নকশী কাঁথা

নকশী কাঁথা

একদম প্রথম থেকে শুরু করি, আমার জন্ম মুহূর্ত থেকে?

তোমাদের মত নয় মাস দশদিন এক মায়ের গর্ভে ধীরে ধীরে আমার জন্ম হয়নি৷ চারটি মায়ের সুখ দুঃখ হাসি বেদনার সাথে কিছু নিপুণ আর কিছু অদক্ষ হাতের ছোঁয়ায় আমি বেড়ে উঠেছি, পরিপূর্ণ হয়েছি মাত্র আটদিনে৷
তখন আমার মূল্যও ছিল কম, ৭০০ টাকা।

কাহিনীটা বলেই ফেলি…

আমাকে যখন জন্ম দেবার জন্য হলুদ এক রঙের অনেক বড় কাপড়, সুঁই, সুতা সহ কেতকী’র মায়ের হাতে দিয়ে যায়, তখনও আমি জানতাম না আমি এত সুন্দর হয়ে গড়ে উঠব। অবশ্য আমার গায়ে সুঁইয়ের ফোড় পড়ার আগে কলমের আঁচড় পড়েছে, অনেক সুন্দর কারুকাজের। সুঁইয়ের আঘাতে ওটা হয়েছে নিপুণ আর মহা মূল্যবান।
কেতকীর মাকে সবাই কেতুনী মা বলে ডাকে। তারা একটা বস্তিতে আট’শ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে থাকে। সাথে চোরা লাইনের ইলেক্ট্রিসিটির জন্য আলাদা এক’শ টাকা দিতে হয়।

“*** বাচ্চা হুদায় টাকাটা গরীবদের পেটে লাথি মেরে নিচ্ছে”…”
গালি পাড়ে কেতকী’র মা।
কথায় কথায় গালি দেয়া এই মহিলার স্বভাব দেখছি। কেতুনী গার্মেন্টসে দেড় হাজার টাকা বেতনের চাকরী করছে একবছর থেকে। তার মা আগে মানুষের বাসায় কাজ করত, দুইমাস ধরে কাঁথা সেলাইয়ের কাজ নিয়েছে শুনলাম। তার আফসোস এই কাজ আগে কেন পায়নি। আগে পেলে সে বড়লোক হয়ে যেত।
এখন তার কাছে চৌদ্দ’শ টাকা জমা আছে, সে বারে বারে সে টাকা দেখে আনন্দ পায়। এই প্রথম দুই মাসে এতো টাকা জমাতে পেরেছে। এমন চললে পয়সাওয়ালা হতে দেরী নাই। সে একটা রিক্সা কিনে ভাড়া দিতে পারবে। খারাপ কি? সুখ এলো বলে।

কিন্তু সুখের উপর যে নজর পড়বেই, এটা খাঁটি কথা। কই এত বছর সে দুঃখে ছিল কেউ তো নজর দিয়ে সুখে ঠেলে দেয়নি! নজরের কথা পরে বলি, তারও আগে অনেক কথা আছে ওদের জীবনে।

কেতকী’র আরেক বোন আছে সেতু। মাত্র চার বছর বয়স তার। কেতকীর তের বছরের ছোট। এতো ছোট কেন, তারও কারণ আছে। কেতকীর বাপ আরেকটা বিয়ে করে তাদের খোঁজ খবর রাখেনাই। তাই পাঁচ বছর আগে কেতকী’র মা আবার বিয়ে করে, কিন্তু এই বেটাও ভাল পড়ে নাই। তার পোয়াতীতে, কেতকীর দিকে নজর দেয়। এক বছরের মাথায় গলা ধাক্কা দিয়ে বের করছে তাকে।

এদের ঘরে আটদিনে আমার যে বছরেরও বেশী অভিজ্ঞতা হল। আমার পরিপূর্ণ হবার কথা ছিলো সাতদিনে, যার মূল্যে ৭০০ টাকা পাবে কেতকীর মা ।

কিন্তু মাত্র সাতদিনে কি এত সুন্দর রূপ দেয়া সম্ভব একা মহিলার? কখনোই না। তাই সে রহিমার মাকে সাথে ডাকে।
সে তার বান্ধবী, প্রতিবেশী এবং আগের প্রত্যেক সেলাইয়ের সঙ্গী হলে কি হবে, প্রত্যেকবার নাকি দরদাম করবেই। কি করবে, তারও তো পেটের ধান্দা। সে এক নাগারে সময়ও দিতে পারেনা। ২ ঘর কাজ করে আসে। সাথে তার তের বছর বয়সী রহিমাকেও নিয়ে আসে, টাকা কিছু বেশী উসুল করার জন্য, বুঝে কেতকীর মা। তবে সে এতো বোকা নয় যে, রহিমার মাকে আসল দাম বলবে, লোভীটা নইলে অর্ধেক চেয়ে বসবে। তার কেতুনীও তো রাতের বেলায় দু’আড়াই ঘন্টা সময় দেয়, মাগনা নাকি! রহিমার মা পাঁচ’শ শুনে দুই’শ চায়। কেতকীর মা রাজী হয়না।

-আমি সারাদিন কাঁথা নিয়ে বসে থেকে তিন’শ নিতাম! কি বলিস রইমনি মা? আমার কেতুনীও তো রাতে বসে আমার লগে।

-তয় দেড়’শ ছাড়া সেলাই করুমনা।

-ঠিক আছে। তুই ঘরের মানুষ, কি আর দরদাম করুম।

খুশি হয় কেতকীর মা। সাড়ে পাঁচ’শ তার । ঘরে বসে, মানুষের গালি গালাজ, পঁচা গলা আর চড় থাপ্পড় না খেয়ে স্বাধীনভাবে মাসে বাইশ’শ টাকা কম নাকি? কেতুনীরেও বলছে, কাজ ছেড়ে দিতে। মেয়ে রাজী হয়না কেন, আল্লাহ মালুম!

একা একা সেলাইয়ের সময় এসব কথা বিড়বিড় করে বলে সে, আর আমি শুনি। ভালোই লাগে শুনতে, এমনিতে কি আর সময় কাটে! আমার শরীরের কাজ প্রায় হয়ে এল, দেড় দিন বাকি। হয়ে যাবে তাতে, আশা করছি। কিন্তু রাতে কেতকী, মায়ের সাথে সেলাইয়ে বসে আরাম পায়না। তার শরীর খারাপ লাগে মনে হয়। সে দৌড়ে বমি করতে যায়, বস্তি’র পেছনে ময়লা আবর্জনায়। তার মা সন্দেহের চোখে জিজ্ঞেস করে।

-হাছা কথা কও কেতুনী… কি হয়ছে তোর? ক’দিন ধরে খানা খাসনা, সকালেও বমির আওয়াজ শুনছি।

-কিছু না মা।

-সত্যি না কইলে নিজে বিপদে পড়বি। আজ কাম থেকে আয়লে ডাক্তার দেখাইতে নিয়ে যামু তরে।

-ডাক্তার দরকার নাই।

– কেন দরকার নাই। চাকরী করবি কেমনে?

কেতকী কি ভাবে তারপর মার পাশে এসে বসে।

– মা, আমারে মাফ করতে ফারবা?

-কিসের মাফ, কি করছস তুই!

উত্তেজিত হয়ে পড়ে কেতুনী’ মা। তার সন্দেহ কি ঠিক তাইলে?

-মা আমার পেটে বাচ্চা।

আল্লাহ গো…
বলে বিলাপ শুরু করে দেয় আমাকে ছুঁড়ে মেরে।

-মাইনষের একা বাসাত কাম করতে না দি তোরে মাইনষের ভিড়ে কাম করতে পাঠাইছি, কু কাম না হবের লাই। কি করলি তুই? কে করল তোরে?

সতেরো বছরের কেতকী ভয়ে এতোটুক হয়ে যায়। তার মা দুইটা থাপ্পড় দিয়ে আরও ভয় পাইয়ে দেয়।

– কার সাথে বয়ছস ****?

গালি শুনে কথা বলে কেতকী।

– পিয়ন, চা পানি দেয় বড় সাহেবদের। ও আমারে কইছে বিয়ে করবো, বড় সাহেবদের সাথে তার কাতির, আমার কথা বলে পাঁচ ‘শ টাকা বেতনও বাড়ায় দিব।

-কয়দিন ধরে চলছে এসব?

-তিন মাস।

– হে বেডা জানে পেটে বাচ্চা? কি কয়, বিয়ে কবে করবো?

– বলছে সাফ করতে, এখন বিয়ে সম্ভব না। তার বউ আছে।

-**** বাচ্চা.., আগে কয় নাই বউ আছে?

– না।

– বেতন বাড়ছে?

– না।

-গাধী বেকুব মাইয়্যা…

কেতকী’র মা জমানো টাকাটা বের করে, হাত বুলায় টাকার গায়ে। কষ্টে জমানো টাকা খরচ করতে হবে কাল মেয়ের জন্য। মন খারাপ তার। রাতে আর কাঁথা সেলাই হয়না। সেতুরে জড়িয়ে ধরে সে শুয়ে পড়ে। কেতকীর দিকে ফিরেও চায়না।

নির্দিষ্ট দিন আমাকে নিতে আসলে, কেতকীর মা অসুখের দোহায় দিয়ে আরেকদিন সময় চায়। অসন্তুষ্ট হয়ে, সময় দিয়ে যাবার সময় পঞ্চাশ টাকা কম দেবে ধমক দিয়ে যায় কাঁথা গ্রাহক। কিছু করার নাই, কম দিলেও কাল হসপিটালে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে, তার আগেরদিন রাতেও ভাল করে সেলাই করতে পারেনি। রহিমার মাকে মিথ্যা কি অজুহাত দিয়ে হসপিটাল গেল শুনলামনা, বড় ইচ্ছা ছিল শুনার! রহিমার মায়ের সংসারে সুখ আছে বুঝা যায়। একটাই মেয়ে। মেয়েকে স্কুলে দিছে, ক্লাস সিক্সে পড়ে। জামাই রিক্সা চালায়।

পরদিন ঐ মানুষ আমাকে পঞ্চাশ টাকা কম দিয়ে নিয়ে যায়। মুখ কালো করে কম টাকাটা নেয়, সাথে আরেক কাঁথার অর্ডার। যাবার সময় আমার হঠাৎ করে কেতকী, তার মা, রহিমা, আর রহিমার মায়ের জন্য মন খারাপ হয়ে গেল!

আমাকে নিয়ে যেখানে সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে, সেখানে রাত হলে লাইট আর লাইট, মানুষের ভীড়। শুনছি বাণিজ্যমেলা নাকি কি যেন। যেই আমাকে দেখে, দাম জিজ্ঞেস করে৷ চার হাজার শুনে আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায়। কোথায় সাত’শ আর কোথায় চার হাজার! আমি নিজেই তাজ্জব বনে যাই।

শেষে সাজুগুজো এক মেম আসেন। আমাকে দেখে পছন্দ করেন। আমি ভেবেছি দরাদরি করবেননা, কিন্তু দোকানদারের সাথে তর্কাতর্কি করে বত্রিশ’শ টাকা দিয়ে কিনে অনেক লাভবান হয়েছেন মনে করেন। করবেনই বা না কেন, দোকানদার যে খুবই মন খারাপ করার ভঙ্গী করে বললেন,
“পানির দরে নিলেন, কারিগরদের দিতে হয় আড়াই হাজার। এই মেলার মৌসুমে সবকিছুই দাম।”

শুরু হল আমার নতুন সংসার। ঐ রাতে আমাকে গায়ে দিয়ে মেম আর সাহেব অনেক ভালোবাসাবাসি করলেন। আমিও নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করতে লাগলাম এমন একটা সুখের সংসারে এলাম বলে।

পরদিন অনেক রাত পর্যন্ত আমি একা, কেউ আসেনা রুমে। অনেক রাত করে ঢুলতে ঢুলতে রুমে আসে দু’জনই। সাথে ইংরেজী বাংলা গালির বর্ষণ। সাহেব বলেনঃ

-আরো খাব, তোর কি? একশ জন বান্ধবী থাকবে আমার, দরকারে সবাইকে একটা করে ঘর দিব। সমস্যা হলে ভাগ…

-তোর চোখ তুলে নিব। সাহস থাকলে মুখে না বলে, করে দেখা।

সাহেব সুন্দর একটা বোতলের ঢাকনা খুলে মুখে দিতে গেলে মেম কেড়ে নিয়ে ছুড়ে মারেন। কিছু পানীয় আমার গায়ে এসে পড়ে। কেমন বিদগুটে গন্ধ আর তিতকুটে স্বাদ। ছিঃ!

গতরাতের তাদের এতো ভালবাসা কোথায় হারিয়ে গেল! এই এসি রুমের দুর্গন্ধ পরিবেশ থেকে কেতকীদের ভাঙ্গা ঘর মনে হতে লাগল অনেক ভাল ছিল। হঠাৎ সাহেব রাগে সিগারেট ধরাতে গেলে হাত থেকে জ্বলন্ত লাইটার থেকে আগুন লেগে যায় আমার শরীরে। পুড়তে থাকি আমি, অসহ্য যন্ত্রণা…

মেম তাকিয়ে থাকেন। শেষে সাহেব আমাকে নিয়ে দ্রুত বাথরুমে নিয়ে আমার গায়ের উপর ঠান্ডা পানি ছেড়ে দেন। আহা, শান্তি! আমি সারারাত ঐভাবে পরে থাকি।

পরদিন বুলবুলি মা, তাদের বয়স্ক কাজের বুয়া গালি পাড়তে পাড়তে আমাকে ধোয়। দুইদিনও নাকি সাহেব মেম শান্তিতে থাকতে পারেন না। ঝগড়া অশান্তি লেগে আছে সবসময়। এটা ঘর না জাহান্নাম!
এসব মুখের ভেতর বলে বলে সে আমার শরীর থেকে ময়লা, পুড়া পরিষ্কার করে। ছাদে শুকাতে দিতে যাবার সময় মেম বলেন, আমাকে যেন বুলবুলি মা সাথে করে নিয়ে যায়।

হুম, আমার তাহলে আবার আরেক সংসারে যেতে হবে।

মনে মনে খুশি হয় বুলবুলি মা । এতো সুন্দর জিনিস, টকটকা নতুন। শুধু দু’এক জা’গা পুড়ছে আর কি। তিনি সারাদিন মনে হয় খুশি খুশি কাজ করে সন্ধ্যায় আমাকে তার ঘরে না নিয়ে সোজা বুলবুলি’র ঘরে নিয়ে যায়। বুলবুলি তার মেয়ে। জামাই ঠেলা করে তরকারি বেচে। তার ছোট ছোট তিন ছেলে মেয়ে। মেয়ে আট বছরের সবার বড়। আমাকে দেখে ঐ মেয়ে এত্তো খুশি। সে লাফিয়ে উঠে।

-নানী… আমার জন্য আনছ!
মা দেখ, কি সুন্দর কাঁথা! মা, আমরা কি অনেক বড়লোক এখন? এত্তো সুন্দর কাঁথা গায়ে দিব! মা, নানী, এই কাঁথা শুধু আমার। কাউরে দিমুনা।

নানী বলে, দাঁড়া গো বেটি, এটা আগে তোর মা সেলাই করে দিক, ছিঁড়া আছে।

আমি মুহূর্তেই ঐ মেয়ের প্রেমে পড়ে যাই। এখানে হয়তো আমি দীর্ঘদিন বসত করতে পারব।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত