আয়েশার আয়না

আয়েশার আয়না

আমার স্ত্রী আয়েশা প্রায়ই মাথা চুলকাতে চুলকাতে কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে, “শাদবিন আমার মাথা থেকে উঁকুন এনে দাও। আমার খুবই বিরক্ত লাগলেও আমি ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে তার মাথায় বিলি কেটে দেই যেন আশেপাশের বিল্ডিং থেকে কেউ এই অদ্ভুত দৃশ্য না দেখেন। একদিন অনেকক্ষণ বিলি কাটার পরও যখন আমার চোখে কোনো উঁকুন ধরা পড়ল না তখন আমি হতাশ গলায় বললাম, “তোমার চুলে একটা উঁকুন তো দূরের কথা কোনো খুশকিও নেই।”

আয়েশা আহ্লাদী গলায় বলল, “এত সুন্দর করে চুলে বিলি কাটো তুমি আমার কী যে ভালো লাগে।”আমি তখন ঠোঁট বাকিয়ে বললাম, “এই জন্য মিথ্যা বলবে?” আয়েশা আমার গা ঘেঁষে ঘার ঘুরিয়ে চোখ বন্ধ করে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, “তোমার চোখ বন্ধ কেন? “তোমার শরীরের ঘ্রাণ আমার কী যে ভালো লাগে।” “আর কী কী ভালো লাগে শুনি?”

“তুমি যখন বাসায় থাকো না, সব কাজকর্ম করে আমি তোমার শার্ট নিয়ে বোকার মতো বসে থাকি। তুমি কলিংবেলে টিপ দেওয়ার সাথে সাথে সেই শার্ট আমি তড়িঘড়ি করে হেঙ্গারে ঝুলিয়ে ফেলি। তোমাকে ইচ্ছে করে প্রতিটা সময় প্রতিটা মুহূর্তে আমার পাশে বসিয়ে রাখি।”এত ভালোবাসো তুমি আমাকে?” আয়েশা চোখ খুলে বলল, “প্রেম কী? ভালোবাসা কী? বিয়ের আগেও আমি জানতাম না। এখনও জানি না। শুধু মনে হয়, তুমিই আমার অস্তিত্ব, তুমিই আমার অনুভূতি, তুমিই আমার আয়না।”

“আমি তোমার আয়না?” – বলে শেষ করার আগেই আয়েশা আমার আরও কাছে এগিয়ে এল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আমার নাকের ডগায় অনুভূতি হলো। ঠিক তখনই আমার মনে হল, “তার ঠোঁটের এমন ছোঁয়া পেতে যুগযুগ ধরে পৃথিবীতে আমি বেঁচে থাকতে রাজি আছি।” বেশকিছুদিন পরের ঘটনা। অফিসের কিছু জরুরি কাগজপত্র গুছাতে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথাও ভুলে গিয়েছিলাম। আমাদের অফিসের ওয়াশরুমটা যেমন দীর্ঘ, আয়নাটা তেমন বড়। সেদিন ক্লান্তি ভাব দূর করতে ওয়াশরুমে হাতমুখ ধুয়ে আয়নার দিকে তাকাতেই আয়শা আয়নার ভিতর থেকে রিনরিনে গলায় বলল, “এ্যাই শাদবিন!”

আমি কিছুক্ষণ বোকার মতো আয়নার সামনের দাঁড়িয়ে রইলাম। আয়েশা সবুজ পাড়ের লাল শাড়ি পড়ে আছে। কপালে লাল টিপ। হাতে কাঁচের চু্ঁড়ি পড়তে পড়তে সে ব্যস্ততার ভঙ্গিতে বলল, “বোকার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে কথা বলো তো। বেশীক্ষণ থাকতে পারব না।” আমি কাঁপা গলায় বললাম, “তুমি এখানে কেন? আমার তো ভয় করছে। “তোমাকে সেদিন না বললাম তুমি আমার আয়না, তাই আমিও তোমার আয়না। আয়না আয়নায় কাটাকাটি” – বলেই সে খিলখিল করে হাসলো। আয়েনার সামনে মুখ বাড়িয়ে সে ফিসফিস করে বলল, “ওয়াশরুমে আর কেউ নেই, চট করে একটা চুমু খেয়ে ফেল। জলদি!”

আমি জ্ঞানশূন্য তার কথামতো চোখ বন্ধ করে (চোখ খোলা রেখে আমি চুমু খেতে পারিনা) আয়নায় আয়েশার ঠোঁটে চুমু খেলাম। সাথে সাথে আমার কলিগ আফনান সাহেব ওয়াশরুমে ঢুকে বললেন, “শাদবীন সাহেব, কী করছেন আয়নার সামনে।” আমি আয়নার সামনে তাকিয়ে দেখি আয়েশা উধাও। অথচ তার লাল লিপস্টিকের দাগ আয়নায় লেগে আছে। আমি দ্রুত বেসিঙের ট্যাপ ছেড়ে আয়নায় ঘষা দিলাম। আফনান সাহেব কৌতূহলী চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

সেদিন আমার সাথে কী ঘটল আমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। মনে মনে ভাবলাম, দুপুরে কাজের প্রেসার আর ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমার মাথা গুলিয়ে গিয়েছিল। রাতে বাসায় ফেরার পর আয়েশাকে দেখলাম সাদামাটা সেলোয়ার-কামিজ পড়া। সে ভাত বাড়তে বাড়তে বলল, “জানো আমার জ্বর জ্বর লাগে।” “কখন থেকে?” সে জবাব না দিয়ে চেয়ার টেনে পাশে বসল। আমি বললাম, “তুমি খাবে না?”

আয়েশা মুরগির মাংস আমার প্লেটে দিয়ে বলল, “আমার ক্ষিধে নেই।” আমি এক লোকমা মুখে দেওয়ার সাথে সাথে সে করুন চোখে বলল, “কেমন হয়েছে খেতে?” “ভালোই তো।” “শোনো না, একটা কথা যদি বলি রাগ করবা নাতো?” আমি হাসিমুখে বললাম, “রাগ কেন করব?” “বিয়ের আগে থেকে আমি আবার ওঝা কবিরাজদের সাথে টুকটাক যোগাযোগ রাখতাম। বিয়ের পরও রাখি। এইবার এক ওঝার কাছ থেকে আয়না পড়া আনার পর থেকে আমার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।” আমি সাথে সাথে কাশতে কাশতে শুরু করে বললাম, “আয়না পড়া?”

আয়েশা পানি এগিয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ। তুমি এত অবাক কেন হচ্ছ? ওই আয়নায় আমি সাত দিন ভালো করে মুখ ধুয়ে মুখ দেখলে তুমি আমাকে ছাড়া এই জীবনে অন্য কাউকে ভালোবাসবা না। কিন্তু আজ সাত দিন হওয়ার সাথে সাথে আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি।” আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “এগুলো কেমন ধরনের পাগলামী? আমি এমনিতেই তোমাকে ছাড়া কাউকে ভালোবাসতাম না। এসব আয়না ফায়না আনতে হলো কেন?”

“ভয় লাগে বুঝলে? বড্ড ভয় লাগে। আমার যে বান্ধবী টিয়া? ওর বয়ফ্রেন্ডকে সাত বছর ভালোবেসে বিয়ে করল। সাত মাসও স্বামীর ঘর করতে পারল না। কেমন লাগে এসব শুনলে একবার ভাবো?” আমি খাওয়া রেখে উঠে হাত ধুতে ধুতে বললাম, “তুমি আমার সাথে কথা বলবে না।” আয়েশাও সাথে সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “প্লিজ শাদবীন খাওয়া শেষ করে ওঠ। আমি জ্বর নিয়ে কষ্ট করে রান্না করেছি। আজ গ্যাস ফুরিয়ে গিয়েছিল। বাড়িওয়ালার ছাদে একটা লাকরির চুলো আছে সেখান থেকে রান্না করে এনেছি।”

আমি কঠিনস্বরে বললাম, “যতদিন তুমি ওঝা কবিরাজের কাছে যাওয়া বন্ধ না করবে আমি তোমার রান্না আর খাবো না।” আয়েশা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, “এমন করে বলিও না প্লিজ।” আমি শোবার ঘরে চলেই যাচ্ছিলাম হঠাৎ লক্ষ করলাম আয়েশা দাঁড়িয়ে ডানে-বামে টলছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই সে মাথা ঘুরে ফ্লোরে পড়ে গেল।

আমি তাকে সেই অবস্থায় বিছানায় শুয়ে দিলাম। আয়েশার মাথায় পানি ঢালার বিশ মিনিট পর তার জ্ঞান ফিরল। তার সমস্ত শরীর ঝিকে জ্বর এসেছিল। কাপড় ভিজিয়ে তার শরীর মুছে দিলাম। বালিশ খাটের সাথে এলিয়ে তাকে আধশোয়া অবস্থায় বসালাম। সে হাসিমুখে বসে বলল, “এখন আবার ডাক্তার ডাকতে যেও না। জ্বর ছেড়েছে।”

আমি পাশে বসে বললাম, “খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এত রাতে কাকে ডাকব? কাকে ফোন করব মাথায়, আসছিল না কিছু।” আয়েশা বলল, “তুমি আমার উপর রাগ করিও না। আমি একটু এমন তাতো তুমি জানো। সবসময় ছোট ছোট ব্যাপারে ভয়ে ভয়ে থাকি। আর কখনও আমি ওঝা কবিরাজের কাছে যাব না।”

আমার শরীরও প্রায় ভিজে গিয়েছিল, আমি কাপড় পাল্টে কালো টি-শার্ট’টা পড়তে নিচ্ছিলাম। সাথে সাথে আয়েশা জোড়ালো কন্ঠে বলল, “ওটা পড়িও না। আবার কী না কী হয়? ওই টিশার্টও আমি কবিরাজের কাছ থেকে ফুঁ দিয়ে এনেছিলাম।” আমি তার কোমল মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললাম। সেও মুচকি করে হাসল।

গভীর রাত। আয়েশা গভীর ঘুমে মগ্ন। রাত তিনটার দিকে আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি ওয়াশরুমে যেয়ে চোখেমুখে পানি দিলাম। বাথরুম থেকে বের হবো সেই মুহূর্তে হঠাৎ পিছনের আয়েনার ভিতর থেকে কেউ আয়েশার কন্ঠে বলল, “তুমি এমন কেন গো? সবসময় খালি গায়ে থাকো। আমি যে কালো টি-শার্ট’টা দিয়েছিলাম ওটা পড়তে পারো না? ওটায় তোমায় খুব মানায়।” আমার পিছনে ফেরার সাহস হলো না। ঝড়ের গতিতে সেখান থেকে দ্রুত বের হয়ে এলাম।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত