চাইনিজ তেলাপোকা

চাইনিজ তেলাপোকা

আমি এক অষ্টাদশীকে বিয়ে করতে যেয়ে পুলিশ বিয়ে করে ফেলছি। জানি আপনারা বলবেন প্রতিটা স্ত্রী এক একজন পুলিশ। প্রতিটা স্বামী নিজের ঘরে চোর। আপনারা হো হো করে হাসবেন।

কিন্তু ঘটনাটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য। আমার এলাকার ছেলে বুড়ো সবাই জানে এই কাহিনী। সেই কণ্যা আবার যেনতেন পুলিশ না। বিসিএস পুলিশ ক্যাডার পাওয়া অফিসার। এদিকে আমি চকবাজারের চিনি ব্যবসায়ী।

মেয়ে যখন দেখতে গেলাম, দেখলাম মেয়ে অষ্টাদশী। কলেজে ভর্তি হয়েছে। হাইটে একটু খাটো। খাটো মেয়েরা কিউট হয়। এই মেয়ে একটু বেশিই কিউট। মুরুব্বিরা কথা ফাইনাল করে দিল। এক সপ্তাহ বাদে বিয়ে। আমার তো বাকবাকুম অবস্থা!

রাত্রে আমার ঘুম আসে না। দোকানে আমার মন বসে না। চিনি পিঁপড়ায় খায়, হুশ থাকেনা। মোবাইলে তোলা তিনটা ছবি সারাদিন দেখি, বিরক্তিও লাগে না। আমি ছবির সাথে কথা কই। কর্মচারীরা হাসাহাসি করে।

বিয়ের দিন আব্বা আম্মারে সালাম করলাম। ভিডিওম্যান বলল, “ভাই ভাল উঠে নাই। আবার সালাম করেন। পায়ে হাত দিয়ে ক্যামেরায় তাকিয়ে থাকেন।” আমি আম্মার পায়ে হাত দিয়ে ক্যামেরায় তাকিয়ে থাকি। আমার সালাম করতেও ভাল লাগে। আম্মা দুধের গ্লাস মুখের সামনে ধরে রাখেন। ভিডিওম্যান বিভিন্ন এঙ্গেলে ভিডিও করেন। আমি স্বপ্নে বিভোর। এরপর থেকে বউ দুধ খাওয়াবে। আমি কল্পনা করি বউ দুধের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে।

আমার বিয়ের গাড়ি আট হাজার টাকায় ভাড়া এনেছে। ছেলেপেলেরা সকালে শাহবাগ থেকে ফুল আর মশারির মত নেট কাপড় এনে গাড়ি সাজিয়েছে। ড্রাইভার প্রথমে ঘ্যানঘ্যান করছিল স্কচ মারলে গাড়ির রঙ উঠে যাবে। বিয়ে তো একবারই করব, গাড়ি সাজাবো না? পাঁচশ টাকা পকেটে গুঁজে দিতেই ভাবখানা এমন, “রঙ উঠলে মালিকের গাড়ির উঠবে, আমার কি?”

আমি গাড়িতে উঠে বসি। আমার এক পাশে বোন আরেক পাশে দুলাভাই বসেছেন। গেদা বাচ্চাকাচ্চা চারটা চারজনের কোলে উঠায় দিয়েছে। আমার কোলেও একটা আছে। শেরওয়ানীর ইস্ত্রি নষ্ট হবে ভেবে আমার খুব বিরক্তি হচ্ছে। কিছু বলছি না, কারণ আজ আমার বিয়ে।

সামনে বসেছেন বড় মামা। ফ্যামিলির যে কোন বিয়ে আসলে উনি যেয়ে সবার আগে গাড়ির সামনের সিটে বসে পড়েন। খুব জ্ঞানী ভাব নেন। ড্রাইভারকে রাস্তা চিনিয়ে দেন। রাজনীতি নিয়ে দুই চারটা আলাপ করেন ড্রাইভারের সাথে। গাড়ি জ্যামে পড়লে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি এনে বলেন, “এই শালার জ্যামের জন্য কোথাও শান্তি নাই। শুক্রবারেও জ্যাম থাকতে হবে? ড্রাইভারসাব এসিটা বাড়ায় দেন তো।”

গাড়ি চলছে। গাড়ির সামনে ছোট চাচার মোটরসাইকেলে উলটো হয়ে বসে ভিডিও করছেন ক্যামেরাম্যান। গাড়ির পেছনে দুইটা মাইক্রোবাসে মহিলা আর বুড়োদের তুলে দেয়া হয়েছে। একটা তুরাগ ভাড়া করা হয়েছে, বাকীরা ঐ বাসে হৈ হুল্লোড় করে আসছে।

বরযাত্রী কখনো ঠিক সময়ে বিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতে পারে না। রাস্তায় জ্যাম কম থাকায় আমরা যথা সময়েই পৌঁছে গেলাম। গেইটে সেই কি হুড়োহুড়ি। ডিমান্ড বিশ হাজার টাকা থাকলেও দশ হাজার টাকার নিচে কিছুতেই ঢুকতে দিবে না। কণে পক্ষের এক মুরুব্বির ধমকে শেষে দেড় হাজার টাকায় রফাদফা হয়ে গেল। লাল রিবন কেটে আমি ভিতরে ঢুকে পড়লাম।

সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়ে ছোট ছোট শালীরা আমাকে স্টেজে নিয়ে গেল। আমি মুখে একটি সাদা রুমাল চেপে আছি। পাশে থেকে দুলাভাই বললেন সবাইকে সালাম দেও। আমি মুখ থেকে রুমাল সরিয়ে সামনের চেয়ারগুলোতে বসে থাকা সবার উদ্দেশ্যে বললাম, আসসালামুয়ালাইকুম। কেউ সালামের উত্তর দিল না। আমি মুখে রুমাল চেপে চেয়ারে বসে পড়লাম।

উঠতি বয়সের শালীরা এসে আমার সাথে সেলফি নিচ্ছে। মাঝবয়সী মহিলারা স্টেজের সামনে বসে আছে। মোটা আন্টিটা দেখলাম চেংড়ামত একটা ছেলেকে বলল, “বাবা ফ্যানটা এদিকে ঘুরায় দেওতো, কি বাজে গরম পড়ছে।” লোকজন খাওয়াদাওয়া শেষে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে জামাই দেখছে।

ছেলেমেয়েরা আমার জুতা নিয়ে টানাটানি করছে। আমার সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি আমার হবু বউকে মিস করছি। বউ এখনো আসেনি, সকাল থেকে ছবিটাও দেখিনি। শেরওয়ানীর পকেট নাই তাই মোবাইলটাও আনা হয়নি। জামাইর হাতে মোবাইল কেমন দেখায় না?

বেলা ততক্ষণে অনেক হয়েছে। বউ তখনো আসেনি। চারিদিকে কেমন যেন ফিসফাস। সবার চেহারায় দুশ্চিন্তার ভাব। সবাই আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। বাচ্চা একটা মেয়ে স্টেজে উঠে বলল, “জানো তোমার বউ না পার্লার থেকে ভেগে গেছে।”

বউ ভেগে গেছে! আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। পায়ের নিচে জুতা নেই। আসলেই নেই, পোলাপান জুতা চুরি করে নিয়ে গেছে। আমার সারা শরীরে ঘাম ছুটে। বুকের ভিতর কামড় মারে। আমি কল্পনা করি দুধের গ্লাস হাতে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। আমার হৃদয় ভেঙ্গে গেছে।

কিছুক্ষণ বাদে দাঁড়িওয়ালা এক মুরুব্বি এসে বললেন, “বাবা চিন্তা করিও না। বিয়ে হবে।” আমার হৃদয় জোড়া লেগে গেল। বাচ্চারা কত কিছুই তো বলে। বউ তাহলে ভাগেনি! আমি আবার কল্পনা করি বউ দুধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুশি মনে তিন কবুল বলে বিয়েটা করেই ফেললাম। ঘটনা ঘটল যখন বউ পাশে এনে বসাল। বউয়ের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠে পাশে দাঁড়ানো দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করলাম,

-এইটা কে ভাই?

-তোমার নতুন বউ।

-নতুন বউ মানে, আমি তো বিয়াই করি নাই!

-একটু আগে তো কবুল বললা।

-ঐটাতো এইটা না ভাই!

-ঐটার বদলেই তো এইটা, তোমাকে কেউ বলে নাই?

-খোদার কসম ভাই, কেউ এইটার কথা বলে নাই!

-ওহ! টেনশনে সবাই তোমাকে বলতে ভুলে গেছে। ব্যাপারনা তোমার কপাল খুলে গেছে। মেয়ে পুলিশ অফিসার।

আমার বুক ধড়ফড় করে উঠে। পুলিশ বিয়ে করে ফেলছি! এই ছিল আমার জীবনে? পরে জানলাম যেই মুরুব্বি বলেছিলেন বিয়ে হবে, তিনিই আমার নতুন শ্বশুর। আগের হবু শ্বশুরের ভাই। নিজের ভাইয়ের সম্মান বাঁচাইতে আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। আমি আবার কল্পনায় যেয়ে দেখি দুধ নিয়ে কেউ নাই, ডান্ডা হাতে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। নতুন বউ নিয়ে বাড়ি যাই। সবাই আমাকে দেখে করুণার হাসি দেয়। কেউ হাসলে হাসি ফেরত দিতে হয়। আমিও অসহায়ত্ব মাখা হাসি ফেরত দেই। এমন না যে বউ আমার খারাপ, এইটা আরো ভয়ানক সুন্দরী। কিন্তু আমার যে হৃদয় ভেঙ্গে গেছে।

বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। এলাকায় ঘটনা রটে গেছে। সবাই আগে পরে এই কাহিনী নিয়ে হাসাহাসি করে। পুলিশের জামাই তাই সামনা সামনি কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। বন্ধুরা টিটকারি মারে, “দোস্ত পুলিশ ধরছে কেন? চিনিতে ভেজাল করছিলা?” আমি বন্ধুদের এড়িয়ে চলি।

বউকে আমার ভালই লাগে এখন। হৃদয় বড়ই ভন্ড কিসিমের জিনিস। ভেঙ্গে গেছি বলে হাহুতাশ করে। পাশে বউ শোয়া দেখলে আগডুম বাগডুম করে। বউ ঠান্ডা মেজাজের মেয়ে। টুকটাক কথা বলে, এটা সেটা এনে দেয়। আমি বউয়ের প্রেমে পড়ি। আমি শিখতে পারি শিশ্নোদরপরায়ণ পুরুষের হৃদয় বলে কিছু নাই। প্রতিরাতে আমি চোরের মত এপাশ ওপাশ করি। পুলিশ আমাকে ধরে না। চোর পাশে রেখে পুলিশ ঘুমায়। আমি চোর ভয়ে পুলিশ ধরি না, যদি মামলা খেয়ে বসি। আমাদের আর চোর পুলিশ খেলা হয় না।

এমনি একদিন উপরওয়ালা আমার দিকে মুখ তুলে চাইলেন আর অমনি বউ ‘ওমাগো’ বলে লাফ দিয়ে আমার গলায় ঝুলে পড়ল। পুলিশ চোরকে ধরলে এত আরাম লাগে জানলে চিনির ব্যবসা ছেড়ে চুরিই বেছে নিতাম পেশা। বউ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, “তেলাপোকা উঠেছিল পায়ে।”

“এত বড় পুলিশ তেলাপোকা ভয় পায়!” বলে হেসে ফেলি আমি। বউও হেসে ফেলে আমার সাথে। হাসি একটা উছিলা মাত্র। সব কিছুর পিছনে আছে উপড়ওয়ালার ইশারা। নইলে চোর পুলিশে খেলা হবে কিভাবে? আমি এগিয়ে যেয়ে ছোট্ট তেলাপোকাটা ধরে হাতে নিয়ে বলি, “আরে এইটা তো চায়নিজ তেলাপোকা। পেঁয়াজের সাথে আসে।”

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত