কে খুনি

কে খুনি

শফিকের ফোনটা বেজে উঠলো। বেশ ঝাঁঝালো একটা রিংটোন। প্রথমবার বাজতেই ওর ঘুম ভেঙ্গে যায়। সে চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে একটা বিশ্রি গালি দেয় ফোনকে। ততক্ষণে ফোনটা কাটা যায়। আবার বেজে উঠে। শফিক চরম মাত্রায় বিরক্ত হয়। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখে আরিফের নাম্বার। ওর মেজাজটা যেন আরেকটু চড়ে যায়। এত রাতে এই ছেলে কেন ফোন দিবে। সে কি জানে না যে এত রাতে কাউকে ফোন দিয়ে বিরক্ত করা মস্ত বড় অন্যায়। আর কী এমন প্রয়োজন হলো যে এত রাতে ফোন দিতে হবে? শফিক বেশ খিটখিটে মেজাজ নিয়ে ফোন ধরে ওপাশের মানুষটাকে উদ্দেশ্য করে বেশ বিশ্রি একটা গালি দেয়।

আরিফ সেই গালি উপেক্ষা করে কাঁপাকাঁপা স্বরে বলে, “ভাই, রানাকে কেউ মেরে ফেলেছে। খুব বাজে ভাবে মেরেছে। শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলেছে। স্ক্রুড্রাইভার দিয়ে বুকের উপর অনেক গুলো ছিদ্র করে আরিফ আর বলতে পারে না। বাচ্চাদের মত কেঁদে উঠে। ওর কান্নার স্বরে একটু বিরক্তও হয় না শফিক। সকল বিরক্তি নিমিষেই উধাও হয়ে যায়। সে যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। পাহাড়ের মতো কিছু সময় স্থির হয়ে বসে থাকে। মুখ কালো হয় ওর। বুকের ভেতর কষ্ট জমাট বাঁধে। চোখ দুটো অজান্তেই ঘেমে উঠে। বিশ্বাস করতে পারে না । বলে, “এই! এই আরিফ! কি বলছিস তুই। মাথা ঠিক আছে। মজা করছিস আমার সাথে?”

আরিফ ডুকরে কেঁদে উঠে। বলে, “ভাই,আমি মজা করছি না। সত্যি বলছি। আপনার বিশ্বাস না হলে আপনি ওর বাসাতে আসেন। এসে দেখে যান। নিজের চোখে এসে দেখে যান।” শফিকের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।তাড়াহুড়ো করে বলে, “আরে ও তো একটু আগেই আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে। এই অল্প সময়ের মাঝে কিভাবে হলো এসব? ” “আমি জানি না ভাই। আমি ঘুমানোর জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ঠিক তখনই একটা কল আসে আমার ফোনে। বলে কেউ নাকি রানাকে মেরে চলে গিয়েছে। আমি দৌড়ে ওর বাসায় যাই। গিয়ে দেখি ওর মৃত দেহ ঝুলে আছে সিলিং ফ্যানের সাথে। মাথা বিহীন একটা শরীর ঝুলে ছিল।”

আরিফ আবারো বেশ উচ্চ স্বরে কান্না করতে থাকে। শফিক কিছু বলতে পারে না। চুপ করে থাকে কিছু সময়। ওপাশ থেকে আরিফ কল কেটে দেয়। শফিক বেশ অবাক হয়। আশ্চর্য! কি থেকে কি হয়ে গেল। ছেলেটা একটু আগে কত হাসিতামাশা করেছে, ‘শফিক ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে’ বলে কত স্লোগান দিয়েছে, বিয়েতে কিভাবে আনন্দ করবে,কিভাবে সব কিছু সাজবে এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা করে গিয়েছে। আর এর ঘন্টা খানেক পরই শুনতে হলো সেই ছেলেটি মারা গেছে! এই পৃথিবীতে সে আর নেই। এটা কি মেনে নেওয়া যায়! খুব সহজভাবে নেওয়া যায়! শফিক নিতে পারে নি। সে কিছু সময় রোবটের মতো বসে রইলো। ভাবতে লাগলো কথা গুলো। ওকে কেউ কেন খুন করবে। কি করেছে ও। ওর সাথে তো কারো গোপন শত্রুতা নেই। তাহলে! কেউ কেন ওকে মারতে যাবে। শফিক আর ভাবতে পারে না। মাথা ভার হয়ে আসে ওর। প্রচন্ড মাথাব্যথা নিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। একটি পুরনো বাড়ি। অনেক পুরনো। কেউ থাকে না এখানে। এটা ওদের গোপন আস্তানা। এখানেই ওদের সব গোপন মিটিং এবং কাজের প্ল্যান হয়।

সেই পুরনো বাড়িটির একটা রুমে শফিক বসে আছে। তার সামনে চেয়ারে বসে আছে আরিফ আর রুবেল। সবার মন খারাপ; মুখ ভার করে বসে আছে। কেউ কথা বলছে না। একটু শব্দও করছে না কেউ। মাথার উপর এনার্জি বাল্বটা নির্দ্বিধায় আলো দিচ্ছে। বাল্বের শুভ্র আলো সবার কালো হয়ে থাকা চেহারায় পড়ে ফ্যাকাশে আভা সৃষ্টি করছে চেহারায়। তাদের সবার মুখ এখন খুব ফ্যাকাশে লাগছে। শফিক একটু নড়ে বসলো।আড়চোখে রানার চেয়ারটার দিকে তাকালো। ওই চেয়ারে সব সময় একটা যুবক বসতো। বেশ হাসিখুশি প্রানবন্ত একটা যুবক। নাম রানা। আজ ছেলেটি নেই। ছেলেটির যায়গা আজ শূন্য হয়ে আছে। সেই শূন্যতা আজ ভোগাচ্ছে শফিককে। শফিক ভাবতেও পারে নি যে এমন একটা কান্ড ঘটবে। কেউই ভাবতে পারে নি। অনেকক্ষণ নিরব থাকার পর শফিক বলল, “আচ্ছা তোরা তো আমার চেয়ে বেশি রানার সাথে থাকতি।তাহলে বলতো ওর সাথে কারো কোনো শত্রুতা ছিল। এমন কেউ কি ছিল যে রানাকে খুন করতে পারে বা খুন করার মতো কোনো শত্রু কি ছিল?” আরিফ মাথা নাড়ে। বলে, “না ভাই। ওর সাথে কারো কোনো শত্রুতা ছিল না।”

শফিককে একটু চিন্তিত মনে হলো। সে বেশ চিন্তিত গলায় বলল, “কারো সাথে কি ইতোমধ্যে কোনো হাতাহাতি কিংবা মারামারি হইছে?” আরিফ বলল, ” না ভাই। আমাদের জানা মতে ও কারো সাথে মারামারি করে নাই। করলে আমাদের একবার হলেও বলতো।” শফিকের মুখটা আরেকটু গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, “তাহলে কেউ কেন ওকে মারবে। আরো কি বাজে ভাবেই না মেরেছে। যেন অনেক দিনের জমে থাকা সব রাগ ক্ষোভ ওর উপর ঝেড়েছে। শালা কি মানুষ! কেউ কাউকে এভাবে খুন করে! আমি এই জীবনে কত খুন করলাম। কাউকে এমন কষ্ট দিয়ে মারি নি। সহসই হয় নি। আর এই খুনি কি নির্মমভাবেই না খুব করল।”

শফিক যেন প্রচন্ড ঘৃণা জানালো খুনির প্রতি। খুনিকে জানোয়ার মনে হলো ওর। প্রচন্ড রাগ হলো খুনির প্রতি।হাতের সামনে কিছু থাকলে এখুনি ছুড়ে ফেলতো। ভাগ্যিস কিছু নেই ওর সামনে। শফিক চোখমুখ লাল করে বসে থাকলো। রানার মৃত শরীরটার কথা মনে হতেই রাগে শরীরের চামড়া ফেটে যেতে চায় ওর। যেন খুনিকে সামনে পেলে আস্ত গিলে খাবে। শফিক তীব্র রাগ নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। ঠিক তখনই এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকা রুবেল বলল, “আচ্ছা ভাই, এটা সাদিকের দলের কারো কাজ নয়তো? তারা তো সব সময় আপনার পিছনে পড়ে থাকে। হয়তো এমনও হতে পারে যে তারা আপনাকে এবং আপনার সাথে যারা চলাফেরা করে তাদের মেরে ফেলতে চায়। কোন বদলা নিতে চায় হয়তো। ”

শফিকের মেজাজটা যেন আরো বেড়ে গেল। গা যেন জ্বলে উঠল ওর। চোখমুখ লাল হতে লাগলো দ্রুত। কানের গোড়া যেন দ্রুতই গরম হতে থাকল। ‘আসলেই তো। সাদিকের কথা তো ভেবে দেখি নিই। সে তো আমাকে না পারতে মেরে ফেলে। তাহলে কি এটা ওরই কাজ?’ শফিক কিছু সময় ধরে কথা গুলো ভাবলো।তারপর চট করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। দ্রুত পাঁয়ে একটা টেবিলের দিকে এগুলো। ড্রয়ার খুলে ওখান থেকে ওর কালো চকচকে পিস্তলটা নিয়ে পিছন ফিরে এমন ভাবে হাঁটা দিল যেন কোন বদ্ধ উন্মাদ হেঁটে যাচ্ছে। আরিফ ওর দিকে দৌড়ে গেল। রুবেএলও। আরিফ বলল, “ভাই, কই যাচ্ছেন ভাই। এখন এসব বাদ দিন। আর দুদিন পর আপনার বিয়ে খামখা ভেজালে ঝড়াবেন না এখন। ভাই দাঁড়ান। ভাই!” শফিক দাঁড়ায় নি। সে দ্রুত হাঁটতে থাকলো। প্রচন্ড রাগে অস্ফুট স্বরে কিছু কথা বের হয়ে এল ওর গলা দিয়ে। আরিফ বা রুবেল সেটার কিছুই বুঝতে পারলো না। রুবেল সামনে গিয়ে শফিককে জড়িয়ে ধরে বলল, “ভাই,এখন এসব বাদ দিন প্লিজ। এখন না।

আমরা পরে ওকে দেখে নিবো। এখন না। প্লিজ ভাই। এখন না। আরিফ ঠিক বলেছে। দু’দিন পর আপনার বিয়ে। এখন এসবে জড়ালে শফিক এক ঝটকায় রুবেল ফেলে দেয়। রুবেল তিন চার হাত দূরে গিয়ে মেজেতে পড়ে।আরিফ চোখ বড়বড় করে সেই দৃশ্য দেখলো। সে অবাক হয়ে একবার রুবেলের দিকে তাকাচ্ছে আবার শফিকের দিকে। শফিক চোখমুখ লাল করে বলল,”আরে তোরা আমাকে বাধা দিচ্ছিস কেন? ও আমার ভাইকে মেরে ফেলেছে। আর আমি চুপচাপ বসে থাকবো? তোরা তো জানতি আমি রানাকে কতটা আদর করতাম। কত ভালোবাসতাম। নিজের ভাই ভাবতাম ওকে।আর ওর খুনি আমার সামনে দিয়ে নির্দ্বিধায় হেঁটে যাবে, আমি সেই দৃশ্য দেখে যাবো? কিছুই করবো না? এতটা অচল হই নি এখনও। আজ শালাকে মেরেই ফেলবো।” শফিককে আর বাধা দেওয়া গেল না। সে তীব্র রাগ নিয়ে বাড়ির মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেল। আরিফ এবং রুবেলও বের হয়ে আসলো। শফিক বাইক স্টার্ট দিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করলো। ততক্ষণে আরিফ নিজের বাইক স্টার্ট দিয়ে ফেলেছে। রুবেল উঠে বসলো ওর পিছনে। শফিকের বাইক তখন চলতে শুরু করেছে।

শফিক বেশ উত্তেজিত এবং প্রচন্ড রাগ রাগ ভাব নিয়ে ওসি সাহেবের রুমে ঢুকলো। ওর পিছন পিছন আরিফ আর রুবেল ঢুকলো। শফিকের মতো ওদেরও মন মেজাজ ভালো নেই। এতক্ষণ কেবল সন্দেহ করেছে যে সাদিক খুন করতে পারে। কিন্তু সেই সন্দেহ সত্যিতে পরিণত হলো যখন জানা গেলো যে সাদিক নেই। যে রাতে রানা মারা গিয়েছে ঠিক সে রাত থেকেই সেই উধাও। কেউই ওর খবর দিতে পারে নিই। এতেই শফিকের মেজাজ যেন লিমিট ক্রস করে ফেলল। সে কোন ভাবেই নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারছে না।প্রচন্ড রাগে সে রাস্তার একটা কুকুরকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। নিজেকে সে কোন ভাবেই সংযত রাখতে পারছে না। ওসি কামরুজ্জামান শফিককে দেখে মৃদু হাসলো।কামরুজ্জামানের বয়স খুব একটা বেশি না। বয়স বত্রিশ কি তেত্রিশ হবে। তবে তাকে দেখলে মনে হয় সে এখনো পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক। সে বেশ হাস্যরসাত্মক মানুষ। হাসতে ভালোবাসে। আচার আচরণ বেশ মার্জিত। সে বেশ শান্ত স্বরে শফিককে উদ্দেশ্য করে বলল, “কি খবর শফিক সাহেব। দিনকাল কেমন যাচ্ছে? ”

শফিক বেশ রুক্ষ দৃষ্টিতে ওসির দিকে তাকালো। তারপর বলল, “আপনি কি আমার খোঁজ খবর নিতে এখানে ডেকে এনেছেন?” কামরুজ্জামান আবারো হাসলো। বলল, “ঠিক তা না। একটু সৌজন্যতা দেখানো আর কি।আমি জানি আপনার মন মেজাজ ভালো নেই।এর কারনও আমি জানি।তবে আমি আপনাকে এমন একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো যাকে দেখলে আপনার মন একটু হলেও হালকা হবে এবং যে আপনাকে এমন মূহুর্তে সাহায্য করতে পারবে।” “কে? ” কেবল এতটুকু বলে সে ওসির দিকে সেই রুক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো। কামরুজ্জামান এটা দেখে মজা পেলো যেন। সে মৃদু হেসে বলল, “আপনি বোধহয় বেশ রেগে আছেন। তাই আশেপাশের কাউকে দেখা প্রয়োজনবোধ করছেন না। যার কথা বলছিলাম সে আপনার পাশেই আছে। পাশে দেখুন৷ উনার নাম তীব্র হাসান।”

শফিক পাশে তাকাতেই দেখলো একটা যুবক ছেলে তার একদম পাশে বেশ শান্ত হয়ে বসে আছে। সে হতভম্ব হয়ে কিছু সময় যুবকটির দিকে তাকিয়ে থাকলো। বেশ শান্ত কোমল তার দৃষ্টি। চেহারায় কঠোরতা না থাকলেও প্রচুর রহস্য লুকিয়ে আছে। শরীরটা একদম মোটাও না আবার একেবারে চিকুনও না। মাজারি গড়নের বেশ তাজা দেহ। যেন প্রতিদিন জিমে যায়। পাতলা ঠোঁট। সরু,তীক্ষ্ণ চোখ । যার সাথে একবার চোখাচোখি হতেই মনে হয় সে কারো মনের সব কথা চট করেই পরে ফেলতে পারে। শফিকের ভেতরটা হঠাৎই যেন কেঁপে উঠলো। কি এক ভয়ে যেন সে দ্বিতীয়বার ছেলেটির দিকে তাকাতে পারলো না। তীব্র বেশ শান্ত ভঙ্গিতেই বলল, “হাই,আমি তীব্র হাসান। ”

শফিক সেদিকে তাকানোর প্রয়োজন মনে করে না। সে কামরুজ্জামানের দিকে তাকালো। তবে পূর্বের মতো সেই রুক্ষতা তার চোখে দেখা গেল না। কামরুজ্জামান বলল, “ইনি এই ক’বছর ধরে বাংলাদেশ গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করছেন। অল্প বয়সে বেশ সুনাম কুড়িয়ে সবার নজর কেঁড়েছেন যারা তাদের মধ্যে ইনি অন্যতম। তবে উনাকে কেউই চেনে না। কারন উনি টিভির পর্দায় কখনো আসেন নি এবং আসতেও চান না। গোপনে কাজ করে বেড়ান। বড় বড় সব মিশন কম্পলিট করে এসেছেন তিনি। আশা করি উনি আপনাদের যথার্থ সাহায্য করতে পারবে। ” শফিক উঠে দাঁড়ালো। কড়া স্বরে কিছু বলতে চেয়েও কেন জানি বলতে পারলো না।তবে মুখটা বেশ গম্ভীর রেখে বলল, “খুশি হলাম।কিন্তু আমাদের কোন গোয়েন্দা ফোয়েন্দা লাগছে না। আমরা আসল খুনিকে পেয়ে গেছি এবং খুব জলদিই সেই খুনির লাশ আপনাকে আনতে যেতে হবে।গেলাম।”

শফিক পিছন ফিরে হাঁটতে যাবে ঠিক তখনই কামরুজ্জামান বলল, “খুনিকে পেয়ে গেছেন? কে সে?” শফিক ঠোঁট বাঁকা করে হাসলো। বলল, “সেটা শুনে আপনার কাজ কি? আপনি আপনার কাজ করেন। খুন একটা হয়েছে আবার এজন্যে গোয়েন্দাও নিয়ে এসেছে।হেহ!” শফিক তিরস্কার করলো কামরুজ্জামানকে। কামরুজ্জামান কিছু যে মনে করেন নি সেটা তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। সে বেশ হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে। মানলাম আমার যোগ্যতা কম এবং একটা ছোট খুনের কেস সমাধান করতে পারি নি যেটা আপনি পেরেছেন। আমি সে নিন্দার কথা মেনে নেই।তবে আপনি চাইলে এই মূর্খকে খুনির নামটা বলতে পারেন। আচ্ছা আপনিই বলেন,কেস সমাধান না করতে পারি, অন্তত খুনির নামটা তো জানার অধিকার আমার আছে। বলুন আছে না?”

শফিক কিছু সময় কিছু একটা ভাবল।তারপর বলল, “হ্যাঁ সে অধিকার তো আছেই।” কামরুজ্জামান বেশ দ্রুত বলল,”তাহলে বলে ফেলুন না!” “সে আর কেউ না। আমাদের এলাকার সাদিকই। যে সব সময় আমার পিছন লেগে থাকতো।আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করতো। আপনি কি চিনতে পেরেছেন তাকে?” কামরুজ্জামান এমন ভাবে হেসে উঠলো যেন শফিক মস্ত বড় একটা জোক্স বলেছে। তার হাসি দেখে শফিকের গা যেন জ্বলে গেল। কামরুজ্জামান হাসতে হাসতে বলল, “আপনাকে বেশ বুদ্ধিমান ভেবেছি। কিন্তু আপনি আসলেই ততটা বুদ্ধিমান নন।” শফিক কপাল ভাঁজ করে ভ্রু কুচকে বলল,”মানে?” “এদিকে আসুন। মানের উত্তর পাবেন।”

এই বলে কামরুজ্জামান নিজের রুম থেকে বের হলেন। তার পিছনে শফিক, রুবেল এবং আরিফ গেল। তীব্র গেলো না। সে চুপচাপ বসে থাকলো। যেন কোনো এক গভীর ভাবনায় মগ্ন সে। শফিকের অবাক হওয়ার সীমা থাকল না। সে কেবল অবাক দৃষ্টিতে সাদিকের দিকে তাকিয়ে থাকলো। সাদিক হাজতের এক কোনায় ছোট্ট একটা খাটে জড়সড় হয়ে শুয়ে আছে। কামরুজ্জামান বলল, “রানা যে রাতে খুন হয়েছিল সে রাতে আমি এই লম্পটকে মাঝ রাস্তায় মাতাল অবস্থায় পাই। মাতাল হয়ে কাকে যেন মারছিল। তাই ধরে এনে হাজতে ঢুকাই। ওকে যখন ধরেছি তখন সময় নয়টা বা তার একটু বেশি। আর পোস্টমর্টেমে’র রিপোর্ট অনুযায়ী রানার খুন হয়েছে বারোটা কি সাড়ে বারোটার মধ্যে। তাহলে আপনিই বলুন সাদিক কিভাবে রানাকে খুন করবে।”

কামরুজ্জামান বেশ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে শফিকের দিকে তাকায়৷ শফিক সেদিকে তাকায় না। সে যেন বেশ দূর্বল বোধ করে।তার সমস্ত রাগ যেন পানি হয়ে একগাদা দূর্বলতা সৃষ্টি করেছে নিজের মাঝে। সে বেশ হতাশ হয়ে বেরিয়ে এসে আবার পূর্বের যায়গায় বসে। তারপাশে সেই অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টিওয়ালা যুবকটি বসে আছে। সে অবাক হয়। একটা মানুষ এতটা শান্ত কিভাবে হয়। সে আড় চোখে তীব্রকে দেখে। তীব্র তখনো গভীর ভবনায় মগ্ন ছিল। কামরুজ্জামান এসে বেশ কোমল স্বরে বললেন, “আমরা আমাদের সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করবো। চিন্তা করবেন না৷ খুনি পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। বিশ্বাস রাখুন আমাদের উপর। আমাদের আপনার সাহায্য খুব প্রয়োজন হবে। তীব্র আপনার সাথে মাঝে মাঝে দেখা করতে যাবে৷ ও যা বলবে আপনি ঠিক সেটার উত্তর দিবেন। দেখবেন, কোনোটি যেন মিথ্যা না হয়। মিথ্যা বলে খুনিকে পাওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে। আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন।”

শফিক মাথা নাড়িয়ে সায় দিল যে সে বুঝতে পেরেছে।সেখানে কিছু সময় কথাবার্তা হলে ওদের মাঝে। তীব্রর সাথে শফিক কুশল বিনিময় করেছে শেষ পর্যন্ত। তবে তীব্রর সাথে কথা বলে সে খুব একটা স্বস্তি অনুভব করতে পারে নি। কেমন জানি ভীষণ অস্বস্তি লাগছিল ওর মাঝে। যাক সেসব ছাপিয়ে সে তীব্রকে বেশ শান্ত স্বরে বলেছে যে,
“যা জানতে হবে, আমি আপনাকে জানাবো।আপনি প্লিজ খুনিকে বের করে দিন। প্লিজ!” ব্যস! এতটুকু বলে সে বেশ দ্রুত কামরুজ্জামানের রুম থেকে বের হলো। বের হওয়ার সময় তার পিছনে থাকা আরিফেকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এমপি সাহেবকে ফোন লাগা!” আরিফ ফোন বের করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। কামরুজ্জামান নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে তীব্রর দিকে তাকিয়ে হাসলো। তীব্রও অনেকক্ষণ পর ঠোঁট বাঁকা করে হাসলো। তারপর বেশ কোমল স্বরে বলল, “তুই পারিসও বটে।”

কামরুজ্জামান এবার একটু শব্দ করেই হাসলো। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা।রুবেল বাসার পথে যাচ্ছিল। হঠাৎই কিছু একটার শব্দে সে চমকে পিছনে তাকায়। তার হার্টবিট যেন দ্রুত বাড়ছিল। পিছন ফিরে তাকিয়ে কাউকে না দেখে মনের ভুল বুঝতে পারে। তারপর ভারি প্রশান্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ও।আবারো বেশ শান্ত ভাবে হাঁটতে থাকে। গুন গুন করে গান গায়। তারপর আবারো সেই আগের মতো শব্দ এবং পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। রুবেল এবার সত্যিই একটু ভয় পেয়ে গেল। সে দ্রুত পাঁ চালাতে লাগলো। ঠিক তখনই পিছন থেকে তৃতীয়বারের মতো কিছু একটার শব্দ শোনা গেল। সে আর পিছন ফিরে তাকালো না। এক দৌড়ে বাসায় চলে আসলো।

এসেই দরজা আঁটকিয়ে ছিটকিনি লাগিয়ে দরজার সাথে হেলান দিয়ে বেশ জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে থাকলো। বাসার লাইট সব তখন বন্ধ ছিল। সে বেশ ধীরে ধীরে সুইচ বোর্ড খুঁজতে লাগলো। লাইটের সুইচ টিপ দিতেই লাইট জ্বলে উঠলো। ঠিক তখনই সে অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখলো। একটা ছেলে ঠিক ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখমুখ লাল হয়ে আছে। চোখ দুটো যেন খুনের নেশায় কাতর। ছেলেটি হাতে একটা লোহার রোল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। রুবেল বেশ অবাক হলো। আরো অবাক হলো এটা দেখে যে সে এই ছেলেটাকে চেনে৷ খুব ভালো করেই চেনে৷ আরে এ তো… রুবেল চিন্তা করার শক্তি টুকু হারিয়ে ফেলে। শরীরের সব শক্তি যেন নিমিষেই পানি হয়ে যায় একটি লোহার রোলের আঘাতে।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত