জন্মদিন

জন্মদিন

‘রানা! আমি ডিভোর্স চাই!’ ‘কেনো তুমি আমার সাথে সুখি নও? আমি তো তোমার কোনো শখই অপূর্ণ রাখি? তোমাকে কোনো কষ্ট দিয়েছি? তোমার স্বাধীনতাতেও আমি কোনো বাঁধা দেই না। তাহলে তুমি এমনটা কেনো চাচ্ছো?’ ‘রানা! আমি বলিনি তুমি এমন কিছু করেছো৷ তোমার কোনো দোষও আমি দেই না। কিন্তু আমি ডিভোর্স চাই।’ ‘কিন্তু কেনো? কি কারণে ডিভোর্স চাও?’ ‘কোনো কারণ নেই। আমি যাস্ট তোমার সাথে আর থাকতে চাই না।’ নিতু বিরক্ত স্বরে উত্তর দিলো। ‘আচ্ছা ঠিক আছে। ডিভোর্স দিয়ে দিবো।’ দুই বছর চুটিয়ে প্রেম করে নিতুর আর আমার বিয়ে হয়। দিনগুলো ভালোই কাটছিলো। নিতুর সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আমার পৃথিবীটা পালটে গিয়েছে। আমি একঘেয়ে মানুষ। ছোট বেলা থেকে একা একা বড় হয়েছি। কারো সাথে মিশতে পারি না।

চুপচাপ থাকি। ছয় বছর বয়সে বাবা মারা যায়। তারপর পাঁচ বছর পর মা আমাকে রেখে এক লোকের সাথে চলে যায়৷ এর পর থেকে আমি পৃথিবীতে সম্পূর্ণ একা হয়ে যাই। এতিমখানায় পড়ালেখা করে বড় হয়েছি। মা যত দিন আমার সাথে ছিলো আমার পুরো পৃথিবী জুড়ে শুধু মায়ের আনাগোনাই ছিলো। মায়ের পর আমার পুরো পৃথিবীটা শুধু নিতুই দখল করে নিতে পেরেছে। নিতু নিজে সেধে আমার সাথে প্রেমে জড়িয়েছিলো। মূলত সে আমার একাকিত্বের গল্প শুনে আমার উপর করুনা করেছিলো৷ মানুষ ভালোবাসে সারাজীবন এক সাথে থাকতে পারে। কিন্তু করুনা করে সারাজীবন কারো সাথে থাকা যায় না৷ বিয়ের সাত মাসের মাথায় নিতু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমাকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছে। আমি সারা জীবন একাকিত্ব মাথায় নিয়ে ঘুরেছি৷ নিতু চলে গেলে আমার তেমন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷ তাই তাকে জোর করে রেখে দেয়ার চেয়ে তার সুখের জন্য তাকে ছেড়ে দেয়াটাই ভালো৷

দিন দিন নিতুর ব্যবহার রূক্ষ হয়ে যাচ্ছে। এতে আমি অবাক হইনি৷ সে আমার কাছে ডিভোর্স চেয়েছে। এখনো ডিভোর্স দেইনি। তাই ব্যবহার রূক্ষ হওয়া স্বাভাবিক। অফিস থেকে ফেরার পর নিতু ছোট একটা বিষয়কে ইস্যু বানিয়ে তুমুল ঝগড়া লাগিয়ে দিলো৷ ঝগড়া শেষে দুই জন দুই রুমে গিয়ে শুয়ে পরলাম। কিছুক্ষণ পর নিতু আমার রুমে ফিরে এসে বলল, ‘রানা! আমি তোমাকে আর সহ্য করতে পারছি না৷ আমি জলদি ডিভোর্স চাই! কালকের মধ্যেই ডিভোর্স চাই।’

আমি শুয়া থেকে উঠে নিতুর হাত ধরে বললাম, ‘তুমি সত্যি আমাকে ছেড়ে দিতে চাচ্ছো?’ নিতু এক টানে আমার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘হ্যা আমি সত্যি ডিভোর্স চাচ্ছি।’ ‘আচ্ছা নিতু ডিভোর্স দিয়ে দিবো। পরশু দিন তো তোমার জন্মদিন। এই দুইটা দিন আমার সাথে থাকো। আর বিয়ের প্রথম দুইটা দিন আমরা যেভাবে কাটিয়ে ছিলাম। ঠিক সেরকম দুইটা দিন আমাকে দিয়ে যাও।’ ‘এরকম দুইটা দিনই তো চাও! ঠিক আছে। কিন্তু তৃতীয় দিন আমি আমার ডিভোর্স প্যাপার রেডি চাই৷ ওকে?’ ‘হুম ঠিক আছে।’

আজকে নিতুর জন্মদিন। আমাদের বিয়ের পর এটা তার প্রথম জন্মদিন। বিয়ের আগে তার দুইটা জন্মদিন সেলিব্রেট করলেও বিয়ের পর এই প্রথম৷ অনেক দিন আগে থেকেই ইচ্ছে ছিলো আজকের দিনটা নিতুর জন্য স্বরণিয় করে রাখব। আজকের দিনের জন্য অনেক পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। কিন্তু নিতু ডিভোর্স চেয়ে সব কিছু ভেস্তে দিতে চেয়েছিলো। ডিভোর্স নিবে বলে তো আর আমার পরিকল্পনা আমি বিফলে যেতে দিতে পারি না। তাই নিতুর থেকে দুইটা দিন চেয়ে নিলাম৷ এই দুইটা দিন আমি স্প্যাশিয়াল করে রাখতে চাই।

বিকেলে নিজ হাতে নিতুর জন্য রান্না-বান্না করলাম৷ বড় একটা কেক কিনে আনলাম। একটা রুম সাঝিয়ে রাখলাম। রাতের এগারোটা বাজতেই নিতুর হাতে একটা নীল শাড়ি দিয়ে বললাম, ‘গোসল করে এটা পইরো!’ এগারোটা পঞ্চান্নতে সাঝানো রুমটায় গিয়ে মোমবাতিগুলো ঝালিয়ে আসলাম। মোমবাতি ঝালাতেই বড় করে ‘আই লাভ (লাভ আকৃতিতে) ইউ নিতু!’ লেখাটা ফুটে উঠলো। লাভ আকৃতিটার ভিতরে একটা টেবিল। টেবিলের উপরে লাভ আকৃতির জন্মদিনের কেক।

আমি নিতুর চোখ ধরে সাঝানো রুমে নিয়ে গেলাম। চোখ ছাড়তেই নিতু বলে উঠলো, ‘ওয়াও!’ তারপর দুই জন এক সাথে কেক কাটলাম৷ নিতু আমাকে কেক খাইয়ে দিলো। আমিও নিতুকে খাইয়ে দিলাম। নিতুর ঠোঁটের কোণে কেক লেগে আছে বলে আমি নিতুর ঠোঁটে দীর্ঘ্য চুমু বসিয়ে দিলাম৷ নিতু বাঁধা দিলো না। বরং চুমুর জবাব দিলো। আমি আর নিতু পাশাপাশি শুয়ে আছি৷ নিতুর শরীরে কোনো কাপড় নেই। একটা কাথা দিয়ে তার গলা অব্দি ঢাকা। আমার পরণে শুধুমাত্র একটা শর্টস। দুই জনই ক্লান্ত। নিতু মিটিমিটি হাসছে। আমি উপরের পাখা তাকিয়ে কোমল স্বরে নিতুকে ডাক দিলাম। ‘হু!’ নিতু ছোট্ট করে জবাব দিলো।

‘আমি তোমার সাথে একটা মিথ্যা কথা বলেছি।’ ‘কি কিথ্যা?’ ‘কাল তো তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তাই মনে হলো যাওয়ার আগে সব কিছু জেনে যাও।’ ‘কি কিথ্যা বলেছো সেটা বলো!’ কি মিথ্যা বলেছি জানার জন্য নিতুর কন্ঠে উৎকন্ঠা ফুটে উঠেছে। ‘আসলে আমি কোনো এতিম খানায় বড় হয়নি। স্প্যাশিয়াল চাইল্ড প্রিজনে বড় হয়েছি। আর আমার বাবা মারা যায়নি। আমার মা আমাকে ফেলে রেখে চলেও যায়নি।’ ‘মানে?’ নিতু একটু উঠে হাত দিয়ে আমার বুকের উপর ভর দিয়ে আমার মুখের উপর মুখ এনে চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

‘আমার বাবাকে আমার মা বিষ খাইয়ে খুন করেছিলো। এটা আমি বড় হয়ে ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলাম৷ মা-বাবার মধ্যে তুমুল ঝগড়া হতো৷ কারণ মা অন্য পুরুষে আসক্ত ছিলো। বাবা তাতে বাধা দিতো বলে বাবাকে মেরে ফেলেছিলো। বাবার চার কুলে কেউ ছিলো না। বাবাকে মেরে বাবার বাড়িতেই মা আমাকে নিয়ে বাস করতে লাগলো। বাবার বাড়িটা আমার নামে রেজিষ্টার করা ছিলো। তাই তাতে আর কোনো ঝামেলা হয়নি। আর বাবার মৃত্যু সবাই স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবেই নিয়েছিলো। মা’র প্রেমিক প্রায় এসে আমাদের বাসায় থাকতো। প্রথম প্রথম আমি কিছু বুঝতাম না। ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলাম। আর সব কিছু বুঝতে পারলাম। বাবাকে যে মা বিষ খাইয়ে মেরেছে তাও বুঝে গেলাম৷ তখনো মা’র প্রেমিক আমার বাসা মানে এই বাসায় আসা-যাওয়া করতো। একদিন সুযোগ বুঝে দুই জনকেই মেরে ফেললাম। তারপর পুলিশ এসে আমাকে নিয়ে গেলো৷ আদালতে রায় হলো পনেরো বছর আমাকে স্প্যাশিয়াল চাইল্ড প্রিজনে রাখা হবে।

সেখানে আমাকে পড়ালেখা করানো হলো।’ আমি একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলাম, ‘মা বাবাকে মেরেছে বলে আমি মাকে মারিনি। মেরেছি কারণ বাবাকে মারার কারণটা আমার ভালো লাগেনি৷ আর মা’র প্রেমিককে মেরেছি কারণ তার বাড়িতেও বউ ছিলো।’ বিছানা থেকে উঠে নিতুর দিকে তাকালাম৷ নিতু চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। ভয়ে তার কপাল থেকে ঘাম ছুটছে। আমি তোয়েলাটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে যেতে যেতে বললাম, ‘তোমার ডিভোর্স পেপার ওয়ার্পড্রয়ারের উপরে আছে৷ আর তোমার সার্প্রাইজ গিফটটা উপরের ড্রয়ারে আছে।’

আমি ঝরণা ছেড়ে গোসল করতে লাগলাম৷ কিছুক্ষণ পর রুম থেকে নিতু চিৎকারের শব্দ ভেসে আসলো। আমি বুঝতে পারলাম, নিতু ড্রয়ার খুলেছে। যার জন্য আমাকে ছেড়ে দিচ্ছে বা তার প্রেমিকের লাশ দেখে সে এভাবে চিৎকার করে উঠেছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত