এক হাজার টাকা

এক হাজার টাকা

সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম তখন। বান্ধবী মিলি উপবৃত্তির টাকা পেলো। আমিও হাত পাতলাম।

“ দে। ”

“ কি দিবো? ”

“ কি দিবি জানিস না? ঢং না করে দিয়ে দে। ”

“ ভাই একটু শান্তি দে। আজকে টাকা দিবে আম্মা জানে। টাকা পয়সা দেয়া যাবে না! ”

“ এটা তুই কি বললি বিল্লি? তুই টাকা না দিলে আমি চলবো কিভাবে? ”

“ তোর শরম করে না? ছেলে হয়ে মেয়েদের কাছে হাত পাতিস? বিয়ের পর বৌয়ের কাছেও হাত পাতবি? ”

“ ও আল্লাহ্! তুই কবে মেয়ে হয়ে গেলি? তোর না পরশু মুসলমানি হইলো? তোরা সব মেয়ে না, মেয়ে না। আমার ব্যাংক একাউন্ট। দে টাকা দে। মিলি টাকা দিবেই না এবার। আমিও নাছোড়বান্দা। কোনোদিন টাকা না নিয়ে ফেরত যাইনি বাড়িতে। যদিও টাকা ওর, অধিকার আমার! পিছন ছাড়ছি না ওর। ও একটু অভিনয় করার চেষ্টা করলো। একটু কাঁদোকাঁদো হয়ে বললো, “ জানিস এবার আমি একটা জামা কিনবো। আব্বার কাছে টাকা নাই। এই টাকাটা দিয়ে তাই জামাটা কিনবো। তুই এবার ছাড়! ” আমি হাসতে হাসতে বললাম, “ অভিনয় ভালো হয়েছে, টাকা দে। সময় নাই। ক্ষিধা লাগছে খুব। ”

“ আমার খুব জ্বর। কপালে হাত দিয়ে দেখ! ঔষধ কেনা লাগবে। ”

“ হু, তারপর ইভটিজিংয়ের কেস খাই। আমার টাকা মেরে দেয়ার ধান্দা না? ”

“ আমি রাত জেগে পড়ে পড়ে উপবৃত্তি পাই। আর তোর টাকা? ”

“ আমার না তো কার? আমি না দোয়া করলে তুই কবেই রাত কানা হয়ে যেতি। রাতে জেগে পড়বি তো দূরের কথা। ” মিলি কান্না করতে করতে বললো, “ সামনের মাসে আপুর বিয়ে। একটাও ভালো জামা নাই আমার! ”

“ দে বইন টাকা দে। আমি ভালো জামা পছন্দ করতে পারি! ” মিলি কান্না করে, আমি হাসি। চোখের কোণে খুব চেষ্টা করে দুফোঁটা পানি আনলো।

“ অর্ধেক নে, পাঁচশো তোর, পাঁচশো আমার। ”

“ বিল্লি, তুই কিন্তু আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করছিস! আমি কারো কাছে দুবারের বেশি টাকা চাই না। দিলে দিবি না দিলে। ” মিলি হেসে বললো, “ না দিলে নাই? না? ”

“ নাহ, না দিলেও দিতে হবে। পুরো টাকা আমার! ”

একরকম জোর করেই টাকা নিয়ে চলে আসলাম। না দিয়ে যাবে কোথায়? আমার বাপে যদি নৌকা নিয়ে ওপার না যায়। তাহলে ও আর এপারে স্কুলে আসতে পারবে না! স্কুলে না আসতে পারলে তাঁর দম বন্ধ হয়ে যায়! মিলির দাদারা মজিদারের বংশধর। সে হিসেবে ওরাও খুব ধনী। আর আমার বাবা সাধারণ একজন নৌকার মাঝি। কিন্তু কখনো দেখিনি ওর চোখে বিলাসিতা হিংসা। একটা সাধারণ মেয়ের থেকেও বেশি সাধারণ সে। এ ধরণের মেয়েদের জ্বালাতেই যত মজা। আর আমার বয়স যখন চৌদ্দ। বড় দুভাই আলাদা হয়ে গেছে বিয়ে করে। আম্মার কোমড়ে ব্যাথা! দাঁড়াতে পারে না। রান্না করতে পারে না!  শুরু হয়ে গেলো আমার কর্ম জীবন। স্কুলে আর যেতে পারিনি। ছাত্র খারাপ ছিলাম কিন্তু যা পড়তাম, বুঝার চেষ্টা করতাম। মুখস্থ বিদ্যা আমার একদম অপছন্দ ছিলো।

পনেরো বছর হতেই আব্বারও অসুখ! নৌকা এপার থেকে ওপারে নিবে দূরের কথা। উঠে দাঁড়াতেই পারে না! সারাদিন কাজ করে বাড়িতে এসে আমি রান্না করতাম। তারপর উনারা খেতেন!কিছুই করার ছিলো না। গ্রামের লোকেরা আমাদের পরিবারের দিকে চেয়ে ঠিক করলেন আমাকে বিয়ে করাবেন! তাহলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। আমার হলো চাঞ্চল্য মন। তখনই বিয়ে করতে হলো! যদিও অনেক সমস্যা করেছে পুলিশ। গ্রামবাসী সব সামলে নিয়েছে। যাকে বিয়ে করি। নিতু, সে নবম শ্রেণীতে পড়ে। বাবা কাপড়ের খলিফা। আমাদের থেকে আর্থিক অবস্থা একটু ভালো ওদের। বাসর রাতে নিতু একটা কথা বলেছিলো, “ আমি পড়তে চাই। সব কাজ করেও পড়তে চাই। চাকরী-টাকরী করতে পারবো কিনা জানি না। কিন্তু আমি পড়তে চাই। ”

আমাদের পুরো রাত গিয়েছে পড়াশোনার আলাপ করে। সকালে উঠে নাশতা করে স্কুলে যেতো। আবার ফিরে এসে রান্না করতো। আমি তো ভোর হওয়ার আগেই কাজে চলে যেতাম। দুভাইয়ের কেউই আমাদের খোঁজ নেয় না। একটা পুরো পরিবার বয়স ষোলোতেই আমার কাঁধে! নিতু ভালো রেজাল্ট করলো। কলেজে উঠলো। বিয়ের সাত বছর পর ওর নাকি একা একা লাগে। কিসের ভয় হয়। এসব দূর হয়ে গেলো যখন আমাদের প্রথম সন্তান আলিফ দুনিয়াতে এলো। পেটে একটা প্রাণ নিয়ে একসাথে সে রান্নাবান্না করে, পড়াশোনার করে দিনশেষে আমার মাথায়ও হাত বুলাতে হয়! মাঝে মাঝে মেয়েটার দিকে আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি।

“ নিতু, তুমি কী মানুষ? ”

“ কেনো আমি আবার কি করেছি? ”

“ কিছু করোনি, তাহলে মনে হয় আমি মানুষ না, অমানুষ। ”

“ এ কথা কেনো বলছেন? ”

“ মানুষ হলে তোমার কেনো মন খারাপ তা আমাকে বলতে! ”

“ নাহ, মন খারাপ না। ভাবছি আমার বয়সও চব্বিশ, আপনারও চব্বিশ। আপনার যখন ত্রিশ হবে। আমি তখন ত্রিশ বছরের বুড়ি হয়ে যাবো! মোটা হয়ে যাবো। তখন কী আমাকে ভালো লাগবে? ”

আমি সঙ্গে সঙ্গে নিতুর গালে একটা থাপ্পড় দিলাম! কথাটা একদম সহ্য হয়নি! তারপর ভাবছি কী এমন করলাম যে ওর এরকম মনে হলো? ওর গায়ে হাত তুললাম না একটা পবিত্র মসজিদে আঘাত করলাম বুঝতে পারলাম না! এতো খারাপ লাগছে। কিন্তু নিতু থাপ্পড় খাওয়ার পর কাঁদলো না! চোখে কয়েক ফোঁটা পানি এলো সত্যি। তারপর কেমন হাসি দিয়ে আমার বাহুতে হাত ঢুকিয়ে বুকে মাথা রাখলো!

“ নিতু, আমায় ক্ষমা করো। কথাটা একদম আমার রক্তে বিষ ঢেলেছে! আর কিছু বলতে পারলাম না। তার আগেই মুখ চেপে ধরে বললো, “ চুপ! ” তখন ২০০৯ সাল।

আমার দেশান্তরী হওয়ার তারিখ হয়ে গেছে! খুব শীগ্রই প্রবাসী হতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কথাটা নিতুকে যে কীভাবে বলি বুঝতে পারলাম না! মেয়েটার সামনে পরীক্ষা! মাঝে মাঝে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলতো, “ কি হয়েছে? আপনার চোখ লাল কেনো? বিমানের টিকিটটা সেদিন পকেট থেকে বের করে দেখালাম। মুখে তো বলতে পারবো না। কিছু বছর তোমার থেকে দূরে থাকতে হবে আমার! নিতু কিছুই বললো না। একদম বোবা হয়ে গেলো! দুদিন পর আমার ফ্লাইট। চার দিন পর ওর পরীক্ষা!

আল্লাহ্ এর কি অদ্ভুত খেলা! রাত বারোটায় আমি বাংলাদেশ এয়ারপোর্টে। রাত তিনটায় আমার ছেলেটা দুনিয়াতে আসে! আমি তখন বিমানে চোখের পানি মুছছি! সেবছর আর পরীক্ষা দেয়া হলো না নিতুর। টানা দুই বছর কষ্ট করে পড়ার কথা চিন্তা করে সে খুব কষ্ট পায়। সে কষ্ট ভুলে যায় যখন ছোট ছোট হাত পা তাঁর গালে মুখে লাগে। পরের বছর পরীক্ষা দিয়েছে। ভালো রেজাল্টও করেছে।  বহুদিন কেটে গেছে। আমার ছেলের বয়স দশ চলছে। কদিন পরেই আমি দেশে ফিরবো। কাজ পড়েছে এক প্রাইমারি স্কুলে। সেখানে রোজ দেখি একটা ছেলে নিজের টিফিন অন্যকে দিয়ে দেয়। তারপর ভাগ বসায় আরেকটা মেয়ের টিফিনে।

মেয়েটা দিতে চায় না। সে জোর করে খায়। মেয়েটা কাঁদে। ছেলেটা হো হো করে হাসে। মেয়েটা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, “ তুই দেখিস না খেয়ে মরবি। ছেলেটা আরো জোরে জোরে হেসে উত্তর দিলো, “ পুরো দেশের খাবার তুই একা খেয়ে নিলে, আমাকে তো না খেয়েই মরতে হবে! ছেলেটা কিন্তু টিফিন আনে। বেশিই আনে। কিন্তু মেয়েটার সাথে ঝগড়া করবে বলে নিজের টিফিন অন্যকে দেয়। আর মেয়েটার টিফিন হা করে খায়! মিলি বিল্লির কথা মনে পড়ে গেলো। ওর নাম্বার খুঁজার চেষ্টা করলাম। একবার শুনেছিলাম ওর বিয়ে হবে। এর পরে আর বিরক্ত করার চেষ্টা করিনি। খুব কষ্টে নাম্বারটা পেলাম। ফোন দিলাম। কেউ ধরলো না।

কিছুক্ষণ পর ফোন আসলো ওর নাম্বার থেকে। আমি হ্যালো বলতেই মিলি বললো, “ ফুলন তুই? কেমন আছিস? তুই একটা স্বার্থপর। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমার গলাটা কীভাবে এত বছর পরেও খুব সহজে হ্যালো বলতেই বুঝে গেলো?

“ ভালোই আছি, তুই কেমন আছিস? ”

“ ভালো, অনেক ভালো। জানিস দুদিন ধরে তোকে খুব মিস করছি। তুই আমার বিয়েতে আসলি না কেনো? আমার খুব খারাপ লাগছিলো রে। আমি জানতাম তুই আসবি। সবাইকে দাওয়ার দিয়েছি, তোকে দেইনি। আমি তো ভেবেছি তুই দাওয়াত ছাড়াই আসবি! কিন্তু আসলি না কেনো? টাকা নেওয়ার সময় বোন মনে হয়! আর বিয়ের সময়? অনেকে অনেক উপহার দিয়েছিলো রে। শুধু তোর হাসিমুখটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার হতো! ” আমি থামিয়ে বললাম।

“ ভাই থাম, তুই তো এতো কথা বলতি না! বিয়ের পর বাচাল হয়েছিস? টাকার খোঁটা আর দিস না। তোর টাকা আমি দিয়ে দিবো। তখন কামাই ছিলো না। এখন আছে। দে বিকাশ নাম্বার দে। এখনই দিয়ে দিবো। ”

“ খুব টাকা হয়েছে তোর না? বড় লোক হয়েছিস? ”

“ না বইন, আমি তোর সব টাকা দিয়ে দিবো। বিকাশ নাম্বার দে। আর কত টাকা পাস মোট বল? সুদে আসলে সব দিয়ে দিবো। আমি দাবীর তলে থাকতে চাই না। ”

“ রাখ তোর টাকা, শোন না। দুদিন ধরে আমি অনেক খুশি! অনেক বেশি খুশি। খুব বেশি খুশি! জানিস কেনো? ”

“ তোর জামাই কী দুদিন ধরে ডিম পাড়া শুরু করে দিছে? ”

“ কুত্তা, জামাইকে নিয়ে কিছু বলবি না। উনি অনেক ভালো। আমায় খুব ভালোবাসে। ”

“ তাহলে দুদিন ধরে এতো খুশি কেনো? ”

“ আমার ছেলে হয়েছে! অনেক দুষ্টু হবে মনে হচ্ছে জানিস? ” আমি দীর্ঘশ্বাস নিলাম।

“ কি হলো, নাক টানলি কেনো? তুই খুশি হোস নাই? খুশি হবি কিভাবে? আমার সুখ তো তুই কোনোদিন চাস নাই। ”

“ আরে খরগোশী, তোরও ছেলে। আমারও ছেলে। দুজনের একজনের মেয়ে হলেই তোরে বিয়াইন বানাতাম। ”

“ তোকে বিয়াই ডাকার কোনো ইচ্ছা আমার নাই ভাই। তুই দেশে আসবি কবে? আমার ছেলেটাকে দেখে যাস হুম? তুই অনেক পছন্দ করবি জানি। তোর মতো শয়তান হবে মনে হচ্ছে! ”

“ তার আগে আমি তোর এক হাজার টাকা ফিরিয়ে দিবো! ”

“ রাখছি, ছেলেটা ঘুম থেকে উঠে গেছে! ”

মিলি ফোনটা রেখে দিলো! বহুদিন পর আবার নিজেকে অপরিপূর্ণ মনে হচ্ছে! আচ্ছা মিলির মেয়ে হলে কী হতো? আমার বৌমাকে আমি দেখেশুনে যত্ন করেই রাখতাম! বৌমার আম্মার সাথে নাহয় আরো কিছুদিন কিলাকিলি হতো!

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত