ব্যবধান

ব্যবধান

এই শুনেছিস, আসিফ আত্নহত্যা করেছে! ভীষন ভাবে চমকে উঠলাম। দু দিন আগেও দেখলাম তাকে কলেজ থেকে ফিরতে। হঠাৎ কি হল? তুমুল হুলস্থুল বাইরে। কিন্ত ওদের বাসার ভেতরে যেন কবরস্থান। লাশ সামনে রেখে আসিফের মা-বাবা পাথরের মত হয়ে গেছে। তার বড় বোনের জবান বন্ধ হয়ে গেছে। কোলে-কাঁখে করে সেই তো মানুষ করেছে আদরের ভাইটিকে।

জানা গেল মৃত্যুর কারণ। স্মার্টফোন কিনে চেয়েছিল বাবার কাছে। দাবি পূরণ না হওয়াতে জীবনের এই বোঝা বহন করতে সে ব্যর্থ হয়েছে! স্মার্টফোনের রঙিন স্ক্রীনের তুলনায় জীবনটা যে তার বড্ড ধূসর!! কি লাভ এই রংহীন জীবনের বোঝা টেনে?!!! সুইসাইড নোটে লিখে গেছে স্মার্টফোন না থাকার কারণে তার সহপাঠীরা কি করে তাকে নিয়ে ট্রল করতো!! সে পারেনি তাদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে! বড্ড ভার ভার হৃদয় নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঠিকমত ঘুমোতে পারলাম না। ছটফট করতে করতেই রাত কেটে গেল। আলো ফোটেনি এখনও। হৈ-চৈ শুনতে পেলাম হঠাৎ নিচে। বুক টা ধ্বক করে উঠল। আসিফের মা, বাবা বা বোনের আবার কিছু হল না তো?

বাইরে এসে দেখি অন্য ঘটনা। বারো-তেরো বছরের শুকনো একটা ছেলেকে খাম্বার সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে দড়ি দিয়ে। ছেলেটা সবাই কে অনুনয় করছে তাকে ছেড়ে দেবার জন্য। পাশের বাসার মান্না সাহেব কষে একটা চড় বসাল ছেলেটার গালে। অন্য সবাই তাকে ধমকাতে লাগল। এইটুকু বয়সে চুরি করা শিখছিস? গর্জে উঠল মান্না সাহেব। আজকে চুরির মজা বের হবে তোর। শিক্ষা হয়ে যাবে আজীবনের মত। আমি চোর না। আমি চুরি করি না। আমাক ছাইড়ে দেন ভাই। আমার বাপের অসুখ। কাঁদতে কাঁদতে বলল ছেলেটি।

কাছে গিয়ে সব ঘটনা শুনলাম। প্রিয়াদের একতলা বাসা। বাসাটা রাস্তার ধারে। গরমের জন্য রাতে জানালা লাগায় নি। শুধু ভেজিয়ে রেখেছিল। জানালার পাশে টেবিলে মোবাইল টা ছিল। এই ছেলেটা জানালা দিয়ে মোবাইলের দিকে যেই না হাত বাড়িয়েছে অমনি তার হাত খপ করে ধরে ফেলেছে প্রিয়ার বাবা। পাশের চেয়ারেই বসে ছিল প্রিয়ার বাবা। তাকে দেখতে পায়নি ছেলেটা। তারপরে ধরে বেঁধে ফেলেছে ছেলেটাকে। উফফ! আবার সেই ফোন?! ফোনের কারণে কত কিছুই না হচ্ছে। মনটা কেমন তেতো হয়ে গেল। চুরি করিস না তাহলে ফোন ধরতে গেলি কেন? প্রশ্ন করলাম আমি। সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে।

মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল ছেলেটা। আমার বাপের অসুখ খুব। কাম করতে পারেনা। তারে ফালাইয়া মাও কামে যাইতে পারেনা। ডাক্তার কইছে অপরেশন করা লাগব। নাইলে টাকা নাই, ওষুধ কিনমু কি দিয়া? খাওন নাই ঘরে। হেঁচকি তুলল ছেলেটা। গল্প পেতে লাভ নাই। আজকে তোর কপালে শনি আছে। মান্না সাহেব শক্ত গলায় বললেন। না থাকলেই চুরি করা যায়? কাম করতে পারো না? ছোট দেখে মানষে কাম দেয় না। বলল ছেলেটা। নাম কি তোর? প্রশ্ন করলাম আমি। রায়হান। ভয়ে ভয়ে বলল ছেলেটা।

আমি সবার দিকে তাকালাম। কারো ভেতরে ওকে মারার কোন স্পৃহা দেখলাম না। গতকাল এতবড় একটা দুর্ঘটনায় সবাই যেন সব এনার্জী হারিয়ে ফেলেছে। কেউ যান ওর সাথে। দেখেন কথা সত্য কিনা? বললাম আমি। তোমার মাথা কি নষ্ট হইছে? চোররে বিশ্বাস কর? ওকে থানায় দেই চল। রেজাউল করিম সাহেব বললেন। ওর বয়স দেখেন চাচা। এখনও বাচ্চা। ওর মা বাপের হাতে তুলে দেন। বললাম আমি। হাসির মত ভঙ্গি করলেন রেজাউল চাচা। বাবা-মা? ওরাই তো ট্রেনিং দেয়। একে ছেড়ে দিলে আরেকদিন আসবে। শিক্ষা একটা দিতেই হবে।

আশে-পাশে সবার দিকে তাকালাম। মুখে শিক্ষা দেবার কথা বললেও হাত-পা নাড়িয়ে সত্যিকারের “শিক্ষা” দেবার আগ্রহ কারো ভেতরেই তেমন নেই। আজব ব্যাপার! চোর পেলে বাঙালী তো চুপ করে থাকার জাতি নয়!!৷ গত কালের ঘটনায় সবাই যেন চুপসে গেছে।

তাওহীদ এগিয়ে এল এবার। চল, তোর বাবাকে দেখে আসি। তোর কথা সত্যি হলে হাসপাতালে নিয়ে যাব তাকে। আর না হলে কিন্তু শাস্তি পাবি। মাথা কাত করে সায় দিল রায়হান। বাঁধন খুলে ছেলেটাকে নিয়ে রওনা হল তাওহীদ ভাই। বাধা দিল না কেউ-ই। তাওহীদ ভাই সব-সময় সামাজিক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত থাকেন। তার ওপরে বিশ্বাস আছে সবার।

বিকেলে জানতে পারলাম, ঘটনা সত্য। বাবার চিকিৎসার টাকা যোগাতে ছেলেটা চুরির মত ঘৃণ্য পথে পা বাড়িয়েছিল। প্রচন্ড একটা দীর্ঘশ্বাস বেরুল বুক চিরে। মানুষে মানুষে কতই না ব্যবধান! কেউ বাবার কাছে ফোন চেয়ে না পেয়ে জীবন উৎসর্গ করে দেয় আবার কেউ বা বাবার চিকিৎসার জন্য জীবনকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। এমনকি “চোর” অপবাদ কাঁধে নিতেও দ্বিধা করেনা। পৃথিবী কতই না বৈচিত্র্যময়!!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত