কর্মফল

কর্মফল

ষাটোর্ধ্ব বয়সী আরিফ সাহেব এক মনে জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন। আপাত দৃষ্টিতে দেখতে গেলে জানালা দিয়ে দেখার মতো তেমন কিছুই নেই। মাঝে মাঝে দুই একটা সাদা বক দূর আকাশে উড়াল দিচ্ছে। খুব মনোযোগ সহকারে আরিফ সাহেব সেগুলোই দেখছেন। তিনি কোথাও একটা শুনেছিলেন বককে নাকি নিঃসঙ্গের প্রতীক বলা হয়। কথাটা সত্যি কিনা তা অবশ্য তিনি জানেন না। কথাটা কোথায় শুনেছিলেন তাও ঠিক মনে করতে পারছেন না।
কেন যেন বকগুলোর সাথে তিনি নিজের তুলনা করছেন।

ইদানিং তারও নিজেকে খুব একা মনে হয়। তিনি নিঃসঙ্গ হলেও পাখিদের সাথে পার্থক্য শুধু ডানার দিকটাতে। তিনি চাইলেও পাখিদের মতো দূর আকাশে উড়াল দিতে পারেন না। তাই পাখিদের থেকেও অনেক বেশি নিজেকে একাকী মনে হয় তার। পরিবার বলতে আছে শুধু একটা ছেলে। সেও কিনা পড়ে থাকে দূর আমেরিকাতে। সেখানেই নাকি এক আমেরিকান মেয়ে বিয়ে করে নাগরিকত্ব নিয়েছে। মন চাইলে চার-পাঁচ বছর অন্তর অন্তর দেশে ফেরে। তাও আবার দুই দিনের জন্য।

আরিফ সাহেব খুব করে চান সেই দুটো দিন ছেলের সাথে কাটাতে। তার খুব ইচ্ছে করে ছেলের সাথে অনেক অনেক গল্প করতে। ছেলে দেশে ফেরার আগে তিনি কত কিছুই না ভেবে রাখেন। কিন্তু প্রতিবারই তার আশা মাঠে মারা যায়। ছেলে যে তার মহা ব্যস্ত মানুষ। বাবাকে সময় দেওয়ার মতো এতো সময় কোথায় তার। তাছাড়া বৃদ্ধ বাবার সাথে কী কারো বেশিক্ষণ কথা বলতে ভালো লাগে নাকি। আর সেজন্যই হাজার বার কল দেওয়ার পরও ফোন রিসিভ করতে তার বিরক্ত লাগে। বেশিরভাগ সময়ই তাই কল রিসিভ করে বলে, মিটিং-এ আছে। পরে কথা বলবে। আরিফ সাহেবও আশায় বুক বেঁধে থাকেন সেই পরবর্তী সময়ের জন্য, যখন তার ছেলের কল দেওয়ার সময় হবে। কিন্তু না, তার ছেলের কখনোই সেই সময়টা আর হয়ে ওঠে না। তাই বাধ্য হয়ে ছেলেকে আবার কল দেন তিনি। এবার শুধু রিং হয়ে চলে, কিন্তু ফোনটা কেউ রিসিভ করে না।

রোজকার মতো আরিফ সাহেব আজকেও কল দিয়েছিলেন ছেলের কাছে। ছেলের সাথে কথা বলতে যে তার ভীষণ ইচ্ছে করছে। শরীরটাও ইদানিং ভালো যাচ্ছে না। তাই ভেবেছিলেন ছেলেকে একবার দেশে আসতে বলবেন। ছেলেকে দেখার জন্য যে তার মন বড় বেশি আনচান করছে। আজকে আর আরিফ সাহেবের বারবার কল দিতে হলো না। ছেলে প্রথমবারেই কল রিসিভ করে বললো, “যেন তাকে বারবার কল দিয়ে বিরক্ত না করা হয়। সে প্রতিমাসে আগের থেকে আরো বেশি টাকা পাঠিয়ে দেবে। তার পক্ষে দুই দিন পরপর দেশে যাওয়া সম্ভব না। ” বলেই ফোনটা রেখে দিল। আরিফ সাহেবের কিছুই আর বলা হলো না। চোখ দুটো কেমন যেন ছলছল করছে। পুরো পৃথিবীটা কেমন যেন ঝাপসা মনে হচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই পঁচিশ বছর আগের দিনগুলো।

হাসপাতালের বেডেই সময় কাটছে রাবেয়া খাতুনের। তার প্রবাসী স্বামী আরিফ সাহেব মাসে মাসে প্রচুর টাকা পাঠাচ্ছেন স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। হাসপাতাল পাল্টাচ্ছে, হাসপাতালের বেড পাল্টাচ্ছে, ওষুধ পাল্টাচ্ছে, ডাক্তার পাল্টাচ্ছে শুধু পাল্টাচ্ছে না রাবেয়া খাতুনের শারীরিক অবস্থা। শরীর যেন দিনদিন শুধু খারাপের দিকেই যাচ্ছে। রাবেয়া বুঝতে পারছেন তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। তাই খুব করে চাইছেন শেষ সময়টা তার স্বামীর সাথে সুখ-দুঃখের আলাপ করে কাটাতে। কিন্তু তার মহা ব্যস্ত স্বামী তার পাশে বসে গল্প করা তো দূরের কথা, দেশে ফেরারই নাকি সময় হচ্ছে না। তার কাছে যে মৃত্যু শয্যাশায়ী স্ত্রীর সাথে দুটো মিনিট কথা বলার চেয়ে টাকার মূল্য অনেক বেশি। দেশে ফিরতে হলে যে তাকে অনেক টাকার ডিল বাতিল করতে হবে, যা একেবারেই অসম্ভব তার কাছে। শেষ পর্যন্ত তাই নানারকম আক্ষেপ নিয়েই পরপারে পাড়ি জমাতে হলো রাবেয়া খাতুনকে। মৃত্যুর আগে শেষ চোখের দেখাটাও দেখতে পেলেন না।

টাকার চিন্তা যেন আরিফ সাহেবকে ক্রমশই পাগল করে তুললো। তার শুধু চিন্তায় একটা কীভাবে আরও বেশি টাকা উপার্জন করা যায়, কীভাবে আরো বড়লোক হওয়া যায়। তাই তার সহধর্মিনীর পৃথিবী ত্যাগও তার কাছে তুচ্ছ বিষয় বলে মনে হলো। কোনো শোক-তাপই যেন তাকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করলো না। তিনি শুধু ভেবেছেন ছেলেকে কীভাবে ধন-সম্পদের প্রাচুর্যে ভরিয়ে দেওয়া যায়। কীভাবে অভাব তাকে স্পর্শ না করে। কিন্তু সবচেয়ে বড় অভাবটা যে তিনিই দিয়ে ফেলছেন তা তিনি মোটেই উপলব্ধি করতে পারেননি। না চাইতেই তিনি ছেলেকে অনেক কিছুই দিয়েছেন। বাড়ি, গাড়ি কোনোকিছুরই অভাব তিনি বুঝতে দেননি। কিন্তু জীবনে সবচেয়ে বেশি যেটার প্রয়োজন সেটা তিনি ছেলেকে কোনোদিনও দিতে পারেননি। আসলে ভালোবাসা জিনিসটা কী সেটাই তার জানা ছিল না। তার কাছে সুখের অপর নামই ছিল টাকা। তিনি টাকা দিয়ে সুখ কিনতে চেয়েছিলেন। তিনি বুঝতে পারেননি সুখ জিনিসটা আসলে আপেক্ষিক। তাই সুখের পিছে না ছুটে নিজেকে সুখী মনে করাটাই উত্তম।

শেষ বয়সে এসে তিনি বুঝতে পারছেন টাকার চেয়েও সম্পর্কের মূল্য অনেক বেশি। তাই আজ তিনি খুব ভালোভাবেই তার স্ত্রীর কষ্টগুলো উপলব্ধি করতে পারছেন। কেননা তার মতো তার স্ত্রীও যে একসময় আপনজনদের সাথে কিছুটা সময় কাটানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকত। রাবেয়া খাতুনের আকুতি ভরা সেই কণ্ঠটা যেন আজ তার কানে বাজছে। কত কিছুই না বলতে চেয়েছিল, কত গল্পই না জমা করে রেখেছিল, কত অপ্রাপ্তির যন্ত্রনা নিয়েই না তাকে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হয়েছিল। আরিফ সাহেব আজ খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন তার সাথে যা কিছু হচ্ছে সবই তার কর্মফল। যার কর্মফল তাকে তো ভোগ করতেই হবে। এটাই তো স্বাভাবিক।

তিনি বরাবরই চেয়েছেন ছেলে তার অনেক বড়লোক হোক, অনেক নাম করুক। তিনি কখনোই চাননি ছেলে তার মানুষের মতো মানুষ হোক। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য, ভালো থাকার জন্য যে খুব বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই তিনি সেটাও বুঝতে পারেননি। বুঝতে পারেননি বড়লোক হওয়ার চেয়েও বড় মনের মানুষ হওয়াটা বেশি জরুরি। নিজের জন্য আজ তার খুব বেশি আক্ষেপ হচ্ছে। তিনি চাইলেই ছেলেকে ভালোবাসার মানে বোঝাতে পারতেন, সম্পর্কের মূল্য বোঝাতে পারতেন। তাহলে আজকের এই দিন তাকে কখনোই দেখতে হতো না। তিনিই এই সবকিছুর জন্য দায়ী।

কেন জানি বুকের মধ্যে তীব্র যন্ত্রনা হচ্ছে তার। মনে হছে কেউ হাতুড়ি দিয়ে বুকের ভেতর সজোরে আঘাত করছে। নিঃশ্বাস নিতেও খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে তার ছেলের জন্য। ছেলের সাথে দুটো মিনিট কথা না বলতে পারার যন্ত্রনা যেন মৃত্যু যন্ত্রনাকেও হার মানাচ্ছে। পুরো পৃথিবীটা যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখ দুটোতেও যেন নেমে আসছে অমাবস্যার অন্ধকার। আর মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, “শেষবারের মতোও কি আর খোকার দেখা মিলবে না?”

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
গল্প

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত