সত্যিকারের পরশ পাথর

সত্যিকারের পরশ পাথর

—দেখো রাজ আমি আর তোমার সাথে সম্পর্কটা রাখতে চাইছি না।তুমি কখনো নিজেকে পরিবর্তন করতে পারবে না।
সুতরাং আজ থেকে তুমি তোমার রাস্তাতে আর আমি আমার রাস্তাতে।
কখনো ফোন দিয়ে বিরক্ত করার চেষ্টা করবা না আর।

‘কথা গুলো একনিঃস্বাসে বলে একটা লম্বা শ্বাস নিলো অবন্তিকা।দেখে মনে হচ্ছে তার কাঁধে থাকা কয়েকমন ওজনের ভারি কিছু ঝেড়ে ফেললো এই মুহূর্তে।আমি অসহায়ত্বের সাথে অবন্তিকাকে বুঝানোর চেষ্টা করতে লাগলাম।কিন্তু না, সে তাঁর কথা থেকে এককদম পিছপা হবে না।

অবন্তিকা আবারো কর্কশ কন্ঠে বলতে লাগলো।—তোমার মত ফাল্তু ছেলের সাথে আমার কোনোদিনও যাই নি আর যাবেও না।আসলে তুমি না পেরেছো কখনো কিছু দিতে,না পেরেছো কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে।তুমি হলে একটা দাড়কাক।তোমার জন্য রাস্তার মেয়েরাই পারফেক্ট।তাদের সাথেই এখন থেকে প্রেম করবা।ফারদার যদি আমাকে আর ফোন দিছো ইভটিজিং এর দায়ে জেলের ভাত খাইয়ে ছাড়বো বলে দিলাম।
ফাল্তু ছেলে কোথাকার।

‘এবার কথা গুলো বলে অবন্তিকা সোজা হাটা শুরু করে দিলো।আর আমি বোকার মত অবন্তিকার সব কথা শুনে চুপটি করে দাড়িয়ে থেকে তার চলে যাওয়া দেখছি।

আসলেই তো অবন্তিকা ঠিকি বলেছে,আমার মত গরিব ছেলের সাথে ওর কখনো যাই না।তার থেকে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগে এখনই শেষ হয়ে যাওয়াই ভালো।কিন্তু অবুঝ মনটা কিছুতেই মানছে না।খুব ভালোবাসতাম পাগলিটাকে,কখনো ভাবি নি এভাবে হুট করেই হারিয়ে ফেলবো।

খুব কষ্ট হচ্ছে।দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে হৃদয়ের মাঝখানটা।
আচ্ছা গরিব বলে কি কাউকে ভালোবাসার অধিকার নেই আমাদের।নাকি সবসময় সবার কাছে করুনার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে হবে এটাই উপরওয়ালা ভাগ্যের লিখনরূপে লিখে দিয়েছে।।

বুক ফেটে কান্না আসছে কিন্তু জোরে কাঁদতেও পারছি না।গুমড়িয়ে গুমড়িয়ে কিছুক্ষণ কাঁদার পর হাটা শুরু করে দিলাম।।

—না আর বাসায় ফিরবো না।ওভারব্রীজের উপর থেকে ঝাপ দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিবো।কিন্তু এখন তো বিকেল,এখন মরতে গেলে হয়তো অনেকেই বাঁধা দিতে পারে।তাই ঠিক করলাম রাতের আঁধারে মরবো।নিশিরাতের ব্যস্ত রাস্তার ধুলো গুলোও যখন নিরব হয়ে থমকে যাবে, ঠিক তখনি আমার অভিশপ্ত জীবনটাকে শেষ করে দিবো।ওভারব্রীজ থেকে নিচে পড়ে গাড়ির চাকার সাথে পিশে যাবে আমার শরিরটা।কেউ হয়তো চিনতেও পারবে না তখন।বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে হয়তো দাফন করে দিবে আমাকে।কিন্তু মরার আগে কয়েকটা ইচ্ছে পূরণ করে তারপর মরবো।

পকেট থেকে মানিব্যাগটা বার করে দেখলাম ব্যাগের ভিতরে একটা পাঁচশত টাকা আর কয়েকটা ছেড়া ফাটা দশটাকার নোট পড়ে আছে।যে গুলোর অবস্থা অনেকটাই আমার মতই।
কেউ সহজে নিতে চাই না।

রাস্তার পাশ থেকে একপ্যাকেট সিগারেট আর একটা ম্যাচ কিনে একটা নির্জন জায়গাতে চলে গেলাম।
লোকমুখে শুনেছি সিগারেট খেলে নাকি কষ্ট কমে।তাই মরার আগে একটু কষ্টটাকে কমিয়ে নিয়ে তারপর মরবো।প্যাকেটটা খুলে একটা সিগারেট মুখে নিয়ে আগুন ধরিয়ে টান দিতেই গলার ভিতরে কেমন জানি জ্বলতে শুরু করে দিলো।
নিজের অজান্তেই কাশতে কাশতে চোখ থেকে পানি বের হয়ে আসলো।
এসব ছাই পাস সবাই খাই কি করে কে জানে?
কি বিশ্রি গন্ধ্য আর দম বন্ধ করা ধোয়া।

তবুও চোখ কান বন্ধ করে টান দিতে লাগলাম। কারণ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনেছি। তা নষ্ট হতে দেয় কি করে। একের পর এক করে টান দিচ্ছি আর খোলা আকাশের বুকে ছেড়ে দিচ্ছি। ধিরে ধিরে সূর্য টা রক্তাক্ত বর্ণ ধারণ করে নিস্তেজ হয়ে যেতে লাগলো পশ্চিমাকাশের বুকে।দিনের আলো শেষ হতে না হতেই পৃথিবীটাকে অন্ধ্যকারের আবছায়াতে মুড়িয়ে নিতে থাকলো।রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্ট গুলোতে হলুদ রংএর বাতিগুলো এক এক করে জ্বলতে শুরু করে দিছে। মুক্ত আকাশের বুকে উড়তে থাকা বিশৃঙ্খলা পাখিগুলাও শৃঙ্খলাব্ধ হয়ে ঝাঁকেঝাঁকে নীড়ে ফেরার পথে রওনা দিয়ে দিছে তার সাথে কর্মব্যস্ত মানুষ গুলোও।

কলরব থেকে বেশ খানিকটা দুরে আমি বসে আছি।এখানে সাধারণতো সন্ধ্যা নামার পর পরই মানুষের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাই।পাশে থাকা নাম না জানা ছোট ছোট ঝোঁপের আঁড়াল থেকে জোনাকি পোকার পাখা ঝাঁপাটানোর আওয়াজ কানে ভেঁসে আসছে।রাস্তার পাশের ডিম লাইট গুলোর থেকে জোনাকি পোকার আলো গুলো দেখার ভিতরে একধরনের ভালো লাগা কাজ করে।টিপটিপ করে জ্বলে আবার নিভে যাই।ব্যস্ত শহরের মাঝে খুব একটা জোনাকি পোকা দেখা যাই না।
দেখা যাই না বললে ভুল হবে,হরেক রকমের আলোকসজ্জার মাঝে জোনাকির নিভো নিভো আলো গুলো প্রস্ফুটিত হতে পারে না।টি শার্ট পরে আছি,তাই একটু শীত ও লাগছে।আর এমন মনোরম পরিবেশ গুলোতে ঠান্ডার প্রকোপটা একটু বেশিই হয়ে থাকে।
রাত গভির হওয়ার সাথে সাথে আমিও হাটা শুরু করে দিলাম। উদ্দ্যেশ্য ওভারব্রীজ।
যেখান থেকে লাফ দিয়ে এই অভিশপ্ত জীবনের ইতি টেনে দিবো।

বেপরোয়া ভাবে রাস্তার একপাশ দিয়ে হেটে চলেছি,কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ করার সময় নেই। যে যার মত করে উদ্দ্যেশ্য সাধনের লক্ষে ছুটে চলেছে। হঠাৎ করে একটা মেয়েকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।ব্রেকআপের আগে অবন্তিকার বলা কথার ভিতরে একটা কথা হঠাৎ করেই মনে চাড়া দিয়ে উঠলো।

মেয়েটা রাস্তার ওপাশে দাড়িয়ে আছে,নীল রংএর একটা জামা পরে আছে।।
মেয়েটির চোখেমুখে বিষন্যতার ছাপ ছড়িয়ে আছে। হাত দিয়ে ধরে থাকা এক টুকরো কাগজটাকে হাতের সাথে পেচিয়ে ধরে বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। হয়তো কোনো খরিদ্দারের ঠিকানা হবে।
শুনেছি রাতের আধাঁরে মেয়েরা টাকার জন্য এভাবে দাড়িয়ে থাকে।
কিন্তু এই মেয়েটাকে তো একটু অন্যরকম দেখাচ্ছে। রাতের পরীরা তো অনেক সাঁজগোজ করে দাড়িয়ে থাকে,যাতে পথযাত্রীরা তাদের দেখে আকর্ষীত হয়।
কিন্তু এই মেয়েটা তো স্বাভাবিক পোষাকেই দাড়িয়ে আছে। চোখগুলোও অশ্রুশিক্ত আর ফোলাফোলা।সে যাই হোক কর্মসাধনের জন্য,রাস্তা পার হয়ে ওপাশের মেয়েটার কাছে গিয়ে আসতে করে বললাম,
—কত টাকা লাগবে। পাঁচশত টাকার এক টাকা বেশি হলে দিতে পারবো না।কারণ আমার কাছ পাঁচশত টাকায় আছে।
মেয়েটা আমার কথা শুনে কিছুটা বিরক্ত নিয়ে বললো..
—কিসের টাকা?
—আরে একরাতের জন্য কত টাকা লাগবে বলেন?

‘কিছু বোঝার আগেই মেয়েটা ঠাস করে আমার গালে তার হাতের পাঁচটা আঙ্গুল বসিয়ে দিয়ে রাগান্বিত কণ্ঠে বললো..
—বেয়াদপ কোথাকার।রাস্তার মাঝে একাকি কাউকে দেখলেই খারাপ চিন্তা পোষণ করে নিতে মন চাই,তাই

‘মেয়েটার চড় খাওয়াতে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম..
—আপনি আমাকে চড় মারলেন কেন? বললেই তো হয় যে এর থেকে বেশি টাকা লাগবে।
—আমাকে দেখে কি ওদের মত লাগছে আপনার।
—রাতের আঁধারে তো সবাইকে একরকম লাগে। আর যারা এসব লাইনে কাজ করে তাদের তো কারো শরিরে লেখা থাকে না।যে আমি দেহব্যবসা করে খাই।
—আর একটা বাঁজে কথা বললে পুলিশ ডাকবো বলে দিলাম।
—এই আপনাদের সমস্যা কোথায় বলেন তো?কিছু হলেই খালি পুলিশ পুলিশ করেন।
পুলিশ কি শুধু আপনাদের জন্য নাকি?টাকা নিবেন কাজ করবেন। আমারই ভুল হয়ছে নিজ থেকে এসে অফার করাটা।
—আল্লার ওয়াস্তে আপনি চুপ করবেন।
বললাম তো আমি ওসব মেয়েদের মত না।
—আচ্ছা বুঝলাম আপনি ওসব মেয়েদের মত না।তাহলে এতো রাতে একাকি এভাবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?আর হাতে ওটা কি?

মেয়েটা পূর্বের মত রাস্তার ওপারে দৃষ্টিগোচর দিয়ে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে।
আমার কথার উত্তর দেওয়ার হয়তো প্রয়োজনবোধ করছে না এই মুহূর্তে।কিন্তু আমি আমার উত্তর নিয়েই তারপর যাবো এখান থেকে।তাই আবারো জিজ্ঞাসা করলাম।”—কি হলো বললেন না,এতো রাতে এখানে কি করছেন?

আমার কথা শুনে মেয়েটা এবার কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলতে লাগলো।

—ঐ যে হাসপাতালটা(ডান হাত তুলে ইশারা করে) ওখানে আমার বাবা ২১১ নং বেডে শুয়ে আছেন।
ডা. বলেছেন জরুরি ভিত্তিতে তার ও- নেগেটিভ রক্তের দরকার।
তাদের ব্লাড ব্যাংকে যা রক্ত ছিলো সব শেষ।লিষ্টে থাকা রক্তদাতারাও এইমুহূর্তে রক্ত দিতে চাইছেন না।
ডা. বলেছে এক ব্যাগ রক্ত খুবই আর্জেন্ট লাগবে তা না হলে আমার বাবাকে বাঁচানো যাবে না।এদিকে আমার পরিচিতো কেউ নেই যাকে ফোন দিয়ে রক্ত জোগাড় করার কথা বলবো।এতো রাতে কিভাবে কি করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।

কথা গুলো বলেই মেয়েটি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলো বাচ্চাদের মত।
কি করবো আমিও বুঝে উঠতে পারছিলাম না।আমাকেও তো আবার মরতে হবে একটু পর।আর মরার আগে এমন অসহায় একটা মেয়েকে এভাবে বিপদের মুখে ফেলে রেখে যাই কি করে।—আচ্ছা আপনার বাবার রক্তের গ্রুপ কি যেন বললেন?
—ও- নেগেটিভ।
—আমারো ও- নেগেটিভ।আপনি চাইলে আমারটা নিতে পারেন।

‘এভাবে নিজের রক্ত দেওয়ার উৎসাহ দেখে মেয়েটি আমার দিকে তাকালো।
আমি কিছুটা থতমত খেয়ে বললাম।
—দেখুন আমার কিন্তু কোনো বাজে অভ্যাস নেই,খুবই ভালো পরিবারের ছেলে আমি।আপনি চাইলে রক্ত নেওয়ার আগে পরিক্ষা করে নিতে পারেন।আর তারপর আমার শরির থেকে রক্ত নিতে পারেন।রক্ত পাচ্ছেন না বিধায় বললাম।না নিলে কিছু করার নেই।

‘মেয়েটি আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে হাসপাতালের দিকে হাঁটা শুরু করে দিলো।
মেয়েটি আমার আগে আর আমি তার পিছে পিছে হাঁটছি।হাসপাতাল নামক এই জায়গাটা বড় অদ্ভুৎ লাগে আমার কাছে।
মেডিসিনের ঘ্রাণটা একবারেই সহ্য হয় না।তারউপরে তো অসুস্থ মানুষগুলোর হাজার রকমের সমস্যা আছেই।সবমিলিয়ে একরকম অসস্থিকর ব্যাপার মনে হয়।

হাসপাতালে ভিতরে ঢুকে সিড়ি বেয়ে ২য় তলাতে উঠছি আর মনে মনে ভাবছি,এখানকার মানুষ গুলো কি ঘুমাই না নাকি।
পুরো শহরটা যখন ঘুমের রাজ্যে বিভর তখনো এখানকার মানুষ গুলো বেঁচে থাকার একখন্ড আশ্বাস নিয়ে লড়ায় করে চলেছে প্রতিনিয়ত।বেঁচে থেকে কি হবে এতো।স্বার্থপর দুনিয়াতে তো সবাই স্বার্থের খোঁজে ঘুরে।তার থেকে মরে যাওয়া ঢের ভালো।

যাই হোক মেয়েটি আমাকে নিয়ে গিয়ে রিসিপশন রুমের একটা নার্সকে বললো..
—রক্তদাতা পাওয়া গেছে,প্লীজ আমার বাবাকে বাঁচান।
মেয়েটার কথা শুনে রিসিপশন রুমে থাকা নার্সটা একটা নার্সকে ফোন করে ডেকে পাঠালো।নার্স ছুটে এসে আমাকে নিয়ে গিয়ে একটা বেডে সুয়ায়ে তারপর হাতে সুই ঢুকায়ে রক্ত নিতে শুরু করে দিলো।সবকিছুই যেন আমার অনিচ্ছাতেই হচ্ছিলো।কারণ আমার তো এতক্ষণে মরে যাওয়ার কথা,ওভারব্রীজের উপর থেকে ঝাঁপ দিয়ে।
কিন্তু আমি তা না করে একজন অপরিচিতো মেয়ের কথাতে এখানে এসে সুয়ে থেকে রক্ত দিচ্ছি।
যাই হোক মরেই তো যাবো তার আগে যদি আমার দ্ধারা কোনো একজন অসহায় মেয়ে উপকৃত হয় তাহলে ক্ষতির কি।তাও তো মরার আগে একটা মানুষের হৃদয়ে সামান্যতম জায়গা করে নিয়ে যাবো।
কেউ একজন হয়তো একটা মিনিটের জন্য হলেও আমার এই মহান কাজটার কথা ভাববে।চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ যাবৎ শুয়ে থাকার পর নার্স এসে আমার হাতে লাগানো সিরিঞ্জটা বার করে নিয়ে বললো..
—রক্ত নেওয়া শেষ,আপনি কিছুক্ষণ রেষ্ট করুন।তারপর উঠবেন।

‘জীবনে ১ম বারের মত কাউকে নিজের শরির থেকে রক্ত দিলাম।ভার্সিটিতে পড়তে অনেককেই রক্ত দিয়েছি।তবে এবারের রক্ত দেওয়ার ভিতরে একধরনের অজানা ভালো লাগা কাজ করছে।সুয়ে থেকে সিলিং ফ্যানের সাথে বাঁধানো চারটা পাখাওয়ালা ফ্যানের ঘুরা ঘুরি দেখছি।
এসব আসবাবপত্র বা যন্ত্রপাতি গুলোও অনেকটা আমার মতই।দরকারে ছাড়া কেউ সামান্যতম খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।
আচ্ছা যেখানে মানুষের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ্য করা হয় সেই সব জায়গা গুলো এতো নোংরা থাকে কেন?এখানে আসলে তো সুস্থ্য মানুষও অসুস্থ্য হয়ে যাবে।
মনে হচ্ছে ডাস্টবিনের একপাশে সুয়ে আছি।এর থেকে প্রাইভেট হাসপাতাল গুলো অনেক পরিচ্ছন্ন্য থাকে।

হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত একটা বাজে।নাহ্ এখানে আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।
এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে,তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইলাম।
কিন্তু শরিরটা একবারে উঠতে নারাজ।
জোর খাটিয়ে উঠতে গিয়ে মাথাটা বনবন করে চক্রর দিয়ে উঠলো।
এমনিতেই বিকেলের পর থেকে সিগারেটের ধোয়া ছাড়া পেটের ভিতরে তেমন কিছু ঢুকে নি।তাই পেটটা ক্ষুধার জ্বালাতে একবারে কাতর হয়ে পড়েছে তার উপর আবার রক্ত দিলাম।
সব মিলিয়ে শরিরে উঠে দাড়ানোর মতো সামান্যতম এনার্জি আমার ভিতরে অবশিষ্ট নেই।
মাথার নিচে থাকা বালিশ টা তুলে পিঠে হেলান দিয়ে বসলাম।

একটু পর নার্স এসে কয়েকটা আপেল আর কমলা লেবু দিয়ে গেলো।
সেগুলো বসে বসে খাচ্ছি চোখ বুজে আর ভাবছি।
দুনিয়াটা বড়ই অদ্ভুত,এখানে কেউ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত লড়ায় করে যাচ্ছে,আবার কেউ জীবনযুদ্ধে হার মেনে নিয়ে নিজের অভিশপ্ত জীবনটাকে শেষ করে দিতে চাইছে।
জীবন শেষ করার কথা মনে হতেই হঠাৎ করে মনে হলো,আমাকেও তো মরতে হবে।
তাড়াতাড়ি এখান থেকে বার হতে হবে।
‘শার্টটা পরে তাড়াতাড়ি করে উঠতে যাবো।এমন সময় কারো পায়ের শব্দ শুনে দরজার দিকে তাকালাম।,দেখি মেয়েটা এসেছে।মেয়েটার মুখটা এখন আগের থেকে অনেকটাই স্বাভাবিক।তবুও হতাশার ছাপ যেন তাকে ছাড়তেই চাইছে না। মায়াভরা মুখটা হতাশার জালে বন্দি করে নিয়েছে।
মেয়েটা হয়তো ঠিকঠাক মত রাতে ঘুমাতে পারে না।যার কারণে তার কাজল কালো চোখ গুলোর নিচে কালো বর্ণের রেখা ছেয়ে গেছে। মলিন মুখে একটুকরো হাসি ফুটিয়ে আমাকে বললো।”—ধন্যবাদ এবং দুঃখিত। আমি একসাথে দুটো বলার কারণ জানতে চাইলে মেয়েটি আবারো একটু হেসে উত্তর দিলো।
“—আমার বাবাকে রক্ত দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।আর আপনাকে তখন থাপ্পড় দেওয়ার জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।

বসে থাকা অবস্থাতেই ভ্যাবলার মত হেসে বললাম।
—”ইটস ওকে।আপনার জায়গাতে অন্য কেউ থাকলেও হয়তো ওটাই করতো। বাই দ্যা ওয়ে আপনার বাবা কেমন আছেন এখন?”

—”জ্বি এখন মোটামোটি সুস্থ্য।তবে কতক্ষণ থাকবে তা বলতে পারছি না।

কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।

—”কেন?

মেয়েটা আবারো মন খারাপ করে জবাব দিলো।

—”আমার বাবার লিউকেমিয়া হয়ছে।তাই প্রতিমাসে রক্ত দিতে হয়। রক্তের জোরে বাবা এখনো বেঁচে আছেন। তবে ডা. বলেছেন এভাবে বেশিদিন বাঁচানো যাবে না।কারণ যখন নতুন ব্লাড গুলো শরিরে আর নিবে না তখনই বাবা মারা যাবে।

‘কথাগুলো বলেই মেয়েটি আবারো কেঁদে ফেললো।কি করবো একেই তো অপরিচিতো তারউপরে আবার মেয়ে মানুষ।
বেডে বসে থাকা অবস্থাতেই মেয়েটাকে শান্তনা দেওয়ার জন্য বললাম..

—”দেখুন মানুষ তো সারাজীবন বাঁচে না।আপনার বাবার যতদিন আয়ু আছে ঠিক ততোদিন সে বাঁচবে।তারপর হাজার চেষ্টা করলেও তো আর বাঁচাতে পারবেন না। তবুও যে কইটা দিন আছে সে কইটা দিন তো চেষ্টা করা যেতেই পারে। আর রক্ত নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই। আমিই আপনার বাবাকে প্রতিমাসে রক্ত দিবো। মেয়েটা আমার কথা উপর বিশ্বাস রেখে কান্না থামিয়ে বললো..

—”আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

—”আচ্ছা হাসপাতালে কি আপনি একাই এসেছেন?মানে আমি এসে থেকে আর কাউকে দেখছি না তো তাই জিজ্ঞাসা করলাম।

—”মা বছর কয়েক আগে মারা গেছে,আর এখন আমার পৃথিবী বলতে একমাত্র বাবা ছাড়া আর কেউ নেই।

‘মেয়েটার কথা শুনে নিজেরই খুব খারাপ লাগছে।যদি এনিচান্স মেয়েটার বাবার কিছু হয়ে যাই তাহলে তো মেয়েটাকে দেখার মত আর কেউই থাকবে না।একেই তো মেয়ে মানুষ তারউপরে আবার মাথার উপরে কেউ নেই।

—”দুঃখিত,আপনাকে না জেনে কষ্ট দেওয়ার জন্য।

—”না ইটস ওকে।আচ্ছা এতক্ষণ ধরে আপনি এখানে আছেন।আমার এতবড় উপকার করলেন।এখনো অবধি তো আপনার নামটাই জানা হলো না।

—”আমি রাজ।

—”আমি রিদিতা।আপনি কি এখানে থাকেন?মানে ঢাকার স্থানীয় ।

—”নাহ্ আমার দেশের বাড়ি ফুলপুর। ঢাকাতে চাকুরির জন্য এসেছিলাম।বেশ কিছুদিন করার পর চাকুরিটা আর থাকে নি। তাই এখন ভবঘুরি হয়ে রাস্তাতে রাস্তাতে ঘুরছি।

—”আপনি এখন কোনো চাকুরি করেন না।

‘একটা হতাশা ভরা নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম..

—”নাহ্।এই স্বার্থপরের শহরে সবাই নিজ নিজ স্বার্থ ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না। অন্যের টা ভাবার সময়ই নাই কারোর। অনেক কইজায়গাতে চেষ্টা করেছি কিন্তু বর্তমানে তো আর যোগ্যতা দিয়ে চাকুরি হয় না।হয় মামা খালুর বাহুর বল দিয়ে, যার কোনোটাই আমার নেই। ভরসা করার মত একজন ছিলো সে ও আজকে ছেড়ে চলে গেছে।

মেয়েটা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো।

—কে? গ্রালফ্রেন্ড নাকি?
কিছু মনে করবেন না।ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেললাম।

—হ্যাঁ। তার নাম অবন্তিকা।চাকুরিটা হারানোর পর সে আমাকে অনেক হেল্প করেছে।কিন্তু এই শহরে তো চাকুরি পাওয়া অনেকটা সোনার হরিণ পাওয়ার মত।
তাই অনেক খুঁজেও চাকুরি মেলাতে পারি না।
আমাদের সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ না দেখতে পেয়ে সে ও আমাকে আজকে ছেড়ে চলে গেছে।
তারই বা দোষ দিয়ে কি করবো।
কোনো মেয়েই তো চাই না একটা বেকার ছেলেকে নিয়ে গিয়ে তার পরিবারের সামনে দাড়াতে।

‘রিদিতা আমার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছে।তার মনে এখন বিন্দুমাত্র ভয়ের আশংকা নেই।হয়তো আমার বলা মিথ্যা আশ্বাসে উপর ভরসা করে নিয়েছে। নিজের উপরেই এখন খুব রাগ হচ্ছে।কেন যে আগবাড়িয়ে হুটহাট বলে দেয়।এখান থেকে তো বার হয়ে আমি আত্মহত্যা করবো।কিন্তু আমি মারা গেলে মেয়েটির কি হবে।সে যে ক্ষণিকের ভিতরে বড্ড বিশ্বাস করে নিয়েছে আমাকে। না তার বিশ্বাসটাকে কিছুতেই নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম,বিশ্বাস ভাঙ্গার কষ্টটা ঠিক কতটা বেদনাদায়ক আর নিষ্ঠুর হয়।তা আমি অবন্তিকাকে হারিয়ে বুঝেছি।তাই এই বিশ্বাস ভাঙ্গার কাজটা করে একটা অসহায় মেয়েকে আর বিপদে ফেলতে চাই না।এখন শরিরে বেশ শক্তি এসে গেছে।নিজের পেশি শক্তি গুলোকে কাজে লাগিয়ে দিব্যি বাড়ি পর্যন্ত হেঁটে চলে যেতে পারবো। রিদিতাকে তার বাবার খেয়াল রাখতে বলে,জামার বোতাম গুলো লাগাতে লাগাতে বার হয়ে আসলাম। পিছন ফিরে আবারো একবার তাকালাম রিদিতার দিকে।মেয়েটা গোড়াগোড়ির মত এবারো তার মলীনমুখে শুকনো ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ধরে রেখেছে। হয়তোবা খুব কষ্ট করেই ধরে রেখেছে। আসলে মেয়েদের ভিতরে উপরওয়ালা একটা বিশেষ ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।আর সেই ক্ষমতার জোরেই তারা কান্নাকে আঁড়াল করে হাসে আবার মিথ্যের অভিনয়ে অন্যকে বেশ নির্বিধায় ঠকিয়ে দিতে পারে। যাই হোক হাটার গতি বাড়িয়ে দিয়ে রাস্তাতে চলে আসলাম।

মনের ভিতরে দুটো প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা, “আমি কি, আত্মহত্যা করবো”? দুই,’মেয়েটাকে এভাবে ছেড়ে মরা কি ঠিক হবে”? তাহলে তো মেয়েটার বিশ্বাসকে ভেঙ্গে ফেলা হবে।
তারপর হয়তো আর কোনো ছেলেকেই সে বিশ্বাস করতে পারবে না।

পুরো শহরটা এখন ঘুমের রাজ্যে বিভর। সবাই সারাদিনের ক্লান্তি অবশানের জন্য নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। যাকে বলে নিশিরাত।এমন সময় নাকি ভূ্ত-প্রেতে ধরার আশংকা বেশি থাকে।কিন্তু আমি ওসবে পরোয়া করি না। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম বিকেলে কেনা সিগারেটের প্যাকেটটা এখনো রয়ে গেছে। খুলে দেখতেই একটা সিগারেট পেলাম। মুখে লাগিয়ে মনের আরামে টান দিচ্ছি আর হাঁটছি।পিছন পিছন আমার একাকিত্বের সঙ্গি হয়ে একটা কুকুর হেটে আসছে।

সাধারণত এসব কুকুর গুলো একটু খেয়োখেয়ি স্বভাবের হয়।কিন্তু আমি তাকে বসে নিয়ে নিছি।কুকুরের সামনে গিয়ে সাহস দেখিয়ে হেঁটে গেলে তারা নত হয়ে যাই।কিন্তু দু’এক বার ঘেউঘেউ করাতে যদি ভয়ে দৌড় দেওয়া যাই,তখন সুবিধা বুঝে তার পিছনে ছুটতে থাকে। সিগারেটে লম্বা টান দিচ্ছি আর এক ধরনের মাতালের মত করেই হাঁটছি।কারণ এতো রাতে এই রাস্তাতে সাধারণত কোনো যানবাহন চলাচল করে না। তাই নিজেকে শাহেনশাহ ভেবে কলার খাড়া করেই হাটছি। এমনসময় প্রকান্ড শব্দ করে হর্ণ বাঁজাতে বাঁজাতে সামনে একটা গাড়ি এসে থামলো।গাড়ির সামনের দিকে মাথার উপর জ্বলতে থাকা ডিপ লাইট গুলোকে ছুটোছুটি করতে দেখে বুঝতে বাকি রইলো না।”এটা পুলিশের গাড়ি। সম্ভবত মাতাল বা নেশাখোর ভেবে দাড়িয়েছে। নইতো বা চোর ভেবে।পুলিশ গুলোও না বড্ড চতুর।এরা দুর্বল শ্রেণীর কাউকে পেলে সেদিন তার থেকে শুষে নিতে সামান্যতম কার্পন্যবোধ করে না। গাড়ি থেকে মস্ত বড় একটা ভুড়ি সাথে করে দারোগা নামলো। অন্ধ্যকারে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না কিন্তু তাঁর ড্রাম সমান ভুড়িটা দেখে বুঝে নিলাম দারোগায় হবে।

হুংকার দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো..

—”এই এখানে কি?কাছে কি আছে? এই শফিক ওরে সার্চ করো তো।

‘দারোগার অর্ডার পাওয়া মাত্রই পাশে থাকা একজন কনস্টেবল কাঁধ থেকে শুরু করে পা পর্যন্ত সার্চ করে নিলো।
সবশেষে একটা ম্যাচবক্স আর মানিব্যাগ ছাড়া কিছুই পেলো না। কনস্টেবল এর কাচুমাচু মুখটা দেখে বুঝলাম তার নসিবটা বড্ড খারাপ। মন খারাপ করে দারোগাকে বলল.

—স্যার এর কাছে কিছুই নেই।

‘দারোগা সাব তার পকেট থেকে একটা সাজানো পানের বাক্স বার করে পান চিবাতে চিবাতে কর্কশকণ্ঠে বললো..

—”এতো রাতে রাস্তাতে কি?বাড়ি কোই?

লোকমুখে শুনেছি পুলিশরা দুর্বলদের শত্রু আর বিত্তবানদের কাছে ভিজে বিড়াল। তাই আমিও চট করে একটু বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলে দিলাম।

—”আমার নাম রাজ,বিভিন্ন ব্লগে লেখালেখি করি।কয়েকটা পত্রিকার সাথে সংযুক্ত আছি। সাংবাদিক কথাটি বলাতে দেখলাম কিছুটা কাজ হলো। দারোগা সাবের কথার ভঙ্গিমা কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। দারোগা ফুচ করে পানির পিক ফেলে আবার প্রশ্ন করলেন।

—”তো এতো রাতে কোথায় গেছিলেন?

সাতপাঁচ না ভেবেই বলে দিলাম।

—”একটা প্রেস মিটিং ছিলো সেটা এটেন্ট করতে গিয়ে দেরি হয়ে গেছে।

‘কিন্তু আমি আমাকে যতটা চালাক ভেবেছিলাম পুলিশ তার থেকে একধাপ এগিয়ে।বেশিক্ষণ মিথ্যে বলে সামাল দিতে পারলাম না।ধরা পড়ে গেলাম শেষমেষ। পুলিশ মুহূর্তে তার কণ্ঠস্বরটাকে পাল্টিয়ে আবার হুংকার দিয়ে বললো…

—”পুলিশের সাথে মশকারি।বেটা,চল তোরে আইজকা থানায় নিয়ে গিয়ে জ্বামায় আদর দেখামু। বলেই তাদের সাথে থাকা গাড়িতে তুলে থানাতে রওনা দিলো।…

পরের পর্বে থানার কাহিনী বলবো,শুনতে হলে সাথেই থাকুন।
‘প্যা পু করতে করতে পুলিশের গাড়ি এসে থানার ভিতরে গিয়ে থামলো।দু’চোখে প্রচন্ড ঘুম,তাই গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ দুটি জুড়িয়ে এসেছে বুঝতেই পারি নি। পাশে থাকা কন্সটেবল এর ঝাড়ি মারার শব্দতে চোখ খুলে তাকালাম।

—”এই যে স্যার দয়া করে গাড়ি থেকে নামেন।

বেশিক্ষণ গাড়িতে থাকলে এই সম্নান টুকু আর পাবো না।তখন আপনি থেকে তুই বলে সোজা শার্টের কলার চেপে ধরে নামাবে। তাই তাড়াতাড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম।

পিছন থেকে অন্য একটা পুলিশ বলে উঠলো।

—ভিতরে চল,বড় স্যার তোকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

‘এ কোন মহাঝামেলার ভিতরে পড়লাম।সামান্য একটা ইস্যুকে টেনে টুনে এতদুর অবধি আনলো।আসলেই এদের কোনো কাজকাম নেই।আর সেই কারণে আমার মত নিরিহ মানুষগুলোদের ধরে এনে রামধোলাই করে।
যাই হোক,জীবনে বড় ধরনের একটা এডভেঞ্চার সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছি। স্বচক্ষে কখনো থানার ভিতরের নির্মম পরিবেশটা দেখা হয় নি।আজকে মনে হয় সেই সৌভাগ্যটা হবে।তাও আবার নিজেকে দিয়ে।
ভিতরে ঢুকতেই থানার বড় স্যার আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকালো।টেবিলের উপর বসে একটা ফাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিলো।সম্ভবত আনসলভ কেস হবে হয়তো।আমাকে দেখে ফাইলটা পাশে রেখে দিয়ে তাঁর কাছে ডাক দিলো।শান্ত হয়ে পা টিপে টিপে তার কাছে গিয়ে মাথা নিচু করে দাড়ালাম।
বড় স্যার আমাকে দেখে গম্ভীরস্বরে বলে উঠলো।

—”অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ,এসব বাদ দিয়ে সোজাসোজি বল।এই মধ্যরাতে তুই রাস্তাতে কি করছিলিস?

— “স্যার আকাশের তারা গুনছিলাম।একা একা তারা গুনেছেন কখনো।না গুনলে একদিন গুনে দেখবেন।সব চিন্তা একবারে অবশন নিবে।

আমার কথা শুনে স্যার চেয়ার টা ঝাকি দিয়ে রাগান্বিত ভাবে বলে উঠলো।

—”এইটা দেখেছিস।(লাঠি নাড়তে নাড়তে)এটাকে বলে যাদুছড়ি।পিঠে দুটো পড়লেই তরতর করে সব সত্যি বলে দিবি।

—”স্যার আপনার লোক তো আমাকে সার্চ করেছে,সন্দেকজনকভাবে তেমন কিছুই পাই নি।আর আমি নেশা-টেশা করি না।

—”তাহলে এতো রাতে রাস্তাতে কি করছিলিস?

— “আসলে একজনকে রক্ত দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম তখনি আপনার লোক তুলে নিয়ে এসেছে।

‘আমার কথা শুনে দারোগা সাব জোরগলাতে বলে উঠলো।

—”মহা ত্যাদড় ছেলে,স্যার।ইনিয়ে বিনিয়ে এমনভাবে মিথ্যে বলবে বুঝারই উপাই নেই। আমাদেরকেও মিথ্যে বলে টুপি পরাতে চেয়েছিলো কিন্তু পারে নি।

—”স্যার,আমি দারোগা সাবকে মিথ্যা বলেছিলাম যাতে ছেড়ে দেয়।কিন্তু এখন যা বলছি পুরোটাই সত্যি।আপনার বিশ্বাস না হলে জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ২১১ নং কেবিনে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। তাকেই রক্ত দিয়ে ফিরছিলাম। ওসি স্যার আমার কথা শুনে হাসপাতালে ফোন দিয়ে ব্যাপারটার সত্যতা যাচাই করে নিলেন।

তাঁর মুখ দেখে বুঝে নিলাম,কাজ হয়েছে।

— “এই ছেলেটা ঠিকি বলেছে।তাকে ছেড়ে দাও।

‘ইচ্ছে ছিলো থানাতে একরাতের জন্য হলেও থাকবো,কিন্তু ব্যার্থ হওয়ার কথা চিন্তা করে, ওসি স্যারের কথা শুনে তাড়াতাড়ি বললাম।

—”স্যার আমাকে আজকের রাতটা আপনাদের হাযতে রেখে দিন।আমার না অনেকদিনের সখ একটা রাত পুলিশের হাযতে থাকবো। আজকে যখন সেই সুযোগ পেলাম তখন আর হাত ছাড়া করতে চাই না।

—”না,তাই হই না।একজন নিরাপরাধ মানুষকে আমরা হাযতে ঢুকাতে পারবো না।এটা করলে আমাদের আইন ভঙ্গ করা হবে।

(কতটা যে আইন মেনে চলেন আপনারা ভালো করে জানা আছে।)
বিড়বিড়িয়ে।

— “প্লীজ স্যার।এই অধমের একটা ছোট্ট ইচ্ছা পূরন করেন।

দারোগা সাব আবার হুংকার দিয়ে বললো

.—”দেখছেন স্যার বলেছিলাম না এই ছেলে মহাত্যাদড়।সবাই জেল দেখে ভয় পাই আর সে তাঁর ভিতরে থাকতে চাইছে।

— “দেখেন স্যার তিন মাসের বাড়ি ভাড়া বকেয়া থাকার কারণে বাড়িওয়ালা তার বাড়ি থেকে বার করে দিছে। এমনিতেই রাতে থাকার জায়গা নেই,তারউপর আবার অনেক রাত,বাইরে ঠান্ডাটাও বেশ পড়েছে। প্লীজ স্যার একটারাতের জন্য আসামি ভেবে থাকতে দিন না।

বড় স্যার কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বললো।

—”আচ্ছা। ঠিক আছে,তবে হাযতের ভিতরে নই তোমাকে এই বেঞ্চে থাকতে দিতে পারি। তবে কাল ভোরে ভোরেই কিন্তু চলে যাবে এখান থেকে।

যাই হোক থানার ভিতরে তো থাকতে পারবো।তাই বাড়াবাড়ি না করে রাজি হয়ে গেলাম।ভাগ্যটা বেশ ভালোই বলা যেতে পারে।থানাতে এসে জ্বামায় আদর না পেলেও শুকনো একটা বিস্কুট আর এক কাপ চা মিললো।চা খেয়ে চুপটি করে বেঞ্চে বসে রইলাম।। থানার ভিতরটা ভালো করে দেখছি। বড় স্যারের পিছনে একটা বড় সাইনবোর্ড,সেখানে কয়েকজন মানুষের ছবি লাগানো আছে।সিনেমাতে দেখেছি যারা ভয়ংকর রকমের সন্ত্রাসী হয় তাদের ছবিগুলো পরিচয় সহ ছবি দিয়ে গাঁথানো হয়।

—”ইশ আমিও যদি ওদের মত হতে পারতাম।রোজ কত পুলিশ আমার পিছনে পাগলা কুত্তার মত দৌড়ে বেড়াতো।

‘ যাই হোক কালকে থানা থেকে বার হয়ে আরেকবার হাসপাতালে যেতে হবে। রিদিতার বাবা কেমন আছে দেখার জন্য।

সকাল হওয়ার সাথে সাথেই একজন পুলিশ এসে ঘুম থেকে ডেকে দিলো।

—এই উঠ,সকাল হয়ে গেছে।

ঘুমঘুম চোখে তাকিয়ে দেখলাম থানার ভিতরে বেঞ্চে সুয়ে আছি।
যাক তাহলে একটা রাতের জন্য হলেও তো থানার ভিতরে রাত কাটাতে পেরেছি।

থানা থেকে বের হয়ে আসলাম।নিজেকে কেমন জানি সন্ত্রাসী সন্ত্রাসী মনে হচ্ছে।কিন্তু ছিপছিপে শরির দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না। যাই হোক সকালের দিকেও শহুরের রাস্তা গুলো য্যাম। বেলা বাড়তে গাড়ির আর সকালে ভুঁড়িওয়ালা মানুষগুলোর। উফপপ কেন যে এরা এতো খাই।খেয়ে খেয়ে ভুড়িটা এমন বানিয়েছে দেখে মনে হচ্ছে এক একজন আস্তো ড্রাম পেটে বেঁধে দৌড়াচ্ছে।
পেটটা ক্ষুধাতে চো চো করছে,কাল দুপুরের পর থেকে পেটে ভাত পড়ে নি।শুকনা খাবার খেয়েই কাটিয়েছি। তাই ভাত খাওয়াটা আমার জন্য খুবই জরুরি। রাস্তার পাশে থাকা হোটেলে ঢুকে বললাম।

— “মামা এক প্লেট ভাত দিন তো।

আমার কথা শুনে হোটেলের লোক চোখগুলো বড় বড় করে তাকিয়ে বললো..

— “মামা এখন ভাত খাবেন।

— “হ্যাঁ,কেন?

—”না,আচ্ছা ঠিক আছে।

বলেই চলে গেলো ভাত আনতে। আমি হাত মুখ ধুয়ে চেয়ারে বসে আছি।আশপাশের সবাই দেখি গরম গরম পরোটা আর ডাউল খাচ্ছে। হয়তো লোকটার বড় বড় চোখ করে তাকানোর কারণ এটাই হতে পারে। যাই হোক,সকালে পেট ভরে ভাত খেয়ে নিলে সারাদিনটা চা-বিস্কুট দিয়ে সেরে ফেলতে পারবো।

ওয়েটার একপ্লেট ভাতের সাথে আলু ভর্তা আর সবজি নিয়ে এসে দিয়ে গেলো। এদিক ওদিক না তাকিয়ে খেতে লাগলাম।প্রচন্ড ক্ষুধা লেগেছে,এক প্লেটে কিচ্ছু হবে না।তাই আরো এক প্লেট আনতে বললাম। খাবার শেষে হোটেল মালিককে বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম। আহ্ পেট ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা।

একবার ভাবলাম অবন্তিকাকে ফোন দেয়,কিন্তু নংটা গোড়াগোড়ির মতই বন্ধ দেখাচ্ছে।
হয়তো যোগাযোগ করবো ভেবে সিমটাই চেঞ্জ করে ফেলেছে।
থাক আর বিরক্ত করবো না তাকে। সে তার নতুন জীবনে সুখে থাকুক।

এখন একটা বার হাসপাতালে যাওয়া দরকার।
তাই রাস্তার ধারে দাড়িয়ে বাস গুলো দেখতে লাগলাম।
সকালের বাস গুলোর চেহারা অনেকটা আমার মত,রুচিতে বাঁধে।
নেহাত টাকা কম লাগে তাই গরিব আর মধ্যবিত্তরা এই বাস গুলোতে চলাচল করে।।
তা না হলে এগুলো কবেই ভাঙ্গা দরে বিক্রি হয়ে যেতো। সাতপাঁচ না ভেবে বাসে উঠে গেলাম।হাসপাতালে যেতে হবে।রিদিতার বাবাকে একপলক দেখতে খুব ইচ্ছে করছে।কারন গতকাল রাতে তাড়াহুড়োর কারণে দেখা হয় নি।

‘ ঢাকা সেনানিবাসের কাছে যেতেই বাস হতে নেমে পড়লাম।কারণ এখানেই রিদিতার বাবা আছে। কাঁচ দিয়ে ঘেরা বেশ দৃষ্টিনন্দন ভবন।রাতের আঁধারে তেমন ভাবে হাসপাতালটিকে দেখা হয় নি।এখানে রাত-দিন সবই সমান।প্রতিনিয়ত হাজার হাজার অসুস্থ্য মানুষে আগমনের কারণে একটা গমগম ব্যাপার কাজ করে সবসময়।
কিন্তু এতো রুম আর মানুষের ভিতরে রিদিতাকে খুঁজে পাবো কি করে।তাকে তো একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে। গতকাল রাতে তাদের জন্যই আমাকে পুলিশ মামারা ছেড়ে দিছে।নইতো জ্বামায় আদরের নামে শরিরে হাড় গুলো এক এক করে ভাঙ্গতো।

নিচে থাকা রিসিপশন রুমে গিয়ে দেখলাম একটা মেয়ে বসে আছে।মেয়েটা অনেকটাই অবন্তিকার মত দেখতে।

“ধুর রিসিপশন রুমের দায়িত্ব মেয়েদের কেই কেনো দিতে হবে।রিদিতার খোঁজ না নিয়ে একরকমের বিরক্তিভাব নিয়ে চুপ চাপ দাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।
ঝমঝলে রোদ খেলা করছে,সাথে মৃদু বাতাস।বাইরে থাকা হাসপাতালে প্রাঙ্গণে হেঁটে বেড়াচ্ছে অনেক রোগি। হাসপাতালে আমি তেমনভাবে কখনো যাই না।কারণ এখানকার মেডিসিন আর রোগিদের একটা গন্ধ্য আমার দম বন্ধ করে দেয়।কিন্তু আজকে তেমন কিছুই মনে হচ্ছে না।বাইরে ঘুরতে থাকা প্রতিটা মানুষের বেঁচে থাকার লড়ায়ে জয়ী হওয়ার আনন্দ দেখে অবাক হচ্ছি।
আসলেই তো,জীবন তো একটায়।আর এই জীবনটাকে ছোট্ট একটা ভুলের কারণে নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।একটা জীবনের যে কতটা মূল্য সেটা হয়তো এখানে না আসলে কখনো বুঝতেই পারতাম না।জানালার গ্রীল ধরে দাড়িয়ে থেকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণের বাহিরটাকে দেখছিলাম এমন সময় একটা মেয়েলি কণ্ঠস্বরে পিছন ফিরে তাকালাম। দেখি গতকাল রাতে দেখা হওয়া মেয়েটি(রিদিতা)দাঁড়িয়ে আছে।হাতে একটা কাগজের প্যাকেট।আমাকে দেখে গতকালকের মত করেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করলো।

—”আপনি এখানে..! আপনার কি কেউ এখানে ভর্তি আছে নাকি?

রিদিতার জবাব টা দেওয়ার জন্য অপ্রস্তুত ছিলাম তাই আমতা আমতা করে উত্তর দিলাম।

—”না কেউ নেই,হাসপাতালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আপনার বাবার সাথে একটু দেখা করে যাই।আসলে গতকালকে তো দেখা হয় নি।

— “ওহ্ খুব ভালো করেছেন,বাবাও আপনাকে বার বার দেখতে চাইছিলো।ভাবছিলাম ফোন দিবো,কিন্তু নং তো নাই।তাই দিতে পারি নি।

রিদিতার কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

—”কেন?

— “গতকালকে তো রক্ত পাচ্ছিলাম না,আর আপনি স্বইচ্ছাতে এসে রক্ত দিলেন তাই।

আচ্ছা চলুন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি।

‘ রিদিতার কথা মত জানালার গ্রীল ছেড়ে হাটা শুরু করলাম।কি বলবো কিছুই বুঝছিলাম না,তাই হাতে থাকা প্যাকেটটার কথা জানতে চাইলাম।

—”আপনি কি কোথাও গেছিলেন?

— “হ্যাঁ,বাবার জন্য ঔষুধ আনতে গেছিলাম। আপনি এতো সকালে কোথায় গেছিলেন।?

— “কোথাও না,সকালে হাঁটতে বার হয়েছিলাম।ভাবলাম একটুু দেখে যাই, তাই।”

— “আসছেন খুব ভালো করেছেন।আচ্ছা আপনার মোবাইল নং দেওয়া যাবে।মানে এখানে তো তেমন কেউ পরিচিতো নাই,তাই কোনো দরকার হলে আপনাকে ফোন দিতাম।”

— “আচ্ছা।আপনার ফোনটা দিন আমি তুলে দিচ্ছি।”

বলেই রিদিতার ফোন টা নিলাম।
রিদিতা আবারো বললো..

—”আপনি কি এখানেই থাকেন।”?

— “হ্যাঁ,পাশেই থাকি। দশ মিনিটের দুরুত্ব।” “ওহ্ তাহলে তো ভালোই হলো।দরকার হলে খুব তাড়াতাড়ি আপনাকে পেয়ে যাবো।”

‘ রিদাতার সাথে কথা বলতে বলতে কেবিনে পৌঁছে গেলাম। দেখি রিদিতার বাবা সুয়ে আছেন। প্রতিনিয়ত রক্ত দেওয়ার কারণে শরিরে হাড্ডি ছাড়া আর কিছুই নেই। রিদিতার হাতে থাকা কাগজের প্যাকেট থেকে ঔষুধ বার করতে করতে বললো।

—”বাবা ইনিই গতকাল তোমাকে রক্ত দিয়েছিলো।”

রিদিতার কথা শুনে তার বাবা আমার দিকে তাকিয়ে হাত ইশারা করে ডাক দিলো।আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। হয়তো কিছু বলতে চাইছিলো কিন্তু পারলো না।দুর্বলতা তাকে এতটাই গ্রাস করে নিয়েছে যে মুখ থেকে কথা বার হতেও খুব কষ্ট হচ্ছে তার। ব্যাপার টা বুঝে আমি আংকেলকে চুপ করে থাকার জন্য বললাম।কিন্তু আংকেল তার যথাসাধ্য শক্তি দিয়ে দু -একটা লাইন বললো।
তারপর আর সম্ভব হলো না।

রিদিতা তাঁর বাবাকে ঔষুধ খাওয়ায়ে চুপটি করে বসে মাথাতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। ব্যাপারটা এমন,যে ‘মা তার অবাধ্য ছোট্ট খোকাকে আদর করে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।
মুহূর্তেই আংকেল ঘুমের রাজ্যে বিচরণ করলেন। রিদিতা বসে বসে কি যেন ভাবছে,মায়াভরা মুখটা একরাশ বিষন্যতার ছায়াতে ঘিরে ধরেছে।চুপ করে দাড়িয়ে ছিলাম,ভিষণ বিরক্তি লাগছিলো। কারণ চুপ করে থাকাটা আমার কাছে একরকম মানুষিক যন্ত্রনার মত লাগে। রিদিতাকে দেখে মনে হচ্ছে সে এখনো অবধি কিচ্ছু খাই নি।তাই কথা বলার একটা কারণ খুঁজে পেলাম।

—”আচ্ছা আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে এখনো অবধি না খেয়ে আছেন।হাসপাতালের পাশেই হোটেল আছে,চলুন খেয়ে আসি।”

রিদিতা আমার দিকে গম্ভিরতার দৃষ্টিতে তাকিয়ে চাপাকণ্ঠে উত্তর দিলো।

—”খেতে ইচ্ছে করছে না।”

— “ভাবলাম আপনার সাথে একসাথে খাবো,চলুন।আর আংকেল তো এখন ঘুমাচ্ছেন।দুপুরের আগে আর উঠবে বলে মনে হয় না।

রিদিতা হয়তো সংকোচ করছিলো,কিন্তু আমি তো জানি ক্ষুধার জ্বালা পৃথিবীর সব থেকে বড় জ্বালা।তাই একরকম জোর করেই রিদিতাকে নিয়ে গেলাম। ঘন্টা খানেক আগেই পেট ভরে দু’প্লেট ভাত খেয়েছি তবুও এখন রিদিতার জন্য আবার খেতে হবে,তা না হলে আবার মেয়েটা খাবে না।হোটেলে ঢুকে খাবারের অর্ডার দেওয়ার পর খাবার আসলেই রিদিতা বাচ্চাদের মত করে খাওয়া শুরু করে দিলো। আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি।শুধু আমিই না হোটেলে বসে থাকা সবার চোখ রিদিতার দিকে। কারণ রিদিতা এমন ভাবে তার সামনে থাকা খাবার গুলো খাচ্ছিলো,দেখে মনে হচ্ছে বহুদিন ধরে সে খাবারের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ করে নি। যাই হোক পেটে ক্ষুধা রেখে ভাব দেখানোটা আমিও মোটেও পছন্দ করি না। তাই রিদিতাকে সাপোর্ট দিলাম। পেট ভরে খেয়ে বিল পরিশোধ করে বার হয়ে আসলাম।

হোটেল থেকে বার হয়ে দেখলাম,রিদিতার গাল গুলো লজ্জাতে লাল হয়ে আছে।কারণ তখন সে এতটায় ক্ষুধার্থ ছিলো যে লজ্জার কথা মাথাতেই আসে নি তার। মাথা নিচু করে চুপি স্বরে বললো।

—”সরি,আসলে বাবার টেনশনে কইদিন ঠিক মত খাওয়ার সময় হয় নি তাই হঠাৎ সামনে পেয়ে ক্ষুধার পরিমানটা বেড়ে গেছিলো।

রিদিতার চেহারার মত কণ্ঠেও মিষ্টি আছে।খুব শান্ত আর গুছিয়ে কথা বলতে পারে মেয়েটা।রিদিতার দিকে তাকিয়ে কিছু না বলে সোজা হাঁটতে শুরু করে দিলাম হাসপাতালের দিকে।
কারণ,তার বাবাকে ছেড়ে থাকতে অস্বস্তি বোধ করছে মেয়েটা। রিদিতাকে হাসপাতালে রেখে চলে আসছিলাম;এমন সময় পিছন থেকে ডাক দিলো।

—”একটু শুনেন।”

‘ পিছন ফিরে তাকিয়ে বললাম।

—”হ্যাঁ,বলেন?

—”আপনাকে খুব ঝামেলাতে ফেলে দিয়েছি তাই না।?

—”কোই নাতো।”

—”এই যে আমাদের জন্য এসব করছেন।”

“আপনি আমার জন্য যা করেছেন,তার কাছে এগুলো অতি নগন্য।

—”মানে ! আমি আবার কি করেছি?”

“সেটা না হয় আরেকদিন বলবো।

— “আচ্ছা ঠিক আছে।

— “আচ্ছা আজকে কি আপনার বিকেলে একটু সময় হবে?

—”কেন?

—”ঐ যে আপনি আমার জন্য কি করেছেন,সেটা বলতাম।

—”ওহ্ আচ্ছা।হ্যা,হবে।

—”ok ধন্যবাদ,তাহলে বিকেলে দেখা হবে।

— “আচ্ছা ঠিক আছে।

আংকেলকে আবারো একবার দেখে রিদিতার থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। হাসপাতাল থেকে বার হয়ে গন্তব্য এক বন্ধুর বাসা।

নাম’রিফাত”।সেখানে গিয়ে কোনোরকম দুপুরটা কাটিয়ে দিবো।একাকি একটা ছোট্ট ফ্লাটে থাকে সে।রিফাতকে বলে কয়েকটা দিন ম্যানেজ করে তার ফ্লাটেই থাকবো,নতুন চাকুরি না হওয়া অবধি।।কারণ তার ফ্লাটটা হাসপাতাল থেকে একটু দুরে।জরুরি দরকারে রিদিতা ডাক দিলে খুব সহজেই চলে আসা যাবে। সাতপাঁচ না ভেবে হাটা শুরু করে দিলাম রিফাতের বাসার উদ্দ্যেশে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত