ডাইরির শেষপাতা

ডাইরির শেষপাতা

বাস থেকে যখন নামলাম, তখন ভরদুপুর। খাঁ খাঁ রোদ্দুর। রোডঘাটে মানুষজন নেই তেমন। বাস স্টপেজের সামনে একটা কালো কুকুর বসা। একলা কুকুর। ঠিক আমার মতন একলা। নিজেকে চিনতে শেখার পর থেকেই বুঝে নিয়েছি এ জীবন ‘একলা থাকা’র।

অনেক বছর পর গ্রামে এসেছি। পুরো নয়টা বছর। বদলে গেছে অনেককিছু। বদলে গেছি আমিও। যাবার সময় বাড়ির পেছনে একটা বড় রেন্ড্রিগাছ ছিলো। অনেক মোটা। বয়স কম ছিলো না তার। লোকমুখে শুনতাম। গাছটা পাঁচশ বছরের পুরনো । গাছে খোদাই করে দু’টো নাম লেখা ছিলো। রাহাত ও শাকিরা। গাছটা নেই এখন। হারিয়ে গেছে। সাথে করে নিয়ে গেছে নামদু’টোও।

বিয়ের আয়োজন। বাড়িভর্তি লোকজন। কতশত লোক। সবার নামের সাথে লেপ্টে আছে সম্পর্কের লকব। আমার সাথে নেই। আমাকে চেনে না কেউ। অচিরিত’র মতন হাতড়ে খুঁজি কেউ একজনকে। সবাই সবাইকে খোঁজে না। পৃথিবীতে খোঁজার বিষয়টা খুবই বিরক্তিকর। খোঁজতে গেলে কষ্ট পোহাতে হয় অনেক। তবুও আমাদেরকে খোঁজতে হয়। আমরা খুঁজি। প্রিয়মানুষ। প্রিয়মুখ। প্রিয় জিনিস। এদেরকে। আমাকে যে দেখে, সে’ই তাকিয়ে থাকে হা করে। মাথার বড় চুল। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ। সবার মনে কেমন যেন সন্দেহের যোগান দিচ্ছে। আমি বিরক্ত হই না। একগাল হাসি। হাসলে বোকা বোকা লাগে আমাকে। বোকা লোকদের হাসতে মানা। তারা হাসলে পরিবেশ উপহাস্য হয়ে ওঠে। আমিও হাসি না। হাসতে পারিও না তেমন। পরিবেশ পরিস্থিতি এখন হাসতে বাধ্য করছে আমাকে।

আমি হাসলে লোকেরা আমার পরিচয় জিজ্ঞেস করে। আমার কোন পরিচয় নেই। তবুও পরিচয় দিতে হবে। চুপ থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু, চুপ থাকাটাও কখনো কখনো বিপদ টেনে আনে। সেটা অল্পকিছুক্ষণেই টের পাই। বোকামো বাদ দিতে হলো। এবার কেউ জিজ্ঞেস করলেই বলে দেই। আমি ‘শাকিরা’র বন্ধু। লোকজন খুশি হয়। আপ্যায়ন করে।
একলা বসে আছি অনেক্ষণ। যদিও আশেপাশে অনেক লোকদের সমাবেশ। সবাইকে সাথের মনে হয় না। সবার বসাটাকে সঙ্গ মনে হয় না। এটাই স্বাভাবিক। অনেক সময় পাশের চেয়ারটা প্রিয় মানুষের বসার অভাবে হাজার লোকের মজলিসটাও খালি খালি লাগে। সঙ্গহীন মনে হয়। প্রিয় শব্দের সাথে যখন অভাব নামের কিছু যুক্ত হয়, তখন সে অভাবের মাত্রাটা অপরিমাপযোগ্য হয়ে যায়। কয়েকটা সুন্দরী মেয়ে ঘিরে আছে আমাকে। তারা টের পেয়েছে। আমি শাকিরার বন্ধু। খোশগল্প জমাতে চায়। আমার ভেতরে গল্প নেই। গল্প আসে না আমার। আমি মানুষ চিনি। মানুষের জীবন চিনি। একেকটা মানুষই আমার কাছে একেকটা উপন্যাসের প্লাটফর্ম।

দরজা খুলে দেয়া হয়েছে। ভেতরের মেয়েদেরকে শাকিরা বেরিয়ে যেতে বলে। সবাই বেরিয়ে যায়। একটা মেয়ের মুখে হাসি। ইশারায় সে আমাকে ভেতরে যেতে বলে। আমি লজ্জাবোধ করি। একটা মেয়ে বিয়ের সাজে ব্যস্ত। তার রুমে একা কী করে যাওয়া যায়! ভেতর থেকে শাকিরা ডাকে। আমাকে দেখেই হেসে ওঠে। ‘কেমন আছিস রে? এতো দেরী করলি কেন?’ প্রশ্ন করে ওঠে শাকিরা। আমি কোন জবাব দিতে পারি না। চুপ করে থাকি।

শাকিরা আমার বান্ধবী। এখন। পরিচয়টা ফেইজবুকে। তারপর থেকে আমরা ভালো বন্ধু। দেখাও হয়েছে বেশ ক’বার। আমি শাকিরার আসল পরিচয়টা জানি। সে আমাকে জানে নকল নামে। তার কাছে আমি রিয়াদ। কিছু কিছু সময় পরিচয় গোপন রাখতে হয়। কাউকে জেনে ফেললেই সম্পর্কের দেয়্লটা খসে পড়ে যায় অনেক সময়। অপঠিত মানুষের প্রতি আলাদা একটা টান থাকে। একটা কৌতুহল থাকে। তাকে জানার তীব্র পিপাসা থাকে। আমি চাইতাম। শাকিরা আমাকে জানার ইচ্ছে পুষুক। সে কি পোষতো আমাকে জানার ইচ্ছেটা?

‘এই নে! শাকিরার হাতে একটা গিফট তুলে দেই। সে হাতে পেয়েই খুশিমনে খুলতে যায় সেটা। আমি মানা করি। ‘উহু! এখন খুলবি না। বিয়ের ঠিক এক সপ্তাহ পূর্ণ হবার পর খুলবি। একদিন বিকেলবেলা। সন্ধ্যা আসবে আসবে ভাব। ঠিক তখন। মনে থকবে তো! নাকি আবার উলোট পালোট হবে!!’ শাকিরা অবাক হয়। এ আবার কেমন গিফট্!
আমি শাকিরার রুম থেকে বেরিয়ে আসি। শাকিরা ডাকে আমাকে। আমি সাড়া দেই না। প্রিয়জনের ডাকে সাড়া না দেয়া পাপ। শাকিরা কাঁদছে।

আমি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি। তার কান্না আমাকে বাঁধা দিতে চায়। আমি পেরিয়ে যাই। প্রিয় মানুষের চোখের জলকে উপেক্ষা করা মহাপাপ। আমি জানি সবই। তবুও সবকিছু উপেক্ষা করে পেরিয়ে যাই।
শাকিরা কথা রেখেছে। বিয়ের পর। পেরিয়ে গেছে সপ্তাহ। প্রতিশ্রুত বিকেল। শাকিরা গিফট্টা খোলে। একটা ডাইরী তাতে। বাদামীরঙা। দেখতে পুরনো মনে হয়। ডাইরির গায়ের সনের সাথে যোগ হয়েছে আরো নয়টা বছর। শাকিরা পৃষ্ঠা উল্টোয়। প্রথম পৃষ্ঠা। বড়বড় অক্ষরে লেখা। ‘আমি পাগল বলছি..’। শাকিরার ভেতরে মোচড় লাগে। পাগল!
একেক করে ভেতরের সবগুলো পৃষ্ঠা উল্টোতে থাকে শাকিরা। হারানো দিনের অনেককিছু মনে পড়ে। যেগুলোকে আমরা স্মৃতি বলি। স্মৃতি বড্ড খারাপ জিনিস। স্মৃতির অপর নাম মায়া। স্মৃতির সেতু তৈরিতে ব্যবহৃত হয় মায়া নামক জোড়ালো আঠা ।

দু’শ সাঁইত্রিশ। আরেকটা পৃষ্ঠা আছে মাত্র। শাকিরার ধারণা এতক্ষণে বদলে গেছে অনেকটাই। ভাবনার দেয়ালে যোগ হয়েছে অনেক গল্প। কিন্তু, এখন আর ভাবনার স্বাধীনতা নেই তার। নেই- তা দেয়া ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেবার। নিজের সব ভাবনার একক মালিকানা যে মিঃ জাবেরের হাতে! পৃষ্ঠা উল্টেছে শাকিরা। এটাই ডাইরির শেষপাতা। মনযোগ পুরোটা আঁটকে আছে এখানে। শাকিরা পড়তে শুরু করে- “শাকিরা! আমিই রাহাত। সে নয় বছর আগে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া রাহাত। এই ডাইরিটা তোমারই দেয়া। ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়াতে তোমার বড় বোন দিয়েছিলো। চলে যাবার সময় তুমি আমাকে দিয়ে বলেছিলে, তোমাকে মনে হলে লেখতে। এইতো! যখন যা মনে হয়েছে। লেখেছি।

ভাবছো, পরিচয়টা গোপন করলাম কেনো! হাহা। আমি তো জানতামই। বছরখানেক আগেই তোমার নতুন জীবনের পরোয়ানা এসে গেছে। তাতে রদবদল চাই নি আমি। সেখানে তোমার পছন্দ ছিলো। পছন্দ ছিলো সবার। এমনকি আমারও। পছন্দের কবিতায় আবগের কারণে ছন্দপতন না আসুক। এখন জানালাম। এরও কারণ আছে। এরপর আর আমাদের দেখা হবে না কোনদিনও। শেষদেখা বলা যায়। এ দেখাটুকু না হলে তোমার আক্ষেপে পুড়তে হতো আমাকে। পুরো একটা জনম। এ জ্বলন না হোক। তাই এই অযাচিত সাক্ষাৎ। এতোক্ষণে অভিমানের মেঘ জমতে শুরু করেছে তোমার আকাশজুড়ে। জমুক। আজকাল সে অভিমানের বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। আমাকে ভেজাবার মতন বৃষ্টি নেই এই শহরে। অন্তত এটুকু বৃষ্টিবিলাস হোক তোমার অভিমানের হাত ধরে।

পৃষ্ঠা শেষ হয়ে আসছে। জীবনটাও ঠিক এই পৃষ্ঠার মতন। চাইলেও পৃষ্ঠায় সবকিছু লেখতে পারছি না। চাহিদার খাতাজুড়ে অজস্র নাম থাকলেও পূর্ণতার অধিকার নেই সবার। একটা সময় তোমাকে চাইতাম। এখনও চাই। তবে চাওয়ার রঙটা বদলে গেছে। এখনকার চাওয়া। তোমার সুখময় সংসার। এই ডাইরির গল্পের মতন আমাদের আবার দেখা হোক। কোন এক অযাচিত সন্ধ্যায়। একটা শোকাচ্ছন্ন উৎসবে। আমরা মাতম করবো। আমাদের মাতমে যোগ দিবে সন্ধ্যে নীড়েফেরা একঝাঁক পাখি।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত