পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন

পূর্ণিমা সন্ধ্যায় তোমার রজনীগন

বিয়ের বয়স আট মাস পার হলেও বউয়ের স্পর্শ ভাগ্যে জোটেনি এখনও। বাসর আজ রাতেই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর সন্ধ্যার আগেই পালাচ্ছে। পালাচ্ছে বললাম কারণ সে এই মুহূর্তে আমার বাইকের পেছনে। বাইকে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মোবাইল লাউডে দিয়ে অনবরত চিল্লাচিল্লি শুরু করে দিয়েছে। বাতাসে কথা আস্তে আসে, এজন্যই লাউড সিস্টেম।

– হ্যালো আব্বা, এইডা আফনেরা কী করলেন? চোখে দেইখা এই মাইয়া ক্যামনে আমারে গছায়া দিলেন? ছবির সাথে কোন মিল নাই। পুরা মুখ জুইড়া একটা থ্যাবড়া নাক। কাইটা রাখলে মনে হয় পাঁচ শতক জমি ঢাইকা যাইব এক নাকের নিচে! গায়ের রঙও জুইতের না। এইডা কোন কাম করলেন নিজের পোলার সাথে? এই পর্যায়ে ফোনের ওপাশ থেকে বরের বাবা ধমকে উঠলেন,

– বাবা তালেব নিশ্বাস নিয়া কথা বলো, বাবা। দম আটকায়া মরবা। মেয়ের নাক নিয়া নাক গলায়ো না। তাকে আমি বহু আগের থেকে পুতের বউ হিসাবে পছন্দ কইরা রাখছিলাম। মাবুদ-ই এলাহির হুকুম হইছে। সুরা আল-আরাফ এর ১৮৯ নাম্বার আয়াতটা পইড়া দেখো, বাবা তালেব। স্বামী-স্ত্রীর জোড়া কী জিনিষ বুঝতে পারবা। সে এখন তোমার বিয়া করা বউ – ভাইসা আসা কোন মাইয়া না, বুঝছ?

– বুঝাবুঝির কিছু নাই। এই মাইয়া নিয়া আমি ঘর করুম না।
– হারামজাদা তুই করবি না তোর দাদা সহ করবে!
– আইচ্ছা তাইলে দাদারেই করতে কও। আমারে ধমকায়া লাভ নাই। আমি ইত্ যাদি ইত্যাদি।।

পিতা-পুত্রের কথার যুদ্ধ চলছে। আমার মোটরসাইকেলও চলছে। তাদের কথোপকথন আর বেচারা তালেবের আজাইরা প্যাঁচাল শুনে যা বুঝতে পারলাম তা হলো, আমার পেছনে বসা যাত্রী জনাব তালেব সৌদি আরব প্রবাসী। গত হজ্বের সময় তার বাবাকে হজ্ব করিয়েছেন। বাবা একা যান নাই। সাথে করে তার ঢাকাইয়া ইয়ার বন্ধুকেও নিয়ে গেছিলেন। সেখানেই আল্লাহর ঘর সাক্ষী রেখে তালেবের সাথে বন্ধু-কন্যার বিবাহ পাকাপোক্ত হয়। বিবাহ পাকা করার মূল ভিত্তি ছিল বন্ধুর মোবাইলে রাখা কন্যার কয়েকখানা ছবি। তালেব ছবি দেখে মাশাল্লাহ বলেছে এবং শরিয়া মোতাবেক কাজী রেখে ফোনের মধ্যেই শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে। হজ্বে যাওয়া অনেক হাজীগণও বিবাহের মিষ্টি খেয়েছেন।

কিন্তু জনাব তালেব তখনও বুঝতে পারেনি যে এই মিষ্টির পর তার জন্য বিষ-তিতা অপেক্ষমাণ। প্রায় আট মাস পর সে আজ দেশে এসেছে। বিমান থেকে নেমেই লাগেজ সমেত সরাসরি শ্বশুরের বাসায় উঠেছিল বেচারা। শ্বশুর কুলের মানুষেরা নতুন জামাই পেয়ে মহা ধূমধামে বিভিন্ন আয়োজনে ব্যস্ত। বহু প্রতীক্ষিত বাসর আজই হবে। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল তখনই। অগণিত শ্যালক শ্যালিকার খোঁচাখুঁচির মধ্যে হঠাৎ তালেবের চোখে পড়ে গিয়েছিল তার স্ত্রী। স্ত্রীকে তখন স্থানীয় কোন পার্লারের পাঠানো হচ্ছে। নাম রত্না – তালেবের ভাষায় বদনা। নাক প্রকাণ্ড হওয়ায় তার স্ত্রীর মুখ না কি অনেকটা বদনার মত লাগে! ব্যাটা ফাজিল!

ঘটনা এখানেই শেষ হলে কোন সমস্যা ছিল না। ইতিমধ্যে জনাব তালেব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে যে, তার পালিয়ে যাওয়া ছাড়া গতি নাই। কালো শরীরের থ্যাবড়া নাকওয়ালীর সাথে থাকার চেয়ে বদনা কোলে নিয়ে জীবন পার করা হাজার গুণে ভাল। অবশেষে লাগেজ ফেলেই সে পালিয়েছে এক বন্ধুর সাথে জরুরী সাক্ষাতের দোহায় দিয়ে। শ্বশুরের বাসা শ্যাওড়া বাজারের পাশেই। সে শ্যাওড়া পার হয়ে হামিং বার্ড পাখির গতিতে মিরপুরমুখী বনানী ফ্লাইওভারের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। গন্তব্য শ্যামলী বাস স্ট্যান্ড। আফসোস, আসার সময় লাগেজ আনা হয় নাই। জীবন বাঁচানোর কাছে একটা মামুলী লাগেজ এমন কিছুই না।

জনাব তালেবের সাথে আমার দেখা হয় বনানী ফ্লাই-ওভার ওঠার মুখে। বারিধারা ডিওএইচএস থেকে অফিস সেরে বাইক চেপে বাসায় ফিরছিলাম। দূর থেকে দেখছিলাম সে চলন্ত বাসে লাফিয়ে ওঠার জন্য হেলপারের সাথে বেশ ধ্বস্তাধস্তি করছে। অফিস ছুটির এই সময়টাতে বাস ফাঁকা থাকে না। এজন্যই তালেবের ধ্বস্তাধস্তি কোন কাজে আসছে না। কেন জানি না বেচারার কষ্ট সইতে পারলাম না। বাম সাইড ঘেঁষে দাঁড়ীয়ে একটা দাঁত বের করা হাসি দিতেই সে লাফ দিয়ে কাছে এসে বলল,

– পাইছি শেষ পর্যন্ত! ভাই কি পাঠাও সার্ভিস? আমার দাঁত বের করা হাসি অট্ট হাসিতে পরিণত হলো। বললাম,
– আমি পাঠাও না, বাঁচাও সার্ভিস!
– গুড। দেশে এখন কত সার্ভিস নামছে। বাঁচাও ডা কবে নামল? এই সার্ভিসের নাম শুনি নাই তো আগে!
তার বাংলা পাঁচের মত চেহারা দেখে আমার হাসি বেড়ে যাচ্ছে। বললাম,

– অনেক কিছু শুনতে বাকী আছে আপনার। ট্রাফিক আইনের এই কড়াকড়ি যুগে এখন শুনবেন হেলমেট ছাড়াও যাত্রী নেয়া হয়। আমার কাছে এক্সট্রা হেলমেট নাই। ইসিবি চত্তরে সার্জেন্ট থাকে। ধরলে মামলা নিশ্চিত।

– এখন উপায়? দরকার হলে ভাড়া ডাবল দেব। চল্লিশ মিনিটের উপরে হইছে দাঁড়ায়া ছিলাম। বিরাট বিপদে আছি ভাই!

তাকে আশ্বস্ত করলাম একটা শর্তের ভিত্তিতে। লেডিস স্টাইলে দুই পা এক পাশে ঝুলিয়ে বসতে হবে। এক পায়ের প্যান্টের বটম ভাঁজ করে হাঁটু বের করে রাখতে পারলে আরও ভাল। একজন পুরুষ মানুষ মেয়েদের মত বসে যাচ্ছে এই অস্বাভাবিকতাটাই সার্জেন্টের মাথায় ক্লিক করবে আগে। রুগী-টুগী মনে করবে। চলন্ত বাইক দেখে ডাউন সিগনাল না দেয়ার চান্স আছে। জনাব তালেবের কিছুই করার নেই। ইমারজেন্সি পগার পার হওয়া নিয়ে কথা! সে কিছু একটা বিড়বিড় করে নিয়ে লেডিস স্টাইলেই বাইকে চেপে বসলো। আর আমার চলমান যন্ত্রণা শুরু হলো। এমন উপকার পেলে যে কোন মানুষ উদ্ধারকর্তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফাটিয়ে দেয়ার কথা। এই লোক কিছুই ফাটাল না। উলটো আমাকে তুমি করে সম্বোধন শুরু করল। যেমন,

– তোমরা জীবনেও ঠিক হবা না বুঝছ? রোড-ঘাটে এত কড়াকড়ি তারপরও তোমরা এক্সট্রা হেলমেট রাখো না।
আমি কিছু বললাম না। আবারও একটা হাসি দিলাম।

– কী ব্যাপার এত হাসো ক্যান তুমি?”
– এই হাসি সেই হাসি না ভাইজান। এইটা ক্রীতদাসের হাসি। শওকত ওসমানের ক্রীতদাসের হাসি লেখাটা পড়েন নাই?” সে এবার কিছুটা সমীহের সুরে অনুরোধ করে বসলো,

– লেখাপড়া তো কিছুটা করছ মনে হয়। যা হোক, শুধু মিরপুর ক্যান? আরেকটু আগায়া শ্যামলী স্ট্যান্ডে পৌঁছায়া দিতে সমস্যা কী? ভাড়া ডাবল দিব বলছিলাম। মনে আছে? আমি হাসি চেপে এবার একটু ভাব নিয়ে উত্তর দিলাম,

– স্যরি স্যার, আমার বাঁচাও সার্ভিস শ্যামলী পর্যন্ত রোড পারমিট নাই!

তালেব সাহেব কিছু একটা বলল। বাইকের ইঞ্জিন আর বাতাসের শব্দে তার বিড়বিড় আমার কানে আসলো না। এরপরই শুরু হলো মোবাইল কল-এর অত্যাচার! অত্যাচার আমার কানের চেয়ে পেটে হচ্ছে বেশী। কাতুকুতু লাগছে। কারণ তালেব ডান হাতে আমার পেট জাপটে ধরে আছে। পেছন থেকে একটি কোমল হাত এভাবে আঁকড়ে থাকলে ভাল লাগার সুযোগ ছিল। ঘামে ভেজা ধূমসি টাইপের পুরুষালী হাতে আর যা হোক কাতুকুতু ছাড়া আর কোন অনুভূতি আসার কথা না। গায়ে পড়ে উপকার করতে গিয়ে চোখের সামনে শুধু বাঁশই দেখছি! আহা! দিন আজ আমার ফাটাফাটি যাচ্ছে!

একবার মনে হয়েছিল জনাব তালেবকে আগের জায়গায় ফেরত দিয়ে আসি। অথবা কৌশলে তার শ্বশুর বাড়ির নাম্বার জেনে নেই। দীর্ঘ দিবস-দীর্ঘ রজনী প্রতীক্ষায় থাকা একটি মেয়েকে ফোন দিয়ে বলি, পাখি এখন আমার হেফাজতে। ধারালো ছুরী নিয়া আসেন। ডানা কাইটা আপনার চোখের সামনে বসায়া রাখব। পরক্ষণেই ভাবলাম, লাভ নেই। ধরা-বাঁধা পীরিত আর ঘষা-মাজা রূপ স্থায়ী হয় না। পুরো একটা জীবন এক সাথে কাটাতে চাওয়ার পূর্ব শর্ত ঘরের স্ত্রীকে কেবল একটি মাংসপিণ্ড নয় – একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া। তালেবের মধ্যে তার কিছুই নেই। কী দরকার একটি মেয়ের কপাল পোড়ানোর!

কোনরূপ ঝামেলা ছাড়াই মিরপুর পৌঁছালাম। ইসিবি তে সার্জেন্ট ছিল না আজ। তালেব অনেকবার সীটের দুই পাশে পা রেখে আরাম করে বসার জন্য অনুনয় করেছে। অনুনয় কানে নেইনি। মন চাচ্ছে ডজন খানেক চুড়ি কিনি। পালিয়ে যাওয়া নাটকবাজ বর-এর হাতে রেশমি চুড়ি মানাতে পারে ভাল! সমস্যা একটাই, এইরকম গাবদা মার্কা হাতের সাইজের চুড়ি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আমার বাসা মিরপুর ৬ নাম্বারে। বাসার সামনে চা-এর একটা টং দোকানের বেঞ্চিতে বসে আছি। চা এর অর্ডার দেয়া হয়েছে। আমার পাশে তালেব অনাবিল প্রশান্তি নিয়ে বসে আছে। সে এখন বউয়ের এলাকা থেকে অনেক দূরে। অনাবিল প্রশান্তির এটাই কারণ। তার বিশ্বাস, চা পর্ব শেষ হলে আমি তাকে শ্যামলী বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেব। ব্যাপারটা ভাবতেই নিজের মনে আবার হেসে ফেললাম। তালেব ভুরূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

– তোমার সম্যসা কী? সেই শুরু থেইকা দেখতেছি! হুদাই হাসো ক্যান?
– আমার একটা রুটিন আছে। সপ্তাহে একটা দিন হুদাই হাসি। আইজ সেই বিশেষ দিন। অকারণে পাগল হাসে।

আমিও সপ্তাহের এই দিনটা জাইনা-বুইঝা পাগল হই। উইশফুল ম্যাড! আপনি রাগেন ক্যান? আপনার সমস্যা তো ভ্যানিসড! হাহাহা চায়ে চুমুক দিচ্ছি। তালেব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একটু দূরে সরে গেল। গোপনীয় কোন ফোন এসেছে। সে ঘাড় দুলিয়ে চাপা স্বরে কথা বলছে। কথা তার মন মত হচ্ছে না বোঝা যাচ্ছে। তালেব কাছে এসে মুখ অন্ধকার করে নিয়ে আমার পাশে বসলো। তার মোবাইল স্ক্রিন আমার চোখের সামনে ধরে জিজ্ঞেস করল,

– মাইয়া ডা দেখতে কেমুন ভাই? এক্কেবারে পরীর বাচ্চার মত সুন্দর না, তুমিই কউ? ছুডকাল থেইকা একটাই ইচ্ছা। পরীর বাচ্চা বিয়া করুম! এমুন চেহারার মাইয়া ভাল না বাইসা থাকন যায়, কউ? আমি পরীর বাচ্চার ফেসবুক আইডির দিকে চেয়ে আছি। পরীর বাচ্চার নাম এঞ্জেল মাইশা। এই হেলা-দোলা গাল ফোলানো মাইয়া আবার বিশিষ্ট টিক-টক সেলিব্রিটি! তালেবের সাথে এই মেয়ের না কি আজই দেখা করার কথা ছিল। মেয়ে এখন ধানাই-পানাই শুরু করেছে। তালেবের মন এজন্যই খারাপ। মনে মনে বললাম, তালেব রে! এই মাইয়ার পাল্লায় পড়লে তর খবর আছে! তালেব ছবির দিকে তাকিয়ে আমার কাছে জানতে চাইল,

– আমার পছন্দ কেমুন কইলা না তো ভাই? ঠোঁট দুইটা দেখছ?
– হুম দেখছি। মনে হইতেছে সাগর শুকায়া লবণ জইমা আছে! কোণায়-কানায় লবণ চিকচিক করে! তালেব আহত হয়েছে আমার কথায় বেশ বোঝা গেল। বলল,

– তুমারে তো ভাই শিক্ষিত মানুষ মনে করছিলাম! একটা সুন্দর মাইয়া দেইখা এইডা কী কইলা তুমি! তুমার রুচি তো খুবই খারাপ। ওয়েট, মাইশার আরেকটা মারদাঙ্গা টাইপের ছবি দেখাই। একটা ভাল কথা অন্তত কউ!
আমি পরীর বাচ্চার আরেকটি ছবির দিকে তাকিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গীতে রায় দিলাম,

– হুম এই ছবিটা সুন্দর। ইনার নাক থ্যাবড়া না। নাক বাঁশির মত! ক্যামেরা নিচ থেইকা ধরাতে নাক বুঝতে সুবিধা হইছে। নাকের ছিদ্র অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাইতেছে। মাশাল্লাহ! নাকে কোন লোম নাই। লোমহীন নাসিকা!
আমি প্রায় নিশ্চিত অন্য কোন সময় হলে তালেব তার হাতের ধরা চা-এর কাপ আমার মাথায় মেরে দিত। সে এসব কিছুই করল না। সে হাতের চা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, ধুর শালার চায়ের গুষ্টি কিলাই! তুমি সুন্দরের বুঝ কী? চা শেষ কইরা গাড়ি ইস্টার্ট দেও চালু কইরা! তালেব উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আমি উত্তপ্ত নই। ঠাণ্ডা গলায় বললাম,

– গাড়ি স্টার্ট অবশ্যই দিব ভাই। শর্ত আছে!
– বারবার এত কীসের শর্ত হুম? দেশে কি সার্ভিস আর নাই মনে করছ? প্রয়োজনে সিএনজি নিয়া যামু। তুমার শর্তের নিকুচি করি আমি। ভাড়া কত হইছে জানাও, দিয়া বিদায় হই।

– ভাড়া দিতে হবে না। চলে যান। – আমি গম্ভীর স্বরে শুদ্ধ ভাষায় জানালাম। তালেব কী মনে করে পাশ ঘেঁষে বসলো। অনুনয়ের স্বরে বলল,
– আমি আসলেই ফাঁপরে আছি ভাই। বিরাট ফাঁপরে! মজা নিও না। কী শর্ত কউ!
– আমি কিছু কথা বলব। মন দিয়ে শুনতে হবে। কী? রাজি?

তালেব হ্যাঁ-না কিছু বললল না। আমি কথা শুরু করলাম। “তালেব ভাই! ধরেন, আপনার ঘরে সত্যিই পরীর বাচ্চার মত একটা বউ আছে। এক সকালে বাইরে কাজে বের হচ্ছেন। আপনার পরীর বাচ্চা ঘুমাচ্ছে। সারা রাত ফেসবুক আর টিক-টক করে সে ক্লান্ত। এই অবস্থায় আপনি ঘুমন্ত বউয়ের মুখের কাছাকাছি আপনার মুখটাও এগিয়ে নিচ্ছেন। আপনার ভেতর উথালপাথাল প্রেম জেগে উঠেছে! এতক্ষণে জনাব তালেবের মুখে হাসি ফিরে আসতে শুরু করেছে। সে গুলুগুলু লুক নিয়ে জবাব দিলো,

-জ্বী প্রেম জাইগা উঠছে। তারপর?
– ধীরে ধীরে আপনার মুখ তার মুখের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে! আপনার বুক ধড়ফড় শুরু হয়েছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে! কানের মধ্যে ভোঁ-ভোঁ শুরু হয়ে গেছে! মুখ ক্রমশ কাছে আসছে কাছে আসছে আরও কাছে!”
তালেব এই পর্যায়ে আমাকে থামিয়ে দিলো। তাঁর নিশ্বাস ঘন হয়ে আসতে শুরু করেছে। চোখ দুটোর সাইজও স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বড়। সে আমার ডান হাঁটুর উপর এক হাতের তালু চেপে ধরে অনুনয়ের সুরে বলল,

– আর আগে বাইড়ো না ভাই! কোন লাইনে যাইতেছ?
– আরে লাইন খারাপ না – ভাল লাইনেই আছি। আগে শুনেন পরে বিচার। শুনেন নাই, আগে খান পরে টেকা? এইটাও সেই রকম আর কী! হাহা

– আচ্ছা বলো। আমি বিজ্ঞের মত থুঁতনি চুলকাতে চুলকাতে ভাব নিয়ে বললাম,
– শুনেন, কথার মইধ্যে লেফট হ্যান্ড দিবেন না, ওকে?”
– ওকে।
– তাইলে কই আছিলাম জানি?
– আপনি ধীরে ধীরে বউয়ের মুখের কাছে মুখ নিচ্ছেন – এই জায়গায় ছিলা।
– আরে মর জ্বালা! আমি কেন আপনার বউয়ের মুখের কাছে মুখ নিব?
– একই কথা। আচ্ছা আমিই নিলাম – এই বার বলো।
– একই কথা না। বউ আপনার মুখ আমার, এইটা হইলো কিছু? পয়েন্টে থাকেন ব্রোহ।
– আচ্ছা পয়েন্টে আছি, চালু কইরা বলো! আমি অন্য দিকে ফিরে মুখে চলে আসা হাসি চেপে আরও বেশী ভাব নিয়ে বললাম,

– ধরুন, এমন সময়ে আপনার পরীর বাচ্চা চোখ খুলে তাকালো। আপনি দেখলেন, তার হরিণীর মত চোখের কোনে পিঁচুটি জমে আছে। এরপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হাঙ্গরের মত হা করে একটা হাই তুলল। বহুক্ষণের ঘুম। বাসি মুখ। পচা ব্যাকটেরিয়ার একটা ঝাঁঝালো গন্ধ এসে আপনার নাকে লাগল। আপনার কাছে পরীর বাচ্চাকে তখন কেমন লাগতে পারে?

আমি অন্যদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তালেবের দিকে রাখলাম। সরাসরি আই কন্টাক্ট! তার চোখ আর আগের মত বড় নেই। কুঁচকানো শুরু হয়ে গেছে। অবাক হয়েছে বোঝা-ই যাচ্ছে। হয়ত ভাবার চেষ্টায় আছে যে সে কার পাল্লায় পড়েছে। মাত্র ঘণ্টা খানেকের সাময়িক পরিচয়ের এক লোকের কাছ থেকে এ ধরনের কথা শুনলে অবাক হওয়ারই কথা। সে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে মন্তব্য করলো, তুমি মিয়া মানুষটাই উলটাপালটা! আজেবাজে এই সব মাথায় আসে ক্যামনে ভাই? ছিঃ

– ছিঃ এখনও বাকী আছে। বসেন। – আমি তার হাত টেনে ধরে আগের জায়গায় বসিয়ে হেসে আবার থেরাপি শুরু করলাম।

– চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন। রাতে বাসায় ফিরেছেন। মনে রোমান্টিক ঝড়! বাসায় এসে পরীর বাচ্চাকে একটু অন্যরকম মনে হলো। কারণ আজ সে চুলে তেল দিয়ে তেলকুমারী সেজে বসে আছে। মুখটা ছোট-ছোট মনে হচ্ছে। তবু কাছে গেলেন। ভালবাসা ব’লে কথা! কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। সে মৃদু ঠাট্টার সুরে জানালো, তার শরীর অসুস্থ। অলরেডি অনেকগুলো ন্যাপকিন জমে গেছে। তার ভীষণ ইচ্ছা, সারারাত আপনার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকবে আজ। পেটের ব্যাথায় কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা চায় তার স্বামী ঘুমানোর আগ পর্যন্ত মমতার হাতটা রাখুক তার শরীরে! একসময় এও জানায় যে, সকাল হতেই বাইরে রাখা ডাস্টবিনে মনে করে যেন ন্যাপকিনের পোটলাটা ফেলে আসতে আপনার ভুল না হয়! কেমন লাগার কথা তখন পরীর বাচ্চাকে?

অথবা দিনের বেলায় রান্নাঘরে সে ঘেমে একাকার। কিঞ্চিৎ জড়িয়ে ধরে বসে থাকার ইচ্ছে হলো আপনার। এবং তা-ই করলেন। তার শরীর থেকে আগের সেই মোহনীয় সুগন্ধ আসছে না যা আপনি পার্কে বা চাইনিজে বসে একান্তে সময় কাটানোর দিনগুলোতে পেতেন। তার শরীরে এখন কাঁচা মাছ ধোয়ার আশটে গন্ধ, তার ঢেঁড়সের মত কমনীয় আঙ্গুলের পাতা এখন হলদেটে আর খাঁজ কাটা। মুখে নিয়ে ঘষবেন? তার আঙ্গুলে পেয়াজ-রসূনের উৎকট গন্ধ!
তার ঠোঁট সবসময় ভেজা-ভেজা উষ্ণতা ছড়াবে না। আটপৌরে ঠোঁট কখনও-সখনও শুকিয়ে থাকে, ফেটে থাকে, বড্ড মলিন মনে হয়!

অথবা ধরে নিন, তার প্রচণ্ড অসুস্থতার দিনে দুর্বল শরীরের পরীর বাচ্চাকে ধরে বাথরুমেও নিয়ে যেতে হতে পারে। হতে পারে বের হওয়ার সময় সে কমোটটাও ফ্ল্যাশ করতে ভুলে গেছে! শেষে পুরো ওয়াশরুমটা আপনারই পরিষ্কার করতে হলো। এরকম হাজারে-হাজার বলা যায়। তার ভীষণ গোপন অনেক ব্যক্তিগত কাজগুলোতেও আপনার হঠাৎ সাহায্য লাগতেই পারে। বলুন তো, একজন মানুষের শরীরের প্রতিটা ভাঁজের রহস্য জেনে যাবার পর তার এই আটপৌরে ভাল লাগা-খারাপ লাগাকে সঙ্গী করে আমৃত্যু সবচেয়ে ভাল বন্ধুটি হয়ে থাকতে পারবেন কি না? ব্যাপারটা মূলত কেবল নারী বলে নয়, এটা ভাইস-ভার্সা। সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমি প্রায় নিশ্চিত আপনি পারবেন না। কারণ আপনি মোহগ্রস্থ! নেশার চোখে সাময়িক পরিপাটি সৌন্দর্যকে খোঁজেন। ভাইজান, ভালোবাসা আর সম্মান থাকলে থ্যাবড়া নাকও ছুরীর আগার মত সরু মনে হয়। আরও অনেক সীমাবদ্ধতাকেও জয় করা যায়।

আর তা না থাকলে পরীর বাচ্চাকেও একসময় সুন্দরী ভিআইপি কল-গার্লদের তুলনায় বিচ্ছিরী লাগতে শুরু করে! কারণ সে এখন আপনার সামনে পড়ার আগে ড্রেসিং-টেবিলে ঘন্টা ধরে নিজেকে সাজানোর সুযোগ পায় না। সে এখন যে কোন কমন নারী – ঘরের আটপৌরে মানুষ। আমার কথা শেষ, বাংলাদেশ! হাহাহা। নেন, এইবার উঠেন। আমি তালেবের দিকে চেয়ে আছি। সে শক্ত হয়ে গেছে মনে হলো। একসময় ধীরে এসে বাইকে চেপে বসে সোনালী রঙের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিলো। বিরক্ত মুখে বলল, এই জন্যেই ঘরের কথা পরে রে কইতে হয় না। চান্সে কতগুলো কথা শুনাইলা! তুমার মাথায় কি সুন্দর কিছু আসে না ভাই?

– জ্বি আসে। সুন্দরের সাথে বিশেষ-বিবেচ্য অসুন্দরকেও ভালোবাসার নামই সংসার। এইটা হুটহাট ক্রাশ খাওয়া রোগের বাতিকগ্রস্ত নেশা বা অনলাইনে রংচঙা মুখ দেখে দুই দিনের লুতুপুতু না, মহামান্য তালেব ভাই! সংসারের সংজ্ঞা অনেক গভীর!

– একটা কথা জিগাই?
– জিগান।
– আপনি কি বিয়া করছেন? কিছুটা অবাক হলাম। তালেব এখন তুমি ছেড়ে আপনি সম্বোধন শুরু করেছে। হাসি চেপে উত্তর দিলাম,
– না। বিয়া করি নাই।
– কন কী? বিয়া করেন নাই, এত কিছু জানেন ক্যামনে?
– কারণ বরযাত্রী বহু গেছি। হাহাহা

আমি হাসতে হাসতে বাইক স্টার্ট দিলাম। শ্যামলী স্ট্যান্ডে জনাব তালেবকে পৌঁছে দেয়ার পর সে যারপর নাই কৃতজ্ঞতা জানালো। আবার কখনও ঢাকায় আসলে সে আমার সার্ভিস চায়। এজন্য আমার ফোন নাম্বারও নিয়েছে সে। মানিব্যাগ থেকে একটা একহাজার টাকার নোট বের করেছে, কিন্তু আমাকে দেবে কি না সম্ভবত বুঝে উঠতে পারছে না। তার মোবাইলে অনবরত কল আসছে। সেদিকে তার খেয়াল নেই। একসময় কিছুটা বিস্ময় নিয়ে জানতে চাইল, আপনি আসলে কেডা ভাই? আমি হেসে জবাব দিলাম, আমি বাঁচাও সার্ভিস!

– এক বন্ধু যে কইলো এই নামে ঢাকা শহরে কোন সার্ভিস নাই!
– ঠিকই বলছে। আমি মাঝেমধ্যে আমার যাত্রাপথে ফাঁপরে পড়া যাত্রী টানি। ফ্রি যাত্রী সেবা বলতে পারেন। আপনাকে অবশ্য সেবা একটু বেশী দিয়ে ফেলেছি আজ। একটা কথা বলি?

– বলেন!
– পরীর বাচ্চা না, পারলে একটা মানুষের বাচ্চার সাথে জীবন কাটায়েন। ওটা আপনার আজন্মকালের বাঁচাও সার্ভিস। ট্রাষ্ট মি!

খুব আশা ছিল যে আমার কথা শুনে চোখের সামনে দেখব, তালেব তার স্ত্রীকে ফোন দিয়ে বলছে, রত্না, আমি আসতেছি। আমার জন্য কিছু খাবার রেডি করো। তোমার হাতে খাব। তুমি লজ্জা পাইলেও কিছু করার নাই। ভীষণ ক্ষুধা লাগছে!

বাস্তবে তেমন কিছুই হলো না। তালেব আর কিছু বলল না। সোজা এক বাস-কাউন্টারে ঢুকে গেল। আমি বিদায় জানিয়ে চলে আসলাম। রাত এগারোটার দিকে নিজের সাথেই যুদ্ধ শুরু করেছি। বাজার থেকে চিংড়ী এনেছিলাম। নিজেই কুটেছি। ইতিমধ্যে পাঁচ বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া হয়েছে। হাতের গন্ধ যায়নি। দুই বার লেবুর সুগন্ধ যুক্ত লিকুইড হ্যান্ড ওয়াশ লাগানো হয়েছে। ফলাফল ভাল না। নখের খাঁজে কাঁচা চিংড়ির সুগন্ধ এখনও বিদ্যমান। এই হাতে ভাত মেখে খাব কী করে ভাবছি। এমন সময় মোবাইল কল আসলো। ফোন দাতা এক নাগাড়ে হাসবে না কথা বলবে কিছু বুঝতে পারছে না।

– ভাইজান আমি তালেব বলতেছি। হাহাহা। একটা মজার কথা শুনেন। বাসর রাইতে বউ আমারে পয়লা বৈশাখের ড্রেস পরায়া ট্রায়াল শুরু করছে। হাহাহা। আমি পরব শেরওয়ানী, সে আমারে পরাইছে লাল-সবুজ পাঞ্জাবী। পুরাই বাংলাদেশের পতাকা! পার্লার থেইকা আসার সময় পয়লা বৈশাখের শপিংও কইরা আনছে। হাহাহা। কী পাগল কন তো দেহি! গত আট মাসের বিয়া করা স্বামীরে কাছে পায় নাই। মাইয়া একটা টু শব্দও করে নাই। আইজ আইসা দেখি, এমুন শান্ত মাইয়া বাসার সবার সাথে ঝগড়া করতাছে। বলতেছে, যেই বাসায় তার স্বামীরে নিয়া উলটা কথা কয় সেইখানে সে আর থাকবে না। আমি ফোন ধরি নাই একটাও। এর মইধ্যে কে জানি বলছে আমি এই জনমে আর ফিরা আসব না। কাইন্দা চোখ দুইটা ফুলায়া ফালাইছে। এখন নাকের মত চোখও ফোলা! মানুষের বাচ্চাগুলা বুঝি এমুনই হয়! হাহাহা! হ্যালো ভাইজান! শুনতেছেন? আপনি কিন্তু আপনার নামটাও বলেন নাই! হ্যালো! তালেবের আর কোন শব্দ পেলাম না। একটু বাদেই কেউ একজন কিন্নর কন্ঠে ভীষণ মায়ায় মোড়ানো শব্দে বলে উঠল,

– ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেছিল জানতাম। আপনি বুঝি সে-ই? আপনি আসলে খুব খুশী হতাম! দেখুন না আপনার বন্ধুর অবস্থা! এতক্ষণ অযথাই হেসেছে। বলছে এটা তার হাসির দিন। এখন আবার খাটে বসে কাঁদছে! এজন্যই ফোন আমাকে ধরিয়ে দিয়েছে। কী হয়েছে বলুন তো? আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। মেয়েটা আমাকেই তালেবের তথাকথিত বন্ধু মনে করে বসে আছে। স্বামীর প্রতি এটা প্রচণ্ড বিশ্বাসের ফল। সংসারে বিশ্বাস অনেক বড় জিনিষ। অন্য একটি ব্যাপার ভেবে বেশ পুলকিত হলাম। তালেবের মত মানুষের স্ত্রীর মুখে এত শুদ্ধ, প্রাঞ্জল ভাষায় কথা অন্তত আশা করিনি। যথেষ্ট শিক্ষিতা বোঝাই যাচ্ছে। আমার গলা ধরে আসছে। কেশে জানতে চাইলাম,

– রত্না!
– বলুন।
– আপনার স্বামীর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেখুন। আমি নিশ্চিত কান্না বেড়ে যাবে!
– তাই?
– হুম। আনন্দ আর অভিমানের অশ্রু আদর পেলে বাঁধ ভেঙে যায়!
– আমি জানি। ও আমাকে অনেক ভালোবাসে।
– তাই যেন হয়! রত্না!
– জ্বি।
– আজকের এই বিশেষ রাতে আপনাদের আর সময় ক্ষেপণ করাবো না। সিম্পল একটা এনকোয়ারি আছে। শাড়ী পরেছেন না কি লেহেঙ্গা পরেছেন আজ?

– শাড়ি পরেছি। কেন বলুন তো?
– স্বামীকে এবার আঁচলে আন্ধা গিঁট দিয়ে বাঁধুন যাতে পালাতে না পারে। জনম গিঁট দিবেন!
– বাঁধতে হবে না। আমি জানি, সে কোনদিন আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না।

বউরা অনেক যাদু জানে! হিহিহি
রত্না নামের মেয়েটি খিলখিল করে হাসছে। আমি অবাক হয়ে শুনছি। আমার চোখের মধ্যে কিছু একটা হচ্ছে। অথচ আজ আমার এমন হওয়ার কথা ছিল না। কারণ আজ আমার সাপ্তাহিক হাসির দিন। নাহ! এর কোন মানে নেই!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত