ঝামেলা মন্টু

ঝামেলা মন্টু

আমার বন্ধু মন্টু তার তেরো নাম্বার প্রেমের ইতি ঘটিয়ে আমার মেসের বেডে হেলানি দিয়ে বসে আছে,খানিক্ষন আগেও হাপুস হুপুস নয়নে কাদছিলো এখন কান্না বন্ধ করে বিছানার চাদর দিয়ে কিছুক্ষন পর পর নাক মুছছে আর হেচকি তুলছে।আমি ওকে ঘাটিয়ে আগুনে তেল দিতে চাচ্ছিনা,কারন ওকে এখন কিছু জিজ্ঞেস করা মানে হলো পাক্কা দুই ঘন্টা বসে বসে ওর হাস্যকর করুন প্রেম ভাঙার গল্প শুনতে হবে।আজ মেজাজটা ফুরফুরা আছে,কিছুক্ষন আগে মেসের বড়ভাইকে ফুসলিয়ে দুই প্লেট বিরিয়ানি খেয়ে এসেছি,প্যাকেটে ডার্বি সিগারেটের পাশাপাশি দুটো ব্যানসন ওলটানো আছে,ভেবেছিলাম,রুমে এসে ব্যলকনিতে বসে ক্ষুদ্র সুখ উপভোগ করব তা বুঝি আর কপালে ছিলোনা,এর মধ্যে মন্তু এসে হাজির।ওর বারবার এই প্রেম ভাঙা এবং প্রেমে পড়া স্বভাবের জন্যই আমরা ওর নাম রেখেছি ঝামেলা মন্টু,আসলে নাম রাখা উচিত ছিলো প্রেমিক মন্টু,কিন্তু বন্ধু হয়ে বন্ধুকে এতো বড় সম্মান দেওয়াটা এবং সেটা মেনে নেওয়াটা কষ্টকর,তাই প্রেমকে ঝামেলা ধরে নিয়ে নাম দিয়েছি ঝামেলা মন্টু,আমাদের এই মন্টু যখন নতুন প্রেমে পড়ে তখন আমরা বলিনা যে প্রেমে পড়েছে,আমরা বলি যে মন্টু আবারো ঝামেলায় পড়েছে।

মন্টু আরেকবার আমার বিছানার চাদর নিজের নাকি দলাইমালাই করে তারপর আমাকে বলে উঠলো,বুঝলিরে বন্ধু,আগেরকার বাংলা সিনেমাগুলি একদম বাস্তব বাস্তব কাহিনী দেখাইতো,বাস্তব বাস্তব গান শুনাইতো।

বুঝলাম শালার উপরে বাপ্পারাজের খারাপ আত্না ভর করেছে,এই বেটা এখন নির্ঘাত আমার মাথা খাবে,তাই আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে একটা মুচকি হাসি দিলাম হাসি দেখে যেনো ও আরো সম্মতি পেয়ে বসলো কথা বলার,হেলান অবস্থা থেকে উঠে বসলো সে,বলল,হাসিস না বন্ধু হাসিস না,সত্য কথা বলছি,বিশ্বাস না হয় তুই জসিমের “এ জীবন কেন এতো রঙ বদলায়”গানটা শুইনা দেখ একবার,অরিজিত সিং আতিফ আসলামরে তোর দুধের শিশু মনে হইবো।

আমি বললাম,আর বাপ্পারাজের ব্যপারে কিছু বল।

মন্টু বলল,এই এতোক্ষনে তুই আমার বন্ধুর মতো একটা কথা কইছস,বাপ্পারাজ,আহারে কি এক্টর আছিলো,এক্কেবারে ভার্সেটাইল অভিনেতা যারে বলে।আহারে,প্রেমের সমাধী ভেঙে পাখি যায় উড়ে যায় বইলা একটা টান দিয়া,নদীর পারে ঢালু জমিতে কি গড়ানিই ডা দিছিলো নাইকা শবনমের লিগা,ঐ সিন দেইখাতো আমি জুতা খুইলা নাইকা শবনমরে মারতে গেছিলাম,শালীর বেটি প্রেম করবিনা তো মন নিয়া ছিনিমিনি খেলতে গেলি কেন?আবার বাপ্পারাজের পুতুল বানাইয়া কথাও কইতো,ঐ পুতুল দিয়াই তো বাপ্পারাজরে কালা জাদু করছিলো।

আমি মনে মনে বললাম,কিয়ের লগে কি পান্তা ভাতে ঘি,কিন্তু শালায় এখন তরল অবস্থায় আছে,কিছু উলটা পালটা বলে ফেললে আবার নাকের পানি চোখের পানি এক করে আমার চাদরের বারোটা বাজাবে,ফুটের মামাকে থুথু দিয়ে গুনে গুনে একশ ষাট টাকা দিয়ে এই চাদরটা কিনেছি,ওর মতো ঝামেলার পেছনে চাদর গচ্চা দেওয়ার কোন মনে নেই শালা বলতে থাকুক যা বলছে আমি ওর কথার চুলায় আগুন লাগাতে বললাম,হ বন্ধু হক কথা কইছস,মাইয়ার জাত আসলেই খারাপ,একারনেই কবি বলেছেন,নারী ভয়ঙ্কর,নারী প্রলয়ঙ্কারী।

আমার কথা শুনে মন্টু যেন অথৈ পানিতে থৈ খুজে পেলো,অতি উৎসাহী হয়ে বলে উঠলো,এইজন্যেই বন্ধু বুঝছস,তোরে আমার এতো ভাল্লাগে,মন মেজাজ খারাপ থাকলে বুকের কষ্ট বেশী বাইড়া গেলে,তোর মেসে আইয়া তোর লগে দুইটা সুখ দুঃখের কথা হই,কইলজাডা হালকা হয়।

আমি বললাম,শালা ঝামেলা,তুমি তো ছ্যাকা না খাইলে তো তুমি আমার মিহি ফুস্কিও মারোনা,এমনিতে তোমারে পার্কের চিপায় চাপায় আর রেস্টুরেন্টের কাপল’স কেবিন ছাড়া খুইজা পাওয়া যায়না,তুমি হালা জাতে ঝামেলা তালে ঠিক।

মন্টু বলল,শোন বেটা খোটা দিবিনা,এই মন্টু আর আগের মন্টু নাই,আজ থেকে তোরা দেখবি নতুন মন্টুকে,আজ থেকে আমি পুরাই চেঞ্জ,মুরুব্বি আর নারী দেখলে আজ থেকে আমার মাথা আর ওটা দুটাই নিচু করে রাখব।আর কোনদিন কোন ললসাময়ী ললনা এই মন্টুর নিষ্পাপ হৃদয়কে ক্ষত বিক্ষত করার সুযোগ পাবেনা।আবেগের বাধাডোরে মন্টু আর পড়বেনা।

শালায় দেখি আসলেই একটা ঝামেলা,আমি নিশ্চিত আগামী কালকের মধ্যেই ঐ বেটা আরেকটা প্রেমে পড়বে,বিরক্ত হয়ে আমি মন্টুকে বললাম,অফ যাও মামাতুমি আর এইসব মোটিভেশনাল কাব্যিক কথাবার্তা মারাইয়োনা,তোমারে আমি কোষে কোষে চিনি তোমার এই বিশাল বড় অডিটোরিয়াম এর মতো হৃদয় আগামীকালের মধ্যেই আরেকটা পাখি দখল কইরা হালাইবো,কম তো আর দেখলাম না এই নিয়ে তেরোবার।আর কত খেলা দেখাবি?

মন্টু এইবার একটু লজ্জা পেলো,কথা ঘুরাবার জন্য বলল,আরে বাদ দে ঐসব পুরান কথা,আমাগো গ্রামের রকেট ভাই বুঝছস?বিরাট জ্ঞানী লোক,সুন্দর রাজপুত্রের মতো চেহারা,কাজী নজরুলের সঞ্চয়িতা পুরাটা মুখস্ত,জিগাইলে ফর ফর কইরা বলতে থাকে চুল তার কবেকার অন্ধকার বিধিষার দিশা…

এইবার আমি বাধা দিলাম,আমি নিজে গল্প উপন্যাস পছন্দ করা পাবলিক,ওর ভুলভাল কথা সহ্য করতে পারলাম না,বললাম,শালা চুপ থাক,সঞ্চয়িতা কাজী নজরুলের না রবীন্দ্রনাথের লেখা আর চুল তার কবেকার এইটা জীবন আনন্দ দাশের তুই শালা কিয়ের মইধ্যে কি ঢুকাইতাছস।

মন্টু বলল,আরে ঐ হইলো একটা কথাডা শেষ করতে দে,কথার মাঝে সাইকেল চালানো আমার একদম পছন্দ না।তো যা কইতেছিলাম আরকি আমাগো রকেট ভাই,সে যখন শুনলো আমাগো সম্পর্কের কথা তখনই আমারে কইছিলো “মন্টু তুমি নারী সঙ্গে পড়েছো!নারীতো তোমাকে খেয়ে ছেড়ে দিবে।”

ওর কথা শুনে আমি আর হাসি আটকাতে পারলাম না,হোহো করে হেসে দিলাম,হাসি শুনে মন্টু অসন্তুষ্টি প্রকাস করে বলল,একটা সিরিয়াস কথা কইতাছি তুই বিলিভই করলি না,বিশ্বাস না হয় তুই রকেট ভাইরে জিগা!এই মন্টু মিথ্যা কথা কয়না।

আমি বললাম,রকেট ভাইরে আমি পাবো কই?

মন্টু বলল,আরে ধুর কথার কথা কইছি।রকেট ভাই এটাও বলছিলো বুঝছস?যে “মন্টু প্রেমে পড়েছো,তুমি তো পাগল হয়ে যাবে।”

আমি যথাসম্ভব মুখ গম্ভির রেখে বললাম,অতি নায্য কথা বলছে,আই এপ্রোশিয়েট,ওনাকে বলিস দেখা হলে ওনার পায়ের ধুলা তাবিজ বানিয়ে পড়ব,আর ওনাকে সিগারেট খাওয়াবো,বিড়ি আমার ঠোট ওনার।

মন্টু আবার বিরক্ত হলো,রাগ করে বলল,এই জন্যেই তগো লগে কোন মনের কথা শেহার করিনা,আমার কইলজাডা ছাড়খার হইয়া গেছে কই একটু মলম লাগাবি তা না মজা লইতাছস,কেউ আমার কষ্ট বুঝলোনা,সামিরার(যার সাথে ব্রেকাপ হয়েছে) লিগা যে আমার বুকটা কতো পূড়তাছে তা তোরা বুক কাইট্টা দেখাইলেও বুঝবিনা।

এই বলে সে আবার কাদার প্রস্তুতি নিলো প্রস্তুতি হিসেবে আরেকবার আমার বিছানার চাদরের কোনে নাক মুছলো।

অবস্থা বেগতিক,বেচারা মনে হয় আসলেই কষ্টে আছে,যাই ওকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি,এলাকায় “খাবোই খাবো চাইনিজ রেস্টুরেন্ট এন্ড বিরিয়ানি হাউজ” নামে একটি রেস্টুরেন্ট খুলেছে ওকে নিয়ে ওখান থেকে বিরিয়ানি খাইয়ে আনি,দুপুর বেলায় বড় ভাইয়ের পকেট থেকে বিরিয়ানির পয়সা খসিয়েছিলাম,এখন বোদহয় পাপের ধন প্রাশ্চিত্তেই যাবি।

মন্টুকে বিরিয়ানি খেতে যাওয়ার প্রস্তাব দিলাম,বললাম,আমি ট্রিট দিবো চল।
এই শুনে কিসের ছ্যাকা আর কিসের কষ্ট লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল চল…

আমরা এখন খাবোই খাবো’তে বসে বিরিয়ানী খাচ্চি একটু আগে আমাদের পাশের টেবিলে একটি প্রায় সুন্দরি মেয়ে এসে বসেছে,বিরিয়ানি অর্ডার দিয়ে তারপর সেই বিরিয়ানির ছবি তুলে ফেসবুকে আপলোড করে এখন বিরিয়ানি খাওয়ার সুখ নিচ্ছে,আর মন্টুর চাহুনিতে যা বুঝলাম এই বেটা আবার প্রেমে পড়েছে।আমাদের খাওয়া শেষ আমরা উঠে বিল দিতে গেলাম,আমি বিল দিলাম মনক্যাশ বক্স থেকে একটা কাগজ আর কলম নিয়ে সেখানে কি যেনো লেখতে লাগলো,তারপর সে আবার ঐ মেয়েটির টেবিলের কাছে গিয়ে মেয়েটিকে কাগজটি দিয়ে এলো আমাকে বলল,চল মামা।ওকে কাগজের ব্যপারটি জিজ্ঞেস করতেই এড়িয়ে গেলো,বুঝলাম হয়ত নাম্বার দিয়েছে ঐ মেয়েটিকে বলতে চাচ্ছেনা দেখে ঘাটালাম না।

আমরা বেরিয়ে পড়লা,ওকে ওর মেসের সামনে নামিয়ে দিয়ে আমি মেসে ফেরত এসে গান ছেড়ে বেনসন দুটোর একটি জ্বালালাম।ক্ষুদ্র সুখ উপভোগ করতে করতে হালকা একটা ঘুম দিলাম।

পরশিষ্ট –

ঘন্টা দুয়েক পর ঘুম ভাঙতেই মন্টুকে ফোন দিলাম দেখি শালায় আছে কেমন, ওমা ফোন ওয়েটিং ক্রমাগত তিন চারবার ফোন দেওয়ার পর ফোন রিসিভ করলো,

রিসিভ করেই বলল, শালা দেখছিস না ওয়েটিং একজনের সাথে কথা বলছি,বিরক্ত করছিস কেন?

যাহ শালা আমার বিরিয়ানি খেয়ে আমার উপরেই ফাপর!মেরা বিল্লি মুঝেহি মেও!আমি একটু নরম গলায় বললাম,খোজ নেওয়ার লিগা ফোন দিছি।

মন্টু বলল,চিন্তা করিস না আই এম ওকে।

আমি বললাম, কথা বলছিলি কার সাথে?

মন্টু বলল,ওহ ঐটা তোদের নতুন ভাবি,আমার গার্ল্ফ্রেন্ড সোনিয়া।

আমি বেকুব হয়ে গেলাম,জিজ্ঞেস করলাম,ভাই সারাদিন তো।আমার সাথেই ছিলি,কোথায় কখন কেমনে?

মন্টু এবার রসালো গলায় বলল,মাম্মা রেস্টুরেন্টের ঐ মেয়ে তো কল দিছে আমি মেসে আসার লগে লগে।

আমি বললাম,তা নাহয় দিলো মাগার এর মধ্যে ভাবি আর গার্লফ্রেন্ড কেমনে?

মন্টু বলল,শালা গার্লফ্রেন্ড তো প্রথম এক ঘন্টায় হইয়া গেছিলো,এখন তো বউও বানায় ফেলছি?

আমি বললাম,মানে!

মন্টু বলল,তুই যখন প্রথমবার ফোন দেস,তখন আমরা ঠিক করছি আমাগো বাসা হবে গুলশান রেসিডেন্সিয়াল এলাকায়,তুই যখন দ্বিতীয়বার ফোন দেস তখন আমরা তর্ক করতেছিলাম আমাদের বাসার টিভি কি সোনি কোম্পানির কিনব নাকি এলজি কোম্পানির তৃতীয়বার ফোন যখন দিলি,আমরা তখন ছেলে মেয়ের নাম ঠিক করলাম,চারবারের সময় ফোন যখন তুই দিয়াই যাইতাছস তখন ওয় উম্মাহ দিয়া ফোন কাটসে,এখন ও পড়তে বসবে,ওর জিএসসি পরীক্ষা সামনে,স্কুলে টেস্ট হইতেছে।

আমি একই সাথে স্তম্ভিত এবং হতাশাগ্রস্থ,বেচে থাকার কোন ইচ্ছাই আমার নাই,মন্টুকে বললাম,রাখি মামা,তোমরাই খেইলা যাও,তোমরাই তো খেলোয়ার,মার্কেটে তোমাগো মতো ঝামেলা মন্টুর ভ্যালুই বেশী আমরা তো দুইদিনের মেহমান আইজ আছি কাইল নাই।

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত