রক্তাক্ত গোসল

রক্তাক্ত গোসল

মিতু যেভাবে গোসল করছে সেভাবে কোনো মেয়ে গোসল করে না। ভরা শীতকালে টাইলসের ঠাণ্ডা দেয়ালে হেলান দিয়ে এমন ঠাণ্ডা পানিতে কোনো মেয়েই গোসল করতে পারেনা। কতক্ষণ ধরে যে মেয়েটা শাওয়ারের ঠাণ্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে আছে তা বোঝা যায় তার হাতের আঙুল দেখে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় অসমোসিসের কারণে আঙুলের চামড়ায় ঢেউ খেলেছে। লোমকূপগুলো স্তিমিত হয়ে গেছে, কানের বক্রভাঁজটা সম্পূর্ণ ভেজা, ঘাড়ের পেছনের চুলের গোড়ায় পানির উপস্থিতি নিশ্চিত করে মিতু অন্তত মিনিট পনেরোর বেশী সময় এই ঠাণ্ডা পানিতে দাঁড়িয়ে আছে। গোসলখানার পূর্বদেয়ালের স্টেইনলেসের হ্যাঙ্গারে শুধু সাদা একটা পাজামা ঝুলছে, তাতে রক্তের ছোপ ছোপ খয়েরী দাগ বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বাথরুমের ফ্লোরে প্রিন্টের ভেজা জামা সহ আনুষঙ্গিক মেয়েলী কাপড় পড়ে আছে । কয়েকটা ঝরে পড়া লম্বা চুল মিতুর গোড়ালিতে আটকে পানির স্রোতের সাথে ভেসে যেতে চাইছে, কিন্তু ওর পা অনড়, যেন শরীরে একটুও শক্তি নেই, অনড় পা’টা চুলগুলোকে বেঁধে রেখেছে ।

মিতুর ছোটবেলার কথা বেশ মনে আছে । যে মক্তবে আরবী পড়তে যেত তার সামনে একটা টিউবওয়েল ছিলো। কাদা থাকায় একদিন সেখানে পিছলে পড়ে পাশের কঞ্চির বেড়াতে পাজামাটা বিঁধে ছিঁড়ে গিয়েছিলো । সামান্য কেটে যাওয়াতে অল্পখানিক রক্ত সাদা পাজামাতে এমনভাবে ভরেছিলো যে ইমাম সাহেবের চোখ এড়ালোনা । ইমাম সাহেব বলেছিলেন, ‘তরা কেউ হায়েজের সময় মসজিদে আইবিনা, মিতু, যা, বাড়ি যা, চারদিন তর আওয়ন লাগবোনা’।
বাসায় ফিরে মিতু মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলো, ‘মা, হায়েজ কি?’ মা বলেছিলেন, ‘কিছু না, ওইডা বদ রক্ত’ বলে থেমে একটু চিন্তায় পড়ে গেলেন । এত ছোট মেয়ের এমন হওয়ার তো কথা না। কালক্ষেপণ না করে মিতুর দু’পায়ের ফাঁকে বাম হাত দিয়ে কিছুক্ষণ কি যেন খুঁজলেন । মিতু কাঁচুমাঁচু করে বলেছিলো, ‘সরো মা, সুড়সুড়ি লাগে তো!’ আশাহত হওয়ায় মা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘কিরে, কাটছে নি শইলের কুনো জাগাত?’ অসাবধানতাবশত পড়ে কেটে গেছে তাই মা বকবেন ভেবে মিতু প্রশ্ন এড়িয়ে স্বাভাবিক থেকে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘মা, কইলা না তো, হায়েজ কি?’

মা এবার চোখমুখে খানিকটা রাগভাব জমিয়ে বলেছিলেন, ‘কল’পাড় পইরা গেছিলি, না? যা গোসল কইরা আয়’ ।
সেদিন গোসলের সময় কেটে যাওয়া চামড়ায় পানির স্পর্শে প্রথমে খুব জ্বলছিলো, খানিক বাদে তা গা সওয়া হয়ে যায় । গা মোছার সময় ভেজা গামছা দিয়ে কাটা জায়গায় হালকা চাপ দিয়ে পানি মুছেছিলো, সেটাও মিতুর স্পষ্ট মনে আছে । কেন যেনো সেদিন মিতু সবার সামনে কাপড় বদলাতে একটু ইতস্ততবোধ করেছিলো। বাড়ির ষোলো-সতের বছরের কাজের যে ছেলেটা মাঝে মাঝেই ওর কাপড় বদলানোর সময় চেয়ে থাকতো সে একদিন ভোর বেলায় মক্তবে যাওয়ার পথে মিতুকে কৎবেল পেড়ে খাওয়াবে বলে ডাকে ।

তখন কৎবেলের পুরো মৌসুম, বাঁশঝাড়ের ওপাশের বড় গাছটাতে সে’বার প্রচুর কৎবেল ধরেছিলো। মিতু এক কথাতেই রাজী হয়ে যায় । উচ্ছ্বল হরিণীর মতো ছেলেটার বড় বড় ধাপের সাথে তাল মিলিয়ে যেন দৌড়াতে থাকে । একসময় কিছুটা দূরত্ব এগিয়ে গেলে মিতুর পরনের সবুজ রঙা কুঁচিতোলা হাফপ্যান্টে পেছন থেকে টান পড়ে । খানিকবাদে যখন ছেলেটা প্রচণ্ড শক্তিতে চেপে ধরা মিতুর মুখ থেকে হাত সরিয়ে বলেছিলো, ‘কাউরে কইবিনা কইলাম, কইলে মাইরা ফালামু’ তখন মিতুর দু’পা বেয়ে রক্ত ঝরছিলো । ভয়ে ও ব্যাথায় মিতুর চোখ বেয়ে রক্ত ঝরছিলো, রঙহীন লোনা রক্ত । ছেলেটি মাটিতে পড়ে থাকা দুটি কৎবেল হাতে দিয়ে বলেছিলো, ‘এই ল, বাড়িত লইয়া যা, দুপুরে ভাইঙা দিমুনে’ । বাসায় এলে একটা রঙ জ্বলে যাওয়া কাপড়ের ত্যানাপট্টি হাতে দিয়ে মা সেদিন হেসে বলেছিলেন, ‘এইডা হাতে ধর, খারা দেহাইয়া দিতাছি কেম্নে পরবি’।

মা শুধু জানতেন তার কন্যা একটা ‘মেয়েমানুষ’ যার শরীরের নিম্নাঙ্গে লাল রঙ থাকা মানে শুধু অশুচির ছায়া, যে লাল রঙা অশুচি অস্তিত্বের উপস্থিতি ধর্মকে দূরে সরিয়ে দেয়, যার সমাপণী শুদ্ধতা হয় নিয়মতান্ত্রিক গোসলের মাধ্যমে । মা বলেছিলেন, ‘এম্নেই কয়েকদিন রক্ত যাইবো, ভয় পাইস না, পরে শিখায়া দিমু কেম্নে গোসল দিতে অয়’।
উরু আর জঙ্গমের ব্যাথায় সে’রাতে মিতু ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। অন্ধকারের টানে চোখে যখন হালকা ঘুম পরশ বুলিয়ে যাচ্ছিলো তখন আচমকা ঘুম ভেঙ্গে বারবার মনে হচ্ছিলো কেউ তার মুখ এঁটে ধরছে, এইতো কিছুক্ষণ পর দু’পা গড়িয়ে রক্ত পড়বে । তার ব্যাথা লাগবে, মা হাসবেন। মায়ের হাতে থাকবে রঙচটা ন্যাকড়া কাপড়ের মাড়হীন ত্যানা। ফজর ওয়াক্তের দিকে মিতু ঘুমিয়ে পড়েছিলো । পরিদিন ভোরে শিমের জাংলার নিচে মা যখন শিম ভর্তার জন্য শিম তুলছিলেন, তখন কাছে গিয়ে মিতু বলেছিলো, ‘মা, আর রক্ত নাই, দেহো দেহো…’। মা’য়ের কখনোই জানা হয়নি যে রক্ত ঝরেছিলো সেটা বদ রক্ত ছিলোনা, মিতু কখনোই বলতে পারেনি ছেলেটা সেদিন কৎবেল পেড়ে দেয় নি, শুধু শক্ত দুটি কৎবেল কুড়িয়ে হাতে দিয়েছিলো ।

পানির ধারা কিছুটা কম মনে হচ্ছে । যেকোনো সময় পানি ফুরিয়ে যেতে পারে । মিতুর মনে হলো গায়ে সাবান মাখা দরকার । সাবানে শরীরের ময়লা পরিস্কার হয়, লোমকূপ উন্মোচিত হয়ে যায়, শরীরের ভেতর জমে থাকা এপিডার্মিসের ফ্যাট ভেঙ্গে বেরিয়ে এসে শরীর তেলতেলে করা ফ্যাট ধুয়ে নেয়া যায়। ত্বক হয় মসৃণ, অনেকটা শস্যক্ষেতের মতো উপযোগী হয়, যেখানে পুরুষেরা আবাদ করার জন্য বীজ নিয়ে ঘোরে । মিতু এসব নিয়ে এখন ভাবছেনা । শরীরে যে ক্ষতগুলো হয়েছে সেখানে এখন জ্বলছে। বুকের মাঝখানটার খানিক উপরের দিকে, যেখানটাতে একটা ছোট্ট তিল ছিলো সেখানে অগভীর আঁচড়ে চামড়া উঠে গেছে । দেখা গেলো ছোট্ট তিলটাও চামড়ার সাথে উঠে গেছে।

মিতু ভাবে এ তিলটা কি আর ফিরে পাওয়া যাবে? চুল উঠে গেলে যেভাবে চুল গজায়, নখ উপড়ে গেলে যেভাবে নখ গজায় সেভাবে তিল কি জেগে উঠবে নতুন চামড়ায়? তিলের কথা মনে হতে, রাতুলের ছেলেমানুষির কথা মনে পড়ে যায় । ছেলেটা দু’বার তিলটা ছুঁয়ে দেখেছিলো । প্রথম ছোঁয়াতে রাতে কয়েকলাইনের একটা কবিতায় লিখেছিলো- ‘কালো যদি ভালোবাসা দাবী করে, যদি অন্তস্থঃ তুলো বালিশের প্রহরায় কালো তিল থাকে, দাবী করে তার নাম হোক বৃত্ততুল্য সঞ্চারীর কৃষ্ণ আক্ষেপ, যদি মাখে প্রশান্তির আড়ালে একমুঠো পাপের প্রলেপ! কালোরা যদি ভালোবাসা পায়, সে কি বড় অন্যায়? খুব বেশী অন্যায়?’ তখন মিতুর প্রতিমাসেই নিয়ম করে তলপেটে খুব ব্যাথা করতো । সমস্যাটার জন্য বহুদিন ধরে ডাক্তারের কাছে ধর্না দিয়েছে, বারবারই ডাক্তার বলেছেন, ‘পিরিওডের সময় একটু আকটু ব্যাথা হয় মা, বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে, তুমি টেনশন করোনা, নাও, এই ঔষধগুলো নিয়মিত খাবা’।

মিতু অপেক্ষা করতে থাকে কবে তার বিয়ে হবে, কবে রাতুল একটা চাকরী যোগাড় করতে পারবে! একদিন রাতুলের চাকরী হওয়ার কথা শুনে মিতুর রাতুলকে অনেক আপন মনে হয় । ছেলেটার কথা রক্ষার্থে সেদিন তার ঘরে গিয়েছিলো । সকাল থেকে না খাওয়া মিতুর তলপেটে সেদিনও খুব ব্যাথা করছিলো । নিভৃতের অভিশাপে যদিও মিতুর মনোদৈহিক ভালোবাসার জোয়ার জেঁকে বসেছিলো তবু নিজেকে সামলে বলেছিলো, ‘রাতুল, আমার খুব পেট ব্যাথা করছে, চলো দুপুরে বাইরে খাবো’। রাতুল কোনো ওজর আপত্তি শোনেনি । সেদিনও স্বাভাবিক চাক্রিক নিয়মেই দু’পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়েছিলো। চোখমুখ বেয়ে নেমে আসা ঘাম মুছতে মুছতে রাতুল বলেছিলো, ‘যাও, গোসল করে নাও’ । তার কিছুদিন পর রাতুল পোস্টিং নিয়ে সিলেট চলে যায়, ভুলে যায় তিলের কথা । দূরত্বের কাছে হেরে যায় প্রেম, মনোদৈহিক সে ভালোবাসাটা শূন্যে মিলিয়ে মিতুকে একা করে দেয় ।

মিতু ঘাড় পেছনে হেলিয়ে প্রথমে গলায় সাবান ঘষলো । মাজুনিটাতে সাবান লাগাতে ইচ্ছে করছেনা। তবুও মাজুনিতে খানিক সাবান ঘষে গলায় ঘষলো। ডান থেকে বামে, বাম থেকে ডানে । সাবানে ময়লা পরিষ্কার হয় । সাবানের ফ্যানাতে দাগ, ময়লা, জীবাণু, জঞ্জাল ধুয়ে মুছে যায় তাই জানে মিতু। সে ঠিক জানেনা ফ্যানা কি পারে কলঙ্কের দাগ মুছতে? এ মুহূর্তে এসব জানতেও ইচ্ছে করছেনা। শুধু ভালোভাবে, খুব ভালোভাবে গোসল করতে ইচ্ছে করছে ওর। মাজুনিটা ঘাড় বেয়ে কাঁধে নামে, কাঁধ থেকে বুকের উপতক্যা বেয়ে কটিদেশের বাজুবন্ধে আটকে যায় । চৌদ্দ বছর বয়সে মিতুকে ওর দাদু একটা তাবিজ দিয়েছিলো,

ঠিক এখন যেটাতে সাবানমাখা মাজুনি আটকে গেছে । তাবিজটা পরাতে পরাতে দাদু বলেছিলেন, ‘এইডা কোমোরো বাইন্দা রাকবি, ভুলেও খুলবিনা কইলাম, আল্লায় তরে বালা মুছিবত থাইক্কা ভালা রাকবো কি যেন মনে করে এক ঝটকায় কালো সুতায় বাঁধা তাবিজটা ছিঁড়ে বাথরুমের ভেন্টিলেটর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয় । ভালো করে মাজুনি দিয়ে নাভি থেকে শুরু করে ডানদিকে পরে বামদিকে, পরে তলপেটে সাবান মাখে। খুব জোরে ঘষতে থাকে । তাবিজের সুতার গেঁথে যাওয়া দাগ লাল হয়ে যায় । তাবিজের কার্যক্ষমতাহীন কলঙ্ক ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে সাদা ফ্যানার ফাঁকে ফাঁকে । এই তাবিজের কথা শুনেই ডিভোর্সি মাঝবয়সী সহযোগী অধ্যাপক টাইটেলের এক ডাক্তারসাহেব খুব হেসেছিলেন । বলেছিলেন, ‘এই বিংশ শতাব্দীতে আপনারা তাবিজ পরেন! হা হা হা। আচ্ছা বলুন, সমস্যাটা কতদিনের?’

মিতু বলেছিলো, ‘স্যার, বেশ কিছুদিন ধরেই সাদা স্রাব যাচ্ছে, ভেতরে জ্বালাপোড়া করে, গাইনির ক’জন ম্যাডামকে দেখিয়েছিলাম সমাধান হয়নি, পরে এক ম্যাডাম আপনাকে রেফার করছেন’ ডাক্তার সব শুনে নিজে ভালো করে দেখবেন বলে পরনের কাপড় বদলিয়ে হাসপাতালের পীত রঙা ইউনিফর্ম পরতে বলেন । ডাক্তার সাহেব মিতুকে পা ফাঁকা করে শোবার জন্য বলেছিলেন, তারপর আবার আবারও হেসেছিলেন তাবিজ দেখে । মিতুর ভয় করছিলো অট্টহাসির ভয়াবহতায় । ডাক্তারসাহেব মাইক্রো টর্চ ফেলে বললেন, ‘আপাতত স্ক্যাবিস বলে মনে হচ্ছে, আচ্ছা ঔষধ লিখে দিচ্ছি’। মিতু শোয়া থেকে উঠতে গেলে চাপ লেগে শরীরের মাঝ বরাবর টিপ বোতামে আটকানো ইউনিফর্মের ওপরের দিকে দুটা বোতাম ফট ফট করে খুলে যায় । দুটি ফট ফট শব্দেই ডাক্তারসাহেব ফিরে তাকান মিতুর দিকে। এ দেখা অন্য দেখা, যে দেখায় রক্তের ভেতর নেশা তৈরী হয় । তারপর বেশ কিছুক্ষণ ডাক্তারসাহেব পেছনে ফেরেন নি । স্ট্রেচার ট্রলিবেডের চাকা ঘুরতে ঘুরতে ঘরের উত্তর থেকে দক্ষিনে ওয়াশরুমের সম্মুখভাগে আটকে যায়। প্রচন্ড ব্যাথায় মিতু টু শব্দটিও করেনা। দাঁতে দাঁত চেপে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে থাকে ।

খানিকবাদে ডাক্তারসাহেব সম্মোধন বদল করে বলেন, ‘ভেতরে টাওয়েল আছে, ভালো করে গোসল দিয়ে আসো, আমি ঔষধ লিখে দিচ্ছি’ মিতু উঠে বসলো । দেখলো তার দু’পায়ে মাঝের দিক থেকে টকটকে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। বেসিনের পাশে ডিসপোজাল ঝুড়িতে তখনই ডাক্তারসাহেব টিস্যু ফেলেছিলেন, টিস্যুতে লাল লাল শুষে নেয়া রক্ত হা করে তাকিয়ে ছিলো মিতুর দিকে। ডাক্তারসাহেব প্যাঁচানো অক্ষরে তাঁর প্যাডে লিখলেন এক, পারমিথিন ওয়েন্টমেন্ট, দুই, আইভারমেকটিন গ্রুপের ছোট ছোট পিলগুলোর নাম । বললেন, ‘ব্লিডিং বন্ধ হয়েছে কি?’ মিতু চুপ থাকে । ডাক্তারসাহেবের এবার মন খারাপ হয় । মন খারাপ বা ভালো হওয়া ব্যক্তিত্বভেদে জেগে ওঠেনা । নিকৃষ্টেরও নৈমিত্তিক কিছু উৎকৃষ্টতা থাকে, যে উৎকৃষ্টতা পৃথিবীর কোনো কাজে আসেনা । মিতু তারপরেও কোনো কথা বলেনি । প্রেসকিপশনটা হাতে নিয়ে ছলছল চোখে বেরিয়ে যায় ।

পানির ফ্লো’ টা আরো কমে গেছে । ঝরনাটা বন্ধ করতে মিতুর ইচ্ছে করছেনা । ইচ্ছে করছে শাওয়ার থেকে একটু দূরে বাথরুমের মাঝে যে যায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । শরীরে মাখা সাবানের বুদবুদগুলো ক্ষীণ শব্দে চিটচিট করে ফাটছে । ফাটুক । সাবান শুকিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে শরীর টানটান হয়ে যাবে, ময়লারা সাবানের সাথে শক্ত করে লেগে থাকুক, যেন এবারের মাজুনির ঘষায় পুরো কলঙ্ক যেন সরিয়ে ফেলা যায় । টেনে টেনে যেন চামড়ার উপরের সাদা সাবানের পর্দা সরিয়ে নিজেকে শুদ্ধ করা যায়। আজ যেমন ওরা টেনে ছিঁড়ে খুলে ফেলেছিলো মিতুর সবকটি কাপড়, অনেকটা সেভাবে কলঙ্ক মুছে অন্তযাত্রায় যেতে চায়। অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর থেকে প্রথম যে টিউশনি যোগাড় করেছিলো ও বাসায় মিতুর এখনো যাতায়াত আছে । মিতু আজ সন্ধ্যায় সেই স্টুডেন্টের বাসার একটা পার্টি থেকে ফিরছিলো। ওখানকার চাপা রাস্তার মাঝামাঝি অংশটা বেশ অন্ধকার ছিলো, তার মাঝেই হনহন করে হেঁটে ফিরছিলো শখ করে পেন্সিল হিল পড়া মিতু । পাশের আন্ডার কনস্ট্রাকশন একটা বিশাল বিল্ডিংয়ের আটতলায় কাজ চলছে ।

উপরে ড্রিল, ঝালাই আর ঠোকাঠুকি শব্দ, নিচে ইট ভাঙ্গার ঘটঘট শব্দে কেউ বোঝেনি চারটা ছেলে মিতুকে সে বিল্ডিং এর গ্রাউন্ড ফ্লোরের ইটের স্তুপের পেছনের টিন দিয়ে ঘেরা মজুরদের ঘরে নিয়ে গেছে । মেয়েটা কিছুক্ষণ চিৎকার করতে করতে অবসন্ন হয়ে পড়ে । ওরা পালাক্রমে উপর্যুপোরি উপনিবেশ চালায় লোমকূপ বেয়ে পড়া ঈষৎ তেলতেলে মসৃণ সাদা ত্বকে । প্রায় দুই-ঘন্টা ঝড়ের শেষে ওরা যে যার মতো কেটে পড়ে । মিতু যেন মারা গেছে, শরীরে কোনো অনুভূতি নেই । কোনোমতে উঠে পাজামা পরার সময় পায়ের ফাঁকে ব্যথায় কুঁকড়ে যায় । মিতু আর নিচের দিকে তাকায় না, ও জানে ওর পা বেয়ে রক্ত ঝরছে। অনুক্রমিক সম্ভোগান্তে শরীর ও মন বিষিয়ে ওঠে। পৃথিবী নামক এই কুরুক্ষেত্রে যেখানে সব রাক্ষস-হায়েনাদের বাস সেখানে বেঁচে থাকা একধরণের অপমান । মিতু অপমানবোধে ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত নেয় । রাত দশটার কাছাকাছি সময়ে পাশের থানায় অভিযোগ করতে যায় ।

পুলিশ প্রমাণ চায়, ‘কই দেখি দেখি কোথায় তোমার কি হয়েছে’ মিতু এক ঝটকায় গায়ের জামাটা ছিঁড়ে ফেলে তার উদাম বুকে পুলিশের তর্জনি ঠেকিয়ে খুঁটে খুঁটে দেখায়, ‘এই দেখুন, এই দেখুন, এই দেখুন, নিচের কাপড়টাও খুলবো স্যার?’ । নিচের কাপড় খুলতে হলো না, পায়ের গোড়ালিতে বেয়ে আসা রক্তের ছোপছোপ দাগ থানার সাদা টাইলসের মেঝেতে দাগ কাটলো। মাঝবয়সী ইনস্পেক্টর সাহেব বলেন, ‘তুমি কাল এসো, আজ কেস লেখার কেউ নাই, সেন্ট্রি, মেয়েটাকে বাসায় পৌঁছে দাও’ । বাসায় ফিরে ওড়না জড়িয়ে চুপ করে ঘরে ঢুকে যায় । যারা সাবলেট দিয়েছেন তাদের মধ্যে কেউ দরজা ঠুকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, রাতে খাবে কিনা । মিতু চুপ করে থাকে। ঘুমিয়ে গেছে ভেবে আর কেউ ডাকেনি ।

এই প্রথম মিতু গায়ের সব কাপড় খুলে শাওয়ারে দাঁড়িয়েছে । সারা গায়ে সাবান মেখে দাঁড়িয়ে আছে । একবার ওদের বান্ধবীদের মধ্যে গোসলের মাসালা নিয়ে কথা হচ্ছিলো, ব্যাপারটার সমধান দেন ওদের এক সিনিয়র আপু । সহীহ হাদিস শোনান । মিতু অনেকটা স্বস্তিবোধ করেছিলো যে এর আগে সে কখনো একদম খালি গায়ে গোসল করেনি । তাতে কি লাভ হয়েছে? কিচ্ছু হয়নি । পানির কলকল শব্দ মেঝেতে জমা সব ফেনিল স্রোত স্যানিটারি পাইপের জালি ঢাকনা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে । সারা শরীরের শুকিয়ে যাওয়া সাবান পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে । মিতু পাগলের মতো পুরো শরীর ঘষছে তো ঘষছেই। গলা থেকে গ্রীবা, বুক থেকে পেট, পেট থেকে পা অব্দি। পানির তোড়ে গা থেকে সব সাবান সরে গেলো । আয়নার সামনে দাঁড়ায় মিতু নামের এই মেয়েটা । নিজেকে দেখে যেন চিনতে পারেছেনা । বুঝতে পারছে তাকে খুব সুন্দর আর ফ্রেশ দেখাচ্ছে । কিছুটা প্রশান্তিবোধে টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছে, বুকের যেখানে তিলটা ছিলো তার কাছে টাওয়েল স্পর্শ করতে চামড়ায় ছ্যাঁত করে ওঠে, ছ্যাঁত করে ওঠে মনের ভেতরেও ।

রাতুলের কথা মনে পড়ে যায় । ঐতো শেষদিনেই তো রাতুল বলেছিলো, ‘বেবি, এমন কখনো হয় আমার জানা ছিলোনা’ মিতু কিছু বুঝতে পারেনা । জিজ্ঞেস করে, ‘কি হয় না?’ রাতুল ওয়াশরুমের আয়নার সামনে মিতুকে নিয়ে মিতুর বক্ষদেশ দেখিয়ে বলেছিলো, ‘ঐ দেখো!’ মিতু খুব লজ্জা পেয়েছিলো সেদিন । ঠিক ওভাবেই এখনো আয়নায় নিজেকে দেখছে, নিজের চোখ, কান, নাক, ঠোঁট, গলা, বুক, কোমর, নাভি, কটিদেশ দেখছে কিন্তু পেছনে রাতুল নাই । রাতুল মিথ্যে বলেনি, খানিকটা বুকের অসমতায় কারো ক্ষতি হয়না, তবে মিতুর এমনটা হলো কেন? পদে পদে জীবনের নৃশংসতায় মৃত্যুর স্বাদের আকাঙ্খা কেনো তাকে চেপে বসলো?

যে যায়গাটায় তিল ছিলো, কানের পাশের চুল বেয়ে একফোঁটা পানি বুকের সেজায়গায় এসে পড়ে । সেখানে তিল নেই । ফোঁটাটা গড়িয়ে নিচে পড়ার পরিবর্তে মেঝেতে ছিটকে পড়লো । গোসলের শুভ্রতায় পানির মতো পবিত্রকারী তরলও স্থান নিলোনা মিতুর শরীরে । মিতুর খুব কান্না পেলো। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নায় মিতুর পুরো শরীর নড়ছে, ও দেখতে পেলো সামনের প্রতিবিম্বকারী আয়নায় পানির ফোঁটার প্রতিটা বিন্দু যেনো ওকে উপহাস করে । চোখের পানির ফোটাগুলো যেন গাল বেয়ে বুকে লাথি মেরে নিচে পড়ে গিয়ে বলছে, ‘তুমি পৃথিবীর কেউ না, এখানে থাকার তোমার কোনো অধিকার নেই’ । মিতু চোখ বন্ধ করে ।

চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে রক্ত, প্রতিবারের ঝরে পড়া তাল তাল রক্ত দু’পায়ের ফাঁকা বেয়ে পর করে দিয়ে চলে যাচ্ছে । সেখানে দাঁড়িয়ে হাসছে বাড়ির কাজের ছেলেটা তার হাতে দুটি কৎবেল একটির চেয়ে অন্যটি খুব সামান্য ছোট, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে রাতুল, তার হাতে একটা ভাঁজ করা কাগজে সেই কবিতাটা, রাতুল কাগজের ভাঁজ খুলে দেখালো, ‘এই দেখো মিতু, তোমার জন্য তিল এনেছি, এই নাও’। তার পাশে ডাক্তারসাহেব হাতে টিস্যু নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সে টিস্যুটা পুরো রক্তে ভেজা । তাদের পাশে দুইদিকে দুজন করে চারজন যুবক হাতে চাবি ঘোরাচ্ছে । ইনস্পেক্টর সাহেব চোখ রাঙিয়ে বলছেন, ‘কই নিচের কাপড় খুলবে না?, খোলো, খোলো।

মিতু ঘরে ঢুকলো । গোসলে ঢোকার আগে চুয়ান্নটা ডায়াজিপাম এক গ্লাস পানিতে গুলিয়ে রেখে এসেছে । সেগুলো এখন পানিতে মিশে সাদা হয়ে মিশ্রণ হয়ে আছে । মা’কে খুব মনে পড়লো । মিতু জানে, জন্মের শুরুতেই ওকে নরম রঙচটা ন্যাকড়া দিয়ে মুছিয়ে দেয়া হয়েছিলো, তার তিনদিনের মাথায় তাকে প্রথম গোসল করানো হয়েছিলো। শুরু ও শেষের সমতায় শেষ গোসল চক্রে সমাপ্তি টানে । মিতু জানে কাল যখন ওকে শেষ গোসল করাবে তখন তার মা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলবে, ‘মারে কি হইছিলো তর? কেন আমগো ছাইড়া গেছস’। মা মূর্ছা যাবেন । অশরীরী মিতু মায়ের পাশে এসে বসবে, ‘মা দেহো, এই শইলডাত আর কোনো কলঙ্ক নাই । দোহাই তোমার, আমারে একটু ধরো মা’ । মা সম্বিৎ ফিরে বারান্দা থেকে একটা রঙচটা ত্যানাকাপড়ের ন্যাকড়া এনে বলবে ‘এইডা ধর রে মা, তোর গা ডা আগে মুছাইয়া দেই, গোসলডা শ্যাষ কইরা আমার বুকে আয়’।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত