সিদ্ধান্ত

সিদ্ধান্ত

চিঠিটার এক কোণা ইরা বালিশের নীচে গুঁজে রেখে উঠে দাঁড়ালো। এটুকুই কাজই বাকী ছিলো। অনেকটা অফিশিয়াল বিদায় নেবার মতোই। আসলে অনেক কথা মুখে বলার চেয়ে বোধকরি লিখে ফেলাই সহজ। ইরাও তা ই করতে চেয়েছে। লিখেছে কিছু। হ্যাঁ ! কিছুই তো। সব কি লেখা যায়? যায়না তো ! নাহ! ইরাও তাই পারেনি সব লিখতে গেলে বিশাল ইতিহাস হয়ে যাবে। থাক!

টেবিলের ম্যাটগুলো গতকালই বদলে দিয়েছে। বিছানার চাদর বালিশের কভার ধুয়ে ইস্ত্রি করে ড্রয়ারে রাখা হয়েছে। কাঠের এই আলমিরা বড়মামা আর সেজো মামা যৌথভাবে কিনে দিয়েছিলো। বিয়ের উপহার। এর দরজার ভেতরের কোণেই ম্যাপ করে সব লিখে রেখেছে কি কোথায় আছে। হ্যাঁ, খুব অবাক লাগলেও এটাই সত্যি। দীর্ঘ একমাস সে ভেবেছে। তারপর একমাস ধরে এসব গুছিয়েছে। একটু একটু করেই।

৮৩৭ দিনের সংসার। খুব বেশি কিছুনা হয়তো । তবুও কম কি? এই ৮৩৭দিনে মামুন তাকে নিয়ে আটবার বেরিয়েছে। তিনবার তাদের বাড়ি , দুবার মামার বাড়ি আর তিনবার শ্বশুরবাড়ি। খুব অদ্ভুত তাইনা! নাহ! ইরার কাছে লাগেনি। ইরা কখনওই বলেওনি। বলতে ইচ্ছেই করেনি। এমনটাই হবে। সে জানতো। তবুও কার্টুনের মতো নিজেকে এখানে মানিয়ে নিতে চেয়েছে কেবল। কি হাস্যকর লাগে এখন। তবে কি তার মনেও কিঞ্চিৎ আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল। কে জানে! কিন্তু মামুন তো তাকে বিয়ের দিনই বলেছিলো,

—তুমি আমার পছন্দের নও! আমি অন্যকাউকে ভালবাসি। বড়জোর কটা মাস বা বছর! এক সাথে থাকবো । এরপর আমি তোমাকে মুক্তি দিয়ে দেবো।

কি অদ্ভুতভাবেই তারপরও থেকে গেছে সে। এতোটা দিন। ভালবাসা নেই তবুও সবই হয়েছে তাদের মাঝে। মানুষ বুঝি রিপুর তাড়নায় মানুষ থাকেনা। পশু হয়ে যায়। মামুনের প্রেয়সী কি সেটা জানে? নিশ্চয়ই জানে! সে জানে বলেই নিজেও তাই করতে চেষ্টা করেছে। মামুনের এটা ভাললাগেনি। এ নিয়ে তাদের মতান্তর শুনেছে সে। তার সামনেই কথা বলে মামুন। ভয় নেই তো। কারণ বলেই রেখেছে ভালবাসেনা , মুক্তি দেবে। অথচ ভোগ করতে বাঁধা নেই। ইরাও কেমন মেনে নিয়েছে। আসলে ভেতরে ভেতরে সেও কি ভেবেছে? শরীরী মায়ায় আঁটকে যাবে সব। টিকে যাবে সংসারটা। এভাবেই হয়তো যেতো আরও কিছুদিন। কিংবা বছরও। বাধ সাধল সেদিনের কথাটা।
খাবার টেবিলে বসে মামুন বলল ,

—শোনো , ওর সাথে আমার ব্রেক আপ হয়ে গেছে। আমরা একসাথেই থাকি আপাতত নতুন কিছু না ভাবা পর্যন্ত।কি বলো ? কি এক অপমানে ওর ভেতরটা জেগে উঠলো । সে কেবলই বিকল্প? ওর আসতে দেরী বলে থাকা কিংবা ও আসবেনা বলেই থেকে যাওয়া। কেন? তার নিজের ইচ্ছে নেই? সে দেখতে ভাল নয় বলে? গায়ের রঙ কালো বলে… হাসলে দাঁত বের হয় না এমনিতেই উঁচু বলে? আর কত কি?

বিয়ের আগে আত্মীয় স্বজনদের ভেতরে অনেকেই বলতো বাবাকে আর মাকে। তাকে পার করতে বেশ মোটা অঙ্কের টাকা গুছিয়ে রাখতে; ভবিষ্যতে লাগবে বলে। সবাই কত ভেবেছে তাকে নিয়ে। এসব শুনতে শুনতে তার নিজের কাউকে ভাললাগতে পারে একথাই ভুলে গেছে। মেয়ে হলেই দেখতে পুতুলের মতো সুন্দর হতেই হবে? অন্যান্য গুনগুলো সব বৃথা? সে যে এতো ভালো ডিজাইন করে দিতে পারে, ভাল ছবি তুলতে পারে এসবের কোন মুল্য নেই? একটা মানুষের পরিচয় কি কেবল তার অবয়বের সৌন্দর্য? হ্যাঁ , সে বুঝেছে এটা। আর তাই একটু একটু করে নিজেকে তৈরি করেছে। ঘরে বসেই সে নিজেই আয় করে। এতোদিন মনে হয়েছে এজন্যই হয়তো সংসারটা টিকে যাবে। কিন্তু নাহ! সে কেবলই বিকল্প কারোর। নিজস্ব অবস্থান নেই তার।

অদ্ভুত এক অপমান! এক বিদ্রোহ সমস্ত রক্তমাংস ঘিরে। কিন্তু লাভ নেই কাউকে বলে। এ সমাজের সবাই ভাববে অন্যকিছু। বলবে, তার গুনের কদরে স্বামী ফিরেছে। ‘ইরা ক্লথিং’ এখন অনলাইনের বেশ নাম করা বুটিকস। এটাও হতে পারে,তাকে খরচ দিতে হয়না। নির্ঝঞ্ঝাটভাবেও থাকা যায় । মানুষ কি এত হিসাবও করে? হয়তো করে। ইরাও করবে এখন থেকে। তার অবয়বের কারণে যারা তার নারীত্বের অপমান করেছে তাদের। ইরার তোলা ছবি এ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। ছবির সুবাদে এখন অনেকেই চেনে ওকে। ইরার ফোন আসে। আগে মামুন যেটা খেয়ালও করতো না। আজকাল তা নিয়েও বলে।

—এতো ফোন আসে তোমার? কে এতো ফোন করে?

ইরা হতবাক হয়। এতদিন তিনি কোথায় ছিলেন? দীর্ঘ দিবস আর দীর্ঘ রজনী তিনি যখন তাকে ফেলে অন্য কাউকে নিয়ে মত্ত ছিলেন? তার জবাবদিহিতা নেই ? নাহ নেই।

ইরার মনে হয় জীবনে বিয়েটা আইকা বা গ্লু জাতীয় কিছু। দুটো জীবনকে এক আটকে থাকায় বেঁধে ফেলে। এখানে ইচ্ছা অনিচ্ছার বালাই কমই থাকে। দুটো পরিবার শুধু ঠেলে দেয়। আর তার মত দেখতে হলে তো কথাই নেই। ধরেই নেয় থেকে যাবে। না থেকেই যাবে কই? দু’স্লাইসড পাউরুটির ভেতর ঢুকে পড়া কিছুই হলো আটকে থাকা জীবন। চীজ মেয়নিজ নামের কিছু আভিজাত্য এর মাঝে… আর কি ই বা আছে? ইরা ওর পাশের বাসার দম্পতিদের দেখে অবাক হয়! মাঝে মাঝে কি চ্যাঁচামেচি আবার একসাথে বেরুচ্ছে হাসতে হাসতে ! সে নিজেই পারেনা। সহজে রাগ করেনা যেমন আবার রাগটা এলে যায়ও না। সেজন্যই ওয়াইল্ড ওয়ার ভালো কোল্ড ওয়ারের চেয়ে বোধকরি! ঠাণ্ডা যুদ্ধ করছে সে …হ্যাঁ তাইতো। একেবারেই ফ্রিজিং! আর প্রতিপক্ষ কে? সে নিজেই। এবার নিজের দিকে তাকানো। মধ্যবিত্ত চিন্তার বাইরে কিছু। নারী মানেই বিয়ে আর সন্তানের দায় বহন ? কিন্তু কেন? নারীর অবয়ব আর দৈহিক গঠনই কি আসল বাঁধা ? ঘরে বাইরে রাস্তায় প্রতিহিংসায় কেবল এভাবে শারীরিক অপদস্ত হওয়া ?

ইরা বেরিয়ে পড়ে । সে একজন মানুষ এটাই তার পরিচয়। নিজের কাজ দিয়েই বেঁচে থাকবে সে। গতমাসে পেটের ভেতর বেড়ে ওঠা ভ্রূণকে সে সরিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ , যার অস্তিত্বতে ভালবাসা নেই সে এসে কি লাভ! সেও চায়না আর দায় নিতে কোন। সামনে অনিশ্চিত গন্তব্য… তবুও ইরা বেরিয়ে পড়ে। অন্তত সিদ্ধান্তটা নিতে শিখেছে সে। বাকিটাও পারবে। পারতেই হয়। জীবনটা নিজের সিদ্ধান্ত কেন অন্যের হবে? তা কি হয়? মেয়ে হয়েছে বলে সে কি মানুষ নয় ?

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত