হিয়াকাব্য

হিয়াকাব্য

মধ্যরাতে ভালোই কুয়াশা নামে আজকাল। খুব সম্ভব এটা শীতের আগাম বার্তা। শীতকাল আমার অনেক প্রিয়, তবে এটা সহ্য সীমার মধ্যে থাকে না আমার জন্য। ছোটবেলা থেকেই ঠান্ডার সমস্যা। পুরো শীতকাল আমার নিজেকে একটা মোটা কাপড়ের উষ্ণ আবরণের ভেতর ঢেকে রাখতে হয়। আম্মা জোর করে এভাবে রাখে আমাকে। এটা অসহ্য লাগে। অদ্ভুতভাবে এটাও সত্য যে আম্মার কাছ থেকে সরে শহরে আসলেই আমি এই নিয়মটা মানি না বললেই চলে, এতেকরে শ্বাসকষ্টে একটা রাতও আমি ঘুমাতে পারি না। এজন্য হিয়া আমাকে খুব বকাঝকা করতো। গতবছর শীতে কতো শাসনে রেখেছিল সে আর কী বলবো।

গভীর রাত, ঘুম আসছে না। হিয়াকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, কথা বলতে ইচ্ছে করছে। হিসাব অনুযায়ী আজকে ওর নাইট ডিউটি। বাসা থেকে বের হয়ে মেডিক্যাল রোডের দিকে এগুচ্ছি। ভুলে স্যান্ডেলটা পরে আসিনি। আজ কপালে খারাপ আছে। খুব বকা খেতে হবে হিয়ার কাছে। সোডিয়ামের নিয়ন আলোগুলো কুয়াশায় ঝাপসা লাগছে। আমি ছাড়া আপাতত রাস্তায় কিছু কুকুর আছে। আর একটু সামনে এগুলে মানিক মামার চায়ের দোকান। আমি জসিমউদ্দীন সড়কের এক কিলো সোজা রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়িয়েছি। মেডিক্যাল রোডের মোড়ে মানিক মামা চা বিক্রি করে, চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে।

মাঝরাতে যখন পেশেন্টের চাপ কমে আসে তখন হিয়া বের হয়ে এখান থেকে ওয়ানটাইম গ্লাসে করে দু’কাপ চা নিয়ে আসতো প্রতিদিন। দুজনে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে এক কিলোর রাস্তা ধরে হাঁটতাম। কথা হতো বলতে আমাকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ, শাসন করা এসবই। আমার অনেক ভালো লাগতো। মেয়েটার ভেতর অদ্ভুত একটা মায়া আছে, গোল গোল নিষ্পাপ দুটি চোখ, ঘন কালো মেঘের মতো চুল আর ড্রাকুলার মতো দু’পাশের ছোট দাঁত দুটো। এই মেয়ের দিকে তাকিয়েই হাজার বছর কাটিয়ে দিতে পারি আমি। যেদিন প্রথম দেখি সেদিনই কেনো জানি ওর জন্য আমি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলাম। কতো নিশ্চুপ নিষ্পাপ তার চেহারা। ওর দিকে তাকালেই মনে হয় আজ বৃষ্টি নামবে, সমস্ত শহর আজ ভিজবে সেই বৃষ্টিতে। সবমিলিয়ে কিছু একটা আছে যেটা তার প্রতি আমাকে এতোটা টানে।

কতরাত এভাবেই রাস্তায় কাটিয়েছি তার কোন হিসেব নেই। ভোরে রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে যখন হিয়া ডিউটি শেষ করে বের হতো তখন হয়তো মানিক মামার দোকানের বেঞ্চে বসে বিদ্যুতের খুঁটিতে ঠেসান দিয়ে আমি ঘুমাতাম নতুবা ইমার্জেঞ্জীর সামনে পাতানো চেয়ারে বসে ঘুমাতাম। হিয়া এসেই তার স্টেথেস্কোপের মাথার ছোট অংশটা দিয়ে আমার নাকে ঠোকা দিতো। আমি লাফিয়ে উঠতাম। অনেক অভিমান করে বলতো, “রবিন এসব পাগলামি করে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছো তুমি, কেনো এমনটা করছো? আর কতো?” আমি তখন বলতাম, “আরো অনেক।”
আসো নাস্তা করি। একটা ছোট রেস্টুরেন্টে ঢুকে তেল ছাড়া গরম গরম পরটা ভাজি খেতাম। হোস্টেলে ফিরে পুরোদিন লম্বা একটা ঘুম। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল, হিয়ার ব্যাস্ততা ছিলো অনেক। বাড়িতেও যেতে কখনো দেখেনি এক বছরে। মাঝে দুই ঈদের ছুটিতে হিয়া তার মামা বাড়িতেই কাটিয়েছে।

“এখন রাত ৩:২৩ মিনিট, এখনো হিয়া আসেনি।” আজকে হয়তো হসপিটালে রোগীর অনেক চাপ। ভেতরে গিয়ে দেখবো? নাহ্ ভেতরে যাওয়া নিষেধ আছে। এখানেই থাকি, চলে আসবে। এরকম লেট হয়ই। এইতো সেদিন হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে ফুটপাথে বসে ছিলাম কিছুক্ষণ। এপ্রোনে ভরে রাখা উষ্ণ হাত দুটোর একটি আমি ধরেছিলাম, আঙুলে আঙুল চেপে। হিয়া খুব মায়া ভরে তাকিয়েছিল আমার দিকে। হিয়া কিছু একটা অভিমানের স্বরে আবদার করতে কিংবা লুকানো কোন কথা বলতে চেয়েও যেনো থেমে যায় বারবার। এই মেয়েটার ভেতর কিছু একটা ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। আমি দেখতে পারছি কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না ঠিক। আমি বলেছিলাম,

– “হিয়া তুমি আমাকে বলো তো কি ভাবো সারাক্ষণ? এতো মনমরা হয়ে কেনো থাকো? আমাকে খুব বেশি বিরক্ত লাগছে? বাধ্য করে ফেলছি ভালোবাসতে? আচ্ছা আমাকে একটুও ভরসা করতে পারছো না?” এতটুকু শোনার পর হিয়া আতকে উঠে বলেছিল,

– “আমার বেঁচে থাকার শেষ ভরসাটাই তুমি রবিন। তোমাকে বিরক্ত লাগলে ভেবে নিয়ো এই পৃথিবীতে আমার আর আপন বলতে কেউ নেই। তবে হ্যাঁ ভালোবাসতে তুমি আমাকে বাধ্যই করেছো” এটা বলেই ওর ড্রাকুলা দাঁত দুটো বের করে হেসেছিল। বুঝিনা আমি হিয়াকে। তারপর হিয়া প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে যেতো। মেয়েটা অদ্ভুত। ফুটপাথ থেকে উঠে আবার হাত ধরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমিও সব ক্যাবলার মতো ভুলে গিয়ে ওই প্রসঙ্গেই জয়েন করতাম।

– আচ্ছা রবিন, আমাদের সম্পর্কটার শুরুর দিকটা মনে আছে তোমার?
– কিছুটা।
– ইশ! এতো বিরক্ত করতা তুমি।

প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকতে ক্যাবলার মতো। মাঝে মাঝে তোমাকে ইচ্ছে করতো চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলি। তবে তোমার চোখ দুটো খুব পবিত্র ছিলো। একবার রেগেমেগে আগুন হয়ে বের হয়ে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম টাশিয়ে দিবো একটা থাপ্পড়। যখন নিজের বেখেয়ালে তোমার চোখে তাকিয়েছি, তখন আমার যে কি হয়েছিল আমি নিজেও জানিনা। আমি উল্টো আবার ভেতরে দৌড়ে চলে গিয়েলাম। নিশ্চিত জাদু করেছিলে।

– হাহাহা তাই নাকি? আমি ইনজেকশন অনেক ভয় পেতাম সেজন্য রক্ত দিতেও কলিজা কাঁপতো। যেদিন বন্ধুরা ধরে নিয়ে আসছিলো জোর করে আমাকে। ভয়ে কাঁপতে ছিলাম। তখনই আমি তোমাকে দেখি। তুমি আমার প্রেসার দেখেছিলে। আর তখনই!

– আর তখনই ভালোবেসে ফেলেছো? তাইনা? কি যে সহজ!
– এতোটাও সহজ ছিলো না, তোমাকে অর্জন করতে হয়েছে আমার।
– এই জানো মানিক মামা তোমাকে মেডিক্যাল পাহারাদার বলে ডাকে। হাহাহা
– হুম পঁচাও পঁচাও।
– আই লাভ ইউ রবিন, তুমি অন্যরকম। ক্যানো আসছো আমার লাইফে বলোতো? আমি তো এতো কিছুর আশা কখনো করিনি।

– হুমম আমিও লাভিউ। আর জানিনা কেনো আসছি। এক প্রশ্ন আর ভাল্লাগেনা।
– গাল ফুলে গেছে তাইনা?
– কিছুনা।
– আচ্ছা জানো রবিন, লাস্ট জন্মদিনটা আমার জীবনের স্বার্থক একটা দিন ছিলো। ওই রাতে তোমার হাতে অর্ধেক কেক দেখে আমি অষ্টম আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। হাহাহা
– আবার পঁচাচ্ছো! রাত তিনটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে খুব খিদে পেয়েছিলো তাই অর্ধেকটা খেয়ে ফেলছিলাম।
– হাহাহা তুমি শুধু আমার রবিন, শুধুই আমার।

এখনো হিয়ার আসার কোন নাম নেই। শীতে আমার অবস্থা খারাপ করে ফেলছে। শেষ রাত। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে খুব আমার। তাড়াহুড়ো করে আর গলার মাফলার পরে আসিনি। যেটা হিয়াই আমাকে কিনে দিয়েছিল। সামনে একটা হিজল ফুলের গাছ আছে ওটার নিচে গিয়ে বসলাম। অবশেষে একদিন এখানে বসেই মেয়েটা তার মনের ভেতর লুকোনো কথাগুলো সব শেয়ার করেছিলো।

– আচ্ছা রবিন তুমি আমার লাইফে কিছুটা দিন আগে কেনো আসোনি? এমন একটা সময়ে এসেছো যে না পারছি তোমাকে ঠেলে সরিয়ে দিতে না পারছি চিরদিনের জন্য বুকে টেনে নিতে। আমি চাইনি কোন ভালোবাসা আর। এই পৃথিবী পদে পদে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে আমি কোন কিছুর যোগ্য নই। আমি বেঁচে আছি মরীচিকার মতো। অনেকটা মায়ের জন্যই। ভেবেছিলাম তার আক্ষেপটা কিছুটা গুছিয়ে দেই অন্তত। অদ্ভুত একটা সমীকরণের বেড়াজালে আটকে আছি। মিলছে না।

– কঠিন না করে আমাকে সহজ করে বলে ফেলো হিয়া। কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেতে চাইলে সব ধংস করে ফেলবো।
– তুমি আমার শ্বাসপ্রশ্বাসে আছো রবিন। তোমাকে ছেড়ে যাওয়া মানে বুঝতে পারছো তো? বেঁচে আছি তোমার জন্যই। আবার বাঁচতেও পারছিনা আমি।

জানো আমি আরেকটা ছেলেকে ভালোবাসতাম। হসপিটালেই পরিচয়, একটা বিরল অসুখে ভুগছিলো। কেনো ভালোবেসেছিলাম তাও জানতাম না। এমনটা ফার্স্ট টাইম ঘটেছিল আমার লাইফে। সবকিছুই ঠিকঠাক ছিলো, হঠাৎ করেই রক্ত বমি শুরু হতো। মনে হতো এই বুঝি মারা যাবে। কতো মায়াবী একটা ছেলে, ওর সেবা করতে করতে অনেক আড্ডা হতো আমাদের। ওর পরিবার দেশের বাইরে স্যাটলড্। লুকিয়ে এই দেশে একটা ভ্যাকেশনে চলে আসে। মাটির টানে, কৃত্রিম জীবন আর নিতে পারছিল না হয়তো। তারপর নিজে নিজেই এই হসপিটালে এসে এডমিশন নিয়েছিল। এভাবেই তার প্রতি প্রেমটা হয়ে যায়। আমি বলেছিলাম ওকে “আমি হয়তো আপনার প্রেমে পড়েছি।” ছেলেটা খুব সুন্দর করে হেসে বলেছিলো, “আঘাত পাননি তো?” যাইহোক, মাত্র এক মাস তেরো দিন বেঁচে ছিল। টুপ করে কোন এক ভোরে এসে দেখি স্টেচারে ছেলেটার লাশ। মারা গিয়েছিল। কেঁদেছিলাম সেদিন খুব। মায়ার মানুষ এতো তাড়াতাড়ি লুকায় কেনো, প্রশ্ন জেগেছিল সেদিন। আমার পরিবার থেকে বিয়ে ঠিক করা হলো, বিয়েরদিন আমার বিয়েটাও ভেঙে যায় জানো। কারণটা বিয়ের দেনা পাওনা জাতীয় কিছু একটা নিয়ে বিতর্ক করে।

আমার মা বাবার ডিভোর্স হয়ে যায় দুই বছর আগে। এটাও আমার জন্যই। আমার বাবা আমার মাকে প্রচুর মারতো। প্রতিদিন মারতো, ভয়ে কাঁচুমাচু হয়ে যেতাম আমরা ভাইবোন। তখন অনেক ছোট ছিলাম। দাদী আমাদের আগলে রাখতেন। বন্ধ দরজার সামনে চিল্লায়া দাদী বলতো বাবাকে, “আর মারিস না দুশমনের বাচ্চা। বউটা মইরা যাইবো।” বুঝতাম না বাট খুব কাঁদতাম। না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তাম। মা অনেক রাতে আমাদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে ভাত খাওয়াতো আর ফুঁপিয়ে কাঁদতো। মায়ের চেহারা দেখে ভয় পেয়ে যেতাম। এতো বিচ্ছিরি আঘাত সারা অঙ্গে!

তারপর হলো কি জানো? একবার আমি যখন পেটে ছিলাম, মা চলে গিয়েছিল নাকি মামা বাড়িতে, বাবার মার সহ্য করতে না পেরে। পরে অনেকদিন পর আমার জন্ম হয় একটা ক্লিনিকে। সেখান থেকে বাবা জানতে পারে তার একটা ছেলে হয়েছে। বাট গিয়ে দেখে মেয়ে। সে বিশ্বাস করেনি আমি তার সন্তান। ভেবেছে কেউ তার সন্তান পাল্টে ফেলেছে। সেদিন আরেকটা ছেলে বাচ্চারও জন্ম হয়েছিল সে ক্লিনিকে। এই সস্তা একটা ইস্যুতে আমি কোনদিন বাবার আদর পাইনি। যদিও ভাইবোনদের মধ্যে একমাত্র বাবার চেহারার গঠন আর আমার চেহারার গঠন এক ছিলো, তারপরেও আমার বাবা আমাকে তার মেয়ে হিসেবে কোনদিন মেনে নেয়নি। এটা থেকে প্রতি রাতে মায়ের উপর চলতো অমানবিক অত্যাচার।

ঘটনা এতটুকু পর্যন্ত ঠিক ছিলো। নানা অবহেলায় ঠিকই বেড়ে উঠছিলাম আমি। পরের ঘটনাটা ঘটার পর সমস্ত পৃথিবীর সব আয়োজন আজ মিথ্যে আমার কাছে রবিন। আজো ভাবতে পারিনা সেই রাতটার কথা যে রাতে কিনা আমার বাবা আমার সম্ভ্রমহানী করতে আসছিল। আমি ঠিক এই ঘোর থেকে এখনো বের হতে পারিনি। মা নানু বাড়িতে গিয়েছিলো সেদিন। বাড়িতে আমি আর বাবা। রাতে হঠাৎ কারো স্পর্শে আমার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি আমার বাবা আমার উপরে। বিশ্বাস করো রবিন, তখনো এটাই ভাবছিলাম যে একটা বাবা তার মেয়েকে আগলে রেখেছে এমন কিছু একটা।

তারপরে আর কিছু ব্যাখ্যা করতে পারছিনা রবিন। চিৎকার করার চেষ্টা করেছিলাম অনেক, বাবা আমার গলা টিপে ধরে। গরগর করে শব্দ করে বাবা বাবা বলার চেষ্টা করেছিলাম অনেক। তবে ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যাই। কে জানি এসেছিল বাবাকে খুঁজে। বাবা সেদিন সাবধান করেছিলো এই ঘটনা যেন জীবনেও কাউকে না বলি। বাবার পায়ে পড়ে কেঁদেছিলাম আর বলেছিলাম, “তুমি তোমার মেয়ের সাথে এটা কিভাবে করতে চাইলা বাবা?” সেদিন বিচ্ছিরি একটা গালি দিয়ে বলেছিলো, “তুই আমার মেয়ে না।” পরে বাড়িতে এসে আমার শারিরীক অবস্থা দেখে মা ভয় পেয়ে যায়। আমিও ভয়ে বলে ফেলেছিলাম। শেষে আমার মা’ও আমাকে আর বিশ্বাস করেনি। তারপর এটা নিয়ে বাবা মার আরো বেশি ঝামেলা শুরু হয়। শেষমেশ ডিভোর্স।

মা আর আমি চলে আসি নানু বাড়ি। কতো অযত্নে এতটা পথ আসা, তা যদি বুঝাতে পারতাম! আজ আমার মা প্রতিনিয়ত আমাকে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে। আমার জন্যই নাকি আজ সবকিছু শেষ। আমি কি করেছি রবিন? আমার দোষটা কোথায় ছিলো? বেঁচে থাকার স্বাদ অনেক আগেই ফুরিয়ে যায় আমার। তাও জন্ম জরিমানা কিংবা একটা দায়ে পরে আছি বেঁচে। এটাকে ঠিক বেঁচে থাকা বলে কিনা কে জানে! রবিন আমি বেঁচে থাকলে আমার মেয়ের জন্য তার বাবাকে সেফ ভাবতে পারবো না আর কোনদিন। এতটুকু পর্যন্ত শুনে আমার নিজেকে পুরুষ হিসেবে ভাবতেও লজ্জা করছিলো। হিয়াকে বললাম;

– হিয়া জানো আমার একটা স্বপ্ন ছিলো আমি একটা ফুটফুটে পরীর বাবা হবো। আজকের পর সৃষ্টিকর্তাকে বলবো আমার মেয়েকে যেনো উনি উনার হেফাজতে রেখে দেন। আমি নিজেকে এখন খুব ঘৃণা করছি।

হিয়াকে সেদিন জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম আমরা কালকেই বিয়ে করে ফেলবো চলো। তোমাকে আর একা থাকা লাগবে না। হিয়া অনেকক্ষণ জড়িয়ে আমার বুকে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছিল সেদিন। আমার কাছে একমাস সময়ও চেয়েছিল। “ভোর হয়ে আসছে, ভোরের পাখির দু একটা শব্দ ভেসে আসছে কানে। হিয়া এখনো দেখা করতে আসছে না। আর হয়তো আসবেও না।” খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে আমার। খুব টায়ার্ডও লাগছে আমার। ফুটপাতে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। হালকা ফুঁ দিয়ে ধুলি বালি সরিয়ে শুয়ে পড়লাম। চোখ বুঁজে আসতেছে। মনে হচ্ছে আমার হিয়া আমাকে ডাকছে এখন। সাদা এপ্রোন পরা, খোলা চুল, এইতো দু’হাত দূরে পকেটে হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছুঁতে পারছি না। খুব শাসনের সাথে বলতেছে;

– এখানে শুয়ে আছো ক্যান পাগলের মতো? আর এসব কী পরছো, এই শীতে? পায়ের স্যান্ডেল কোথায়? উঠো বলছি।

– আমি উঠতে পারছি না হিয়া। ঘুমের ঘোরে ঝাপসা দেখছি তোমাকে। আমার আজ ঘুম পাচ্ছে কেনো বলোতো? একটু কাছে আসোনা, আমার হাতটা ধরো একটু। কতোদিন ছুঁই না তোমায়। আমার খুব অসহায় লাগছে।
– আমি আর কাছে আসতে চাইনা রবিন, দোহাই লাগে চলে যাও এখান থেকে।

– এটা কেনো করলে হিয়া? কেনো সবকিছু ঠিকঠাক থাকা সত্ত্বেও আমাকে ছেড়ে চলে গেলে?
– বিশ্বাস করো, উঁচু বিল্ডিংটা থেকে যখন লাফ দেই তখনো আমি তোমাকে ‘ভালোবাসি’ বলেই লাফ দিয়েছিলাম। তোমার ওই দুটো চোখ কল্পনা করেই বাতাসে বেসে উড়ে চলে গিয়েছিলাম। অনেক কথা আমি লুকিয়েও ছিলাম তোমার কাছে। আমি চেয়েছিলাম স্বাভাবিকটাই থাকুক। সেদিন আর এটা বলতে পারিনি, “সম্ভ্রমটা আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। সে রাতে আমি আর বাঁচতে পারিনি আমার জন্মদাতা বাবার কাছ থেকে।”

একটা মাস আমি অনেক ভেবেছিলাম। হিসাব মিলাতে পারিনি, একটাই সমাধান করতে পেরেছিলাম। চলে যাই। বেঁচে থাকলে যদি তোমাকেও নতুন কোন অচেনা রুপে আবিষ্কার করি! নিতে পারবোনা আমি। কতোবার মরবো আর বেঁচে থেকে! ভালোবাসার মানুষ একজন নাহয় পৃথিবীতে থাকুক। যে আমাকে সারাজীবন ভালোবাসবে। জানি অন্যায় করে ফেলেছি, কি করবো বলো? বিচার চাইবো? কার বিচার? মাফ করে দিয়ো।

আমি পৃথিবীর কারো কাছে কোন অভিযোগ করিনি। বাবা নামটাকে কলঙ্কিত করিনি। এই সমাজটাকে নোংরা করিনি। খামোখাই নতুন কোন ইস্যু নিয়ে পাবলিককে খেলা করতেও দেইনি। নিরবে নিভৃতে সবার অগোচরে ডুবে গেলাম। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমার নিয়তিটাই দায়ী। গেলাম রবিন। কোনরকম উঠে হিয়ার পিছু পিছু যাচ্ছি, হিয়া মিশে যাচ্ছে এই পৃথিবীর নোংরা অন্ধকারে। চিৎকার করে বলছি যেয়ো না হিয়া, প্লিজ হিয়া আমাকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গিয়েছে। কিন্তু না, হিয়া এখনো আমার মধ্যেই বেঁচে আছে। আমরা এভাবেই হাঁটি। কথা বলি। দেখা যায়না ছোঁয়া যায়না তবুও আমরা ভালোবাসি। জার্নিটা আবার শুরু করবো আমরা ওপারে, যেখানে পাপের কোন অস্তিত্ব আর থাকবে না।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত