পথ শিশুদের বৈশাখ

পথ শিশুদের বৈশাখ

হোটেল থেকে কাজ শেষ করে ফিরলো রহিম। সাথে রাতের জন্য সামান্য কিছু খাবার। ছোট বোন নিশিকে নিয়ে খেতে বসেছে ঠিক তখনই নিশি বলল,

— বাই, কাইল তো পয়লা বৈশাখ। আমারে একখান নুতুন জামা কিইইন্না দিবা না ?

নিশির কথা কানে যেতেই শুকনো ভাতের দলা আটকে যায় রহিমের গলায়। নিশি তাড়াতাড়ি পানি এগিয়ে দেয়। রহিম পানি পান করে নিশির দিকে তাকায়। দেখে নিশি উত্তরের জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে।

— কি জামা কিনমু ক ? রহিমের মুখে এমন কথা শুনে নিশির চোখ-মুখে আনন্দ বয়ে যায়। মুচকি হেসে বলে,
— কাইল দেহামু নে তোমারে ।
— আইচ্ছা, তুই এখন ঘুম যা রাইত মেলা অইছে।

রহিমের কথা শুনেই নিশি চুপচাপ চটের বস্তাটার উপর শুয়ে পড়ে। আর রহিম চিন্তায় পরে যায় কি করবে এখন ? ছেঁড়া হাফ প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে আজকের কাজ করা সব টাকা বের করে। তারপর রাস্তার পাশের সোডিয়াম লাইটের নিচে বসে গুণতে শুরু করে, দুই পাঁচ তেরো বিশ, সব মিলিয়ে বিয়াল্লিশ টাকা রহিমের কাছে। হতাশ হয় রহিম।

ছয় বছরের ছোট্ট বোনটা তার কখনোই কোন কিছুর আবদার করে নি। আজ একটা জামা কিনে চেয়েছে সেটাও কি দিতে পারবেনা? ছোট্ট বোনটার দিকে তাকিয়ে দেখে সে ঘুমের দেশে চলে গেছে।উপায় না পেয়ে রহিম ছুটে যায় পথের দিকে। যে ভাবেই হোক কিছু টাকা জোগাড় যে করতেই হবে।বোনটার একটা আবদার যে পূরণ করতে হবে। রহিম দেখে এখনো কয়েক টা হোটেল খোলা আছে। ঢুকে যায় একটা হোটেলে। তারপর,

–বাই, আমারে একখান কাম দিবেন আইজ রাইতের জন্য?
— ঐ বেটা তুই ভিতরে কি করে ঢুকলি যা বের হ। রাগি কণ্ঠে হোটেল ম্যানেজার বলে।
— একখান কাম দেন না।
— কোন কাম নাই, যা ভাগ। বলেই তাড়িয়ে দেয়।

দিশেহারা রহিম কি করবে ভেবে পায়না। তার যে এখন অনেক টাকার প্রয়োজন। এখানে ওখানে ঘুড়ে ঘুড়ে অবশেষে একটা হোটেলে পানি টানার কাজটা পায় রহিম। এতেই ও খুব খুশি! অন্তত কিছু টাকা তো পাবে। ছোট্ট বোনটার জন্য একটা জামা যে কিনতেই হবে। খুশি মনে কাজ করে ও। ছোট্ট বালকটির চোখে নিদ্রা আসে না। শেষ রাত পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কাজ করে।তারপর থালাবাসন পরিষ্কার করে কাজ শেষ করে হোটেল ম্যানেজার রহিমের হাতে ২০ টাকার একটা নোট তুলে দেয়। রহিম হয়ত প্রাপ্তির থেকে একটু বেশিই আশা করেছিল। তবে বেশি কথা বললে যে বাকিটাও আর পাবেনা এটা ওর অজানা নয়। টাকাটা নিয়ে দৌড় লাগায়। রেল লাইনের কাছে গিয়ে দেখে ছোট্ট বোনটা এখনো সেভাবেই ঘুমাচ্ছে। আস্তে করে বোনটার পাশে শুয়ে পড়ে। চোখটা বুজে যায়। আস্তে আস্তে ঘুমের দেশে তলিয়ে যায় রহিম।

— বাই,ও বাই উঠ তাড়াতাড়ি। নিশির চেঁচামেচিতে ধরফড় করে উঠে বসে রহিম।

— কি হয়ছে তোর?
— বাই আমারে নুতুন জামা কিইন্না দিবা না?
— হ দিমু তো। তয় এহন তো সহাল, দোহান খুলতে মেলা দেরি আছে। তোর কাম নাই আইজ?
— খালাম্মা কইছে আইজ বাসায় থাকবো না তাই কামে যাওন লাগবো না।
— আইচ্ছা তুই থাক আমি আইতাছি।
— কই যাস বাই?
— কইলাম না আইতাছি। বলেই দৌড়ে চলে যায় রহিম।

রাস্তার পাশের চাপ কল থেকে হাতমুখ ধুয়ে কাজের খোঁজে চলে যায়। আজ পথে এই সাত সকালে এত্ত মানুষ দেখে খুব ভালো লাগে ওর। সবাই নতুন জামা পড়া। মুখে কি যেন লেখা। মাথায় ও টুপির মতো কি যেন। রহিম দেখে ওর বয়সি একটা ছেলে খুব সুন্দর একটা পান্জাবি পড়ে আছে। রহিম ভাবে,

— ইশশশশ!! এই জামা খান যদি কিনবার পারতাম!

ভাবতেই বুকের ভিতর ধক্ করে ওঠে ওর। ছোট্ট বোনটা তার জামার আবদার করেছে। ছোট্ট রহিম নিজের ইচ্ছাটাকে পিচঢালা রাস্তায় পিষে দিয়ে কাজ খুঁজতে চলে যায়। তবে ভাগ্যে আজ হয়ত কাজ নাই। কোথাও কাজ মেলেনা ওর। সকাল ১১ টা। হতাশ হয়ে বোনের কাছে ফেরে রহিম। দেখে, ছোট্ট বোনটা তার পথের পাণে চেয়ে আছে। ভাইকে দেখেই একদৌড়ে কাছে চলে আসে নিশি।

–বাই আমার জামা কিইইন্না দিবা না?
— হ, দিমু চল।

নিশি ভাইয়ের আঙুলটা শক্ত করে ধরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়।আর পথ দিয়ে যাওয়া ওর বয়সি ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের দিকে তাকিয়ে ভাবে,

— ইশশশশ আমারো যদি ওগোর মতো একখান জামা থাকতো? আজ পহেলা বৈশাখ। প্রায় সব দোকানই বন্ধ। তবে ফুটাপাতের কয়েকটা দোকান খোলা আছে। রহিম নিশিকে নিয়ে সেদিকে ছোটে।

— কুন জামাডা নিবি দেখ? নিশি জামার দিকে তাকায়। মনে ধরেনা কোনটাই। অপর দোকানে যায়। হঠাৎই চিৎকার করে ওঠে নিশি।

— বাই, ভাই ঐ লাল জামাটা আমার মেলা বালা লাগছে। রহিম তাকিয়ে দেখে মাথার উপরে একটা সুন্দর কারুকাজ করা লাল ফ্রক।

— বাই আমারে এইহান কিইন্না দিবা?
— চাচা ঐ লাল জামাডার দাম কত ?
— কুনডা ? (দোকানদার)
— ঐ যে উপুরের ডা। হাতের ইশারায় দেখায় নিশি। দোকানদার জামাটা নিচে নামায়।
— হ এইডা।
— এইডা খুব ভালা জামা। (দোকানদার)
–চাচা, দাম কত? জানতে চায় রহিম।
— এইডা একদাম তিনশো রাখা যাইবো। বুকটা ধক করে ওঠে রহিমের ! এহন এত ট্যেহা কই পাবো? মনে মনে ভাবে রহিম। অনেকক্ষণ ভেবে নিশিকে বলে,

— বইন, তুই এই দোহানডার পাশে বয় আমি আর কিছু ট্যেহা নিয়ে আইতাছি।
–আইচ্ছা বাই যাও।

রহিম একদৌড়ে সেখান থেকে চলে যায়। এতটাকা কই পাবে ভেবে পায়না। তবে কি ভিক্ষা করবো ?কেমন যেন লাগে। না খেয়ে থাকলেও কোনদিন হাত পাতেনি রহিম। তবে বোনটার এই একটা আবদার কি সে রাখতে পারবে না? নাহ্, বোনডার জন্য আমার আইজ হাত পাতাই লাগবো।নিজের কথা না ভেবে অবশেষে হাত পাতে রহিম।তবে মুখে কিছু বলতে পারেনা হয়ত লজ্জা অথবা আত্মসম্মানের জন্য। কারো দয়া হলে দিচ্ছে তবে বেশিরভাগই না। দুপুর গড়িয়ে গেছে।হাত পাতা আর সহ্য হয়না। ওদিকে বোনটাকে সেই সকালে বসিয়ে রেখে আসছে। দৌড়ে বোনের কাছে চলে যায় সে। গিয়ে দেখে ছোট্ট বোনটা তার হাটুর উপর মাথা রেখে অধীর আগ্রহে তার পথ পাণেই চেয়ে আছে। রহিম নিশির হাতটা ধরে দোকানটার সামনে আসে।

— চাচা ঐ জামাডা নামান তো।
— জামা কি নিবা? দোকানদার বলে।
— হ চাচা নিমু। দোকানদার জামা টা নামায়।
— দাম কত?

— একদাম তিন’শ ট্যেহা।
— কিছু কমান যায় না চাচা?
— কত দিবা তুমি কও।

রহিম ছেঁড়া হাফ প্যান্টের পকেট থেকে একমুঠ খুচরা টাকা বের করে তারপর রাস্তায় রেখে গুণতে শুরু করে।
দশ, পনের,তেইশ,চল্লিশ, সত্তর,এক’শো এভাবে একশ তের টাকা হয়। রহিম খুশি মনে দোকানদারকে বলে,

— চাচা একশ ট্যেহা দিবা এই জামাডা?
— এত কম দামে দেওন যাইবো না।বেশি হলে কও। রহিম কত বলবে ভেবে পায়না।
— চাচা একশ দশ ট্যেহা দিবেন? এর বেশি আমি আর পারুম না।
— ধুর বেটা। এত কম দাম অয় নাকি! আরো কও।
— আমার কাছে মোট একশ তের ট্যেহাই আছে।
— ভাগ বেটা। ট্যেহা নাই জামা কিনতে আইছে ফকিন্নি কোথাকার।
— চাচা দেন না জামাডা। আমার বইনডার মেলা পচন্দ অয়ছে জামাডা (।
— যা এহান থেইক্কা। ট্যেহা নাই আবার জামা কিনা লাগবো কে?
— চাচা আফনে এই ট্যেহাডা রাহেন। আমি পরে বাকিডা শোধ করে দেবোনি তবুও জামাডা দেন।
— ভাগ বলতেচি এহান থেইক্কা। বলেই দোকানদার তাড়া করে রহিমকে। ছোট্ট বোনটার হাত ধরে দৌড় দেয় সে।

— বাই আমারে জামাডা কিইইইনা দিবা না?
— হ বইন দিমু তো। তুই একদম মন খারাপ করিস নে আমি তরে জামাডা কিইইন্নাই দিমু।

ছোট্ট নিশি ভাইটার কথায় স্বস্তি পায়। ভাবে, ভাইটা ঠিক তারে ঐ লাল টুকটুকে জামাটা কিইন্না দিবো। তবে ছোট্ট রহিম জানে বাস্তবতা কি। তার বোনটার ছোট্ট একটা আবদার “লাল জামাটি” হয়ত আর কখনোই কেনা হবে না। অনেক চেষ্টা করেও রহিম পারলো না বোনটার ছোট্ট ইচ্ছাটি পূরণ করতে। ছোট্ট নিশিটার ছোট্ট ইচ্ছাটি অপূর্ণ ই থেকে গেল। ওদের গল্পটা শেষ হয়না।এ গল্পের শেষ ও হয়না। পথশিশুদের গল্পের শেষ কখনোই হয়না। কারণ, এরা এক একটা মহাকাব্য হয়। রহিম আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এই বার না পারলাম পরের বার বোনডারে ঐ জামাডা ঠিক কিইন্না দিবো।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত