের খুব কষ্টে সামলে রেখেছি। আবির নিজেকে সামলে রাখতে পারে নি, চিৎকার দিয়ে কেঁদে দেয়। সাইফ তুই এইখানে থাক আমরা টাকাটা নিয়ে আসি।

অপারেশন থিয়েটারে সামনে অপেক্ষা করছি।কখন সবুজ বাতিটা জলে ওঠে।আবির বার বার চোখ মুছছে।সাইফ এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে। অবন্তী ভাবি কেঁদেই যাচ্ছে। অবন্তী ভাবির মা ও ফাহিম ভাই এর ছোট বোন ভাবিকে শান্তনা দিচ্ছে কিন্তু কোন মতেই ভাবি নিরব হচ্ছেন না। ঘন্টা পার হতেই অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্টার বেরিয়ে এলেন। আমাদের চিন্তা মুক্ত করে দিয়ে বললেন অপারেশন সুন্দর ভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে।ভয়ের কোন কারণ নেই,জ্ঞান ফিরলেই আপনারা দেখা করতে পারবেন। অবন্তী ভাবির কান্নাটা আগের থেকে বেড়ে গিয়েছে।আমরা গিয়ে ভাবিকে শান্তনা দেই।

ভাবি আমাদের জড়িয়ে নিয়ে বলে,আজ আমার ভাই গুলোর জন্য আমার ফাহিমকে ফিরে পেলাম।তোদের এই ঋণ আমি কোন দিন শোধ করতে পারবো না।আমার কোন আপন ভাই নেই কিন্তু আজ থেকে তোরা আমার আপন ভাই।তোদের বোনকে তোরা আজ ঋণী করে দিলি রে ভাই ঋণী করে দিলি। ভাবি এ কথা বলবেন না ফাহিম ভাই আমাদের বড় ভাই উনার জন্য এতটুকু করতে পেরেছি সেটাতেই আমারা ধন্য।আর আমাদের এই সংগঠনের মূল বাহক তো ফাহিম ভাই, উনার বিপদে আমরা পাশে এসে দাড়াবো না তো কারা দাড়াবে বলেন।উনি আমাদের বড় ভাই!আমাদের বড় ভাই! কান্না জড়িত কন্ঠে সাইফ কথা গুলো বলে উঠলো।

আপনারা আসুন রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। অবন্তী ভাবি ছুটে যায় ফাহিম ভাইয়ের কাছে।ফাহিম ভাই হাত দুটি বাড়িয়ে দেয় অবন্তী ভাবির জন্য।ভাবি ফাহিম ভাইয়ার বুকে গিয়ে মাথাটা রাখে। হাতটা বুলিয়ে দিচ্ছে ফাহিম ভাই। মৃদু সরে বলছে তুমি কেঁদো না আমি ঠিক আছি।তুমি কাঁদলে আমিও নিজেকে সামলে রাখতে পারি না।কথা শেষ হতেই ফাহিম ভাইয়ের চোখের কোণায় পানি দেখতে পেলাম। হাতের ইশারায় ডেকে নিলো আমাদের।হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলো আমাদেরকে।

আমাদের চোখেও নোনাজলের পূর্বাভাস মিলে।তবে এটা ফাহিম ভাইকে ফিরে পাওয়ার অনন্দে।অবন্তী ভাবি ও ফাহিম ভাইকে রেখে আমরা সকলে বাহিরে এসে দাড়াই।আবির ওষুধ আনতে গিয়েছে আর সাইফ খাবার আনতে। আমি হাসপাতালের জানালা দিয়ে বাহিরের বৃষ্টি দেখছি। নিজের ভিতর অন্যরকম ভালো লাগা অনুভব হচ্ছে।আজ এই সংগঠটা ছিলো বিদায় ফাহিম ভাই কে নতুন করে ফিরে পেলাম।আল্লাহর অশেষ রহমতে ফাহিম ভাই ফিরে পেল নতুন জীবন।প্রাপ্তির উপহার হিসেবে দু-ফোটা চোখের পানিই বিসর্জন দেওয়াটাই সব থেকে বড় প্রশান্তির।

কে জানি আঙুলে আঙুল রেখে হাতটা জড়িয়ে নিলো। মুখ টা ঘুরিয়ে সুমাইয়া কে দেখতে পেয়ে কিছুটা বিস্মিত হই।এ রকম পরিস্থিতির জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তুমি এখানে আর এভাবে কেন? ছাড়ো আমায়, কেউ দেখে নিলে সমস্যা হবে। হাতটা যেহেতু ধরেছি সেহেতু আর ছাড়তে হবে না।আপনাকে ভাইয়া ভিতরে ডাকছে।কথা না বাড়িয়ে ফাহিম ভাইয়ের ক্যাবিনে চলে যাই। ইশারায় উনার পাশে বসার কথা বলছে।

আচ্ছা তমাল তুমি যদি কিছু মনে না করো তাহলে আমি আমার বোন সুমাইয়া কে তোমার হাতে তুলে দিতে চাই।ও তোমাকে খুব পছন্দ করে।তোমার ভাবী ওর ডায়েরী পড়ে জেনেছে।আমি হয়তো বেশিদিন বেঁচে থাকবো না।তাই তোমার হাতেই আমার ছোট বোনের দায়িত্বটা দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে চাই।তুমি প্লিজ না করো না। ভাইয়া আসলে না করার কিছুই নেই।আমার পরিবারের পর আপনিই আমার গার্জিয়ান। আপনার কথা আমি কখনও অমান্য করি নি।তবে ভাইয়া আমার পরিবারের লোকজনের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে।উনাদের সিদ্ধান্ত ই আমার সিদ্ধান্ত।তোমার আব্বু- আম্মুকে নিয়ে আগামী ৫ তারিখ আমাদের বাসায় আসো।আপনি আগে সুস্থ হন তারপর দেখা যাবে। বাবা ফাহিম তুমি তো সবই জানো আমার ছেলে এখনও বেকার। কাজ কর্ম কিছুই নেই।শুধু ঐ সংগঠনটা নিয়ে পড়ে থাকে।তারপরও তুমি যেহেতু চাচ্ছো আমরা না করবো না। কেননা তুমিই ওর সম্পর্কে আমাদের থেকে ভালোই জানো।বেশির ভাগ সময় তোমাদের সাথেই থাকে।

আঙ্কেল তমাল এখন হয়তো বেকার আছে তবে সারাজীবন তো আর বেকার থাকবে না।আর কিছুদিন পর গ্রাজুয়েশন কম্প্লিট করবে তাছাড়া ও খুব কাজের ছেলে।আমার বোন ওকে পছন্দ করে।তাই বোনের সুখের কথা ভেবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।এখন আপ্নারা যেটা বলেন তাই হবে। কই আমাদের বউ মা কই। একটু নিয়ে আসেন দেখি আমাদের ঘরের লক্ষীকে। ওমা…খুব মিষ্টি একটা মেয়ে।এই শোনো আমার বউমা পছন্দ হয়েছে।আর তোমার ছেলের মানিব্যাগে এই মেয়েটার ছবি দেখেছি। তুমি পাকা কথা বলে দাও।

মা তুমি চুপ করবে নাকি। একটু রাগের ভাব করে উঠে চলে আসি।হাটতে হাটতে সুমাইয়ার রুমে চলে যাই।খুব গোছানো রুমটা।ক্লান্তিও একটু ভর করেছে আমার উপর।বিছানায় বসে একটু বিশ্রাম নেওয়া যাবে ভেবে বসতে যাবো এমন সময় সুমাইয়ার আগমন। আপনি অনুমতি ছাড়া আমার রুমে ঢুকছেন কেন? এটা তোমার রুম!আগে জানলে ঢুকতাম না।মানুষের রুম নাকি এতটা অগোছালো আর অপরিষ্কার থাকে। কিহহহ বললেন আমার রুম অপরিষ্কার, আপনার খবর আছে আগে বিয়েটা হোক তখন দেখাবো মজা।

তোমাকে বিয়ে করতে যাবে কে হ্যাঁ! ও তাই বুঝি আবার তো মানিব্যাগে আমার ছবি রাখা হয়।যাকে পছন্দ করি তার ছবি রাখবো না তো অন্য মেয়ের ছবি রাখবো নাকি।এতদিন যেহেতু বলতে পারিনি তবে আজ সুযোগ পেয়ে না বলে থাকছি না।যাকে ভালোবাসি তার ছবি মানিব্যাগে ওটা তো বাহ্যিক ভালোবাসার প্রকাশ কিন্তু আমার মনের ফ্রেমে যে তোমার ছবি একে রেখেছি সেই ৩ বছর আগেই।কিন্তু ফাহিম ভাই এর কথা ভেবে নিরবে তোমাকে ভালোবেসেছি প্রকাশ করি নি।কারণ ফাহিম ভাইয়ের বিশ্বাসটুকু নষ্ট করতে চাইনি।

এখন আর কোন বাঁধা নেই রাজকুমার। আগামী সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে।আর হ্যাঁ আপানাকেও আমি ভালোবেসি তবে ভাইয়ার ভয়ে কিছু বলতে পারি নি। আচ্ছা আমি আপনার বুকে আমার মাথাটা রাখতে চাই দিবেন রাখতে? এই বুকে তুমি মাথা রাখবে বলে অন্য কাউকে রাখতে দেই নি। হাত দুটো প্রসারিত করে দু-কদম সামনে এগিয়ে বুকে জড়িয়ে নেই ভালোবাসার প্রিয় মানুষকে।গরম নিঃশ্বাস টা খুব ভালো ভাবেই অনুভব করতে পারছি।আমি যেন খুজে পেলাম অজানা এক সুখের ঠিকানা।আচ্ছা আমি যদি তোমাকে কখনও ঠকিয়ে চলে যাই তখন কি করবে সুমাইয়া? যে মানুষটা নিজের বাইক,গিটার,নিজের ব্যবহার করা মোবাইল পর্যন্ত বিক্রি করে দেয় অন্যের জীবন বাঁচাতে সেই মানুষটা আর যাই করুক না কেন মানুষ ঠকাতে পারে না। তুমি জানলে কি করে এই গুলো।

আমার মা বলেছে, তোমার মা জানবে কি করে? আরে বোকা তোমার মা মানেই তো আমার মা।ওহহহ! মা বলেছে এই যে শুনেন যদি অন্য কোন মেয়ের কথা শুনেছি তোমার হাত পা ভেঙ্গে বসিয়ে রাখবো ।তুমি শুধু আমাকে ভালোবাসবে।শক্ত করে জড়িয়ে ধরো একটু ধমক দিয়েই বলে সুমাইয়া।কি আর করার ভালোবাসার মানুষ তাই আবদার মেটাতে জড়িয়ে ধরা শক্ত করে। বিয়ের ৫ বছর পরে সংগঠনের কার্যক্রম শেষ করে বাসায় যাচ্ছি।দরজায় টোকা দিতেই দরটা খুলে দেয় ইবনাত।আমার গলাটা ধরে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আম্মুর নামে বিচার দেওয়া শুরু করে।ছেলেটা আমার একটু দুষ্টামি বেশিই করে।সারাদির সংগঠন,নিজের ব্যবসা নিয়ে বাহিরেই থাকা হয়।রাতের বেলায় বাবার গলা জড়িয়ে ধরে মায়ের সম্পর্কে বিচার দেওয়া হয়।

-এই নাও তোয়ালে ফ্রেস হয়ে আসো।
-তোমাকে কত বার বলেছি তুমি ইবনাতকে মারবে না।ছোট মানুষ বুঝিয়ে বলবে।
-তোমার ছেলে বুঝালে শোনে তোমার মত যেটা বলবে সেটাই।দেখো গত সপ্তাহে কিনে দিয়েছো গাড়িটা ভেঙ্গে ফেলেছে।
-আমার বাবা আমাকে আবার কিনে দিবে।তুমি পচা আম্মু।
-ঠিক আছে বাপজান! বাবা নতুন গাড়ি কিনে দিবে ইবনাত কে।
-তোমার লায় পেয়ে পেয়ে বেড়ে গেছে।
-আচ্ছা থামো না।ছোট রয়েছে তো সোনা।জানোই তো আমার বাপজানকে মারলে আমার খারাপ লাগে।
-আচ্ছা যাও তুমি ফ্রেস হয়ে আসো আমি খাবার দিচ্ছি।আসো আব্বু আম্মুর কাছে আসো।আম্মু আর মারবে না।
-না তুমি পচা তোমার কাছে যাবো না।আমি বাবার কাছেই থাকবে।
-আম্মু আর তোমাকে মারবে না বাপজান।আমি ফ্রেস হয়ে আসি আম্মুকে মাইর দিবো।আমার বাপজান কে কেন মারে।

চলো বাবা আমরা এখন ঘুমাতে যাই।অনেক রাত হলো তো।সকালে আবার বাবার কাজ আছে।তুমি বড় হয়ে তোমার বাবার মত হবে।বাবা যেমন মানুষের সেবা করে বেড়ায় তুমিও করবে কেমন। কথাগুলো ইবনাতকে সুমাইয়া বলছে। এই চশমাটা দাও তো। এই নাও চশমা,তোমার আর কত সময় লাগবে।ইবনাতকে ঘুম পাড়িয়ে আসি। যাও আমার একটু সময় লাগবে হিসাবটা করতে।আচ্ছা তুমি কাজ শেষ করে সুয়ে পইড়ো।কাজ শেষ করতে একটু বেশি সময় লাগলো।চশমাটা টেবিলের উপর রেখে সুয়ে পড়ি।ইবনাত বাপজান ঘুমিয়ে গিয়েছে সাথে আমার সুমাইয়াও। খোলা জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আচড়ে পড়েছে ইবনাত ও সুমাইয়ার মুখে।দেখতে খুব মহনীয় লাগছে ওদের।চাঁদটা যেন আজ আমার ঘরেই উদয় হয়েছে।হাত টা বাড়িয়ে জড়িয়ে নিলাম ইবনাত ও সুমাইয়াকে।আমার সুখের ঠিকানা তো এই দুজন ও আমার সংগঠন “পরোপকারী ” মধ্যে। এভাবেই চলতে থাকে আমার জীবন যাত্রাটা…

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত