শেষ দৃশ্য দেখার পর

শেষ দৃশ্য দেখার পর

রাহাত মতিঝিলের অফিস থেকে বেড়িয়ে একটা রিকশা নিলো। বেইলী রোডে যেতে হবে। ওই দিকে অনেকগুলি অাধুনিক শাড়ির মার্কেট গড়ে উঠেছে । মেহজাবিন এর জন্য একটা শাড়ি কিনতে হবে। বেশ কিছুদিন হলো বলছে। রাহাত সময় করে উঠতে পারে নি। শাড়ি টারি বিষয়গুলো সাধারণত মেয়েরাই দেখে। কিন্তু মেহজাবিন এমন ধরনের মেয়ে না। সবকিছুতে রাহাতের উপর ভরসা। সে যেটা আনবে বা পছন্দ করবে তার উপর মেহজাবিন এর কোন কথা নেই।

মেহজাবিন রাহাতের স্ত্রী। বাবার পছন্দে বিয়ে করা। গ্রামের মেয়ে। রাহাতের পছন্দে না। সে মেহজাবিনকে ঢাকা নিয়ে এলেও এক সাথে কখনো কোথাও পারতপক্ষে নিয়ে যায় না। মেহজাবিন সেটা ভালো করেই জানে, রাহাত তাকে শুধু শুধু শাড়ি কেনার জন্য বাইরে নিয়ে যাবে না। সে যেটা নিয়ে আসবে সেটাই পরতে হবে। সে মাস খানেক আগে বলেছিল যে শাড়ি অানতে হবে পরার মত কাপড় তার ফুরিয়ে গেছে এ টুকুই। রাহাতের পছন্দ ছিলো কাকলী। কামরুন্নাহার কাকলী তার ডিপার্টমেন্টের দু ইয়ার জুনিয়র। কবিতা টবিতা লিখতো। রাহাত বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও সেও কবিতা লিখতো। একবার ফেব্রুয়ারিতে টিএসসির কবিতা উৎসবে তার সাথে পরিচয়। তার নিজের জেলাতেই বাড়ি। পরিচয় থেকে প্রেম। কয়েক বছর দুজনের পাশাপাশি চলা কবিতা নিয়ে তুমুল যুগলবন্দী কল্পনা আর কথকতা। সেই সাথে সম্পর্কের গভীরতা।

রাহাতের ভার্সিটি লাইফ শেষ, প্রাথমিক এন্ট্রি হিসেবে একটা কোস্পানীতে জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসাবে জয়েন করা। তারপর চলে এলো বিয়ের বিষয়। রাহাতের বাবা কাকলির বাবার কাছে প্রস্তাব নিয়ে গেছিলো কিন্তু কাকলির ধণাঢ্য বাবা রাহাতের এই ধরনের চাকরি বাকরি পছন্দ করে নাই। তার ইচ্ছা মেয়েকে বিসিএস কমপ্লিট কোন প্রথম শ্রেণির চাকুরীধারীর সাথে বিয়ে দেয়া। কাকলির রাহাতের ব্যাপারে তেমন অাপত্তি ছিল না আবার জোড়দার কোন কার্যক্রমও ছিলো না।

রাহাতের বাবা কাকলির বাবার কাছ থেকে ফিরে আসার পর অনেকটা জোড় করেই বন্ধুর মেয়ে মেহজাবিনের সাথে রাহাতের বিয়ে দিয়ে দেয়। রাহাতের করার কিছু ছিল না। কারণ সে পিতার জাত্যাভিমানে অাঘাত করতে চায়নি। শিক্ষক পিতা তাকে অনেক কষ্ট করে পড়িয়েছেন। কিন্তু সে কাকলীকে ভুলতে পারে না। বিয়ে করা স্ত্রী মেহজাবিনের সাথে তার সম্পর্ক অনেকটা বাংলা সিনেমায় ভিলেন কতৃর্ক অবরুদ্ধ নায়িকার সংলাপের মত- শয়তান, দেহ পাবি কিন্তু মন পাবি না’ র মতো। রাহাতের মাথার ভিতর সেই ভার্সিটি লাইফ, কবিতা আর কাকলী ই রয়ে যায়। যন্ত্রের মতো নিষ্প্রাণ সংসার চলে। কথায় বলে- যার কথা ভাবা যায় সে যদি সামনে চলে আসে তার হায়াত নাকি বেড়ে যায় বা বেশি দিন বাঁচে। কাকলী হয়তো বেশি দিন বাঁচবে।

কাকলীর সাথে রাহাতের দেখা হয়ে যায় বেইলী রোডের এক শাড়ির দোকানে। সঙ্গে বিসিএস ধারী প্রথম শ্রেণির চাকুরিধারী কি না বোঝা না গেলেও তবে যে পয়সা টয়সা ওয়ালা লোক বোঝা যায়। কাকলী রাহাতের সাথে পরিচয় করে দেয় যে এটা তার বর। রাহাতের মনে হলো লোকটি স্ত্রীর সামনে অনেক নিস্প্রভ অনেক কাঁচুমাচু। লোকটি যাই বলছে কাকলী তাতে ধমকা ধামকি করছে। কোন একটি শাড়ির ব্যাপারে কাকলির বর কিছু বললেই কাকলী চাপা স্বরে তাকে ধমকে বলছে- তুমি চুপ করো, তুমি কি কিছু চেনো? লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে আর এতো গুলো মানুষ আর রাহাতের সামনেই বরের প্রতি কাকলীর এমন অাচরণ রাহাতের মোটেই পছন্দ হলো না। হায়রে কাকলী যে কবিতা লিখতো প্রেমিকা হিসেবে কবিতার মতো মিষ্টি করে কথা বলতো স্ত্রী হিসেবে কাকলীর এমন আচরণ! কিছু কিছু মেয়ে বিয়ের পর বুঝি এমন হয়ে যায়। নরম তুলতুলে বিড়ালের থাবার ভিতর থেকে নখ গুলো বেড়িয়ে আসে।

রাহাত দোকান থেকে বেড়িয়ে এলো। অন্য একটি দোকান থেকে একটু বেশি দাম দিয়েই ভালো একটা শাড়ি কিনলো। রাহাতের মনে হলো মেহজাবিন আচার আর ঝাল চানাচুর খুব পছন্দ করে। সে ভালো একটি কনফেকশনারী থেকে কয়েক প্যাকেট আচার আর ঝাল চানাচুর নিলো। তারপর রিকশা নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসার দিকে রওনা হলো। রিকশায় উঠে চলতে চলতে রাহাতের মনে হলো মেহজাবিনকে নিয়ে ঢাকা শহরটা ঘোরা দরকার। মেহজাবিন অনেক কিছুই চেনে না, তাকে চেনানো দরকার। কালকে অফিসের পরই সে মেহজাবিনকে নিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস ঘুরিয়ে দেখাবে। এখান থেকেই পূনরায় তার নতুন জীবনের যাত্রা শুরু হোক।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত