বড়আপু

বড়আপু

ঘুম ভেংগেছে সেই কখন। কিন্তু এখনও গায়ে কাঁথা জড়িয়ে চুপচাপ শুয়ে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছি। আর ছোট বেলায় পড়া সেই কবিতা টা মনে মনে আওড়াচ্ছি

=আয় বৃষ্টি ঝেপে,ধান দেবো মেপে,
=লেবুর পাতায় করমচা,যা বৃষ্টি ঝরে যা।

কিন্তু আজ আর ঝরে যাবার কথা বলবো না বৃষ্টি কে। কারন আজ তো আর সে নেই,যে কান ধরে নিয়ে খেতে বসাবে।
প্রিয় মানুষ টা যদি কাছে না থাকে,তাহলে যে কতোটা অসহায় আর একা লাগে, তা আজ ক দিন ধরে আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ইস,,,কি দুষ্টুমিই না করতাম ওর সাথে।

ওর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করাটা ছিলো, আমার প্রতি দিনের চাকরি। এটাকে চুরি বলে না,কারণ আমি জানতাম যে, ও একমাত্র আমার জন্যেই আলাদা করে ব্যাগে টাকা রাখতো। তারপর আর কি, প্রতিদিনই ধরা খেতাম। আর প্রতিদিনই কান ধরে উঠ বস করতাম। ঘুমের ভেতর একটু নাক ডাকতো বলে, ওকে যে কতো খেপিয়েছি ,,, একবার তো অনেক কষ্টে তা রেকর্ড করে ওর ফোনের রিংটোন দিয়ে দিয়েছিলাম,,,,,,আর এটাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। একটু মজা করেই কল দেই ওর ফোনে। কিন্তু আমি জানতাম না যে ঐ সময়টা তে ও ক্যাম্পাসে গিয়েছিল ফ্রেন্ডস দের সাথে দেখা করতে। ব্যাস,,,,,,,ওর আসে পাশে হাসির রোল পরে গেলো। খুব কষ্ট পেয়েছিলো সেদিন ,বাড়ি এসে শুধু এতটুকুই বলেছিলো যে, আমাকে কষ্ট দিতে তোর খুব ভালো লাগে তাই না?? আসলে আমি বুঝতে পারিনি। আমি কেনো ওকে কষ্ট দেবো !!! ওকে তো আমি ভালোবাসি। একটা চকলেট খেলেও অর্ধেকটা ভেঙে রাখতাম পাগলিটার জন্য।জানি আরেকটা দিলে খাবে না,,,ঐটাতেই ওর ভাগ চাই,,,,,,,,,

সে-দিনই বিকালে ব্যাচ থেকে ফেরার সময় বন্ধুরা মিলে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম। ঠান্ডা আমার মোটেই সহ্য হয় না।তাই রাতেই কাপুনি দিয়ে জ্বর চলে আসে। আব্বু ঔষধ এনে অনেকক্ষন বসিছেলো মাথার কাছে,আর আম্মু দু-লোকমা ভাত খাওয়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছিল। ঠিক ঐ সময়টা তে ওকে শুধু আমার আসে পাশে না,আমার রুমেও দেখিনি, ভাবলাম রাগ এখন ও কমেনি হয়তো। কিন্ত রাতে আম্মু ঘুম পাড়িয়ে চলে যাবার পর যতবারই আমি চোখ খুলেছি,ততবারই ওকে আমার পাশে পেয়েছি । আর প্রতি বারই ওর একি প্রশ্ন,,,,,,

=ভাইয়া? এখন কেমন লাগছে তোর? কিছু লাগবে??আমাকে বল,,,,,,,

আমি শুধু চেয়ে চেয়ে আপুর নিস্পাপ মুখে সুপ্ত ভালোবাসা টাই খুঁজে ফিরছিলাম।কতোটা কেয়ার করে আমাকে!!
আর আমি আপু কে কি জ্বালানো টাই না জ্বালাই,,, সত্যি,,,,,, সেদিনই বুঝেছিলাম যে আপু কতোটা ভালবাসে আমাকে। যার কোন তুলোনা হয়না। ভোরে ফজরের আজানের পর একটু ভালো লাগছিলো বলে উঠে বসেছিলাম।তখন ও আলো ফোটেনি বাইরে।

আপুকে খুজতেই দেখি তিনি জায়নামাজের পাটি তে মোনাজাত ধরে বসে আছে। আমি আগ পিচ কিছু না ভেবে সোজা গিয়ে আপুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লাম পাটির উপরেই। আরো কিছু সময় পর মোনাজাত শেষ করলো আপু। তারপর মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে বললো, এখন কেমন লাগছে ভাই?আর কক্ষনো যেনো বৃষ্টি তে ভিজবি না।কেমন!!!! কেনো যানি কোন কথাই আমার কানে ঢুকছিল না, মনে হচ্ছিল সারা দুনিয়ার সুখ এখন আমার মাথার উপরে। হটাৎ বালিশের নিচে কিছু একটার কাঁপাকাপি তে চিন্তায় ছেদ পড়লো,বুঝলাম কেউ স্বরণ করছে। জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতে দেখতে অতীত ডায়রীর কতো পৃষ্ঠাই না পড়ে ফেললাম। বৃষ্টি হলে আপুকেও এভাবে বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখতাম।কি সব চিন্তা করতে করতে কোথায় যেনো হারিয়ে যেতো। যা হোক, বালিশের নিচে হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে পরিচিত একটা কন্ঠ ভেসে এলো,

=ভাই,,,,এখনও বুঝি শুয়ে আছিস?
=হুম,,
=জানতাম তুই এমনটাই করবি।যা,উঠে নাস্তা কর নে।
=কি করে জানলি যে আমি এখনও শুয়ে আছি?
=বারে,,আমি জানবো না তো কে জানবে? আমি এও জানি যে তুই কাঁথা গায়ে দিয়ে আছিস। বৃষ্টি হলে তুই কি করিস তা জানি না বুঝি।
=হুম৷বুঝছি,,,
=ঐ,,,, তোর ওতো বোঝা লাগবে না, বৃষ্টি কমলেই দ্রুত আব্বু আম্মু কে নিয়ে চলে আয়। মনে নেই? আজ আমাকে নিতে আসার কথা। বিয়ে করেছি বলে কি পর হয়ে গেছি?
=আচ্ছা হইছে,উঠতেছি তুই ঠান্ডা হ। শশুড়বাড়ি গেছিস যার কেবল ৭ দিন হইছে।
=তাতে তোর কি,আমি আসবো। আর এ কদিনে কি কি খেয়েছিস তার অর্ধেকটা গুছিয়ে রাখিস,আমি এসেই যেনো পাই।

আমি আর কিছু বললাম না।ফোনটা রেখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি অনেকটা কমে এসেছে।তার মানে এখনই উঠতে হবে, তা না হলে বোন যে আমার পথ চেয়ে থাকবে। বুকের একেবারে ভিতর থেকে লম্বা একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বিছানা থেকে উঠছি আর ভাবছি, যার বড় বোন নেই,তার অনেক কিছুই নেই। কিন্তু আল্লাহ আমাকে এই নেয়ামতটা দিয়েছেন, তাই হাজার শুকরিয়া তার কাছে।

গল্পের বিষয়:
গল্প
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত