মেঘ পরীর গল্প

মেঘ পরীর গল্প

আমি মিহিনের কথায় এবারও কিছু বললাম না।আগের মতই চুপ করে রইলাম।আমি কিছু বলতে চাইলেও পারছিলাম না।আসলে মিহিনের কথায় কি বলা উচিত সেটা আমার জানা নেই।এসময় আমি মেয়েটা কে যেটাই বলি না কেন,সে শুনবে না।আমার চুপ থাকা দেখে মিহিন আবারও বললো,

-আচ্ছা বাদ দাও।এখন বলো তোমার জবের কি অবস্থা?

মিহিনের কথায় আমি ওর দিকে মলিন মুখে তাকালাম।এতক্ষন জব নিয়েই কথা হচ্ছিলো।তাহলে মেয়েটা কি বাদ দিল বুঝলাম না।আমি আস্তে করে বললাম,

-চেষ্টা করছি তো।
-তোমার এই চেষ্টা করছি শুনতে শুনতে আমার চুল পেকে গেলো।

দুদিন পর যখন তোমার সামনে বর বাচ্চা সহ হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করবো, তোমার জবের কি খবর? তুমি তখনও ঠিক সেইম উত্তর দিবা, “চেষ্টা করছি তো” মিহিনের কথার সারমর্ম বুঝতে আমার খুব বেশি সময় লাগলো না।তাছাড়া ওই বা কি করবে।একই কথা বারবার শুনতে কারই বা ভাল লাগে।জব ছাড়া একটা ছেলের সাথে যে মেয়েটা এখনও আছে সেটাই বা কম কিসে।আমি একটু চুপ থেকে মিহিনের দিকে তাকাতেই মেয়েটা বললো, “আজকের পর থেকে আমাদের আর দেখা হচ্ছে না।যেদিন জব সহ আসতে পারবা সেদিন ই দেখা হবে।আসি। কথাটি বলে মিহিন আর দাড়ালো না।তাছাড়া এখানে আর থাকারও কথা না।থাকবেই বা কেন।কোন কারন আছে?নেই তো নেই।

আমি জায়গাটাতে আরও কিছুক্ষন বসে রইলাম।মিহিনের সাথে এই জায়গাটাতে বসতে বেশ লাগে।তবে আজ কেমন যেন অস্বস্থি লাগছিল।এখন ঠিক আছি।সন্ধা গড়িয়ে রাত নেমে এসেছে।তবে এখানে অন্ধকার আসতে পারে।চারিদিকের এই সাজানো আলোতে প্রায় দিনের মতই মতই লাগে।আমি মাঝে মাঝে ভাবি,এরকম দিনরাত যদি আমার শহরেও আলো থাকতো, যেখানে রাতের গভীরতা কোন মতেই বোঝা যেত না।অন্ধকারের কালো ছায়া পড়তো না আমার শহরে।আমি আর কিছু ভাবতে পারি না।চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে।হাটা দেই বাসার দিকে। তিনটা বেজে পনেরো মিনিট।আমি ইন্টারভিউ শেষে নিচে এসে আবারও হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম।তিনটা বেজে সতেরো।আকাশটা বেশ মেঘলা।গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিও পড়ছে।আমি যখন ইন্টারভিউ দিতে আসছিলাম তখনও এরকমই ছিল।তাই আর বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করলাম না।এ বৃষ্টি থামার নয়।

এই অল্প বৃষ্টিতে ভিজতে খুব একটা ভাল লাগে না।কেমন যেন একটা খারাপ লাগা।এই খারাপ লাগার নাম জানিনা।নাম বের করতেও চাইনা।আমি দ্রুত হাটা দিলাম।বাসায় পৌছাতে পারলেই এ ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।আমি আরও একটু এগুতেই একটা রিক্সা এসে আমার সামনে থামলো।থামলো বলতে প্রায় আমার উপর দিয়েই তুলে দিচ্ছিলো পেছন থেকে।একটু চেপে না দাড়ালেই একদম উপরে তুলে দিত।আমি যখন মেজাজ হারিয়ে ধমক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম তখনি ছাতা মাথায় রিক্সা থেকে নামা এই মেঘের দিনে মেঘ পরীকে দেখলাম।মেয়েটা এসে একদম পাশে দাঁড়িয়ে ছাতাটা মাথায় ধরে বললো,

-চলো রিক্সায় ওঠো। মেয়েটার কথায় আমি কিছু বললাম না।এ অবস্থায় এরকম বৃষ্টিতে ভেজার চাইতে রিক্সায় ওঠা ঢের ভাল মনে হচ্ছে।আমি মাথা নাড়িয়ে ইশারা করে বললাম,

-হু,চলো।

-বৃষ্টিতে ভিজলে না তোমার জ্বর আসে?
-সে খোজ কে রাখে।
-নিজের খোজ নিজের ই রাখতে হয়।

মেয়েটার শেষ কথাটা আমার বেশ পছন্দ হলো।নিজের খোজ নিজের ই রাখতে হয়।আজ বেশ কয়েকদিন হলো,আমার খোজ কেও নেয়নি,রাখেনি।যার নেওয়ার কথা সেও নেয়নি।দিনশেষে নিজের খোজ নিজেরই নিতে হয়।কিন্তু আজ এই মেয়েটা যে আমার খোজে বেড়িয়েছে এটা আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি।

সেদিনও পুরো আকাশ মেঘে ঢাকা ছিল।গুড়িগুড়ি বৃষ্টির সাথে ছাদের রেলিং ধরে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে ছিল এক মেঘ পরী।অবশ্য এই মেঘ পরী নামটা আমি সেদিনই দিয়েছিলাম ওকে।তবে এর আড়ালেও ওর একটা নাম আছে।সুপ্তি।নামটার সাথে মেয়েটাকেও আমার বেশ ভাল্লাগে।আমি সুপ্তির পাশে দাঁড়িয়ে রেলিং এ হাত রাখতে রাখতে বললাম,

-এই বৃষ্টিতে ছাদে!তোমার এই চাদমাখা মুখ দেখে তো এরা লজ্জায় চলে যাবে।

আমার কথায় সুপ্তি কিছু বললো না।আমার দিকে একটু চেপে এসে ছাতাটা মাথায় একটু উচু করেই ধরলো।মেয়েটা বারবার কিছু বলতে গিয়েও যেন থেকে যাচ্ছে, এটা আমি স্পষ্টই বুঝতে পারলাম।আমি একটু চুপ থেকে বললাম,

-কিছু হয়েছে? সুপ্তি এবার জড়তা কাটিয়ে বললো,
-বাবা আমাদের ব্যপারে সবকিছু জেনে গেছে।আর বলেও দিয়েছে এটা উনি কোনমতেই মেনে নেবেন না।

সুপ্তির কথায় আমি কি বলবো ভেবে পেলাম।সুপ্তিরা আমাদের পাশের ফ্লাটেই থাকে।সেই সুবাদে পরিচয়,মেলামেশা।তবে এটা যে হুট করে অন্যদিকে মোড় নেবে আমি ভাবতেও পারিনি।আমাদের এই প্রেমের বয়স ছ সাতদিন হবে।এখন মনে হচ্ছে এটা শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

সেদিন আফজাল সাহেব সুপ্তিকে নিয়ে অন্য বাসায় চলে যায়।অবশ্য আমি সেটা নিজ চোখে স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছিলাম।কিছু করতে পারিনি।কিছু করার ও ছিল না।তাই আজ এতদিন পর সুপ্তির ফোন পেয়ে আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম।কিন্তু বারবার ফোন আসার পরও আমি ধরিনি।ধরতে পারিনি।সেই শক্তি আর সাহস আমার ছিল না।কিন্তু মেয়েটা ঠিকই খুজে বের করে ফেলেছে।আমার চুপ থাকা দেখে সুপ্তি আবারও বললো,

-ফোন ধরোনি কেন?

সুপ্তির কথায় এবারও আমি কিছু বলিনা।চুপ করে থাকি।ওর দিকে তাকাই।বেশ চেঞ্জ মনে হচ্ছে।চশমাতে বেশ লাগছে মেয়েটাকে।আমি একটু চুপ থেকে বললাম,

-তোমাকে আজ বেশ সুন্দর লাগছে।
-কেন আগে লাগতো না?
-অবশ্যই লাগতো।তবে আজ অন্য রকম সুন্দর লাগছে। আমার কথায় মেয়েটা মুচকি হেসে বললো,

– ইন্টারভিউ কেমন হলো?
-বেশ ভাল।
-এর আগে কতগুলা ইন্টারভিউ দিছো?
-অনেকগুলাই।
-সেগুলা কেমন হইছিলো?
-আজকের থেকে আরও ভাল।
-তো চাকরি হয়নি কেন?
-কোম্পানিগুলা আমার লেভেলের ছিল না।তারা ভেবেছিল আমি আরও বড় কোন কোম্পানির বড় কোন পোষ্ট ডিজার্ভ করি।তাই তারা আর তাদের ছোট কোম্পানিতে চাকরিটা দেয়নি। আমার কথায় সুপ্তি মুচকি হাসলো।তবে কি যেন ভেবে বলবো,

-আমার সাথে আবার পরশু দেখা করবে।আর অবশ্যই ফোন দিলে ফোনটা ধরবে।

সুপ্তির কথায় আমি মাথা নাড়ালাম।তবে কিছু বললাম না।মেয়েটা এমনিতে এত চুপচাপ থাকে না তবে আজ বেশ চুপচাপ।এতদিন পর সুপ্তিকে দেখে কেমন যেন এতদিনের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে গেলো।ওর মুখের দিকে তাকালেই কেমন যেন শান্তি লাগে।হ্যা শান্তি। শান্তি।

বেশ কয়েকবার মিহিনকে ফোন দিলেও মেয়েটা সেই আগের মতই ফোন কেটে দিল।এই মেয়েটার সাথে আমার শেষ কথা হয়েছে মাস দুয়েক হবে।কি এক আজব শর্তে আমাকে ফেলে রেখেছে।জব পেলে দেখা।ও কি সত্যি ই আমাকে ভালবাসে নাকি জবকে।আমি ভাবতে পারিনা।বাসা থেকে বের হয়ে সুপ্তির দেওয়া ঠিকানার দিকে পা বাড়াই।মেয়েটা হুট করেই ফোন দিয়ে বলে দেখা করা ক্যান্সেল।এরপরই একটা অফিসের এড্রেস দিল।সাথে বললো আজ কিছু একটা হবে। কিন্তু আমি তো জানি কিছুই হবে না।আজকাল লোক ছাড়া চাকরি হয় না।সেইখানে এই পিচ্চি মেয়েটাই বা কি করবে আমার জন্যে।আমি সুপ্তির বলা অফিসটাতে ঢুকতেই একজন বছর ত্রিশেক মহিলা এসে মুচকি হেসে বললেন,

-আপনিই আহাদ সাহেব?

মহিলার কথায় আমি মাথা নাড়িয়ে জানান দিলাম হ্যা আমিই বেকার আহাদ সাহেব।উনি আমাকে ‘আসুন আমার সাথে ‘বলে ভেতরের রুমের দিকে পা বাড়ালেন।আমিও চললাম পিছু পিছু।তবে মহিলাটাকে আমার কেমন যেন মহিলা মহিলা লাগছে না।বয়সটা ও তো তেমন হয়নি।এটাকে মেয়ে বলাই বেটার।দ্যাটস এ ইয়াং লেডি। অফিসের বসগুলা যেরকম ভাবে থাকে সেরকম ভাব আমি জুলফিকার সাহেবের আচরনে একটুও পেলাম না।বেশ সহজ একটা মানুষ।আমাকে খুব একটা বসিয়েও রাখলেন না।

টুকটাক কিছু জিজ্ঞেস করে হুট করেই জয়েনিং লেটার ধরিয়ে দিলেন।লোকটার এরকম আচরনে আমি কিছুটা অবাক হলাম।অবশ্য আসার আগে সুপ্তি বলেছিল আজ কিছু একটা হবে, হলোও তাই।কিন্তু ব্যপারটা যে এত সহজে হবে ভাবতেও পারিনি।এত বড় একটা কোম্পানিতে এত ভাল পোষ্টে কোন রেফারেন্স ছাড়াই চাকরি হয়ে যাবে এটা কখনও ভাবতেও পারিনি।অবশ্য রেফারেন্স তো ছিল, সুপ্তি।কিন্তু ও এর দ্রুত কিভাবে করলো। জুলফিকার সাহেবের কেবিন থেকে বের হতেই আবার সেই মেয়েটার সাথে দেখা।মহিলা বলতে কেমন যেন শোনায় তাই এবার মেয়েই বললাম।মেয়েটা আমাকে দেখে মুচকি হেসে আমার সামনে এসে বললো,

-সুপ্তি ম্যাম আপনার কি হয়? মেয়েটার কথায় আমি কি বলবো সেটা ভাবতে ভাবতেই মেয়েটা আবারও বললো,
-ম্যাম খুব ভাল ছিলেন।হুট করেই এভাবে চাকরিটা ছেড়ে দিল আবার সেখানে আপনাকে বসিয়ে দিল এটা ভাবতেই কেমন যেন লাগছে।ম্যামকে আর দেখতে পাবো না। মেয়েটার কথায় আমি এবার একটু বেশিই অবাক হলাম।তারমানে এই জবটা সুপ্তির ছিল।আমার চুপ থাকা দেখে মেয়েটা বললো,

-এদিকে ম্যাম তো একাই থাকেন।এখন চাকরী ছেড়ে কি করবে, কিভাবে চলবে…. মেয়েটা বিড়বিড় করে এসব বলতেই আমি বললাম,
-আচ্ছা আপনি কি আপনার সুপ্তি ম্যামের বাসার ঠিকানা টা আমাকে দিতে পারবেন? আমার কথায় মেয়েটা আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বললো,
-ম্যাম তো বলেছিল আপনি ওনার কাছের লোক।কাছের লোক হয়ে বাসার ঠিকানা জানেন না!

মেয়েটার কথায় আমি কিছু বললাম না।মেয়েটা কিছুক্ষন চুপ থেকে টুকরো কাগজ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,নিন, ম্যামের বাসার ঠিকানা। আমি মেয়েটাকে ধন্যবাদ দিয়ে আর দাড়ালাম না।বের হলাম।ভেবেছিলাম আজ চাকরী নিয়ে মিহিনের সামনে গিয়ে দাড়াবো। কিন্তু সেটা আর হচ্ছে না।আমি এখন দাঁড়িয়ে আছি সুপ্তির বাসার সামনে।বেশ কয়েকবার কলিংবেল বাজানোর পর দড়জাটা খুলে সুপ্তি এসময় আমাকে দেখে একটু অবাকই হলো।তবে সেটা কাটিয়ে মেয়েটা আস্তে করে বললো,

-ভেতরে আসো। আমি সোফায় বসতে বসতে বললাম,
-একা থাকো? সুপ্তি আমার কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,
-হ্যা।সেদিনের পর বাসা থেকে চলে আসি।এরপর থেকে এখানেই আছি।
-তো এতদিন তো জব ছিল,সবকিছু চলে গেছে।এখন কি করবা?
-ভাবছি বাসায় চলে যাব।

সুপ্তির কথায় আমি সোফা থেকে উঠে ওর সামনে গিয়ে দাড়ালাম।মেয়েটার ঝলমলে মুখটা হুট করেই মলিন হয়ে গেছে।আমি ওর গালে হাত রেখে বললাম,

-এই বাসাতে কিন্তু আমাদের দুজনের বেশ ভালভাবেই হয়ে যাবে।রাখবে কি আমাকে?তোমার সাথে,তোমার পাশে সেই আগের মত।আগলে রেখে।

আমার কথায় সুপ্তি কিছু বললো না।তবে ওর ভেজা চোখের পানি টুপ করে গড়িয়ে পড়তেই মেয়েটা আমাকে বেশ শক্ত করেই জড়িয়ে ধরলো।আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করে মিহিনের নাম্বারটা ডিলিট করে দিলাম।যেই মেয়ে বিপদের সময় হাত ছাড়তে পারে সেই মেয়ে আর যাই হোক ভালবাসতে পারে না।কোন ভাবেই না,কোন মতেই না।আমি ফোনটা রেখে সুপ্তিকে এবার বেশ শক্ত করেই জড়িয়ে ধরলাম আর মনে মনে বললাম, অবশেষে আমি পাইলাম,উহাকেই পাইলাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত